মানুষ-মাত্রই একটা সময়ের প্রতিনিধি। যে সময়টা সে অতিক্রম করে, যে জীবন যাপন করে— তার ভেতরে আলো ফেলার মতো উপাদানের কমতি থাকে না। প্রয়োজন শুধু দেখার মতো একজোড়া চোখ। কবি-সাহিত্যিকেরা এ কারণেই নমস্য যে তারা সময়ের অলিগলিতে আলো ফেলতে জানেন। টেনে-হিঁচড়ে এমন সব ঘটনা বের করে আনেন যা সাধারণের দৃষ্টিতে হয়তো অধরাই রয়ে যেত! এই কাজটাও আবার সবাই একভাবে করেন না। একেকজনের কৌশল একেকরকম। বঙ্গীয় সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে পাঠকের সামনে এনে হাজির করার বিরল কর্ম সাধন করেছেন যে কয়জন হাতেগোনা সাহিত্যিক তাদের মধ্যে আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) অন্যতম।
দীর্ঘ ৮১ বছরের সংগ্রামমুখর ও কর্মবহুল জীবনে বিচিত্র সব দায়িত্ব পালন করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। রাষ্ট্রীয় উচ্চপদেও সমাসীন হয়েছেন। খুব কাছ থেকে পরখ করার সুযোগ হয়েছে মানুষের জীবন, সমাজের গতিবিধি, ধর্মীয় সমস্যা প্রভৃতি। সাহিত্য যদি মানবজীবনের অকৃত্রিম ভাষ্য হয়, তবে আবুল মনসুরের প্রায় সব রচনা ধর্তব্য হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন মূলত ধর্ম ও রাজনীতিসচেতন গদ্যশিল্পী। পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের জনজীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি সর্বদাই হয়ে উঠেছে তাঁর রচনার মূল জীব্য। এই ভূ-খণ্ডের মানুষের জীবনের এক গভীর ও অমূল্য চিত্রই অঙ্কিত হয়েছে তাঁর রচনায়। মানুষের বিশ্বাসের গলদ কিংবা ভুল বিশ্বাসকে সাহিত্যের বিষয় বানিয়েছেন সচেতনভাবে। সে দিক দিয়ে তিনি একজন সমাজশিল্পীও বটে! ভাষার ব্যবহারেও আবুল মনসুরের বাছবিচার ছিল না। আরবি-ফার্সি-ইংরেজি-হিন্দি শব্দের সঙ্গে লোকজ শব্দের চাতুর্যপূর্ণ বহুল ব্যবহার দেখা যায় তাঁর রচনায়। সমকালীন বাস্তবতাকে ধরার জন্য ভাষার এই মিশ্র ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল বৈ-কি! তিনি তা করেছেন অকুণ্ঠভাবে। সবচেয়ে বড় কথা, তৎকালীন সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট, তীক্ষ্ণ ও গভীর জ্ঞান ছিল। তাঁর গল্পগুলোতে এমন সব বিষয়ের সম্মিলন ঘটেছে, যা এই ব্যাপকতারই সমার্থক।আবুল মনসুর আহমদের প্রকাশিত গ্রন্থ হতে ৩২টি গল্প বাছাই করে ‘আবুল মনসুর আহমদের শ্রেষ্ঠ গল্প’ আকারে মলাটবন্দী করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন। বইটির শুরু হয়েছে ভণ্ড পীরের মুখোশের ভেতরকার মানুষকে চেনানোর প্রয়াসে ‘হুজুর কেবলা’ গল্প দিয়ে। যেখানে এমদাদের মতো হীনমন্যতায় ভোগা শিক্ষিত তরুণকে হুজুরের মুরিদ বানানো এবং শেষমেশ পীরের ভণ্ডামিতে প্রতিবাদী হয়ে ওঠার পরিণাম দেখানো হয়েছে। একটু চোখ মেললে আজও আমাদের আশেপাশে এমন মুখোশধারী পীরের দেখা পাওয়া যায়।
‘গো-দেওতা-কা দেশ’ গল্পে হিন্দু-মুসলমান বিবাদ এবং তার রূপক পরিণতি বিবৃত হয়েছে। ‘নায়েবে নবী’ও ধর্মীয় পটভূমিতে রচিত। গ্রামের দুই মৌলানার বিবাদ, মাযহাবকেন্দ্রিক বিরোধিতা, ওয়াজের মজলিসে নিজেদের অজ্ঞতাকেই প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত মরদেহের জানাযা পড়ানো নিয়ে মতভেদ গল্পটিকে এমন এক রূপ দিয়েছে, যা আজকের দিনেও দুর্লভ নয়।
‘লীডরে-কওম’ গল্পেও মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরে নানামুখী কূটকৌশলের প্রয়োগ এবং তার ফলে ইসমাইল সাহেবের মতো অযোগ্য ও সুযোগসন্ধানী মানুষের ধর্মীয় নেতা বনে যাওয়ার ঘটনা আমাদেরকে বিস্মিত করে। ‘মুজাহেদীন’ ‘বিদ্রোহী সংঘ’ এবং ‘ধর্ম-রাজ্য’ গল্প তিনটিও ধর্মের ভেতরের কোন্দল, খেলাফত ও হিন্দু-মুসলমান বৈরিতাকে জীব্য করে রচিত হয়েছে। আবুল মনসুর আহমদের গল্পে ঘুরেফিরে ধর্ম এসেছে, কিন্তু তা সাম্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হতে পারেনি। তার পরিবর্তে অশান্তি, হানাহানি, রক্তপাতের ‘কারণ’ হয়ে উঠেছে। এ জন্য ধর্ম দায়ী নয়, ধর্মকে যারা প্রচার ও প্রয়োগ করার দায় নিয়ে বিচরণ করে তাদের অজ্ঞতা, স্বার্থলোলুপতা সর্বোপরি অন্যের ওপর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা মুখ্য হয়ে ধরা দেয়। এই সময়ে এসেও ধর্ম নিয়ে এই বিবাদ ও বিভেদ কিছুমাত্র কমেনি।
এরপরের গল্পগুলোর মধ্যে ‘ফুড কনফারেন্স’ ‘সায়েন্টিফিক বিযিনেস’ ‘লঙ্গরখানা’ ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ ‘গ্রো মোর ফুড’ ‘মিছিল’ ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ ‘জনসেবা য়ুনিভার্সিটি’ মূলত পলিটিক্যাল স্যাটায়ার। গল্পগুলোর ধার মারাত্মক। মূল ভাবধারা একই জায়গায় এসে মিলেছে; তা হলো— সমাজের সুবিধাবাদীদের স্বার্থন্বেষী রূপ।
গল্পগুলোর সময়কাল বাংলা ১৩৫০-১৩৫৪ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এর উপজীব্য। দুর্ভিক্ষে মানুষের মানবেতর জীবন তার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থপরতা, উদাসীনতা ক্ষেত্রবিশেষে নির্বুদ্ধিতা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার— এ সবই ফুটে উঠেছে গল্পগুলোতে। সময়কাল আজ থেকে বহু বছর আগে হলেও, আজও গল্পগুলো ঠিক একইরকম প্রাসঙ্গিক।
সমস্যা সমাধানের ভার যাদের ওপর অর্পিত, সেই ব্যক্তিরাই যখন সমস্যার নেপথ্যে থাকেন তখন কেমন দৃশ্যের অবতারণা হতে পারে, তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘ফুড কনফারেন্স’ গল্পটি। লেখকের ভাষায়, ‘ভদ্রলোকেরা বারবার যা করে থাকেন, করাও হলো তা। অর্থাৎ, সভা ডাকা হলো। এ দেশে দেশদ্রোহীরাও দেশোদ্ধারের জন্য স্বাধীনতা-সম্মিলনী ডাকেন; দজ্জাল স্বামীরাও নারীরক্ষার জন্য নারীসম্মিলনীতে সমবেত হন; চামড়ার ব্যাপারীরাই গো-হত্যা বন্ধের জন্য কাউ-কনফারেন্সের প্রধান উদ্যোক্তা।’ সমাজ বাস্তবতায় রাজনীতিকে দেখার দুর্দান্ত মানস ছিল আবুল মনসুরের। ‘বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধে’ ‘অনারেবল মিনিস্টার’ ‘আহা! যদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতাম’ গল্পগুলোতেও রাজনৈতিক ফয়দা হাসিলের আকাঙ্ক্ষা এবং তৎপরবর্তী প্রেক্ষাপট ঘুরেফিরে এসেছে।
‘আদু ভাই’ আক্ষরিক অর্থেই আমাদের নস্টালজিক করে দেয়। ছেলেবেলা থেকেই আদু ভাইয়ের কাহিনি শুনে এসেছি। গল্প শুনে হেসেছি ঠিকই কিন্তু কোথায় যেন একটা কষ্টের অনুভূতি জেগে উঠত। এখনও একই রকম হাস্যকর এবং হাহাকারজাগানিয়া অনুভূতি হয় আদু ভাইয়ের জন্য। ‘আদু ভাই’ যাঁর হাতে তৈরি, সে লেখকের সার্থকতা প্রমাণ করতে আর কী লাগে! বইয়ের বাকি গল্পগুলোর মধ্যে ধর্মীয় ইতিহাসভিত্তিক ও কিশোর উপযোগী কিছু গল্প রয়েছে যা উপস্থাপনের কারণেই রসময় হয়ে উঠেছে। তাঁর গল্প পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, এ যেন কেবল আবুল মনসুরের পক্ষেই সম্ভব! কাজী নজরুল ইসলামও দ্বিমত না করে যথার্থই বলেছেন, ‘ব্যঙ্গ-সৃষ্টিতে অসাধারণ প্রতিভার প্রয়োজন। এ যেন সেতারের কান মলে সুর বের করা—সুরও বেরুবে, তারও ছিঁড়বে না।… বন্ধু আবুল মনসুরের হাত-সাফাই দেখে বিস্মিত হলুম। ভাষার কান মলে রস সৃষ্টির ক্ষমতা আবুল মনসুরের অসাধারণ। এ যেন পাকা ওস্তাদী হাত।’
পরিশেষে বলতে হয়, এমন মূল্যবান বইয়ের বানান ও অক্ষরসজ্জায় আরেকটু মনোযোগী হলে ভালো হতো। একটু বোধহয় তাড়াহুড়া করেই প্রকাশ করা হয়েছে বাংলা সাহিত্যের রত্নসম এ বইটি! পরবর্তী মুদ্রণে ভুলগুলো সংশোধন করা হবে, এই প্রত্যাশা থাকল।

সম্পাদনা : নুরুল আমিন
প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল
প্রকাশনা : ডেইলি স্টার বুকস
পৃষ্ঠা : ৩২৮
মূল্য : ৪৭৫ টাকা (বাংলাদেশে)






