‘মাইদ্যানের দুঃখ’ মাহফুজ রিপনের কবিতার বই। এটি লেখকের ৬ষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া লেখকের ‘মাড়ভাতের গল্প’ ও ‘অণুগল্পের ঘোড়া’ নামে দুটি গল্পগ্রন্থও রয়েছে, তবে তিনি কবি হিসেবেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।
স্বতন্ত্রধারার কবি মাহফুজ রিপন কবিতায় একটি নিজস্ব আদল তৈরি করেছেন যা কবিতা প্রিয় পাঠকদের ভালোলাগার আবাসভূমি। স্বাছন্দ বিচরণ ক্ষেত্র। কবি যখন বলেন, ‘দূর থেকে মেঘ ভেবে- দেখি ওটা পাহাড়/ কাশবন প্রচুর ঘন- কাছে গেলেই ফাঁপর।/ ভালোবাসা এমনতরো সর্বনাশ বাড়ায়/ নদীর জল ঘোলা ভালো তৃষিত তৃষনায় (কবিতা- একোজ বলে কিছু নেই, পৃষ্ঠা-২৫)।’ অথবা ‘অলকে পলকে মেঘের ডমরু/ ভিজে গেলো উঠোনের ধান।/ আষাঢ় শ্রাবণ ভরা-ভাদর জুড়ে/ বেয়াই বেয়াই খেলা ইলশে ঘ্রাণ/ ঝিরিঝিরি মশকরা তোমার/ তাকালেই শেয়ালের বিয়ে।/ গতবার তুমি আসো নাই/ অভিমানী বেয়াই আমার/ ধান, দূর্বার কসম দিলাম/ শোন মেঘারানির কান্দন (কবিতা- দেওয়ানে বেয়াই বলে ডাকি, পৃষ্ঠা- ৩৫)।’ কী ভালো লাগা জমাট বাঁধা শব্দের কারুকাজ। ভালো লাগার থেকে বড় কথা প্রত্যেক পাঠকের মনোজগতে ধাক্কা দেয়ার জন্য যথেষ্ট সজল শব্দের বুনন। চিরচেনা সুর। এভাবে একজন কবির কথা যখন হাজারও পাঠকের কথা হয়ে যায়, তখন কবি স্থায়ী আসন গেড়ে বসেন পাঠকের মনের উঠোনে।
এ গ্রন্থে আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, কবিতা যেন কবিতা নয়, এক একটি ছোটগল্প। গল্পরসে টইটুম্বর আখ্যান। যেমন, ‘জাউ খাইয়া প্যাট ভইরা মাঠে গেছো বিয়ানে/ এক ভামোর হাল চইসা জোত দিছ তিনজনে।/ গত জুম্মায় বলদটার ফাল লাগছে ঠ্যাঙ্গে/ পরানডা আনচান হরে মাথাফাটা চত্তিরে।/ ভাতাররে খোডা দেয় ভাত দিতে পারো না/ ভীমরতিতে ধরছে ভাসান গানের বাহানায়।/ মনডা যেন কি-রহম হরে মনের গতি বুঝি না/ যার জন্যি হইছি পাগল সে ক্যান বুঝলো না (কবিতা- মাইদ্যানের দুঃখ, পৃষ্ঠ- ১৮)।’
এভাবে প্রায় বেশির ভাগ কবিতাই স্বাদে-গন্ধে-মেজাজে এক একটি গল্প এবং চরিত্রগুলো আমাদের খুব চেনা, বিশেষ করে যাদের শেকড় গ্রামে। এভাবে গ্রামের কথ্যভাষার শব্দায়ন খুব কম কবির লেখায় আমরা দেখতে পাই। এখানেই কবি মাহফুজ রিপনের সার্থকতা। সৃষ্টিশীলতা।
কবিমাত্রই প্রেমময়। মায়াময়। যা তাঁর কবিতায় উঠে আসে। কিন্তু মাহফুজ রিপনের কবিতায় সেধরণের দেহজ প্রেমের কোনো ব্যাপার নেই। আছে ভেতর থেকে উঠে আসা আকুতি। বোশেখে তৃষ্ণা। শরতের শুভ্রতা। তাই তো তিনি ‘কবিরাজ হেমন্ত’ কবিতায় লেখেন, ‘মাটির শরীর টের পায় তোমার আগমন। সাদা কুয়াশায় গাঢ় হতে থাকে পূবের পাথার। ঠান্ডালাগা বিয়ানে মিথিলার আঁচলের ওম মোমের মতো গলে যায়। মনের তাপ মিলিয়ে যায় তিলা ঘুঘুর ডাকে। ক্ষমা করে দিই তোমার সকল পাপ হেমন্তের সকালে।’
এভাবেই রচিত হয় কবি মাহফুজ রিপনের ভালোবাসার পঙক্তি। যা অন্য পাঁচ জন থেকে আলাদা এবং ভিন্নতর। তাঁর কবিতায় গ্রাম বাংলার জীবন ও প্রকৃতির ছবি ফুটে উঠেছে সহজ, সরল ও সাবলীল ছন্দে। বইটির নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন শুভদীপ রায়। ভূমিকা লিখেছেন ভারতের সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ঠ কবি অরুণ কুমার চক্রবর্তী। উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলাদেশের নব্বই দশকের অন্যতম কবি ওবায়েদ আকাশ এবং কলকাতার কবি শুভদীপ রায়কে।
আলোচিত গ্রন্থে ৪০টি কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রতিটি কবিতা একক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বনজফুল হয়ে ফুটে আছে যা থেকে পাঠক পাবেন- জ্যোৎস্না ফুলের ঘ্রাণ।
মাইদ্যানের দুঃখ
লেখক: মাহফুজ রিপন
ধরণ: কবিতা
পৃষ্ঠা: ৪৮
মূল্য: ১৫০ টাকা
প্রকাশনী: ব্যাটিংজোন
ISBN : ৯৭৮-৯৮৪-৯৪৯৪৪৩-১-৭






