বাংলা সাহিত্যে নারী-অভিজ্ঞতা, যৌন-রাজনীতি এবং নগর-সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বহু উপন্যাস লেখা হয়েছে; কিন্তু কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের এবং চিত্রাঙ্গদা উপন্যাসিকাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় এ কারণে যে এটি ব্যক্তিগত ট্রমাকে কেবল ব্যক্তিগত রাখে না— বরং সেটিকে সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং এমনকি সভ্যতাগত প্রশ্নে রূপান্তরিত করে। এই রচনায় একদিকে যেমন রয়েছে যৌন নিপীড়নের নগ্ন বাস্তবতা, অন্যদিকে রয়েছে নারীবাদ, শরীরতত্ত্ব, জেন্ডার পরিচয়, ক্ষমতার প্রকৃতি এবং প্রতিরোধের ভাষা নিয়ে গভীর বিতর্ক।
উপন্যাসিকাটি মূলত কয়েকটি আলাদা ঘটনার কোলাজ বা সমান্তরাল ন্যারেটিভের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথমে হলিউড প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টেইন ও অ্যাশলে জাডের ঘটনার উল্লেখ, তারপর ঢাকার কর্মজীবী নারী সালেহার বাসযাত্রা, মডেল হতে চাওয়া তামান্নার অভিজ্ঞতা, এনজিওকর্মী শবনমের ধর্ষণ ও তার আইনি লড়াই—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের “নারী-অভিজ্ঞতার মানচিত্র” তৈরি করে। লেখক দেখাতে চান, স্থান বদলায়, ভাষা বদলায়, শ্রেণি বদলায়—কিন্তু নারীর ওপর ক্ষমতার প্রয়োগের কাঠামো একই থাকে।
উপন্যাসিকার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এর বিষয়বস্তুর নির্মম সততা। লেখক কোনো রাখঢাক করেন না। বাসে সালেহার শরীর স্পর্শ করার দৃশ্যগুলো পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে। এই অস্বস্তি ইচ্ছাকৃত। কারণ লেখক ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখান না; বরং দৈনন্দিন সামাজিক আচরণের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখান। বাসের ভিড়ে নিতম্বে চাপ, স্তনে হাত দেওয়া, “বাসের জার্কিংয়ে এমন হয়”—এই সংলাপগুলো বাংলাদেশের নগর বাস্তবতার এমন এক সত্যকে ধারণ করে, যা আমরা জানি, কিন্তু সাহিত্য সচরাচর এত স্পষ্ট করে বলে না।
এই অংশে সালেহা চরিত্রটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সে কোনো তাত্ত্বিক নারীবাদী নয়, কোনো আন্দোলনকারীও নয়। সে মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারী, যে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে। তার প্রতিরোধ সীমিত—কিছু কড়া কথা বলা পর্যন্ত। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলে। লেখক দেখিয়েছেন, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে ধীরে ধীরে প্রতিবাদহীন করে দেয়।
অন্যদিকে তামান্নার অভিজ্ঞতা নারীদেহের পণ্যায়নের আরেক রূপ তুলে ধরে। মিডিয়া জগতে “ব্যবহার” শব্দটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রওনক খন্দকারের ভাষা, শরীরী আচরণ, প্রশিক্ষণের নামে স্পর্শ—সবকিছু মিলিয়ে ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষার এক নোংরা খেলাকে লেখক উন্মোচন করেছেন। এই অংশে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, লেখক সরাসরি সহিংসতা দেখান না; বরং ধীরে ধীরে মানসিক ফাঁদ তৈরি করেন। রওনক প্রথমে প্রশংসা করে, তারপর পরামর্শ দেয়, এরপর শরীর “সংশোধন” করতে শুরু করে। এই ক্রমবিকাশ বাস্তব এবং ভয়াবহ। কারণ যৌন ক্ষমতা প্রায়ই সহিংসতার ভাষায় নয়, “ক্যারিয়ার”, “সুযোগ”, “গ্রুমিং” ইত্যাদির ভাষায় কাজ করে।
তবে উপন্যাসিকার কেন্দ্রীয় চরিত্র নিঃসন্দেহে শবনম। তিনি শুধু ভিকটিম নন; বরং চিন্তক, বিতার্কিক এবং প্রতিরোধী সত্তা। তাঁর চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক উপন্যাসটিকে নিছক সামাজিক বাস্তবতার বর্ণনা থেকে দার্শনিক বিতর্কে উন্নীত করেছেন। শবনমের বক্তব্য—“মেয়েদের শরীরই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে”— আসলে সিমন দ্য বোভোয়ারের বিখ্যাত উক্তি “One is not born, but rather becomes, a woman”-এর বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছে। এই বিতর্ক বাংলা কথাসাহিত্যে সচরাচর দেখা যায় না।
এখানে হাসনাত আবদুল হাইয়ের সাহস প্রশংসনীয়। তিনি নারীবাদকে একরৈখিকভাবে উপস্থাপন করেননি। বরং শবনমের মাধ্যমে নারীবাদের ভেতরের মতভেদও সামনে এনেছেন। শবনম মনে করে, নারী হওয়ার সামাজিক নির্মাণের চেয়েও শরীরের জৈবিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, নারীদেহের নির্দিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গই পুরুষের কামনা ও ক্ষমতার কেন্দ্র। ফলে নারীদেহ জন্মগতভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। এই বক্তব্য বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু সাহিত্যিকভাবে তা শক্তিশালী, কারণ এটি পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।
উপন্যাসিকায় সংলাপ একটি বড় শক্তি। দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক, মতের সংঘর্ষ, সামাজিক বিশ্লেষণ— সবই সংলাপের মাধ্যমে এসেছে। কোথাও কোথাও এই সংলাপ অতিরিক্ত তাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে, যেন চরিত্র নয়, লেখক নিজেই কথা বলছেন। বিশেষত শবনমের বক্তব্যগুলো অনেক সময় প্রবন্ধধর্মী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো বিরক্তিকর হয় না। কারণ চরিত্রটির মানসিক গঠনই এমন— সে চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে, তর্ক করে।
তবে এই আঙ্গিকের একটি দুর্বলতাও আছে। অনেক জায়গায় উপন্যাসিকার ন্যারেটিভ থেমে গিয়ে “বক্তব্য” প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষত চিত্রাঙ্গদা সিনেমা নিয়ে শবনমের বিশ্লেষণ বা সিমন দ্য বোভোয়ার প্রসঙ্গের আলোচনায় কাহিনির গতি কমে যায়। পাঠকের মনে হতে পারে, তিনি যেন উপন্যাস নয়, একটি দীর্ঘ বিতর্কপত্র পড়ছেন। কিন্তু এটিই সম্ভবত লেখকের সচেতন কৌশল। তিনি গল্পের চেয়ে “চিন্তা”কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আঙ্গিকগতভাবে উপন্যাসিকাটি কোলাজধর্মী। আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর চিত্র তৈরি করে। এই নির্মাণরীতি সমকালীন। এখানে প্রচলিত প্লটের ধারাবাহিকতা নেই; বরং বিষয়গত ঐক্য আছে। হার্ভে ওয়েনস্টেইন থেকে মহাখালীর বাস— এই সংযোগ দেখিয়ে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, যৌন ক্ষমতার রাজনীতি বিশ্বজনীন।
উপন্যাসিকাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “দেখা” ও “অদৃশ্য উপস্থিতি”-র মোটিফ। বারবার একটি বাক্য ফিরে আসে—“আমি তার সঙ্গে থাকি। সে আমাকে দেখে না।” এই “আমি” কে? প্রত্যক্ষদর্শী? বিবেক? ইতিহাস? সমাজ? নাকি লেখক নিজেই? এই অস্পষ্ট উপস্থিতি রচনাটিকে এক ধরনের অতিবাস্তব আবহ দেয়। যেন নারীদের অভিজ্ঞতার এক নীরব সাক্ষী সবসময় পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
শবনমের সেক্স চেঞ্জ করার আকাঙ্ক্ষা উপন্যাসিকার সবচেয়ে বিতর্কিত এবং জটিল অংশ। এখানে লেখক আসলে ট্রান্সজেন্ডার অভিজ্ঞতার বাস্তব চিত্র আঁকেননি; বরং “পুরুষ হওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন”-এর ধারণাকে প্রতীকীভাবে ব্যবহার করেছেন। শবনমের মনে হয়, পুরুষ হয়ে উঠতে পারলেই সে প্রতিশোধ নিতে পারবে। এই মানসিকতা তার ট্রমার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু লেখক এখানেই থেমে থাকেন না। সার্জন আলম চরিত্রের মাধ্যমে তিনি এই আকাঙ্ক্ষাকে মনস্তাত্ত্বিক ও চিকিৎসাবিদ্যাগত প্রশ্নে নিয়ে যান।
এই অংশে উপন্যাসিকাটি একধরনের মেটা-টেক্সচুয়াল স্তরে পৌঁছে যায়। ঋতুপর্ণ ঘোষের চিত্রাঙ্গদা সিনেমার সমালোচনার মধ্য দিয়ে লেখক আসলে জেন্ডার, শরীর ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। শবনম মনে করে, “সিন্থেটিক উওম্যান” ধারণাটি নারীত্বকে অপমান করে। তার দৃষ্টিতে, পুরুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য শরীর বদলানোও একধরনের আত্মসমর্পণ। এই বক্তব্যের সঙ্গে পাঠক একমত না-ও হতে পারেন, কিন্তু এটি গভীর আলোচনার জন্ম দেয়।
উপন্যাসিকার ভাষা সরল, সংলাপনির্ভর এবং সাংবাদিকতামূলক। এতে কাব্যিকতা কম, কিন্তু গতি আছে। লেখক দৃশ্য নির্মাণে দক্ষ। বিশেষত বাসের ভিড়, আদালতের কোলাহল, মিডিয়া অফিসের উজ্জ্বল আলো— এই সব দৃশ্য খুব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে কোথাও কোথাও ভাষা অতিরিক্ত ব্যাখ্যামূলক। লেখক পাঠককে নিজে ভাবার সুযোগ কম দিয়ে অনেক কিছু সরাসরি বলে দেন।
চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে শবনম সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ। সালেহা ও তামান্না তুলনায় বেশি প্রতীকী। তারা নারীজীবনের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি। শবনমের ভেতরে দ্বন্দ্ব আছে, রাগ আছে, বুদ্ধিবৃত্তিক তাড়না আছে। ফলে সে বেশি জীবন্ত। সার্জন আলম বা ব্যারিস্টার শমসেরের মতো পার্শ্বচরিত্রও স্মরণীয় হয়ে ওঠে সংলাপের কারণে।
উপন্যাসিকার সমাপ্তি নাটকীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। শবনমের ওপর হামলা এবং হাসপাতালের সামনে মানুষের রক্ত দিতে ভিড়— এই দৃশ্য লেখককে একধরনের আশাবাদী রাজনৈতিক জায়গায় নিয়ে যায়। ব্যক্তিগত লড়াই তখন সামাজিক প্রতিরোধে রূপ নিতে শুরু করে। “আমরা আশা রাখি”—এই বাক্য শুধু চিকিৎসাবিষয়ক নয়; বরং সামাজিকও।
তবে উপন্যাসিকার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পুরুষ চরিত্রগুলো প্রায় সম্পূর্ণ নেতিবাচক। তারা হয় শিকারি, নয় ক্ষমতালোভী। এই একরৈখিকতা বাস্তবতার জটিলতাকে কিছুটা কমিয়ে দেয়। আবার অনেক জায়গায় তত্ত্ব ও বক্তব্য চরিত্রকে ছাপিয়ে গেছে। বিশেষত শবনমের দীর্ঘ সংলাপগুলো কখনো কখনো উপন্যাসিকাকে প্রবন্ধে রূপ দেয়।
তারপরও এবং চিত্রাঙ্গদা সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। কারণ এটি কঠিন প্রশ্ন তোলে। নারীদেহ কি কেবল আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্র? আইন কি সত্যিই নারীর সুরক্ষা দেয়? নীরবতা কি অপরাধকে টিকিয়ে রাখে? ক্ষমতা কি জেন্ডারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত?
সবচেয়ে বড় কথা, এই উপন্যাসিকা পাঠককে আরাম দেয় না। এটি অস্বস্তি তৈরি করে। আর সত্যিকারের রাজনৈতিক সাহিত্য প্রায়ই সেটাই করে— পাঠকের নিশ্চিন্ত অবস্থান ভেঙে দেয়। হাসনাত আবদুল হাইয়ের এবং চিত্রাঙ্গদা সেই অর্থে শুধু একটি উপন্যাসিকা নয়; এটি সমকালীন সমাজ, শরীর ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ জিজ্ঞাসা।






