দুই দালানের মাঝ থেকে তেচরা করে আসা বিকেলের হলুদ কিন্তু তেজী রোদের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসছে মেয়েটা। মেয়ে মানে মহিলা। রিক্সা থেকেই আমি দেখি। গোলগাল পুরুষ্ট সামান্য বেটে শরীরটা নিয়ে অঞ্জনা রায় এগিয়ে আসছে। এবার ঠিক আমার রিক্সার মুখোমুখি। পথ আর মাত্র কয়েক হাত। আমি রিক্সা থামিয়ে দেই । নামি । অঞ্জনা আর আমি মুখোমুখি ।
কি, চলে যাচ্ছেন?
অঞ্জনা সালামের ভঙ্গি করে তারপর বলে- হ্যাঁ আপা।
আমি বোকার মতো আবার বলি- আপনি চলে যাচ্ছেন! মানে অফিসে আর ফিরবেন না।
না আপা বাসায় চলে যাচ্ছি।
অফিসে অনুষ্ঠান চলছে না?
অনুষ্ঠান?
মাকসুদ স্যার আজ চলে যাচ্ছেন না ? আমি তো ওনার বিদায় অনুষ্ঠানেই এসেছি।
ও হ্যাঁ চলছে বোধহয়। আপনি যান আপা ।
আপনি অনুষ্ঠানে থাকবেন না?
আমার একটু কাজ আছে।
অঞ্জনা রায়ের চোখে চোখ রাখি। উজ্জল শ্যামবর্ন গোলাকার নির্লিপ্ত মুখ, বিবর্ণ ত্বকে মরা বিকেলের ছায়া। ডেবে যাওয়া চোখের নিচের বলিরেখা কড়া প্রসাধনীতে আড়াল করা। চোখের পাতার চামড়ার কুঞ্চন। চোখ দুটো যেন আরো একটু ছোট দেখাচ্ছে।
অঞ্জনা রায়ের পুরো চেহারায় বয়স ভালোই থাবা মেরেছে।
ও আমাকে এড়ানোর জন্য কি না জানি না। একটু দ্রুতই বলে – আসি আপা ।
মাকসুদ চৌধুরি সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক । আজ অবসর নিচ্ছেন। অনেক সময় অনেক যদু মধুও এরকম সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে চাকরি করেন। তিনি সেরকম পরিচালক নয়। তিনি সরকারের সচিব হতে পারতেন। খুব ভালো লেখক হতে পারতেন। ভালো বিশ্লেষক ও গবেষক হতে পারতেন। কিন্তু তাতেও বোধহয় তার বহুমুখী মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন হতো না। তিনি অবশ্য ওগুলোর কোনটাই হননি। এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদ তাকে শুষে নিয়েছে এবং তিনি এই পদের সবটুকু উপভোগ করেছেন। সবাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মন্ত্রী, সচিব , চেয়ারম্যান, সহকর্মী, কর্মকতা সমিতি, কর্মচারী ইউনিয়ন সবাই। তার মেধার কাছে সবাই গুটি পোকা হয়ে থাকে, তাকে না হলে ইন্টারন্যাশনাল নিগোসিয়েশান চলে না,উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে বারগেইন চলে না, কোনো ভালো সেমিনার পেপার হয় না, সরকারের উর্ধ্বতন মহলে কোনো প্রতিবেদন প্রেরণ সম্ভব হয় না। প্রশাসনিক জটিলতার সকল ব্যাখ্যার তার মতামত বাধ্যতামূলক। সাধারণ কর্মকর্তা -কর্মচারীদেরও ভরসা তিনিই। তার কাছেই মনের বেদনা প্রকাশ নিরাপদ। আপাতভাবে ন্যায় বিচার ও নিরপেক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। তার পড়াশোনা ব্যাপক এবং বাংলা ও ইংরেজীর দক্ষতা সকল বিতর্কের উর্ধ্বে । বিনয়, ভদ্রতা, ভালো আচরণ, রসবোধ, পান্ডিত্য,গাম্ভীর্য তাকে এমন এক উচ্চমার্গীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে যে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে তার বন্ধু শুভাকাক্সক্ষী, এমনকি প্রতিপক্ষের কাছেও একক,অনন্য ও অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
অঞ্জনা রায় এই সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের একজন ব্যক্তিগত সহকারী যাদের আজকাল ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বলা হয়। তিনি চাকরি নিয়েছিলেন টাইপিস্ট হিসেবে। এখন আর টাইপ রাইটার মেশিনের অস্তিত্ব নেই। টাইপিস্ট পদবী পরিবর্তিত হয়ে কম্পিউটার অপারেটার হয়েছে। অবশ্য অঞ্জলি সেই পদবীকেও পরিবর্তন করতে পেরেছেন। বছর তিন আগেই তিনি ব্যক্তিগত কর্মকর্ত পদে পদবীর উন্নতি ঘটিয়েছেন। অঞ্জলি রায় দেখতে ভালে। গোলগাল শরীর। গোলকার মুখটায় একটা সাধারণ সৌন্দর্য বেশ ভালোভাবেই প্রকাশিত। বিশেষ করে তার পুরুষ্ট দেহটা তেল চকচকে আর রসালো রসালো মাধূর্য নিয়ে একটা নেশা জাগানিয়া আকর্ষণ তৈরি করেছে। সৌন্দর্য বিষয়ে সে খুবই সচেতন। ভালো পোশাক , শাড়ি এবং ভালো প্রসাধনে সৌন্দর্যকে আরো অনেক বেশি প্রকাশিত করে রাখার ব্যপারে ভালোই পারদর্শী। যখন সে টাইপিং কাজ করতো তখন তার সুন্দর আঙুল গুলি বেশ দ্রুত লয়ে তা করতো। একটা বিশেষ দক্ষতা ও সৌন্দর্যে খুটখুট আওয়াজ তুলে সে টাইপ করতো। টাইপিং পুলের নিদিষ্ট আসনে বসে অঞ্জলি যখন টাইপ করতো তখন তার চারপাশে দুতিন জন মুগ্ধ পুরুষের আনাগোনা থাকতো তারা কখনও বসে থাকতো, কখনও অজ্ঞলির সাথে চা খেতো এবং গল্প করতো। এরকম বেশ কয়েকজনের আনাগোনা থাকলেও অজ্ঞলির সাথে ভালো ঘনিষ্টতা গড়ে উঠেছিলো মিরাজ সাহেবের। মিরাজ সুদর্শন পুরুষ। পদবী উচ্চমান সহকারী। কিন্তু প্রথম শেণির কর্মকর্তার চাইতেও সে চোস্ত। যেমন পোশাকে, তেমনি চলা-ফেরায় ও কাজে । সে কামায়ও ভালো । অফিসের বিভিন্ন কাজে তার রয়েছে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ।
মাকসুদ চৌধুরি বনেদী বংশের লোক। তার বাবা এবং দাদা শিক্ষিত ছিলেন। বর্তমানে তার পরিবারের তিন ঘনিষ্ট সদস্য সরকারের উচ্চপদে আসীন,একজন এলাকার নির্বাচিত এম পি। তার বন্ধু বান্ধবের অধিকাংশই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেউ যুগ্ম সচিব, কেউ অতিরিক্ত সচিব, কেউ সচিব, কেউ বিশাল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক। তার একসময়ের পেশা ছিলো সাংবাদিকতা, লেখালেখিও করতেন। সেসব বন্ধুদের অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং প্রথিতযশা সাংবাদিক। ছাত্রাবস্থায় তিনি তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। তার বন্ধুদের অনেকেই এখন মাঝারি ও বড় নেতা। মোদ্দা কথা তার সার্কেল ব্যাপক ও বিশাল। কিন্তু তিনি অতিমাত্রায় অমায়িক। তার আত্মসন্মান বোধ প্রবল ও দৃঢ়, তিনি প্রখর ব্যক্তিতসম্পন্ন¡। তাই এত বড় ও বহুমাত্রিক সার্কেল নিয়ে বাইরে কোনো আওয়াজ তোলেন না । ব্যক্তিগত কাজে সার্কেল খুব একটা ব্যবহারও করেন না। তার মেধা ,কর্ম দক্ষতা ,ব্যক্তিত্ব তাকে এমন এক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে যে তাকে সার্কেল ব্যবহার করতে হয় না বরং তার সচিব ও অতিরিক্ত সচিব বন্ধুরা প্রয়োজনে তার কাছে বুদ্ধি, বিবেচনা এবং ভাষা ধার করে থাকেন।
অঞ্জলি রায়ের স্বামী একটা ফার্মে চাকরি করেন। ধারনা করা হয় তিনি ভালো বেতন পেয়ে থাকেন। কারণ অঞ্জলি রায়ের পোশাক আশাক সাজ-সজ্জা এবং তার বাসার পরিবেশ তা বলে। ধারনা করা হয় অঞ্জলি রায়ের স্বামী সদাশয় এবং তিনি অঞ্জলি রায়ের কথা বেশ শুনে থাকেন। বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে মার্কেটে তাকে বেশ অনুগতের মতো অঞ্জলি রায়ের পেছনে পেছনে দেখা যায়। অঞ্জলি রায় সুন্দরী এবং সংসারী। অঞ্জলি রায়ের স্বামীকে সুদর্শন বলা যায় না ,তবে কুরুপ নন। এই চেহারা এবং যতটুকু মালপানি(?) তিনি কামাই করেন তাতে এমন একটা সুন্দরী ও টলটল স্বাস্থবতী বউ ধরে রাখার জন্য আনুগত্যের প্রয়োজন আছে বলেই মনে হয়।
মাকসুদ চৌধুরীর দুই ছেলে। অঞ্জলি রায়ের দুই মেয়ে। তিন বছর আগে অঞ্জলি যখন নিন্মমান সহকারী থেকে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদবী উন্নতি করেন। তখন বেশ কিছু গল্প তৈরি হয়। সেই গল্পের অনেকগুলোই এখনো এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ফ্লোরে ঘাপটি মেরে আছে। কেউ কেউ বলেন পদবী পরিবর্তনের সময় প্রায়ই মাকসুদ স্যারকে অঞ্জলির বাসায় দেখা গেছে। কেউ কেউ তাদেরকে একসাথে মার্কেট থেকে বের হতে দেখেছেন। সে সময় মাকসুদ স্যার কালো টি র্শাট পরে ছিলেন এবং তাতে তিনি নাকি তার বয়স প্রায় দশ বছর কমিয়ে ফেলেছিলেন। ঐ সময় নাকি অঞ্জলিকে প্রায়ই মাকসুদ স্যারের রুমে দেখা যেত এবং বেশ কিছুটা সময় অঞ্জলি স্যারের রুমেই থাকতো। ঐ সময় অজ্ঞলি রায়ের স্বামীকেও নাকি দুতিন দিন মকসুদ স্যারের রুমে দেখা গেছে। স্যার এক হিন্দু মহিলাকে পছন্দ করেন এমন একটা গুনগুন নাকি আগেও শোনা যেতো কিন্তু সেটা কে তা কেউ ভালো করে জানতো না। স্যারের নাকি রাতে কোন এক জায়গায় জুয়া খেলার বদভ্যাস রয়েছে। সেখানে নারী ঘটিত ব্যাপার ঘটে কিনা তার কোনো প্রমাণ নেই তবে ফিসফিসানী রয়েছে সেখানে সেসবও ঘটে। তবে ঐ সব কাজে স্যারের অংশগ্রহণ নিয়ে ব্যাপক বির্তক রয়েছে। কারণ আপাত দৃষ্টিতে স্যারের সমন্ধে এসব নেতিবাচক কথা বিশ্বাস করা কঠিন। এসব গল্পের অবিশ্বাস্য অংশগুলো ষ্পষ্ট বিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করে অজ্ঞলি রায়ের পদবী পরিবর্তনের সময় । তখন অনেকেই ধারণা করেন ভালো মানুষ স্যারকে অজ্ঞলিকে বেশ ভালোই শুষে নিচ্ছেন।
অঞ্জলি রায়ের এই উন্নতি পুরোটাই মাকসুদ সাহেবের উপহার এই বিষয়টা ফ্লোরে ফ্লোরে গল্পের সাথে বেশ কিছু দগদগে প্রশ্নের জন্ম দেয়। মাকসুদ স্যারের মতো লোক অজ্ঞলি রায়ের বাসায় কেন? কি আছে ঐ মোটা মাথার ভোতা বুদ্ধির মেয়েটার । হ্যাঁ একটা গোলগাল তেলতেলে দেহ আছে। কিন্তু স্যারের মতো এতো সূক্ষ্ম রুচির মানুষ, এতো শিল্প সংস্কৃতিবান, বিশেষত শত্রুও যাকে নারী ঘেষা লুইচ্চা অপবাদ দিতে পারে না। তিনি হঠাৎ অজ্ঞলি রায়ের কাছে ধরা খাবেন। এটা কেমন কথা! অজ্ঞলি মেয়েটার পড়াশোনা নেই তবে সে নিশ্চয়ই ভালো কৌশলী । ঐ কৌশলেই ধরা খেয়েছে মাকসুদ স্যার। আবার অনেকে বলেন। দেহ জিনিসটা মারাত্মক। এই বয়সে এমন একটা তেলতেলে দেহের স্বাদ! স্যার অজ্ঞলিকে মেয়েটিকে ভালোই ব্যবহার করছেন। একবারে চেটে পুটে খাচ্ছেন।
দেয়ালগুলো যখন এরকম ফিসফিস করছে এবং অঞ্জলি তার পদবি পরিবর্তন করছেন তখন আমিও ঐ প্রতিষ্ঠানের একজন মধ্যম গোছের কর্মকর্তা । নিদ্বিধায় বলতে পারি আমি মাকসুদ স্যারকে বিশেষ পছন্দ করি তার অতুুলনীয় ব্যক্তিত্ব এবং জ্ঞানের জন্য । স্যারের সাথে আমার কাজের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। সেই অভিজ্ঞতায় আমি নিঃসন্দেহ হতে পারি না যে তিনি অঞ্জলি রায়ের সাথে একটা বিশেষ সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন এবং সেই সম্পর্কের কারণে তিনি অঞ্জলিকে পদবি পরিবর্তনের সুযোগ দেবেন। তবে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান করে অপ্সলি রায় পদবি পরিবর্তনে সক্ষম হোন। তখন বিষয়টি অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। কিন্তু তারপরও আমি মাকসুদ স্যারের মতো একজন ব্যক্তিত্ব যাকে পছন্দের উচ্চতর স্কেলে রেখেছি তাকে নিয়ে এ ধরনের প্রকাশ্য গুঞ্জনকে মনে পুরোপুরি ঠাঁই দিতে পারি না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে উপনীত হতে দ্বারস্থ হই অঞ্জলির ঘনিষ্ট ও পছন্দের মানুষ মিরাজ সাহেবের কাছে ।
আচ্ছা, মিরাজ সাহেব ব্যাপারটা কি ঠিক?
কোন ব্যাপারটা আপা?
এই যে অঞ্জলি আর মাকসুদ স্যারের ব্যাপারটা।
মিরাজ সাহেব মিশুক মানুষ আমার সাথে মোটামুটি ভালো সম্পর্ক। একটু রহস্যময় হাসেন
আপনার কি মনে হয়?
আমি তো বুঝতে পারছি না
চেহারায় একটু বিজ্ঞ ভাব এনে মিরাজ সাহেব বলেন- হ্যাঁ আপনার বোঝার অবশ্য কথাও না । আপনি অন্য জগতের মানুষ।
আপনি তো বুঝেন আপনিই বলেন না?
দেখেন আপা মানুষ যা বলে সামান্য কিছু না ঘটলে কি আর বলে?
কিন্তু স্যার এতো ভালো মানুষ আর অঞ্জলি তো আপনার খুব কাছের। ও কি এরকম হতে পারে?
আপা, হতে পারে। মানুষের মন তো। কত কিছুই হতে পারে। মন যদি বদলে যায় কি করবেন?
আপনার সাথে তো ওর অনেক ভালো সম্পর্ক। এই যে মানুষ এতো কথা বলে আপনি ওকে কিছু বলেন না?
আপা গাছের মগডালে কে না তাকায়। কেউ যদি উঁচুতে উঠতে চায় আপনি কি করবেন?
মিরাজ সাহেবের এরকম বেদনার্ত প্রচ্ছন্ন অথচ সরাসরি ইঙ্গিত আমাকে প্রায় নিশ্চিত করে ফেলে অঞ্জলি রায়ের এই উন্নতির পেছনে স্যারের অনুগ্রহ এবং অনুরাগকে। তারপরও আমি যখন আমার স্বভাবসিদ্ধ দোদূল্যমনতায় ভাবছি হতে পারে একটা অনুরাগ তাই বলে কি মকসুদ স্যারের সাথে অঞ্জলি রায়ের একটা বিশেষ অনৈতিক সম্পর্ক পুরোটাই সত্য?
এই প্রশ্নবোধক চিহ্নকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় আমার সহকর্মী তুলি। তুলি এ বিষয়গুলো আমার চাইতে অনেক বেশি ওয়াকেবহাল। ছেলে মেয়েদের বিশেষ দৃষ্টি, বিশেষ ব্যাপার স্যাপার , শরীরের ভাষা এগুলো আমার চাইতে অনেকগুণ ভালো বোঝে। সে এই অফিসে আমার প্রায় নয় বছর পরে যোগদান করলেও এই অফিসের নানা তথ্যের সে তথ্য ভান্ডার আর এ ধরনের তথ্য চালাচালি তার পছন্দের বিষয় । সে আমাকে বলে-
আপা আপনি ওই অঞ্জলিকে ভালো বলেন । আমি তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম মকসুদ স্যারকে নিয়ে আপনার নামে এতো কথা ব্যাপারটা কি ?
অঞ্জলি কি বললো ?
সে তো তাঁর সারা শরীরে ঢেউ তুলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। আর তার চোখে মুখে সে কি খুশি আর আহ্লাদ তো গদগদ।
মানে?
মানে আপনে বোঝেন না আপা,সে ঐ কথা শুনে গোপন পুলকে মতোয়ারা আর তার ভালো লাগছে এসব কথা শুনতে।
এ সব কথা শুনতে কোনো মেয়ের ভালো লাগতে পারে আর কেউ হেসে গড়িয়ে পরতে পারে আহ্লাদে। এটা আমার অভিজ্ঞতার বাইরে। আর এরকম হাসির প্রকৃত মানে কি দাঁড়ায় তাও আমার জানার বাইরে।কিন্তু তুলি ঝানু মেয়ে সে ঠোট উল্টিয়ে বলে-
আপা ওর সাথে মকসুদ স্যারের সব হয়েছে আমি নিশ্চিত।
এ রকম প্রায় নিশ্চিত একটা গুঞ্জন যখন চারদিকে তখন আমি আমার দীর্ঘদিনের ঐ কর্মস্থল ছেড়ে যোগ দিয়েছি নতুন কর্মস্থলে। জীবনের আরো অনেকগুলো গল্প আমার সামনে ভীড় করে দাঁড়িয়েছে আর এতো গল্পের কাছে অঞ্জলির গল্পটা আমার কাছে ফিকে হয়ে গেছে।
এ অফিস হতে বিদায় কালে মকসুদ স্যার আমার পদত্যাগ পত্র এবং সে সময়ের কাজগুলো করতে সহায়তা করেছিলেন। তারপর তিনি আমার প্রতি যথাযথ সন্মান প্রদর্শন করে একটা বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সে কৃতজ্ঞতা থেকে আমি আজ সকল কাজ ফেলে ছুটে এসেছি স্যারকে সন্মান জানাতে। স্যারের সাথে অঞ্জলি রায়ের প্রশ্নবিদ্ধ সম্পর্ক ,এসব নিয়ে গুঞ্জনের সত্য মিথ্যা যাই থাক এটা প্রকাশ্য সত্য যে স্যার অজ্ঞলি রায়ের পদবি পরিবর্তনের মতো বড় একটা উপকার করেছিলেন। সাধারণ টাইপিস্ট থেকে ব্যক্তিগত কর্মকতা অথ্যাৎ কর্মচারী থেকে কর্মকর্তায় উপনীত করেছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে অঞ্জলি রায়ের আজ বিদায় অনুষ্ঠানে থাকারই কথা। এক ধরনের দুঃখবোধে আক্রান্ত হবারও কথা। যেমন আমি কৃতজ্ঞতার সাথে একটু শূন্যতাও বোধ করছি যদিও আমি এখন আর এ অফিসের কেউ না। আমি নিশ্চিত এই অফিসও স্যারের শূন্যতা খুব তীব্রভাবে বোধ করবে।
অঞ্জলি রায়ের আজ ব্যক্তিগত কাজ থাকতেই পারে। মকসুদ স্যারের বিদায় অনুষ্ঠানে সে উপস্থিত নাই থাকতে পারে। কিন্তু তার চেহারায় কেন স্যারের বিদায় সামান্য ছায়া ফেলবে না? স্যারের কথা শুনে যে অঞ্জলি একদিন গদগদ হয়ে যেত। শরীরে পুলকের ঢেউ তুলে হেসে গড়িয়ে পড়তো ,যে স্যার তার জীবনটাই বদলে দিয়েছেন। তার জন্য অঞ্জলি রায়ের সামান্য কোনো ভাবাবেগ নেই কেন? স্যারের আর কোনো ক্ষমতা থাকছে না সেজন্য কি? তার একটু আগের চেহারা আমি দেখেছি, না সেখানে দুঃখ আনন্দ বেদনা বিষণœতা অথবা কোনো বোধের প্রকাশ নেই। মরা মাছের শরীরের মতো নিস্প্রাণ নির্লিপ্ত একটা মুখ। তার কন্ঠস্বর ভাবলেসহীন। সামান্য আবেগ বা আন্তরিকতাও নেই। তার চলে যাওয়ার মধ্যে কোনো অনুভব নেই, কোনো সম্পর্কের ষ্পর্শ নেই,কেনো কালে কোনো পরিচয়েরও গন্ধ নেই ।
অঞ্জলিকে পেছনে রেখে সামনে আগাই। অফিসের করিডোরে পা দিয়ে শুনতে পাই অনুষ্ঠানের আওয়াজ। মাইকে কেউ একজন স্যারের প্রশ্বস্তি গাইছেন। আমি একটু ভাবি। এই অফিসে খুব গুঞ্জন ছিলো স্যার অঞ্জলিকে ব্যবহার করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন অঞ্জলি স্যারকে ব্যবহার করেছেন। কে ব্যবহৃত হলেন- অঞ্জলি নাকি স্যার? আমি কিছুতেই মিলাতে পারি না।
