মানবীয় শ্রেষ্ঠত্ব কীভাবে সত্যায়ত হতে পারে? একক ব্যক্তি-মানবের শারীরিক-মানসিক-আত্মিক পুণ্যাভ-পূর্ণতা যখন তাঁর চতুষ্পার্শ্বের মানবমণ্ডলী, আন্যান্য প্রাণী-উদ্ভিদ-বৃক্ষের সত্তা-পোষণার সংরক্ষক হয়, তখনই কি তাকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করতে হবে? … হ্যাঁ। কথাটা ঠিক। একক মানবকেই হ’য়ে উঠতে হবে শ্রেয়োদীপ। আর, তাহ’লেই পরিপার্শ্বের অন্যান্য মানব, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বৃক্ষের জীবনধারার দীপান্বিত হবে, সকলের সত্তা হবে পুষ্ট।
বস্তুতঃ উপর্যুক্ত কথাগুলোর সূত্রধারাই মানবীয় প্রগতিপন্নতার আকর। সামাজিক ন্যায়ের বিকাশ পুরুষানুক্রমে এই শৈলীতেই সপ্রাণ হয়ে থাকে। এর কোনো ব্যত্যয় নেই। পৃথিবী তাবৎ মানবের জীবনধারার যা-কিছু ভালো, তা এই সত্যেরই প্রভাস্বরূপ। মহাজনের চিন্তাপটে ধৃত সজীব বার্তা :
‘যা জীবনের জন্য গভীরভাবে সত্য তা অমর….’।১
এখন প্রশ্ন হলো: একক সত্যদীপ মানব কোন্ কোন্ চিন্তাকর্ম-প্রকরণে সংশ্লিষ্ট হ’তে পারেন? সঙ্গত উত্তর হলো :
ক. তিনি তাঁর কালনিষিক্ত ভাষাশ্রয়ে স্ব-সমাজ তথা স্বদেশের জনমনদ্যুতিকে প্রলম্বিত করতে পারেন, যা সাহিত্যাঙ্গনের অঙ্গভূষণ হ’তে পারে।
খ. তাঁর মুখঃনিঃসৃত ভাষণ স্বদেশী জনজীবন-নির্দেশনার রূপ পরিগ্রহ করতে পারে।
উল্লেখ্য, সাহিত্যের ধ্যানময় অবয়ব হলো ‘গদ্য’। ‘গদ্য’ শব্দের ব্যুৎপত্তি: গদ্ [ = কথনে]+য (র্ম)’।২ ‘কথন’ বা ‘বক্তব্য’-এর ওজস্বিতাই এখানে মূল বিষয়। প্রতিভাদীপ মানবের সুস্থিত পর্যবেক্ষণ এবং অমলিন প্রজ্ঞাকর্ষণার ক্ষেত্র হ’লো গদ্যশরীরী ‘প্রবন্ধ’।
‘দেশপ্রেম’ শব্দটি ‘দেশ’ ও ‘প্রেম’-এর যৌথ প্রতিবেদন। ‘দেশ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিঃ দিশ্ (নির্দেশ)+ অ = পৃথিবীর অংশবিশেষ।৩ ‘দেশ’ বস্তুতঃ একটি নির্দিষ্ট ভূখ-; মানুষই যার আত্মা। সেখানে থাকবে প্রগতিপুষ্ট পরিকল্পনার পট। ‘প্রেম’ শব্দের ব্যুৎপত্তি : প্রিয়+ইমন্=অনুরাগ, প্রীতি, ভালোবাসা।৪ আবার‘প্রিয় শব্দের ব্যুৎপত্তি:প্রী (তুষ্ট করা)+অ = প্রীতিজনক, ভালোলাগে এমন (প্রিয়কর্ম); ভালোবাসা হয়-এমন।৫
বস্তুতঃ দেশের সর্বৈব সমুন্নতির লক্ষ্যে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ চিন্তাকর্ম-প্রযুক্তি প্রয়োগের মধ্যেই দেশপ্রেমের সার্থকতা প্রতিপন্ন হতে পারে। আমাদের দেশ-বাংলাদেশ-মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এদেশ এক প্রসন্ন প্রাণাগার। এখানে সম্পুষ্ট এক আত্মদীপ্ত জনগোষ্ঠী। কখনো ‘প্রকৃতি বৈরী হয়েছে, পশ্চিম থেকে পুব থেকে দূর দেশ থেকে বহিরাগত দস্যুশক্তি লুণ্ঠন করেছে সমগ্র দেশ। কখনো বা মাৎস্যান্যায়ে ছেয়ে গেছে জনপদের পর জনপদ। শতাব্দীব্যাপী দুঃশাসন দাস করে রেখেছে জনপদবাসী মানুষদের। তবু পূর্বপুরষ আমাদের পিতা-পিতামহ-প্রপিতামহ শেষ-অবধি হার মানেননি। প্রচ- প্রতিকূলতার মুখেও আপন স্বকীয়তা, আপন সংস্কৃতির প্রাণশক্তি জিইয়ে রেখেছেন। আমাদের একালের ইতিহাসের লেখনও তাই।’৬
উপর্যুক্ত গদ্যায়ত কথামালা বিশ্বস্ততায় সজীব। এতে বাঙালীর ঐতিহ্যের অবয়ব, সংগ্রাম-শুদ্ধ মননধর্ম আর স্বাদেশিকতার প্রগাঢ় রূপই বিভাসিত। এতে বাঙালীর নব্বই দশকীয় অত্যাধুনিক চিন্তা-জ্যোতিরই আবেশ। যদিও আত্মসমুত্থান-প্রক্রিয়া: মাতৃভাষাশ্রয়ী প্রকাশ-অভিনবত্ব রবীন্দ্রনাথের আগে পর্যন্ত ছিলো অনুপস্থিত। ‘রবীন্দ্রনাথের আগে পর্যন্ত সব বাঙালী লেখকই তাঁদের বিদেশী প্রকাশভঙ্গীর বেমানান প্রচেষ্টা নিয়ে ধস্তাধস্তি করতেন। ……..রবীন্দ্রনাথ তাঁদের শক্তিশালী ও স্বাধীন করেছেন। তিনি ভাষা সৃষ্টি-বা নতুন ক’রে সৃষ্টি করেছেন এক অমর গৌরবের বস্তু।’৭
মানবতার ত্রিবিধ ‘বৃহৎ’ ভাব: ‘সত্য ও ন্যায়ের জন্য স্বার্থত্যাগ, দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাসের জন্য আত্মত্যাগ, কর্তব্য পালনের জন্য চরম দুঃখ-ক্লেশ বরণ।’৮ কিন্তু, ‘পনের আনা’ মানবের অন্তঃপটে কি এই ‘বৃহৎ’ ভাব ‘বৃহৎ’ মানব অর্থাৎ কর্মচিন্তাপ্রজ্ঞাধীন সীমিত ঘটে সংখ্যক মানবেরই অধিকারে থাকে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আত্মদীপ্তির পটশ্রীই খুঁজে পায় না।…এই-ই বাস্তবতা। অসম আর্থসামাজিক বিন্যাস বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীকে অন্ত্যজ করে রেখেছে। ‘সমাজের বিন্যাস এবং উন্নতি কোন দেশেই আজ পর্যন্ত এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছায়নি যে, সেখান থেকে ব্যক্তি মানুষের সব রকম নিরাপত্তার অভাববোধ এবং উৎকণ্ঠা দূর হয়ে যাবে।’৯
প্রেমদীপ বুদ্ধিজীবী-সাহিত্যিকের গদ্যায়তনিক অনুভবচর্চা-পরিসরে উপর্যুক্ত সত্যশাশ্বতী সম্পদেরই সঞ্চয়ন সংরক্ষিত হয়। ভাষাবোধ ও পর্যবেক্ষণী অভিজ্ঞতা…এই দুই-এর উদ্গমেই সত্য সুস্নিগ্ধ হয়, হতে থাকে- হতে থাকে। প্রক্রিয়াটি এমন: ‘প্রেমের শতদল পদ্ম অহংকারের বৃন্ত আশ্রয় করে আত্ম হতে মানবে, মানব হতে সমাজে, সমাজ হতে দেশে; দেশ হতে মানবে, মানব হতে বিশ্বাত্মায় ও বিশ্বাত্মা হতে পরমাত্মায় একটি একটি করে পাপড়ি খুলে দিয়ে বিকাশের লীলা সমাধান করছে।’১০
তথ্যসূত্র
১. কাজী আবদুল ওদুদ, ‘সাহিত্যিকের সাধনা’ (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতিতে পঠিত), আবদুল হক (সম্পাদিত), কাজী আবদুল ওদুদ-রচনাবলী (প্রথম খ-), প্রথম প্রকাশ; ঢাকা :বাংলা একাডেমি, ১৯৮৮, পৃ ১৪২।
২. শৈলেন্দ্র বিশ্বাস (সংকলিত), সংসদ বাঙ্গালা অভিধান, চতুর্থ সংস্করণ (ঊনবিংশ মুদ্রণ), কলিকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৯৯৫, পৃ. ১৯০।
৩. কাজী আবদুল ওদুদ, ব্যবহারিক শব্দকোষ, ১ম খ-, প্রথম প্রকাশ (দ্বিতীয় সংস্করণ); কলিকাতা: শ্রীজগদীশ প্রেস, ১৩৬৭ বাং, পৃ. ৪৮০।
৪. ঐ পৃ.৬৫২।
৫. ঐ পৃ. ৬৫১।
৬. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ‘কথামুখ’, আবহমান বাংলা (সম্পাদিত),প্রথম প্রকাশ (পুনর্মুদ্রণ), ঢাকা, ১৯৯৩।
৭. রমাঁ রলাঁ, ভারতবর্ষ (দিনপঞ্জী : ১৯১৫-১৯৪৩) অক্টোবর, ১৯২৬- এর একটি দিনপ্ঞ্জুী। বঙ্গানুবাদ (ফরাসী থেকে) : অবন্তীকুমার সান্যাল, প্রথম বাংলা সংস্করণ (দ্বিতীয় মুদ্রণ); কলিকাতা : র্যাডিক্যাল বুক ক্লাব, ১৯৮৯, পৃ.১৬১।
৮. দ্রষ্টব্য; রশীদুল আলম, ‘বিশ্বদেবতা’, রবীন্দ্রকাব্যে ‘আমি’র ক্রমবিকাশ, প্রথম প্রকাশ; ঢাকা :বাংলা একাডেমী. ১৯৯৮৮, পৃ ২৯৫।
৯. জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাকাব্য ও মৌলবাদ, প্রথম প্রকাশ: কলিকাতা: এলাইড পাবলিশার্স লিমিটেড, ১৯৯০, পৃ. ১৪৯।
১০. রবীন্দ্র রচনাবলী (১৩শ খ-), বিশ্বভারতী সংস্করণ, পশ্চিমবঙ্গ, পৃ. ৫৩২।






