‘জাদুঘর’ আর ‘ছোটকাগজ’ জাতিসত্তার অস্তিত্ব বহন করে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, যা শব্দে শব্দে আপনাকে আপনার মনোজগতে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। যেখানে আপনি স্বয়ং তাদের সাথে কথোপকথন করতে পারবেন। জাদুঘরগুলি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রচার করে। তেমনি ছোটকাগজ আমাদের জ্ঞানভাণ্ডার পরিপূর্ণ করতে সহায়তা করে। জাদুঘর বিনোদনের একটি ভাল উৎস এবং পুরানো নিদর্শন, ভাস্কর্য, বস্তু, ইতিহাস ইত্যাদির তথ্যভা-ার সমৃদ্ধ। ছোটকাগজগুলো সেই তথ্যভাণ্ডারের হাজার নিদর্শনসমূহ গবেষণা ও অধ্যয়নে সাহায্য করে।
“একটি যাদুঘর পরিদর্শন একটি সৌন্দর্য, সত্য, এবং আমাদের জীবনের অর্থের অনুসন্ধান। যতবার পারেন জাদুঘরে যান।” মাইরা কালমান। ‘সঠিক তথ্যজ্ঞান পাওয়ার জন্য মাসে অন্তত একটি সাহিত্য পত্রিকা সংগ্রহে রাখুন। যা আপনার জীবনকে সুন্দরভাবে তৈরি করতে সাহায্য করবে। সাহায্য করবে সত্য অনুসন্ধানে। এবং আপনি নিজেকে জানতে পারবেন।’
‘কবিতা এখনই লেখার সময়
ইস্তেহারে দেয়ালে স্টেনসিলে
নিজের রক্ত অশ্রু হাড় দিয়ে কোলাজ পদ্ধতিতে
এখনই কবিতা লেখা যায়
তীব্রতম যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন মুখে
সন্ত্রাসের মুখোমুখি-ভ্যানের হেডলাইটের ঝলসানো আলোয়
স্থির দৃষ্টি রেখে…’ (কবি নবারুণ ভট্টাচার্য )
‘নিসর্গ’ একটি শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক খুদে পত্রিকা। খুদে পত্রিকা হলেও ১৯৯৫ সালে বড় কাজ করেছেন সম্পাদক সরকার আশরাফ। তিনি সেই সময় কবিতা সংখ্যা নিয়ে বিশাল কলেবর বের করেছেন। কবিতাগুচ্ছ রয়েছে। আরো রয়েছে আলাপচারিতা এবং আলোচনা। আছে কুঁড়িগ্রাম ব্যবচ্ছেদ নামে একটি বিভাগ। কবিরা এমন একটি প্রাণী, যেখানে যান, যে স্থানে থাকুন না কেন? সব স্থানে কবিতা দেখতে পান। তেমন একটি কবিতা লিখেছেন কবি আহমেদ রায়হান- ‘জিন্দাবাদ’
‘কেবল কবিতা লিখি। গদ্য নয় আর কিছু নয়
পৃথিবী কবিতাময়, কবিতাকে চারপাশে দেখি,
নাটকের মঞ্চ নয়, গল্প নয়, উপন্যাস নয়
শুধু জয়জয়কার কবিতার, কবিতাই প্রাণ
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর গণতন্ত্র
কবিতাই জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ আর জিন্দাবাদ।’
যারা কবিতা পড়েন বা পড়তে পছন্দ করেন তাদের জন্য রয়েছে তপোধীর ভট্টাচার্য রচিত ‘পড়–য়ার কবিতা’ নামে বিশাল একটি প্রবন্ধ। গঠনমূলক একটি প্রবন্ধ অঞ্জন সেন রচিত ‘লোকযানের অন্তর্বয়ন : উত্তর আধুনিক কবিতা’। ‘উত্তর আধুনিকতায় উত্তর ব্যক্তিসত্তার সূত্র’ নামে এজাজ ইউসুফীর একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ রয়েছে। ‘প্রত্যাখ্যাত’ কবিতাটি নারায়ণ মুখোপাধ্যায় এর লেখা কবিতার একটি চরণ-
‘আত্মার হাতে একটি কাঁচা টাকা দিতে চাইলাম
আমার সঞ্চয়!
তার হাত নেই, তাই টাকাটা মাটিতে ঠক্ করে
পড়ে গেল।
মাটির উপর একটি পদচিহ্ন ছিল
পশ্চিমমুখো
যা আর কোনোদিন গ্রহণ করতে ফিরে আসে না।’
কবিতায় ফিকশন নিয়ে একটি আলাপচারিতা রয়েছে। ফিকশন একটা মানুষকে যেভাবে আকষর্ণ করছে কবিতাও তার কৌশল ফিকশনের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে? এখানে কথোপকথন এর মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। উদয় নারায়ণ সিংহ এর প্রবন্ধ ‘তিন বিশ্বে দিন রাত্রির পাঠ’। ‘কবিতার জন্য উৎসর্গকৃত শব্দ-বন্ধন এবং কবিতার কসরৎ’ ফারুক ওয়াসিফ রচিত প্রবন্ধ। কবি মাসুদ খানের কবিতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন বজলুল করিম বাহার ‘ঘ্রাণ আর প্রলাপ বিলাপ বিকিরণ : মাসুদ খানের সাম্প্রতিক কবিতা’। একটি কবিতা আমাদের মন জগতের অন্দরে বসবাস করে হাজারো কবিতা, ছড়া। আমরা গুনগুনিয়ে হাজারও কবিতা বলি। মনের অজান্তে পাঠ করি নিরবে। কবি মঈন চৌধুরী সেই কবিতা নিয়ে লিখেছেন প্রবন্ধ- ‘মনের জানালা, সৃষ্টি, মাসুদ খান, কবিতা এবং…’। কবিতা নিয়ে পাঠ অনুভূতি রয়েছে জাকির তালুকদার রচিত নিবন্ধ- ‘ঐ যে পথ দেখা যায়! যায় কী?’ মুক্ত আলোচনা রয়েছে শিবলী মোকতাদির রচিত- ‘প্রখর আলোঝলমল মধ্যদুপুরে জ্যোৎ¯œামাখা রূপকথার চূড়ান্ত বর্ণনা’। শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক খুদে পত্রিকা হলেও সে সময় নতুন একটি বিষয় তুলে এনেছেন। কবিতা ও কবি নিয়ে যে বিস্তর লেখা যায়। উক্ত সংখ্যাটা পড়লে বুঝতে পারবেন। খুব সাদামাটা প্রচ্ছদে মলাটবদ্ধ হয়েছে কবিতা সংখ্যা। প্রচ্ছদ করেছেন মনিরুল ইসলাম। প্রথম যে কোন জিনিসেই ত্রুটি বিচ্যুতি থাকে। তবে এই সংখ্যাটিতে খুব একটা ত্রুটি চোখে পড়েনি।
‘ঋতপত্র’ কবিতা বিষয়ক মুখপত্র। যেখানে কবিতা নিয়ে হয় কাজ। যেখানে কবিতা আর কবিতা নিয়ে হয় কথা। কবিতার রস, কবিতার ভাব, কবিতার মধ্যে মানুষের যাতনা। কবিতার ভিতরেই রয়েছে প্রেম, ভালোবাসার বন্দনা। এখানে রয়েছে প্রবন্ধ, গুচ্ছকবিতা, দু’টি কবিতা, কবিতা, দীর্ঘ কবিতা ও অনুবাদ কবিতা বিভাগ।
‘ঠাই নাই ঠাই নাই ছোট সে তরী,
আমারে সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।’
কবিতা এমন একটি শক্তি, এমন একটি অনুপ্রেরণা, এমন একটি ভাবনা, এমন একটি আন্দোলন। যার মাধ্যমে সব জয় করা যায়। কলম শক্তি, কলম বল, কলম দেয় সকল অন্ধকারকে ঢেলে আলোর পথের দিশা। ঋতপত্র তে রয়েছে আহমদ রফিক রচিত- ‘শেষ দশকের প্রগতিবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ’। ‘কবিতার পশ্চাৎপট’ নামে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি প্রবন্ধ। এখানে একটি স্থানে বলা হয়েছে কবিতা কি? এর উত্তরে জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন- ‘কবিতা অনেক রকম’। উক্ত সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ রয়েছে যোগেন চৌধুরী রচিত- ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে অসম্পূর্ণ কয়েকটি কথা’। ‘মোহ ও মায়া’ কবিতায় কবি বলেছেন-
‘বুকের পাঁজরে গড়া অবয়ব আঁকি নিশুতি কাগজে
তবুও হারিয়ে খুঁজি খরস্রােতা স্মৃতি বিস্মৃতি মগজে।’
করুণাময় গোস্বামী কর্তৃক রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান নিয়ে লেখা- ‘সংগীত রচনার তিন যুগ’।
‘কথারা জড়ায় হৃদয়ের পাকে পাকে
কথারা ওড়ায় মিথ্যার ফুলঝুরি
ঝরতে ঝরতে ঝরতে
মিথ্যা হয় সত্য, সত্য হয় মিথ্যা
এভাবেই জড়িয়ে জড়িয়ে জট পাকায়।’
কবিতাটিতে এই অপ্রিয় সত্যকথার ছলে শব্দ বুনেছেন কবি অরুণ দাশগুপ্ত।
‘ঋতপত্র’ সম্পাদকের সাথে তাল মিলিয়ে বলতে চাই- জয় হোক কবিতার, জয় হোক আমাদের বিশ্ব বিবেকের।’
‘চিহ্ন’ উজানের টানে ধেয়ে আসে মানুষের মনোজগতে। মানুষের দর্শনে, নারীর ঠোঁটে, গায়ের মেঠো পথে বাউলের পদ চিহ্ন। ‘চিহ্ন’ বিশাল কলেবর নিয়ে এসেছে কবিতার পরতে পরতে ছাপ ফেলতে। ‘চিহ্ন’তে খুব ছোট একটি নিবন্ধ রয়েছে ‘কবিতার কথা’ নামে আহমদ ছফার।
‘খনির লোহাকে ইস্পাত করতে হলে কি না লোহার আকরের সঙ্গে পাথরের কয়লার গুড়ো মিশিয়ে বারবার গলিয়ে খাতসহ করতে হয়। তারপরই ইস্পাত তৈরি হয়। ইস্পাত বিশুদ্ধ লোহার চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই এবং শক্ত। বিশুদ্ধ কবিতার মধ্যে এই ইস্পাতের কিছু গুণ অবশ্যই রয়েছে। সাধারণত আমরা শব্দ দিয়ে কবিতা লিখি। শব্দ তো প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে।’ আহমদ ছফা সুন্দর একটি উদাহরণ দিয়েছে। উজানের টানে ভেসে এসেছে নতুন কবিতার নিয়ম। ‘পুরাতন পথ ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত নতুন কিছু হয়ে ওঠে না। তবুও পুরাতন সরে যায় না, ফল্গুধারার মতো তখন তার সঞ্জীবনী-প্রবাহ। কারণ, আজকের ভিত্তি গত কালের উপর। আর এখানেই তার আপেক্ষিক গুরুত্ব।’ আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশিদ খান রচিত যৌথ প্রবন্ধ। ‘কবিতা রচনা মানেই কী তৈলমর্ধন করা?’ কবিতা মানেই কী কলমের কালি দুঃখ পায়। কলম নিশ্চুপ হয়ে গন্ধ বের হয়। না কবি কবিতা লেখে সত্য আর ন্যায়ের জন্য। অত্যাচারের হাত থেকে দেশ এবং জাতিকে রক্ষা করার জন্য। ক্রমশ অথনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসন করা। কিন্তু সুন্দর করে শহীদ ইকবাল লিখেছেন- ‘পথ চলতি ধূপের গন্ধ : এদেশের কবিতা’
‘চিহ্ন’ সত্যিই তাদের ছাপ রেখেছেন। একটি বিভাগ তৈরি করেছেন- ‘পঞ্চাশ থেকে শূন্য দশক’ সেখানে ২১ জন প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের ২২টি কবিতা দিয়ে সাজিয়েছেন। ‘কবিতার পেঁয়াজ পরত আছে- খুলে খুলেও শেষ নেই। কবিতার হাজার দুয়ার। এক দরজা পেরুলে আরেক দুয়ার। আরেক। আরেক। নৈঃশব্দের ঝর্ণা।’
‘কবিতার ভেতর-বাহির’ একটি নিবন্ধ লিখেছেন মোহাম্মদ কামাল। ‘চিহ্ন’ উজানের স্রােতে শরীর না ভাসিয়ে, ভাসিয়েছেন কবি সম্পর্কে নানা প্রবন্ধ ও নিবন্ধ স্থান দিয়ে। শুধু ভুঁড়ি ভুঁড়ি কবিতা দিয়ে এর শ্রীহীন করেননি। ‘চিহ্ন’ খুলেই প্রথমে চোখে পড়ে উৎসর্গ। যেখানে কবিতার প্রাণপুরুষ কবি নবারুণ ভট্টাচার্যকে উৎসর্গ করেছেন। খুব সাদামাটার মধ্যে প্রচ্ছদ করেছেন আইয়ুব আল আমিন।
‘অনুভূতি’ শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজ। ‘সত্যম্ শিবম সুন্দরম্। যা সত্য তাই সুন্দর। এই সত্য সুন্দরের লেজ ধরে বেঁচে থাকা ইদানিং বড়ো দুরহ। তথাপি, বুকের জমিনে ঢেকে রাখা ক্ষত শুকাতে শরীর নিয়ে আমাদের ক্রমাগত পথ চলা।’ শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজ ‘অনুভূতি’ এর সম্পাদক রনি অধিকারী। ‘অনুভূতি’ ছোটকাগজের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যে এবং তাদের ম্যাগাজিন আপোসহীন। তা তাদের ম্যাগাজিন কথা বলে। ‘অনুভূতি’ এর কবিতা সংখ্যায় তুলে এনেছেন- ‘কবিতায় জাদুবাস্তবতা’। কবিতা সত্যি বলতে একটি জাদুর মত কাজ করে। আন্দোলিত করে। মনের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। এ সংখ্যায় মোট ১৬টি পদ্য রয়েছে। রয়েছে সৌমিত্র শেখর রচিত প্রবন্ধ ‘বাংলা কবিতায় জাদুবাস্তবতা ও ইচ্ছেপূরণ’। কবিতায় জাদুবাস্তবতা কী? কত সালে জাদুবাস্তবতার চিন্তা প্রসারিত হল? তিনি তার এই প্রবন্ধে- আমাদের আদি গ্রন্থ চর্যাপদে জাদুবাস্তবতার ছাপ রয়েছে। চর্যাপদ থেকে শুরু করে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনেক লেখকের লেখায় রয়েছে জাদুবাস্তবতার চরম বাস্তবতা।
স্বপন দত্ত রচিত প্রবন্ধ- ‘কবিতা রেহেল- এ জাদু-বাস্তবতার বর্ণমালা’। জাদুবাস্তবতা প্রথমে গদ্যে ও পদ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা গল্প উপন্যাসেও ধরা দেয়। ‘জাদুবাস্তব না পরাবাস্তব’ নামে তথ্যবহুল প্রবন্ধ লিখেছেন খুরশীদ আনোয়ার। ‘জাদুবাস্তবতা কিংবা ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা: এই দ্বৈত শব্দের বাক্যটি শুনলেই যে কারো মনে জাদু প্রদর্শনীর একটি চিত্রকল্প ভেসে ওঠা স্বাভাবিক ব্যাপার। বিষয়টি আসলে কি তাই?’
‘কবিতায় জাদুবাস্তবতা : অসম্ভবের দোলাচল’ জাদুবাস্তবতার মধ্যে যে অসম্ভব বলতে কিছু একটি আছে তাও সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন হাসান আল আব্দুল্লাহ। ‘কবিতায় জাদুবাস্তবতা এবং বাংলা কবিতায় তার অবস্থান’ উক্ত প্রবন্ধটি হচ্ছে মনোজিৎ কুমার দাস রচিত।
জাদুবাস্তবতাবাদ (জাদুবাস্তববাদ বা অবিশ্বাস্য বাস্তবতা হিসেবেও পরিচিত) কল্পকাহিনী এবং সাহিত্যের একটি ধারা, যা জাদুময় উপাদান বা উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আধুনিক বিশ্বের এক বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি রচনা করে। জাদুবাস্তবতাবাদ, সম্ভবত সবচেয়ে প্রচলিত শব্দ, যা প্রায়শই উপন্যাস এবং নাটক পরিবেশনায় দেখা যায়, অন্যথায় বাস্তব-জগতে বা জাগতিক পরিবেশে উপস্থাপিত জাদুকরী বা অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলি বিশেষত সাহিত্যের জাদুবাস্তবতার উল্লেখ করে। কিছু জাদু উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা সত্ত্বেও, এটি সাধারণত কল্পনার থেকে আলাদা ধরনের হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ জাদুবাস্তবতাবাদ কৌশল বাস্তবের বিশদ বা বর্ণনা যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করে এবং বাস্তবের সাপেক্ষে একটি বক্তব্য দেওয়ার জন্য জাদুবাস্তব উপাদানগুলি প্রয়োগ করে, যখন অলীক কল্পকাহিনীগুলি প্রায়শই বাস্তবতা থেকে আলাদা রূপ লাভ করে থাকে। জাদুবাস্তবতাবাদকে প্রায়শই বাস্তব এবং জাদুকর উপাদানগুলির সংমিশ্রণ হিসেবে দেখা যায় যা সাহিত্যিক বাস্তবতাবাদ বা কল্পনার চেয়ে অধিক পরিবেষ্টক লিখনের গঠনে নির্মাণ করে।
তেমন একটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন আনোয়ার কামাল তার ‘কবিতায় জাদুবাস্তবতা : সম্ভব অসম্ভবের ঘেরাটোপ’। কবিতা সংখ্যা মানেই কি কবিতা দিয়ে ঠাসা? না, কবিতার উৎপত্তি, কবিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণামূলক লেখা। যা থেকে নতুন পুরাতন লেখক নতুন কিছু শিখবে। তাতে তাদের লেখা আরো শাণিত হবে। তবে অনুভূতি সত্যি বলতে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ নিয়েছে। তারা চেষ্টা করেছে কবিতায় জাদুবাস্তবতাকে তুলে নিয়ে আসতে। অনুভূতি এর প্রচ্ছদটাই যেন জাদু দিয়ে তৈরি। শাণিত তরোয়ারের মতো তুলে এনেছেন কবিতায় জাদুবাস্তবতা। প্রচ্ছদ শিল্পী চারু পিন্টু।
শাজান শীলন সম্পাদিত সাহিত্য শিল্পকলার কাগজ ‘কহন’। ‘কহন’ এর অর্থ হচ্ছে ‘বলা’ বা ‘কওন’। ‘কহন’ পত্রিকার অন্যতম একটি দলিলের মত লেখা হচ্ছে- ‘মলয় রায়চৌধুরীর নিবন্ধ এবং চিঠিপত্র’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে এই পত্রিকা পাঠ না করলে কখনও ‘হাংরি আন্দোলন’ সর্ম্পকে জানতে পারতাম না। হয় তো এটা আমার ব্যর্থতা। হাংরি আন্দোলনের মূল নেতা ছিল কবি মলয় রায়চৌধুরী। ‘হাংরি ছিল আন্দোলন; পত্রিকা- গোষ্ঠী নয়। যে- কোনো আন্দোলনের জন্ম হয় কোনা না কোনো আধিপত্য প্রণালির বিরুদ্ধে, তা সে রাজনৈতিক আধিপত্য হোক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, নৈতিক, নান্দনিক, ধার্মিক, সাহিত্যিক ইত্যাদি আধিপত্য হোক না কেন, আন্দোলনটির উদ্দেশ্য, উচ্চাকাক্সক্ষা, গন্তব্য হলো সেই প্রণালীবদ্ধতাকে ভেঙে পরিসরটিকে মুক্ত করা।’
কবি মলয় রায়চৌধুরী রচিত কবিতা ‘তালুতে ওড়ানো চুমু’- ‘ভালোবাসা কিচ্ছু মানে না, বয়স-ধর্ম-দেশ-সীমান্ত নিষেধ।’
ওবায়েদ আকাশ রচিত- ‘র’নবীর টোকাই ও ব্যক্তিগত মুকুর’ কবিতার একটি চরণ আমাকে খুব ভাবিয়েছে। ‘আজকাল প্রাতঃভ্রমণের শেষে মার্ক্স, এঙ্গেলস বা লেনিনের পাশে দেখা যায়। র’নবীর টোকাইয়ের মাথা অকস্মাৎ ভরে গেছে ঝাকড়া বিশ্বাসে মধ্যরাতে রক্তাক্ত বিদীর্ণ চাঁদ লাল বইয়ের হৃৎপি- খুঁড়ে পরস্পর নিজেকে দেখে : শহর বন্দর গ্রামে ব্যক্তিগত বিশ্বস্ত মুকুরে।’
কবি মিনু মৃত্তিক রচিত বেশ কয়টা ছোট কবিতা রয়েছে। তার মধ্যে ‘প্রস্তুতি’-
‘শাদা কাগজে
একে যাই
থুথুচিহ্ন, বিবমিষা
পাঠের আগে
মগজে ঢুকে বসো।’
‘চিহ্ন’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক শহীদ ইকবাল ‘কহন’ ম্যাগাজিনের কবিতা সংখ্যায় বিস্তারিত একটি নিবন্ধ লিখেছেন- ‘কবিতা নিয়ে দু’এক ছত্র’ বাড়ি আমাদের সকলের প্রথম শান্তির স্থান। শুধু মানুষদের না। সকল জীবজগতের। সন্ধ্যের পর সবাই যার যার নীড়ে ফেরে। সেই বাড়ি নিয়ে কবিতা লিখেছেন কবি কাজী গিয়াস আহমেদ-
‘কি ঘনিষ্ঠ মমতায় মানুষ বাড়ির ভিত গড়ে
ইট, বালি, রড, সিমেন্টে মিশিয়ে দেয় নিংড়ানো
ভালোবাসা, প্রেম।’
দেশত্যাগী মানুষের জবানবন্দি নিয়ে লিখেছেন কিব শামীম নওরোজ-
‘এ বড় নষ্ট কাল। একটি মানচিত্র ফেলে অন্য কোনো মানচিত্রের দিকে যাওয়া। এরকম মুহূর্তে যারা দলে ভিড়তে চায়, সৌজন্যবশত তাদের দেখে হাসতে পারি না। লোকগুলো কীভাবে? ভাবুক আর না ভাবুক, মূলত সময়ের ভেতর আমরা সবাই একই যন্ত্রণার দুবাহু মাত্র।’ উক্ত কবিতাটি সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিল রয়েছে।
শিশির আজম এর ‘ধূসর জীবনানন্দের কাউন্টার পোয়েট্রি ডায়াসপোরা’ উক্ত লেখাটি জীবনানন্দের কবিতার নিখুঁত চিত্রপট ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবি বঙ্গ রাখালের লেখা কবিতা ‘একরাশ ক্ষুধাত কবিতা’
‘শাদা একরাশ কবিতা
ক্ষুধায় জ্বলে
মানুষ খুন করে…’
এই ম্যাগাজিনের একটি বিশেষ গুণ হচ্ছে তারা ‘আমাদের কয়েকটি প্রিয় কবি এবং সেগুলোর ইংরেজি অনুবাদ’ নামে একটি বিভাগ রেখেছেন। যেখানে বিখ্যাত লেখকদের বিখ্যাত কবিতার ইংরেজি অনুবাদ রয়েছে। আর সবচেয়ে হতাশ হয়েছি কবিতা সংখ্যায় শুধু কবিতাই বেশি প্রাধ্যান্য পেয়েছে। কিন্তু কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ নেই। কবিতা, ছড়া এসব নিয়ে বিস্তর গবেষণা হলে আরো ভালো হত। একটি শক্তিশালী সংখ্যা হত। তবে সম্পাদক সাহেবকে কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি খুব সর্তকতার সাথে সেরা সেরা কবিতাগুলো বাছাই করে তার মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। তবে একটু আধটু দুর্বল মনে হলেও চোখে পড়ার মত নয়। প্রচ্ছদ করা হয়েছে ইউসুফ বান্না’র ড্রয়িং অবলম্বনে ম্যাগবেথ নিল। খুব সাদামাটার মধ্যে ভালো একটি প্রচ্ছদ করা হয়েছে।
এড্রিয়ান মছেল, ‘একটা সত্য উচ্চারণ এই যে, অধিকাংশ মানুষ অধিকাংশ কবিতাকে এড়িয়ে যায়, কারণ অধিকাংশ কবিতা অধিকাংশ মানুষকে এড়িয়ে যায়।’ কবি যত কম সত্য তার কবিতায় তুলে ধরবে ততই দেশে অন্যায় বাড়বে। আমরা যা সব সময় দেখে আসছি। এই পাঁচটি কবি ও কবিতা সংখ্যা নিয়ে আমার কিছু দ্বিমত রয়েছে। তা হচ্ছে কবিতা সংখ্যা মানেই কী ভুঁড়ি ভুঁড়ি কবিতা? কবিতা সংখ্যা মানেই কী গুঁটি কয়েক প্রবন্ধ আর নিবন্ধ? কবি ও কবিতা সংখ্যা মানেই কী কবিতা নিয়ে আলোচনা? আমি এর বাহিরে আর কিছু খুঁজে পেলাম না। কবি ও কবিতা নিয়ে আরো বিস্তর আলোচনা প্রয়োজন। তাহলে নবীন লেখক ও কবিরা পড়তে পারবে। বুঝতে পারবে? তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বসাহিত্য নিয়ে ছিল না খুব একটি আলোচনা। তবে অনুভূতি সবার থেকে আলাদা বিষয় তুলে নিয়ে এসেছে। তবে প্রতিটা ম্যাগাজিন ভিন্ন ভিন্ন তথ্য তুলে আনাতে খুবই ভালো লাগলো।
লেখক : সমন্বয়ক, কাগজঘর (সাময়িকী সংগ্রহশালা, নব ভাবনা); অভিনেতা ও আবৃত্তি শিল্পী।






