সকালবেলা ছেলে-বউমা যখন অফিসে যাচ্ছে ঠিক তখনি ফোন বেজে উঠলো। কেউ মেসেঞ্জারে কল দিয়েছে। এরকম ব্যস্ত সমস্ত সময়ে এরকম কল সাধারণত বাংলাদেশ থেকে আসে, অস্ট্রেলিয়ার সাথে যাদের সময়ের ব্যবধানটা জানা নেই, তারা করে।
চশমা চোখেই ছিল। দেখলাম শিবলু কল দিয়েছে। দরজা খুলে বাইরে গেলাম। বাইরে বৃষ্টিসহ হু হু বাতাস। এমনিতে এখানে শীতকাল। তাই শীতটা গায়ে খুব লাগলো। তবু ফোল্ডিং চেয়ারটা খুলে আয়েস করে বসতে বসতে বললাম, কী রে, কী মনে করে?
-এই সাতসকালে তুই আমার গল্প লেখা নিয়ে পড়লি ক্যান?
– রসুন আর ছৈয়ালের আলাপডা তুই যেইবাবে করছো, কইছিলি এইডা নিয়া তুই তাড়াতাড়িই লেখবি! তাই হঠাৎ মনে অইলে তুই এক ছৈয়ালের কতা নিয়া গল্প যদি লিখতে পারোস্, আর আমার সাথে যহন তোর আবার দেহা অইলে, তো তোর গল্পে আমার কতা কী লেহস, লেখলে জানাইস! রাহি!
এভাবে লাইন কেটে দিলে কার না মেজাজ খারাপ হয়! শিবলুর সাথে বহুবছর আমি কেন আমাদের আত্মীয় বা জানাশোনা কারো সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ছিলো বলে জানা ছিলো না। অস্ট্রেলিয়া আসার পথে সেবার সম্ভবত ট্রানজিট পড়েছিলো হংকং। প্লেনে ওঠার আগে তো দেখা হয়ই নাই। ঘন্টা চারেকের ফ্লাইটে উঠেও না। নামার সময় দেখা! মনে হয়েছিলো ও ওখানেই পাতাল ফুঁড়ে উদয় হয়েছে! চোখ-মুখও ছিলো তেমনি ভাবলেশহীন। ওকে দেখে আমার কলিজার ভেতর ভীষণ চমকে উঠেছিলো। তাও আবার একই পথের যাত্রী! ওর সাথে তাল মিলিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁফাচ্ছিলাম। টুকটাক নয়, ঠাসঠুস কিছু কথাও হচ্ছিলো। শিবলু শুধু দৌড়াতে দৌড়াতে প্রত্যুত্তর দিচ্ছিলো। এর ভেতর দেখি ও কিছু না বলেই অন্যদিকে যাওয়া শুরু করলো। হতাশকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, ওদিকে কই যাস্?
আমি যামু সিডনি। তুই তো মেলবোর্নে থাহো…। বলে শিবলু চলে গেলো! ক’দিন পরে এক সকালে ফেসবুক খুলে দেখি শিবলুর ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট। একসেপ্ট করেই মেসেঞ্জারে কল দিয়ে বললাম, অতদিন পর দেখা হলো এয়ারপোর্টে আর তুই অইভাবে চলে গেলি?
-চইল্লা যামু না তো তরে জড়াইয়া দইরা চুমা খামু? দেহা অইছিলো বুইল্লাই তো তরে খুঁইজ্জা রিকোয়েস্টটা দিলাম। তুই তো তাও দেওনাই! শিবলু তগো জীবন থেইক্কা মইরা গ্যাছে। ক, খোঁজ নেছো এতো বছরে? সেদিন ঘন্টাখানেকের মতো সময় আছিলো সিডনির ফ্লাইটের। বাসার ঠিকানা দিয়া রাহিস। ফোন নাম্বারও। আমি মাজে মাজে মেলবোর্ন যাই। তাই যামুয়ানে তরে দ্যাকতে। রাহি…। বলেই লাইন কেটে দিয়েছিলো।
আমাপোড়া কাঠকয়লার মতো মনটা জ্বলছিলো। অক্ষম আক্রোশে বিড়বিড় করে বকছিলাম- যেন আমি ওর পাশের বাড়ি থাকি। যেন প্রতিদিন বাড়ির পুকুরের এঘাট-ওঘাটের দূরত্বে দেখা হয়। ওর এমন তরো বিষয় নিয়ে ওকে বকেও দেখছি। কোনো কাজ হয় না। ও এমনি।
এরপর খুব বেশিদিন যায়নি। মানে কথা হওয়ার দুইসপ্তাহও না। এক পড়ন্ত দুপুরে শিবলু বাসায় এসে হাজির। গেট বোধহয় খোলাই ছিলো। সরাসরি টোকা শুনে দরজা খুলে শিবলুকে দেখে আমি এত আশ্চর্য ও আনন্দিত হয়েছিলাম, কিন্তু খুব কঠিনভাবে সে ভাব লুকিয়ে রাখলাম, কারণ ওর কাছে আমার ওই একটিই মাত্র হার, আমার সরল উচ্ছ্বাসের কাছে ওর কঠিন নিলির্প্তি। তাই নির্লিপ্ত-হীমকণ্ঠে বললাম, আয়…!
শিবলু ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, তোর ভাবখানা দেহি এমনতারা, য্যান আমার আওনের কতা তোর জানা আছিলো?
– এইভাব তোর থেকে শিখেছি !
-ও আল্লা তুই দেহি ভাত বাইড়াই বইয়া আছো!
-হ্যাঁ তোর জন্য ভাত বেড়ে বসে আছি আর কি? রান্না করতে হবে। তাই বাসিটুকু ঝেড়েমুছে বের করেছি খেয়ে হাঁড়ি-পাতিল খালি করবো!
-তুই সর ওদিকে। আমি দ্যাখতে আছি তুই আমার লাইগা খাবার বাড়ছোস! তয় আমি ভাত খামু না! ভাতগুলা তুই মরিচ পুইড়া খা! ত্যালতেইল্যা স্যামন মাছখানা দেইহা জিব্বায় পানি চইল্যা আইছে। ওইহান আমারে দে! আমার রক্তে বোলে কোলেস্টরল। যা, ইট্টু সালাদ বানাইয়া আন, গোলমরিচের গুড়া ছিঁডাইয়া দিছ্! লেবু দে একটুকরা! ডায়াবেটিসও বলে আমার কাছে আইয়া দাঁড়াইয়া আছে। বাইচ্ছা চলতাছি দেইক্খা নাগাল পাইতেআছে না! তরে এট্টা সত্যিকতা কই, তুই যা রান্দস, অন্যবাড়ি বইয়া খাইলেও বোজা যায়, এইডা তর রান্দা! আমার মা’য়ও বোলে তর মার থেইকা রান্দন শিখছিলো!
কিংকর্তব্যবিমুঢ় আমি সালাদ কাটতে কাটতে শিবলু আবার বলে উঠলো-সালাদ অইলে কড়া কইরা এককাপ বেলাক কফি দিস্!
আমি হাসবো-কাঁদবো, না রাগ করবো, না আনন্দ প্রকাশ করবো এই বয়সে ওর এমন আচরণে, ভেবে পাচ্ছি না। এ যদি ওর উদ্ভট আচরণ হয়, তবে ও সব সময় এমন! তাই নিজের জন্য বাড়া খাবার ওর দ্বারা সদ্গতি করাতে ওর ফরমাশ খাটতে খাটতে বললাম, কোলেস্টরলের জন্য কী খাচ্ছিস?
এ্যা কি এ্য, তগো ঘরে এট্টা এ্যাশট্রে নাই? এট্টা কাপ দে ছাই ফেলি! তুই, এই তুই একজনের লাইগ্যা এট্টা এ্যাশট্রে কিইন্না এ্যাকুরিয়ামের মইদ্যে রাইখ্যা দিছিলা, য্যান কেউ ব্যবহার না করতে পারে। তাও তর বিয়ার পর, মাইনে তর পোলাপাইন তহন স্কুল-কলেজে পড়ে! ও, এই দ্যাশের ডাক্তারেরা কোলেস্টলের ওষুধ দেয়? খালি আঁটতে কয়! ছেমড়ি তুই এই দ্যাশে থাহো, জানো না?
-শোন্, এককোয়া করে রসুন খা। রোজ। খালিপেটে খেলে অনেকের বুক জ্বলে। মুখে গন্ধ হয়…।
-মুখে গন্ধ অইলে অউক। আমি তো আর নতুন কইরা প্রেম কইরা কেউরে চুমা খাইতে যাইতেছি না। তয় আমার বুক জ্বলে! এই, এই এ্যাদ্দিন পর এট্টু সময়ের জন্যি দেহা, অন্যসব কথা বাদ দিয়া রসুন নিয়া তুই সস্তা কবিরাজি ফলাইতে আছোস্, এগুলা শিখলি কবেতন, এ্যাঁ?
-শোন আমি যখন বাড়ি করি এক ছৈয়াল বলেছিলো, সে যুবক বয়সে মোষের রাখাল ছিলো। কবজি ডুবিয়ে প্রতিবেলা মোষের দুধ দিয়ে ভাত খেতো। কিন্তু দুদিন যদি রসুনের ভর্তা না খেতো তাতে নাকি তার ভুঁড়ি নেমে যেতো! সে ছৈয়ালও তোদের বরিশালের ছিলো!
-ওরে আমার খোদারে, চল্লিশ বৎসর আগে তুই বাড়িতে ওয়ালের জাগায় চারখানা ব্যাড়া দিছিলি, আমি তোর বাড়ি দ্যাকতে গিয়া দুলাভাইয়ের লগে আমিও গেছিলাম সে ব্যাড়া কিনতে। কিন্তু ব্যাড়ার কাজ যে হরছে, হেই বুইড়া ব্যাডারে তুই এহনো মাথায় রাখছো? আর একটা ছৈয়ালের কতা তুই সত্যি বুইলা মানছো? ব্যাডার কাম আছিলো ব্যাড়া লইয়া…।
-দেখ ছৈয়ালের এমন কথা সত্যি না হয়ে যায় না! এই যে বড় বড় কোম্পানীর আচার বা এমন অনেককিছু খাস্, সে সব কি কোম্পানীর বাপ-দাদার না তাদের স্মার্ট বউদের রেসিপি? ওগুলো সাধারণ বউ-ঝি’দের রেসিপি! দেখিস না ফ্রীজ-টেলিভিশনের লোভ দেখিয়ে সারাদেশ থেকে কোম্পানীগুলো বউ-ঝি’দের একত্র করে?
-বুঝছি, কাগো তুই ওস্তাদ মানো!
মেজাজ এমন খারাপ হচ্ছিলো, মনে মনে বললাম এত ভালো একটা চাকরি করতি, অভিনয়ের দিকে ঝোঁক আগে থেকে ছিলো, চেহারা-সুরত-উচ্চতাও ভালো। চাইলে দেশে থেকে কোনো একটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারতি। এখানে যা করছিস তা তো শখ করে। সেই কবে শুনেছিলাম শিবলু চাকরি সূত্রে দেশ ছেড়ে চীনে গিয়েছে। সেখানেই একা বিয়ে করেছে। তারপর কয়েক বছরে বউ সব নিয়ে চলে গেছে। ওর সাথে যোগাযোগ হওয়ার পর সিডনিতে থাকা দেশের পরিচিত এক ফেসবুক ফ্রেণ্ডের কাছে ওর সম্পর্কে এমনিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে চিনেছে। বলেছিল বাঙালিদের যে নাট্য সংগঠন আছে, সেখানে ও অংশ নেয় এবং ভাল অভিনয় করে। তাই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ওকে দেয়া হয়। সেভাবেই সে ওকে চেনে।
বউয়ের সাথে মিল হলো কি না এখন কাছে পেয়েও জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। কারণ আর কারো সাথে না হলেও আমার কাছে ও সুবিধা মতো উত্তর দেবে। তার থেকে সিদ্ধান্ত পাকা করে রাখলাম ওদিকে যাবোই না!
শেষমেষ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো তুই কী করিস? মানে পেশা কি?
-গাড়ির ব্যাবসা করি!
-মেলবোর্ন আসছিস কেন?
-ওই কাজেই!
-তার মানে তুই পুরনো গাড়ির ব্যাবসা করিস?
-তুই বুঝলি কেমনে?
-আমার ওস্তাদ কারা জানিসই তো!
-ছৈয়াল না হয় রসুনের গুণাগুণ শিখাইছে, কিন্তু এইটা কে শিখাইলো? নতুন গাড়ির ব্যাবসা অইলে তার জন্য অন্যহানে যাওয়া লাগে না?
-আমার চেনা এক দম্পতি আছে ওরা বেড়ানোর ছলে সবখানে ঘোরে আর সুবিধা মতো পুরনো গাড়ি কিনে ভাড়া দেয়। সেটাই তাদের আয়ের উৎস। তাই আমার জানাটা সব সময় সত্য না হলেও পুরোপুরি মিথ্যে হয়ে যায় না! আর শোন রসুন খাওয়া ছৈয়ালরে তুইও ওস্তাদ মানবি আরো একটা বুদ্ধিতে।
-বল, ওস্তাদ মানার মতো মানুষ পাইলে জীবনের ভার কমে। দেহি তর ছৈয়ালরে কিছুডা ভাগ দেওন যায় কি না!
-শোন, তখন ছৈয়ালের সাথে যে লোকটি যোগালির কাজ করতো, সে একদিন ছৈয়ালের বিরুদ্ধে আমার কাছে কিছু বলতে, বললো, ‘আপনে ওনারে এতো বালো পান কা? উনি মানুষটা কত্ত খারাপ জানেন? ওনার বউ আছে তার ওপর ফিইরা আবার শালিরেও বিয়া হরছে! পাশাপাশি বাড়ি মোগো, সব জানি!’ আমারও তখন বয়স কম। হাতে সময়ও গড়গড়ায়। আমি যোগালির পরিণতি না ভেবে রে রে করে ছৈয়ালকে বললাম, ছৈয়াল ভাই, সমাজ তো এটা হতে দেয় না, তুমি বউ থাকতে শালিকে বিয়ে করে মৌলবি-মাওলানার মাইর না খেয়ে বেঁচে আছো কেমনে?
কম কথা বলা শিবলু আমার কথা গিলতে গিলতে আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, তারপর? ছৈয়াল কী কইছেলে তরে?
শিবলুকে বললাম, ছৈয়াল বলছিলো, এইডা আবার আপনেরে কইহল্যে কেডা? তয় হোনেন, হোনছেনই যহন, বাইঙ্গা কই! আমার শাওড়িরে আমার শ্বশুর তালাক দেলে আমার শাওড়ির আবার যেইহানে বিয়া অইছে, আমার হেই শ্বশুরের আগের গরের এউক্কা মাত্র মাইয়া দুইডা পোলাপান নিয়া বিদবা অইয়া বাপের বাড়ি ফিইরা আইছে। জোয়াইনকা মাইয়ার এল্হা থাহনের মতো দশা সেইহানে আছিলে না। শ্যাষে আমার দুই পোলাই তাগো মায়েরে কইলে আমাগো এই নানাও বাইচ্চা নাই। খালার অন্যহানে বিয়া অইলে হেই বেডা অয় আইয়া গরজামাই থাকবো, না হয় সম্পত্তিটুকু বেইচ্চা নিয়া যাইবো। শ্যাষে আমরা বেড়াইতে যামু কই? কিডা আমাগো বোচকা বাইন্দা জিরাতি দিবো? তাই আব্বারে কও খালারে নিকা করুক!
আমি আশ্চর্য হলে বললাম, শুধু বেড়াতে যাওয়া আর বোঁচকা পাওয়ার জন্য তোমার ছেলেরা এমন কি তোমার বউও তোমাকে আবার বিয়ে দিলো?
ছৈয়াল বলছিলো, ইয়া কন কি? খালি বেড়াইতে যাওনের লাইগ্যা অইবে কা? আমার পুলারা তার ওই খালার সম্পিত্তি পাইবে না তাগো বাপেরে বিয়া দিয়া? তয় কি আপনে বোজজেন এমনি এমনি? ওরে আল্লা, এমনি এমনি না…!
– কেমনে লতায়-পাতায় জড়ানো সম্পর্কের খালার সম্পত্তি তোমার ছেলেরা পায়?
– হোনেন কই, আমি মরলে, আমি তাগো খালার স্বামী ইসাবে যেডু পামু, সেডুকতন তাগো খালায় আর তাগো মা’য় মিইল্যা পাইবে একআনা হইর্যা দুইআনা, আর তারা দোনো ভাইয়ে পাইবে চৌদ্দআনা…।’
আমার কথা শেষ হলে শিবলু বললো, ‘ভাবো ভাবো ভাবা প্রাকটিস করো!’ এত বছর দইরা কিংবদন্তি চলচিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের এই বাণী খালি আওড়াইতেআছি, এই সেদিনও, মাইনে চাইর নভেম্বর তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বিদেশে বইয়া এত্তবড় একখান বক্তৃতা লেইখ্যা আমি ঝাড়লাম। তবু সেই মহাপুরুষ পারেনাই মোর মতো মাইনষেরে সত্যিকার অর্থে ভাবা প্রাকটিস করাইতে। বাণীডা খালি কানের কাছ দিয়ে গোরছে! তোর ছৈয়ালে সত্যিই এবার আমারে ভাবনার খাদে ফেলাইয়া দেলে! এবার ভাবনা প্রাকটিস করতে পারমু!’
শিপলু কতক্ষণের জন্য এসেছে বলেনি। ও এলে আমার আজো মনে হয় সময়ের চাকা বন্ধ হয়ে থাক। কিন্তু ওর সাথে আমার প্রেম দূরে থাক বন্ধুত্ব’র মতোও কিছু ছিলো না। সম্পর্কে ও ফুপাতো ভাই। তাও তিন পুরুষ আগে তার নানার পূর্ব পুরুষ আর আমার দাদার পূর্বপুরুষ আপন ভাই ছিলো এটা জানা যায়। শিবলুর মা মারা গেলে সে তাদের বরিশাল ছেড়ে তার মামার বাড়ি, মানে আমাদের গোপালগঞ্জে চলে আসে।
শূন্য হাতে গায়ে পড়ে যে কেউ কোনো অনটনের বাড়িতে আশ্রয় নিলে তার কদর বেশিদিন থাকে না। তারওপর প্রভুহীন কুকুরের মতো কিশোরবেলা! তাই বেঁধা তীরের মতো আপন মামাদের পরিবারগুলোর সেই অবহেলার যন্ত্রণাটা যারা ওর ভেতর টের পেতো, মানে একই শ্রেণিভুক্ত আমাদের মা-চাচিদের অনেকে, যারা ওর আপন মামি ছিলো না, মানে যাদের ওপর ওর দায়িত্ব ছিলো না, তাদের কেউ কেউ ওকে কাছে পেলে আলগা বাৎসল্যে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। ভালো কিছু রান্না হলে ডেকে খাওয়াতো। কিন্তু কোনোদিন কারো প্রতি ওর কোনো ভাবান্তর আমি দেখিনি! এমন কি সৎমার কারণে বাবার ওপর অভিমান করে যাদেরকে আশ্রয় জেনে চলে এসেছিল এবং তাদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েও তাদের প্রতিও না!
কাছাকাছি বয়স আমাদের তবু শুধু ওর ওইটুকু বিশেষত্ব বেশি বুঝতাম বলেই অনেকের ভেতর থেকে যেন আমার কাছে ওর অমূল্য কিছু বন্ধক রাখা আছে! যেন ও একটুকরো ধূপের প্রাণে একবিন্দু লুকানো আগুন! ও কী মনে করে সেই কবে একদিন, ওই একদিনই বলেছিলো, ‘মা’র কথা মনে হলে তোর কথা মনে পড়ে! মা যেন চেহারায় না হলেও কিছু একটা রেখে গেছে তোর স্বভাবে!’ কিন্তু এতো শুধু ভেতরে রাখার মতো একটি বোধ। এর কোনো অনুরণন কখনো টের পাইনি!
আমার বিয়ের পর দূরের আত্মীয়-স্বজনদের জন্যও আমার বাসাটা ঠাঁই হয়ে উঠেছিলো। একসাথে যাদের সাথে বেড়ে উঠেছিলাম তাদের জন্য তো বটেই! কারণ তখন ঢাকা শহরে অনেকেরই কোনো আত্মীয়-স্বজন ছিলো না। কিন্তু শিবলু প্রথম দিকে ঘন ঘন এলেও ক্রমে আসাটা কমিয়ে দিয়েছিলো। সে নিয়ে কৈফিয়ত তলব করলে একবার শুদ্ধ ভাষায় বলেছিলো- দুঃখ-হাহাকার নিয়ে সুখি মানুষদের ভেতর বেশি ভিড়তে নেই। তাতে দুঃখের মর্যাদা কমে যায়। দুঃখ খুব দামি বিষয় বুঝলি! সুখি মানুষেরা দুঃখের মূল্য না বুঝে দুঃখওয়ালাদের সম্মান না করে করুণা করে। সেটাই আমার সহ্য হয় না। তাই এখন তোর কাছে আসতে দুঃখগুলো অন্য কোথাও রেখে আসতে পারি না বলে আসতে ইচ্ছে করে না! একসময় দেখবি, বহু বহুদিন তোর আমার দেখা নেই!
আমি বলেছিলাম, তুই না এলে আমি দুঃখ পাবো…।
শিবলু হা হা করে হেসে বলেছিলো, মনে কর, দুইপ্রান্তে দুই দুঃখি মানুষের বসবাস। একজনের দুঃখ যথার্থই দুঃখ, আরেকজনের দুঃখ দুঃখের মতো… হা হা হা…।
শিবলু বসা থেকে সটান উঠে দাঁড়ালো। তা কি চলে যাওয়ার জন্য না হাত-পা’র ঝিম ঝাড়ার জন্য আমি তা বুঝে ওঠার আগেই যেন স্বগোক্তি করতে লাগলো, যাইগিয়া রে। আর দুইঘন্টা পর ফ্লাইট। একঘন্টার বেশি লাগবো এয়ারপোর্ট পৌঁছতে। টিকেট কাটা না থাকলে আইজ রাইত হোটেলে থাইক্কা যাইতাম। কিন্তুক আগামীকাল একটা নাটকে পার্ট আছে। এইহানতন সরাসরি দলের প্রেসিডেন্টের বাসায় গিয়া রিহার্সেল দিতে যাওন লাগবো! অন্যরা অপেক্ষা করবো!’
ওর এসব যে আমি জেনেছি আমি তা চেপে যাই। কারণ ওর এতটা অধিকার ছিলো না আমার থেকে ওর নিজেকে এতোটা যোগাযোগহীন রাখার!
বয়স প্রায় সবারই মাথার চুল হালকা করে কপাল বড় করে তোলে। কিন্তু শিবলুর আগের মতো তেমনি মাথা ভরা চুল। সময় শুধু তাতে সাদামেঘের পরশ বুলিয়েছে। আমাদের একটি বাড়িতে পঞ্চাশটির মতো পরিবার বাস করতো। এদের কারোই তিনবেলা পেটপুরে খাওয়ার মতো অবস্থা ছিলো না। খাদ্যে যেখানে টানাটানি, সেখানে দেখতে নির্ভরতার মতো হলেও প্রতিটি সম্পর্কই থাকে চোরা টানাপোড়েনের থাবার ভেতর। তারওপর ছিলো না সেখানে কোনো একটি পরিবারেও এমন কেউ, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েগুলো যার কাছে থেকে কোনোরকম দিকনির্দেশনা পেতে পারতো। অথবা কারো শুধু সত্যনিষ্ঠ আচরণে অভিভূত হয়ে পরবর্তী প্রজন্ম তাকে আদর্শ মানতে পারে। তবে পুরো বাড়িতে সমান তালে লেখাপড়ার চলটা ছিলো। সেটা কম করে হলেও আগের প্রজন্মেরও ছিলো। আর ছিলো একজন আরেকজনকে টপকে সামনে যাওয়ার আশাবাদীতা। সেটাও আগের থেকে। তাই যে কারণে পাথর গড়াতে গড়াতে গোলাকার ধারণ করে সেভাবেই পুরো বাড়ির ছেলেমেয়েরা একইভাবে শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলো। যে ক’জন সর্বচ্চো পর্যায়ে পৌঁছেছিলো, শিপলু তাদের একজন। তাই সয়ম্ভূ বলতে যা বোঝায় শিপলু আসলে তাই! তারওপর ও কোনদিন কারো ভিতরে বিরক্তির উদ্রেক করেনি। সেটুকুই যেন সে চিরদিন সুসংহত করে রাখতে চেয়েছে। আর তার প্যাশনই হয়তো তাকে সর্ব অর্থে আজো এতোটা ঋজু রেখেছে। কৈশরে সুযোগ পেলে ও আমার হাতের খাবারটুকু ছোঁ মেরে দূরে গিয়ে তারিয়ে খেতো। আজও হঠাৎ এসে তেমনি একটু সুযোগ পেয়ে যেন ষোলকলা পূর্ণ করতে পেরে সে তুষ্ট। এরচেয়ে বেশি আশা করলে হয়তো আমার নিয়তিই বদলে যেতো!
আরো এককাপ কফি এনে শিপলুর সামনে রাখলে ও হেসে বললো, তুই হাঁসের মতো শুধু আমারেই খওয়াইবি?’ আমি মুখে তিতিবিরক্তির ভাব ফুটিয়ে বললাম, তোর খেদমত করতে করতেই তো আমি মরছি! আমার কথায় শিপলু হা হা করে হেসে উঠলো এবং আগ্রহ নিয়ে কফিটা খেয়েই যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আমি ওর পিছন পিছন গেট পর্যন্ত গেলাম। ও গেটের বাইরে গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে আমার মাথায় জোরে চাটি মেরে বলল, বেডা ছৈয়াল এতদিনে নির্ঘাত মরছে। কিন্তু তোর মাথার বিতর দুইডা কার্যকরী বিষয় ডুকাইয়া অমর অইয়া আছে। কী কপাল ব্যাডার! তর এইডা মাথা না রদ্দিমালের দোকান এহন তাই ভাবদেয়াছি…। আগে বাবদাম তর এত ব্যস্ততা, এতো ছুটাছুটি তার বেতর শিবলু মুরসালিন নামের কেওরে তুই চিনতি এইডাই বোধহয় বুইলা গেছোস্, তাই বাবছিলাম সবাইরেই বুইলা যাইতে সুযোগ দিই…।’ বলতে বলতে পকেট থেকে চারপাশে সুতা ওঠানো একটুকরো সাদা কাপড় বের করে সতর্ক হাতে আমার সামনে মেলে ধরলো। যাতে অপটু হাতের শেলাই করা অসমাপ্ত ক্ষুদ্র একটি নকশা।
শিবলু বললো, তুই বাড়ির ভাবীগো কাছে রুমাল শিলাই শিখতে আছিলি মনে আছে? শেলাই শ্যাষ অওনের আগে সে রুমাইল আরাইয়া গেলো। হায় রে তর চিল্লাফাল্লা! কান্দনে বাড়িতে বন্যা বইয়া গেছিলো। তুই এইডা খুঁজতে খুঁজতে খালি আমারে বাদ দিয়া আমাগো সমাইন্না সবগুলারে একেক করে চোর দরলি। মনে উডলে আমি এহনো হাসি। আমারে তুই এ্যকবার সন্দেহও করলি না!! আমি জানি এইডা শিলাইয়া তুই কারে দিতি, এই লাইগা লুকাইয়া ফেলছিলাম, বিশ্বাস কর চুরি করিনাই! এই তোর সেই অসমাপ্ত রুমাল! এহন ছৈয়ালের লগে আরো এট্টা মুখও যোগ অইলে তোর বিশেষভাবে মনে রাখতে। আমি নিশ্চিত…। তর এইহানে আমু দেইখ্যা আবর্জনা ঘাইট্টা এইডা লইয়া আইছি।
বুকের ভেতর একটা প্লাবন টের পেলাম। মুহূর্তে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমার যেন মন একাই হিসেব করে ফেললো, আমার বিয়ে হয়েছে পঞ্চাশ বছর। এ রুমাল তারও আগের। ব্যবহারহীন থাকায় কাঠপেন্সিলের আঁকও অম্লান রয়ে গেছে। চুরির জন্য করা চুরির যে এক ক্ষুদ্র অহেতুক বস্তু ও চারযুগের বেশি সময় ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে, এর কী মূল্য ও নির্ধারণ করে, তা ওর ওপর ছেড়ে শুকনো কণ্ঠে বললাম, তোকে একটা বর্ণচোরা বলা যায় বড়জোর…! আমার কথা পা বাড়ানো শিপলুর কানে গেলেও সে আর ফিরে তাকায় না! কিন্তু ওর অহেতুক রুমাল চুরির মতো আমিও অহেতুক প্রসারিত দৃষ্টিতে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি যতক্ষণ ওকে দেখা যায়…।
দ্বিতীয় পর্ব :
অনেকদিন পর শিবলু আবার এসেছে। ঠিক তেমনি না বলে এসেছে। টোকা শুনে দরজা খুলেই শিবলুকে দেখে এবার উচ্ছ্বাস চাপা রাখার কথা ভুলে গেলাম আমি। বললাম, আজো না বলে এলি? আমার ফোন নাম্বার তোকে দিয়ে রেখেছি না? একটা মেসেজও তো লিখে আসতে পারতি? আমি বাসায় না থাকলে?
গৌরাঙ্গ শিবলু তার বড় বড় দুটি চোখ পাকিয়ে আমার পেট বরাবর ঘুষির মতো হাত পাকিয়ে ধাক্কা দিয়ে বললো, হাবলি, তুই জানো না ইংরেজি, জানো না ডেরাইভিং বাসায় না থাইক্কা এই দুফুইরাবেলা তুমি একলা কই আর যাইবা? এইডা তোমার দ্যাশ পাওনাই যে রিকশা ডাইক্কা উইট্ঠা পড়বা! বড়জোর ল্যাপটপের বাটন টেপাটেপি করতে পারো এলহা বাড়ি বইয়া!
-এই, তুই আমাকে হাবলি ডাকতি, আমি ভুলে গেছিলাম!
-আমিও ভুইল্যা গেছলাম। এইমাত্র তর মুহের দিকে তাকাইয়া মনে পড়লো। হা হা হা…।
দরজা থেকে সোফার দিকে এগোতে এগোতে আমি বলি-এই না বলে আসার কালচারটা বাদ দে শিবলু!
-কৈফিত তলব করবা না কইলাম! তরে না পাইলে চইল্লা যাইতাম! মহাভারত অশুদ্দ অইয়া যাইতে তাতে? না কইয়া আওনের মজাই আলাদা! আমি এ্যর বিতরে আরো দুইবার মেলবোর্ন আইছি। তর বাড়ির কাছাকাছি দিয়া গেছিও। কিন্তু ইচ্ছা কইরা তর এইহানে আসিনাই। অবশ্য সাথে বিজনেস পার্টনার ছিলো, তরে ঝামেলা দিতে চাইনাই আসল কতা এইডা!
-ক্যানো? তুই এলে আমার কত ভাললাগে! তোর বিজনেস পার্টনার কি আমার সব খাবার খেয়ে ফেলতো?’ আমি পারলে কেঁদে ফেলি।
-আমার যেইডা বেশি করতে ইচ্ছা করে সেইডা আমি করি না। এইডা আমার নিজের সাথে লড়াই! অনেক বছর আমারে দেহোনাই তো, তাই আমার অতোখানি তোমার আমারে না চিনারই কথা। আমার বিতরে আমি একজন প্রতিপক্ষ পুষি, বুজলা? কতক্ষণ সুমায় থাহি, যাইতে কালে আমিও বুজমুনে তোমার কত নতুর সত্তা গজাইছে।
-আমার এমনি কত শূন্য প্রহর তুই এমনি এসে ভরিয়ে দিতে পারতি। এমন করে তোর ভেতরের প্রতিপক্ষের পরামর্শে কী কী বাদ দিলি রে জীবন থেকে?
-প্রত্থমেই তো তরে বাদ দিছলাম! এই যে আসল কথা বাইরাইয়া গ্যালে! তয় পত্থমবারে না। পত্থমবার তো তর সামনে আমি নাবালক! এহনো তুই দ্যাখতে আমারতন বড়। মাথার চুলও আমার থেইকা বেশি পাকাইছো!
-তাহলে আজ অনিচ্ছা নিয়েই এলি, বল? আর আমি সেই তোকে ফুল-চন্দন দিয়ে বরণ করবো ভাবছিস? আসতে ইচ্ছে না করলে আসিস না! তোর মতো খামখেয়ালি তুই একা নস আমার জীবনে। মনের দুয়ারে আরো কতজনের রেখে যাওয়া দাগ আছে, সে সবই মোহভঙ্গের যাতনা তা তো নয়, প্রেমের বেদনাও আছে!’ বলে গর্বিতের ভান ধরি!
-ও সবারই থাকে। থাকাটাই ক্রেডিট। না থাকার ভেতর কোনো গৌরব নাই। তবে ‘ সে রঙ যেন আমার সকল কর্মে লাগে! সন্ধ্যাদীপের আগায় লাগে? গভীর রাতের জাগায় লাগে’র মতো অয়! যা তো, এতো কতা কইস্ না! রান্দাবাড়া কী আছে বাইর কর? কপালে ফুল-চন্দন লাগবো না। ওসব বহুত পাইছি। বহুত মানুষ চন্দন বাইট্টা প্রদীপ জ্বালাইয়া বইয়াও আছে। তুই বাটিতে কইরা কয়ডা শাকপাতা দে! শশা কাট একটা। মাছ-মাংসের সাথে ছাগলের মতো খাই, হা হা হা…।
সেদিন আমার রান্নাটা আগেই হয়ে গিয়েছিলো। রাতের জন্য রান্না করা সব খাবারের কাছে ওকে ঠেলে নিয়ে দাড় করাই। শিপলু রয়েসয়ে সব পদ থেকে একটু একটু নিলো কিন্তু সেদিনও ও ভাত নিলো না।
আমি বললাম তোর কোলেস্টেলের অবস্থা কি?
-কী জানি কে আর মাপতে গেছে! বেছেবুছে খাই! দৌড়াই। জিমে যাই!-কিন্তু আমি তো বেছে খাই না! ঠিক মতো হাঁটিও না। শরীরে ওজন। ভিটামিন ডি’র সংকট। আর বলিস না দেশ থেকে ভিটামিন ডি এনেছি ছয়মাসের। এখানে আসার আগে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। চিকিৎসা করেছিলেন ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল। তিনি যা ওষুধ লিখছিলেন, সব কেনা হয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তার একটা করে দুইবেলা দুটো খেতে বলেছেন সে ঢাউস আকারের ট্যাবলেট, কিন্তু প্রতিবেলা ও ওষুধ খাওয়ার কথা মনে হলে, ওই যে আগেকার দিনে আট বছরের মেয়ের বত্রিশ বছরের যুবকের সাথে বিয়ে হলে, বিকেল হতেই সে মেয়ে নাকি কোথাও লুকিয়ে পড়তো। আর সন্ধ্যা হলে যখন সে শিশুমেয়েকে খুঁজে পাওয়া যেতো না জামাইয়ের ঘরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে রাখতে, বাড়ির ছোট-বড় সবাই মিলে তখন ঘরের চাঙ্গি থেকে মাচা করে রাখা খড়ের পালার নিচেও কেড়াইল ঢুকিয়ে খুঁজতো। ভেবে দেখ, খড়ের পালার নিচে সাপ থাকে। মেয়েটি সাপের চেয়ে বেশি, তার থেকে বয়সে তিনগুণ বেশির স্বামীকে ভয় পেতো…! বিশ্বাস কর দেশ থেকে আনা ও ওষুধটা সাইজেও যেমন বড়, তেমনি খরখরে। গলায় আটকে যায়। তাই প্রতিবার ও ওষুধ খাওয়ার আগে আমি আটবছরের খুকির মতো মনে মনে ভীষণ পালাই পালাই করি, বিশ্বাস কর! আমার মনে হয় ও ওষুধ ডিমের খোসা দিয়ে বানানো। একদিন গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম, ডিমের খোসায় ভিটামিন ডি আছে।
শিপলু এতক্ষণ চেখে চেখে খেতে খেতে চোখ বড় করে একটানা আমার এতগুলি কথা শুনে আসছিলো হু-হা না করেও। কিন্তু শেষের কথায় ভয়ার্তকণ্ঠে বললো, তাই বুইল্যা ডিমের খোসা খাওবোছো মনা!
-খেয়েছি তো কদিন! ভাবলাম এই ওষুধই যদি ডিমের খোসায় তৈরি হয়, তাহলে আর একেকটা ওষুধ ত্রিশটাকা করে কিনবো কেন?
-তাই বুইল্যা সরাসরি ডিমের খোসা খাইছো?
-কেন? গুণাগুণ জানলামই যখন তাহলে পরিস্কার করে, মানে সিদ্ধ করে খেলেই কি? আমি নিশ্চিত আমাদের দেশে ওই ওষুধ ডিমের খোসা দিয়ে বানিয়েছে।
-আরে বেডা, সায়েন্টিফিক উপায়ে ডিমের খোসা দিয়া ক্যান, ভীষ্মের গু-মুত যা দিয়ে বানাইলে বানাইছে। কিন্তক তুই যদি ডিমের খোসা দাঁত দিয়া কুচকুচাইয়া চাবাও, দাঁতের এনামেল তো যাবেগিয়া, দাঁত ক্ষয় অইয়া মজ্জা বাইর অইয়া কয়দিনেই সব দাঁত না উপড়াইয়া উপায় থাকবো না! নইলে পানি খাইতে গ্যালেও ইইই করবি। আর ব্যথার বর্ণনা তো দেহলামই না!
-তুই জানিস কেমনে? তুই খাইছিস কখনো?
-সবকিছু খাইয়া দেহন লাগে? আমি তর মতো পিত্তিছাড়া? তুই ছোডবেলা কাঁচা চিংড়ি কচকচাইয়া খাইতি, এইডা এহনো কেউ ভোলেনাই! তর কতা উঠলে ওইডাই আগে উডে! আরে বলদা, পাটা-পুতা দিয়া পাথ্থরের গুড়া বাটলে পাটা দুইদিনে ক্ষয় অইয়া যাইবো, বাইট্যা দেখ!
– ঠিক বলেছিস তো? বাটাবাটির বিষয়টা তো আমার জানার কথা ছিলো। আমি মনেহয় তাহলে আমার নিজের কিছুটা ক্ষতি করেই ফেলেছি শিবলু!
-সত্যিই খাইছিলি কহনো?
-হ্যাঁ!
-ভালো করছিস। তরে বুঝায় কারো বাপেরও সাইদ্য নাই। যা চা বানায়ই আন। দুধ দিয়া! তারপর সোফার ওপর একটা বালিশ আইন্যা রাখ। কভারডা ধোয়া অয় য্যান। তর মতো খবিশের মাথার গন্ধ য্যান আমার নাকে না লাগে!
-তুই না ব্ল্যাককফি খাস্?
-আরে ব্যাডা সেইডা তো ঠেকায় পইড়া খাই! চায়ে আধাচামুচ চিনি দিছ্! আর আমি যুদি ঘুমায়ে পড়ি এইফাঁকে দুইখানা আলুর চপ বানাইস! ওই যে আগে যেমনে বানাইতি অমুন য্যান অয়! আর না ঘুমাইলে লাগবো না। গল্প হরি! তগো কেউরে কাছে পাইলে ছোডবেলার স্মৃতি উথলাইয়া ওডে! আর আমাগো মাথাতোলা ছাওয়াল গো বিত্রে মাইয়া তো তুই একখানই ছিলি যে নৌকা বাইয়াও আমাগো হারাইয়া দিতি।
চা বানাতে আমার ভালোলাগে। আর শিবলুর জন্য চা কেন, ও যা-ই বলুক তাতে আমার আনন্দ মিশে থাকে বলে ভালো হয় না মন্দ হয় আমি বুঝতে পারি না। তবে আমি কেবলি কৃতার্থভাব অনুভব করি! সেটা অবশ্য যখন চারপাশ থেকে কাজিনরা সবাই সরে গেছে যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে। কেউ কেউ আরো দূরে গেছে টান ছিঁড়ে। কেউ কেউ সাধারণত দরকার না থাকলে একটা সময় থেকে আসতো না।
মানে আসাটা বন্ধ করে দিয়েছে। কারণটা এমনও হতে পারে, শুরুতে কখনো যার আশ্রয় দরকার হয়, জীবনে অবস্থা ফিরে গেলে আগে তাকেই ত্যাগ করো। কারণ, তার মনে ও চোখে আঁকা আছে তোমার দুর্দশাগ্রস্ত সব ছবি! সবস্থানে নিজের বড়ত্ব জাহির করতে পারলেও ওইখানে মেপে কথা বলতে হবে, তাই…।
কিন্তু খুব কম হলেও শিবলু তার মতো আসতো।
একচুলোয় চা আরেক চুলোয় চিনিসহ দুধ সমানভাবে জ্বাল দিয়ে, তারপর চুলা নিবিয়ে দুধের সসপ্যানে চা ছেঁকে দুটো কাচের গ্লাসে গলাগ্লাস করে ভাগ করে নিয়ে আমি শিবলুর সামনের সোফায় এসে বসলাম। শিবলু বললো, এ্য কি? এ্যা? তুই গেলাশে কইরা চা আনছো ক্যা?
-বউ যদি সুন্দরী হয়, সুযোগ পেলেই কেউ কেউ জর্জেটের শাড়ি আর স্লিভলেস ব্লাউজ পরিয়ে বন্ধুদের বাড়িতে বেড়াতে নেয়। সিনেমা দেখতে যায়।
-ক্যা?
-বউ সুন্দরী বলে! যার ভাগ দিতে হয় না তা দেখিয়ে সুখ আছে না? হাটের বড় রুইমাছটা কিনে কানকোর ভেতর দিয়ে দড়ি সেঁধিয়ে বেঁধে হাতে ধরে বাড়ি আনতে সে মাছের সাথে পথের মানুষ চলে আসতো উঠোন পর্যন্ত। আর শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা তাদের কারো কারো সামনে কুটেকেটে গেরস্ত মানুষের লোভ জড়ানো সে মাছ তো রেঁধে একাই খেতো, তাই না? না হলে মাছ আনতে ও গেরস্তের কি বাড়িতে একটা বস্তা ছিলো না!
-তোর গেলাসে চা দেওয়া আর আধল্যাংটা করে বউ বেড়াইতে নেয়া এক অইলে? তুই ক, কাপ না থাকলে আমি কিইন্না দিয়া যাই! জীবনে তুই তোর সংসারে হামলে থাকা আমার মতো সবগুলারে সামর্থের বাইরেও বহুত দেওয়ার সুযোগ পাইছো। অথবা সুযোগটা আমরা নিছি! দীর্ঘসুমায় ধইরা ঢাকাতে তোর বাড়িই আছিলো আমাগোর একটুকরা ঠাঁই!
আকন্ঠ স্মৃতির সাগরে নিমজ্জিত হওয়া আমি পাখির মতো গা ঝেড়ে বলি- আরে খাওয়ার আগে সর্বাঙ্গ তারিয়ে দেখার একটা বন্য আনন্দ আছে না? নে খা! এক কবি বলেছিলেন, চায়ের ওই প্রথম চুমুকই চা!
বাকিটা আর না খেলেও চলে। আমিও তার সেই কথা ধরে বসে আছি।
-হা হা হা তুই তো আগে এতো ফাজিল আছিলি না! ফাজিল অইতে মেধা লাগে। মেধা ধার দিয়া তরে এতো ফাজিল বানাইলো কেডা?
শিবলুর প্রশ্নটা আমি লুফে নিই। বলি-একজন না, দুইজন আমাকে ফাজিল হতে মহান অবদান রেখেছেন। একজন কবি সৈয়দ হায়দার। আরেকজন ছড়াকার আলম তালুকদার। আলম তালুদার একসময় অফিসে ঢুকে প্রথম ফোনটা আমাকে করতেন। তার নতুন আবিষ্কৃত কোনো কৌতুক, হাস্যরসাত্মক কোনো তথ্য বলতে তিনি আমাকে যথার্থ মনে করতেন। বলতেন অন্য নারীদের হজমশক্তি কম!
-আর কবি হায়দার?
কবি সৈয়দ হায়দারের কথা একসাথে নানান বিষয়ে মনে পড়ে আমি হাসতে থাকি। যিনি মারা গেলে আমি অনেক কেঁদেছি। যার জন্য আমার বিশাল একটি কবিতা আছে। আর প্রথম গল্পের বইটি আমি তাঁকে উৎসর্গ করতে লিখেছিলাম-নিঃসঙ্গ দুপুরের মতো একটি আর্তপাখি/ আশ্রয় খুঁজে ফেরে যে বৃক্ষের শ্যামল ছায়ায়!’ তারপরও তার কিছু কিছু কথা মনে উঠে যখন-তখন আমি একাই হাসতে থাকি। তখন শিবলুকে কোনটা রেখে কোনটা বলবো! তবু বলা শুরু করলাম, বললাম, শোন্, একবার এক কবিকে তিনি আমাকে দেখতে যেতে বললেন, আমি যাবো না তো যাবোই না! তিনি বললেন, যদি আমাকে সুহৃদ মনে করেন। যদি ভাই মনে করেন, আমার কথাটা রাখে…।’ আমি তাকে থামিয়ে বললাম, আমি তো ভাই-ই মনে করতে চাই আপনাকে! কিন্তু আপনিই তো আমার সাথে ফাজিল ফাজিল কথা বলেন!
-হা হা হা, সৈয়দ হায়দার কী কইলেন?
-শোন না, হায়দার ভাই আমার কথায় বললেন, ‘ওম্মা, মানুষের মামাতো খালাতো ফুপাতো ভাই থাকে না?’ এটুকু শুনেই শিবলুর মুখে পোরা চা ছিঁটকে এসে ওর সামনের সোফায় বসা আমার সারা সারামুখ ভরে গেলো। সে তা দেখেও গা করলো না। বরং মনেহয় এমনটি ভাবলো, এটা আমার দোষে হয়েছে। সে একটুও দুঃখিত না হয়ে হেসেই যাচ্ছে। আমি কিছুটা রাগের ভানে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছে পেপারটা ওর দিকে ছুঁড়ে ফেললাম। আর গলগলে হাসির ভেতরই শিবলু বললো, ওনার অনুরোধ সত্ত্বেও তুই দ্যাখতে যাইতে চাইতেছিলি না কারে, তার নাম ক?
-না। যাদের নাম বললাম, তারা মৃত। যাকে দেখতে যেতে চাইনি তিনি প্রখর সৃষ্টিশীলতার ভেতর এখনো জীবিত! যখন তিনি থাকবেন না, তখনো অনেক অনেক জীবিতকে ম্লান করে তিনি প্রবলভাবে তার সৃষ্টিতে বাঁচবেন। কিন্তু এখন নাম বলবো না! আর তা তার জীবিত থাকার দোষে বলবো না।
-তাইলে মৃত মানুষের নাম না বইল্যা তুই ভাব-বাইচ্চে আমরে ঘটনা বলতে পারতি! কারণ মৃত মানুষের নাম উচ্চারণ করতে আরো সংযত অইতে অয়। কারণ তাগো সম্পর্কে তুই যা কবি, তাই সই। তারা তো আর প্রতিবাদ করতে আইবো না!
-শিবলু, আমি কী বলবো, তা কি তোর থেকে আমাকে শিখতে হবে? তুই ভুলে যাস্ না যে আমি কথাশিল্পী…।
আমার রাগটা কপট ছিলো না। তাই শিবলু থতমত খেয়ে বললো-আরে তুই মনে হরছো, আমি গিয়া জিগামু? জানো আমি কত্ত বছর দ্যাশে যাই না?
-হ, আমি তোমারে শ্রীকৃষ্ণ মনে করে চলি আর কি, যিনি সব সত্যের ধব্জা ধারণ করে আছেন! আর কয়েক মাস আগে যে এয়ারপোর্টে দেখা হলো, ঢাকা থেকেই তো এলি!
-ওইডারে যাওয়া কয় না! দীল্লিতে কাজ আছিলো। ঢাকা অইয়া ফিরছি। দুদিন আছলাম ঢাকা, তাও কাজে ছিলাম। কেও জানেও না আমি গেছি যে। কারণ দ্যাশটারে বহুদিন দইরা আমার কাছে দ্যাশ মনে অই না! আর বঙ্গবন্ধুর কইন্যা তো দ্যাশটারে ঢালের শ্যাষ কিনারে রাইখ্যা গেছে! কী দুর্ভাগা দ্যাশ, যেখানে একটা রাজনৈতিক উত্তরসূরী তৈরি অয়নাই! বঙ্গবন্ধুর কইন্যা কথাবার্তা যেমুন ভাবে কওয়া শুরু হরছেলে, দ্যাশের হাল ধরার অন্য মানুষ থাকলে ওনার দলের লোকই ওনারে সরাইয়া দেতে!
রাজনীতির আলাপ ছেড়ে আমি পুরনো প্রসঙ্গে তুলতে বলি, শোন শিবলু, তবু আমি সেই নাম বলবো না।
এই সংযম আমি তোর থেকে শিখেছিলাম। তোর চরিত্রের এই একটুখানি রেশ আমাকে ভীষণভাবে দাগ কেটেছিলো। এটুকুর জন্য আমি আজো তোর কাছে কৃতজ্ঞ।
আমার কথায় সোফায় হেলে থাকা শিবলু বেশ ঔৎসুক্য নিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে আমাকে অনুরোধ করে জানাতে, তার নিজের সে বিষয়টা কি?
-তুই ঢাকা বেড়াতে এসে বাড়ি চলে যাবার আগে আমাদের বাসায় এসেছিলি। এসে শুনলি গতকাল আমার বিয়ে হয়ে গেছে। মা তোকে খুব বুঝিয়ে বলে দিলো কোন কোন বাড়ি গিয়ে বিয়ের খবরটা পৌঁছুবি। ছয়মাস পর জানা গেলো আমার বিয়ের খবরটা তুই কাউকে বলিসনি! কেউ জানতোই না।
আরো মাস ছয়েক পর আবার যখন তুই আমাদের ঢাকার সে বাসায় এলি, মা তোকে খুব বকলো। বকাগুলো গিলে তারপর তুই হীমস্বরে মাকে বলেছিলি, মামীমা, আপনি জোছনার বিয়ের কথা বলার সাথে বলেছিলেন, এখনো কাবিন হয়নি। তার ওপর ঢাকায় থাকা আত্মীয়রা, মানে আমি ঢাকায় এলে ছোট খালাম্মার বাসায় উঠি, তারাও ফিসফাস করতেছিলো, অতো বড় ঘরে নাক- চোখহীন মেয়ের বিয়ে? বিয়েটা টিকবে কি না। তাই আমি ভাবছিলাম, কাবিনটা রেজিষ্ট্রী হোক, তারপর আবার গিয়ে বলবো।’ তোর কথায় মা কী মনে করেছিলো আমি জানি না। কিন্তু অইটুকু বয়সে তুই আমাকে অনেক বড় করে দিয়েছিলি। আমাদের দাম্পত্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে সহায়তা করেছিলি তোর এইকথায় এবং তোর চারিত্রিক দৃঢ়তায়! তখন কতটুকু বয়স আমাদের! আমি শহরের স্কুলে নাইনে। আর তুই গ্রামের স্কুলে টেনে। কিন্তু তোর সততা-দৃঢ়তা আমাকে আবিষ্ট করে রেখেছে। নাক-চোখহীন সেই আমাকে সব কাজে প্রখরতা দেখানোর প্রবণতায় পেয়ে বসলো। আর প্রচ্ছন্নভাবে সাথে থাকলি তুই!
আহারে, কত্তদূর পৌঁছাইদিলি তুই আমারে। সেইহানতন উঠতেও তো আইজ্জার চাউলের ভাত লাগবো আইজ রাইতের খাওনে! যাউক, ভালো মাইনষে গো প্রভাব পড়ছে তর ওপর। তর চা’ও ভালো অইছে! রাত এগারোটা পর্যন্ত আছি। খাওন তো রান্দাই আছে। আরেকবারও আমি নিজে লইয়া খামুনে। তুই মনে কইরা খালি আমারে আর দুইবার দুইকাপ চা খাওয়াইস!
-তুই কখনো আমার একটা গল্প পড়ছিস?
-যেটা নজরে পড়ে সেটা কি না পড়ে পারি?
-এই তোরা আমাকে ট্যালাও ডাকতি!
-তুই এহনো ট্যালা! ট্যালাগো সুবিধা আছে। তাগো নজরে সব গলদ দরা পড়ে না!
-তুই আমার গল্প নিয়ে কখনো কিছু বলিস নাই!
-তর সাতে আমার দেহা অইছে তারপর? মানে তর লেহালেহি শুরুর পর।
-তোদের কেউ একজন এই আমি গল্প লিখি, ছাপা হয়, তুই পত্রিকায় আমার গল্প পড়ে বা দেখে আনন্দ পাস, এটা জানাতেই তোর আমাকে খুঁজে বের করা উচিৎ ছিলো ডুব মেরে না থেকে!’ আমি গর্বিত ঢংয়ে হেসে বলি।
-তোমাগো লেহইন্যা মানুষের ওই এক দোষ। নাম ছাপা অইলেই কী হনু রে ভাব! অথচ দুয়িাজোড়া আবিষ্কার কইরাও বিষয়ডা খবরে তুলতে একজন আবিষ্কারকের সময় লাগে। তোর গল্প দুইচাইরডা যা পড়ছি, পইড়ে আমার দুঃখ অইছে।
-কারণ কি?
-তর নজরডা কার দিকে আছিলো মনে কইরা দেখ? রুমালডা তো এমনি লুকাইনাই!
-তো?
-আমি তো তোর গল্প যে কয়ডা পড়ছি মনে হয় গল্পজুড়ে বদরুলই প্রচ্ছন্ন…।
-একজন লেখক যা লেখেন, তার থেকে নিজেকে বের করতে সময় লাগে। তুই প্রশ্নটা তুললি বলে ওর কথা মনে হলো। তবে তোর এটা মনে হয় আমার মনের বয়স বাড়েনি? ওরকম কত বদরুল এলো- গেলো!
-আল্লারে, মাইয়ামাইনষে এমনতারা কইতে পারে? আমি এই প্রত্থম জানলাম।
-নাহ, ওইটা তোমাদের একারই অধিকার!
-তয় বদরুল তরে ছ্যাঁক দিয়া কাজডা বালোই হরছেলে! একছ্যাঁকে তরে কোনহানতন কোনহানে তুইল্যা দিছে!
-অবশ্যই! সেটা না হলে আমি বুঝতাম কী করে মানুষের জন্য যা কিছু ঘটে, তারচেয়ে না ঘটাটাও অনেক সময় ভালো। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন না, ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে…।’
-‘এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর জীবন ভরে/ বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে/ না চাহিতে মোরে যা করেছ দান/আকাশ আলোক তনু মনও প্রাণ/ দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায়/ সেই মহাদানেরই যোগ্য করে/ অতি ইচ্ছার সংকট হতে বাঁচায়ে মোরে…।’ শিপলু গলা ছেড়ে গাওয়া গানটি থামিয়ে বললো, কথাডা কি দ্যাক, ‘অতি ইচ্ছের সংকট হতে বাঁচায়ে মোরে!’
-আমি বললাম, তুই গানও জানিস?
-আরে বেডা সঙ্গদোষে লোহা ভাসে। একজনরে ভালো লাইগ্যা গ্যালে তারে কাছে পাইতে কইলাম আপনার ছাত্রছাত্রীদের সাথে আমাকে গান শেখান, তাই মাঝারি বয়সে শিখছিলাম কয়ডা! সে আমার আসল কথা জানার আগেই তল্পি-তল্পা গুটাইয়া অন্যখানে গ্যাছেগিয়া, আমার শেখাডা আমার রইয়া গ্যাছে! বউ গ্যালে সব নিয়া যায়, আর প্রেমিকারা এমন কিছু না কিছু দিয়া যায়! আর নিজেরে চর্চার বিতরে না রাখলে মেরুদণ্ডে জোর থাহে না! তা তুমি খালি লেহো না পড়োও। তোমার ঘরে তো পড়নের কোনো পরিবেশ তোমার লাইগা দ্যাখতে আছি না! সারাজীবন মা অইয়া থাকলে তো অবে না! খালি ফেসবুকের পড়ায় কিন্তু লেহা অইবো না। অইবো না মানে, অইবো না। তয় নিজের ওয়ালে নিজে পোস্ট দিয়া কয়েকটা লাইক-কমেন্ট পাইবা! নিজে ইচ্ছা করলে ক্ষোভ ঝাড়তে পারবা! মার্ক ইলিয়ট জাকারবার্গ তোমাগো এই সুবিদাটা আইনা দিছে!
আমি বেশ রাগ দেখিয়ে বলি- দেখ শিবলু, আমি যা করি, সেটাতেই আমার মনে হয় আমি আমার সৃষ্টিশীল সত্তার জন্য আহার জোগাড় করছি। নিজেকে আমি যথাযথভাবে, মানে ছাড়া গরুর মতো তৈরি করতে গেলে কি ছেলেমেয়ে নিয়ে এ পর্যন্ত আসতে পারতাম? মা মাকড়সার দিকেও নজর রাখিস। তার মহিমাও ভুলিস না নিজের পারঙ্গমতা ফলাতে।
-তোমার মতো মাকড়সার অভাব নাই। ওইডা তাগো সবার একটাই পরিণতি! কিন্তু লেহাডা তোমার নিয়তি না! এটা সাধনা করে আয়ত্ত্ব করতে অয়! একজন শিল্পীকে যার সাথে তুলনা করা অয়, সে তার কাছেই মার খায়! নাইলে আরো কত রবীন্দ্রনাথ জন্মাইতো এক রবীন্দ্রনাথ মরার পর থেইক্কা! ‘চকচক করিলেই সোনা হয় না!’ এটা বহু কালের প্রবাদ। কিন্তু এসেছে শেক্সপিয়ারের ‘All that glisters is not gold.’, থেকে। বিষয়ডা সহজ। কিন্তু অনন্য! অতএব খোঁড়া যুক্তি ছাড়ো। তুই কী লিখবি, কাদের জন্য লিখবি, কোন পর্যন্ত পৌঁছানোর স্বপ্ন সেটার ছক আগে না কষলেও এখন কষো! আর না হয় ক্ষ্যান্ত দেও! সরি, এতোগুলি কথা কইতে অইলে তর লেহা যতটুক পইড়া কওনের দরকার আছিলো, তা পড়িনাই। আমার স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করলাম। তয় যা কইলাম আমারে অভাজন মনে কইরাও আজ্ঞাটা মানলে লাভবান অইবা। নিজেরে নিজে ছাড় দিলে তোমার সৃষ্টির বিচার কেউ দয়া বা সহানুভূতি যোগ কইরা করবো না। বিচারে যাইতে অইলেও তোমার সৃষ্টি তোমার নিজেরই জাইন্যা বুইজ্জা পাঠকের সমীপে পাঠাইতে অইবো! আর শোন, রোষ ফুরাইয়া গ্যালে আর বকতে পারমু না, তুমি নিজেরে যত সুখি মনে হরো, অতো সুখি তুমি না! সাক্ষীটা আমি। বিষয়ডা অইলে, কেউ যখন ছোটখাটো দুঃখগুলো নিয়াও বকবক করতে থাহে, সে যে দুঃখি, সেইভারে সে তলাইয়া থাহে। কিন্তু তুমি কাঁটাগুলা ঝাড়া দিয়া কেবল ফুলগুলো সাজানো মানুষ। এই জন্য আমার মতো ভ্রমরের তোমার জীবনে অভাব নাই! এই যে দুইডা দিনের একবেলা হইরা তরতন নিয়া গেলাম, সৃষ্টির রেণুতে য্যান মনপ্রাণ বইরা গেলো…। সেদিন যে আইছিলাম, সেদিনই বুঝছি তোমার পরিবর্তনডা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা খুব দুর্লভ। বুঝছি তোমারে ক্যান মানুষ মনে রাহে। আমার মতো বোহেমিয়ানও তরে মনের কোনায় রাইখ্যা অযথা ভালোইস্যা গেলো! হা হা হা…।
-আহ্, শিবলু, তুই এই কথাগুলি যদি তোর বরিশালের ভাষায় না বলে শুদ্ধ ভাষায় বলতি, আমি রেকর্ড করে রাখতাম। ফেসবুকে পোস্ট দিতাম আর সুযোগ পেলেই সবাইকে শোনাতাম!
-আরে শয়তান, আমি কইছি কি সেইডাই বড় কতা! কোন ভাষায় কইছি সেইডা বড় কতা না!
-ও, ভুলে গিয়োছলাম তুমি যে কিংবদন্তি অকৃতদার প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের এক্কেবারে আপন নাতি, তাই না?
-ও রে হারামি, বাঁকা কতাডা কী সুন্দর কইরা সোজা ভাষায় কইয়া দেলে! তয় শোন, শুদ্ধ ভাষায় তো অনেকেরে রাস্তায় ফালাইয়া গালাগালিও দেই! কিন্তু তগো সাথে আমি যদি আমার বাপের জেলার ভাষায় কথা না কই, আমার থাকলো কি! এইডা তগো কাছে আমার দর্প, যে আমারে তরা সবটা বিলীন হরতে পারোনাই! আমিও এট্টা বিশিষ্টতা লইয়া চলি হা হা হা…।
সন্ধ্যা হতে ছেলে-বউমা বাসায় এলে বউমাকে বাদ দিয়ে দুইপক্ষই প্রথমে চমকে গেলো। কারণ বউমার আগে সুযোগ হয়নি শিবলুকে দেখার। ছেলেকে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হলো না। বিমূঢ হয়ে থাকা সময়টুকুর ভেতর তবু মনে করিয়ে দিলাম, বেশ বড় হয়েও যাদের ঘাড়ে চড়তে, মাথায় উঠতে সেই দিকপালদের একজন। স্মৃতির ঘন কুয়াশা সরিয়ে শৈশবে দেখা শিবলু মামাকে নয়ন চিনে নিলো। আর সেই আনন্দে অল্পক্ষণের ভেতরই হাঁড়িপাতিল বেশি করে খালি হয়ে গেলো। তারপর ছেলে-বউ একসাথে দুজন ওপরতলায় চলে গেলো। নিচেরতলায় থাকলাম দুপুর থেকে গেঁজানো পাঁচনের মতো বুদবুদওঠা স্মৃতিতাড়িত আমি আর শিবলু। রাত এগারোটা পর্যন্ত থাকবে ও। তবু আবারও দ্রুত দুই কাপ চা বানালাম, তারপর দুটো কাপে ঢেলে একটি শিবলুর হাতে ধরিয়ে দিলাম। চা বানানোর সময় গন্ধ পেয়েই শিপলু উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলো। ও চুলোর কাছে দাঁড়িয়ে থেকে দেখলো আমি কীভাবে চা বানাই।
আজ ওর সবকিছুতে উচ্ছ্বাস বেশি দেখে আমার ভেতরটাও কুন্ঠাহীন লাগছিলো। মানে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বটা আজ আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিলো না। বারবার সমবয়সী ওর কাছে নীতি ও কৌশলে পরাস্ত হয়ে থাকা নিজেকে প্রায় ভাঙাচুরা মনে হতো। এবার একসময় বলেই ফেললাম, তুই আমার কথার ঠিক উত্তর দিবি না মনে করে আমি জানতে চাইনি সেদিন। তোর বউ আছে তো তোর কাছে, শিবলু? শুনেছিলাম ঝামেলা হয়েছিলো?
আমার কথার উত্তর না দিয়ে চা’এর ঢোক গিলে শিবলু হাসিতে ফেটে পড়লো। তারপর বললো, তহন তুই আট বছরের মেয়ের বত্রিশ বছরের স্বামীর কতা কী কইতেছিলি, আমি বুজিনাই। সেই তখন থেইকা আমার মাথা এইডা নিয়া ভিতরে ভিতরে কাজ করতে আছিলো। আমি এতক্ষণে এইডারে মিলাইতে পারছি। তুই কোন ফাঁকে মচমইচ্যা আলুর চপ বানাইয়া ফেললি, তাও মিলাইতে পারলাম না। কারণ সোফার এতো কাছে তোর চুলা। আমি টের পাইলাম না ক্যা? আর তুই আইজ একটানা আমার সামনেই গেঁজাইতেয়াছো। তয় তুই এসব পারোস, সবতে কইতো। কিন্তু তুই একটা সাইজে বড় খরখইররা ওষুধের সাথে বত্রিশ বছরের বেডা আর আট বছরের মাইয়ার তুলনা দেছো, খেড়ের পালা-সাপ…। কেড়াইল। হা হা হা…। ঠিক এইর লাইগাই তর লগে আমার প্রেম অয়নায়, যদিও সুযোগ আছিলো না! কোনো মাইয়ামানুষ কোনো পুরুষমাইনষের কাছে এই গল্ফ হরতে পারে এ্যা? আরে আপন না অই, সৈয়দ হায়দারের কথায় আমি তোর কোনো একরকম তো ভাই তো! যা কবি, ইকটু রইয়া-সইয়া ক! চিন্তা-ভাবনার তুলনা করলে বলতে অয় মানুষ চান্দে-মঙ্গলে পৃথিবীর সাথে বাঁশ ছাড়াই প্রায় সেতু বানাইয়া ফালাইলো, আর তুই কোনকালে শিশুব্যালা অজগাঁয়ে কী দেইখ্যা, কী শুইন্যা আইছো তাই কপচাও! শিশুমাইয়া ক্যান পলাইতো, তুই বুজতি ক্যামনে এ্যা? কোনহানকার কোন ছৈয়ালের ধুরন্ধর বুদ্ধিও তোর মাথা ছাড়ে না। তোরে দেহি আমি একলা না, আমরা সবতে মিইল্যা হাবলি কইতাম। বড় অন্যায় হরছি এহন মনে অইতেছে। সবতেরে একত্র কইরা তর কাছে আমাগো ক্ষমা চাওয়া লাগে!
শিবলু হাসতে থাকে আর আমি তন্ময় হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকি, বলি ওটা তোরা তোদের গায়ের জ্বালার থেকে বলতি। কারণ তোদের চোখের আলোতেই আমি আমাকে আবিষ্কার শুরু করেছিলাম। তোদের শক্তিকে নাগাল পেতেই আমি আমার ভেতর তেজ সৃষ্টি করতে শিখি অবচেতনে। আর তা এখন বুঝি। আগে বুঝিনাই। বা আগে বুঝলেও প্রকাশের ভাষাটা জানা ছিলো না! আগে সংসারের টানাপোড়েনের ভেতর হিসাব করতাম, কে কতটা খেয়ে গেলো। কে কতোটা নিয়ে গেলো। এখন হিসাব করি, কে কতটা দিয়ে গেছে! মানে রেখে গেছে। সেই অর্থে আমি তোদের সবার কাছে ঋণী! আমার স্মৃতিজুড়ে তোদের আনাগোনা মউমউ করে। মা’র ছেলে ছিলো না বলে মা’র প্রচণ্ড হীনমন্যা ছিলো। সেই অভাবকে পূর্ণ করতে তোদের সাথে ডাঙায় শাক তুলতে গেলে তোরা যখন একটা একটা ডগা ছিঁড়ে গামছার কোচড়ে রাখতি, আমি সরিষা বা পাট-তিলগাছের শেকড়সহ তুলে আঁটি বেঁধে মাথায় করে আনতাম। মনে আছে? যদিও কার সর্বনাশ করে এসেছি ভেবে মা কিল-চড়-থাপ্পড়ে আমাকে প্রতিবার হুশিয়ার করেছে। চা ঠাণ্ডা হলে আমি অখুশি হই। চা’টা খা!
শিবলু চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর বলতে থাকে, বউয়ের কথা জিগাইছিলি? প্রায় দশ বছর আগে বউ চইলা গেছিলো। বাঁধা দেইনাই। আবার একলাই আইছে। ফাঁকতালে মাইয়াডারে আমেরিকা রাইখা আইছে। মাইয়ার বিয়াও অইছে সেইহানে। তারও দুইডা বাচ্চা অইছে। মানে আমার এই এক নাতি, এক নাতনি।
– তুই তাদের দেখিসনি!
– দেহি। ভিডিও কলে।
-মানে অনেকদিন তুই পরিবার ছাড়া ছিলি?
-আরে আমি ওই বউয়ের পরিবারটার খাল দেইখ্যা বাঘ মনে হরছিলাম। মনে হরছিলাম পুরা পরিবার সংস্কৃতিবান। পরে দেহি টাকা কামাই ছাড়া আর কিচ্ছু বোজে না। অন্যসব কাজ তাদের কাছে অর্থহীন। আমারে খোটা দেয় আমার স্ট্যাটাস তাগো সমান না। আমি অনেক টাকা কামানোর ধান্দা করি না, যা তাদের একমাত্র লক্ষ্য। আমার নাটক করা, নাটক লেখা দুটোই তাদের কাছে সময়ের অপচয়। আমার বন্ধু-সতীর্থদের পর্যন্ত অপদার্থ মনে করতো। বউয়ের উপরেও সেই প্রভাব আইয়া পড়লে আমি বউরে কইলাম, নিজের মতো থাকো অথবা বাপের বাড়ি ফিইরা যাও, আমার কোনোদিন স্ট্যাটাস অইলে খবর দিমুনে। আইসো।’ কইয়া সুটকেস-পাসপোর্ট লইয়া বাইর অইয়া পনেরোদিন পর আইসা দেখি মা- মাইয়া বাসায় নাই। এহন ফিইরা যহন আইছে, তাইলে আমার স্ট্যাটাস অইছে মনে লয়! হা হা হা…।
-জীবন থেকে শূন্য গেছে যে একটি দশক?
আমি শূন্য না ভাবলেই হয়। তবে মাইয়াডার জন্য কষ্ট পাইছি। যাই রে, উবার কল করেছি বারোটায় ফ্লাইট।’ বলে নিজেই দরজা খুলে বাইরে নামে শিবলু। আমি ওর পিছনে পিছনে যাই। পথ আর ক’কদম! গেটের কাছে গিয়ে শিবলু ঘড়ি দেখে বলে, হিসাবে বুল অইছে। আরো দশ মিনিটের দূরত্বে আছে গাড়ি ‘ বলে এবার আর চাটি মারে না। হাতটা চেপে রাখে মাথায়। কয়েক সেকেণ্ড দম নেয়। তারপর বলে শোন, আমি আইজ অন্য কোনো কাজে আসিনাই। তরে দেখতেই আইছি। পরশু আমেরিকা যাচ্ছি। বউ অনেকদিন থেকে বলছিলো চলে যেতে। কাগজপত্রও সে-ই করছে। কিন্তু যে যত ডাকে আমি ততো পিঠটান দিই! বউয়ের বেলায়ও তাই করছি। তবে মেয়েকে বড় সে একা করলেও দায়িত্ব পালনে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি…। বউ গতসপ্তায় আমারে না জানাইয়া চইলা আইছে।
-তুই বউকে এতোদিন একা রাখলি ক্যান?
-ওই যে চাইছিলাম, আমার থেইকা বালো কাউরে পাইলে চইলা যাক, আমার কাছে থাইক্কা, আমার পাশে শুইয়া কেউ ভাবতে পারে আমার মূল্য তার সমান নয়, কথা শোনাইতে পারে সে আমার থেইকা বালো কাউরে জীবনে পাইতে পারতো! অন্ধকারে না রাইখা তারে আমি সুযোগ দিলাম ঘেরাটোপ ছিঁড়তে। দুর্বলতার গ্লানি লইয়া আমি কারো কাছে বাঁচতে পারবো না। বউ যদি এই কয়বছরে কারো সাথে সম্পর্ক রাইখা, বা ঘর কইরাও আসে, আবার বিনা সাধাসাধিতে তারেই তো ফিইরা আইতে অইলো! যদিও এতে আমার জয়-পরাজয় কোনোটাই নির্ণয় করছি না!
-এতেই তুই খুশি? কোনো খটকা নাই তো মনে?
-একজন পার্টনারের দরকার নারী-পুরুষ সবার। বিশেষ করে যে বয়সে এসে ঠেকেছি। অবশ্য সেই হিসাবেও না। আমার সন্তানের মা তো সে! আরেকটা প্রজন্ম এসে গেছে। মানুষ হিসাবে ছাড় যা গেছে, তাতে আমার সম্পূর্ণ ভূমিকা ছিলো না। কিন্তু আমার যে প্রজন্ম এসে গেছে তাতে আমার নিজেকে যুক্ত না রাখলে তাদের বড় একটা গ্যাপ থেকে যাবে, যা পুরণের নয়। তাদের সাথে নিজেকে যুক্ত করার এবং যুক্ত হওয়ার দায় আমার আছে। আর আমি আমার জীবন থেকে ওই কয়টা বছর বাদ দেবো। ভাববো, মানে ওই কয়ডা বছর ভুলে যাবো। খাবার প্লেটেই বা কে কবে ফ্রেস খাবারটা তুলে দিয়েছিলো বল? তোদের বাড়িতে এক মেয়েকে আমার পছন্দ ছিলো। নাম বলবো না।
-আমি জানি। সে-ই বলেছে আমাকে।
-তাই? আমি অর্চির সাথে ভাব করতে চাইলে সে সাড়া দিয়েছে, কিন্তু আমি কাঙালের মতো তার চোখে প্রেম খুঁজেছি, কিন্তু ওই কাঙালপনার ভেতর সে কোনো প্রার্থনা অনুভব করেনি। আর যার চোখে প্রেম খুঁজেছি তার চোখে আমি অঢেল করুণা চাই নি! কারো অতোটা করুণার নিচে আমি নিজেতে চাপা দিতে চাইনি! মা ছিলো না, মামাদের কাছে বেড়েওঠা। কিন্তু আমি শরিকের দাবি নিয়ে ছিলাম তাদের কাছে। তারা যা করেছে, সেটা তাদের বিষয়। আমাকে তাদের সন্তানদের সাথে বাৎসল্যে মানুষ করেনি বলে আমার মা’র সম্পত্তি সবটুকু তাদের থেকে উসুল করেছি, এটা বোঝাতে যে আমি অবাঞ্ছিত কেউ ছিলাম না! কিন্তু বাবার সম্পত্তি সব সৎভাইবোন আর সৎমাকে ছেড়ে দিয়েছি। যদিও আর বাড়িতে যাইনি, বাবাকে জানিয়ে ছিলাম আমার সবটা আমি ওদেরকে দিয়ে দিলাম।
খুব সতর্তভাবে নিজেকে তৈরি করতে করতে আমি অপেক্ষা করেছি…। একটা নিঃশর্ত প্রেমের তৃষ্ণা চাতকের মতো জেগে ছিলো বুকজুড়ে। তোদের বাড়িতে সব ঘরে আমার আশ্রয় ছিলো। কিন্তু অধিকার কোনো ঘরে ছিলো না। অথচ মা’র সম্পত্তি বিক্রির প্রশ্ন ওঠাতেই পুরো গোষ্ঠী জেনে গেছে ওবাড়িতে আমার কতটা অধিকার ছিলো। বরাবর লেখাপড়ার খরচ আব্বা দিয়েছেন কিন্তু আব্বার বিয়েটা আমি মানতে পারিনি। হয়তো ওটা উনি আরেকটু দেরিতে করলে আমি বুঝতাম এটা ছাড়া উপায় তার উপায় ছিলো না!
-কিন্তু অর্চিকে তুই বুঝতে ভুল করেছিলি…।
-বাদ দে, এটা যার যার নিজস্ব উপলব্ধি। নাবিলার সাথে বেশ কয়েক বছর আনন্দেই কেটেছে। আমি চীনে চাকরি করতাম। কাজ ছিলো বাংলা নিয়ে। ও, মানে নাবিলা ওখানে রেডিওতে ইংরেজি খবর পড়তো। বিয়েও ওখানে হয়েছিলো। কিন্তু পরে ওর পরিবার ওখান থেকে গিয়ে সেটেল করে আমেরিকায়। কিন্তু ও আমার সঙ্গেই থেকে গিয়েছিলো। সেই দিনগুলোর জন্য আমি ওর কাছে ঋণী। তুই একটা মারাত্মক সত্য একটা বিষয় আমার কাছে উন্মোচিত করেছিস্। তা হলো চা’য়ের প্রথম চুমুকই চা! সেরকম জীবন যতোটুকু, তা যাপন হয়ে গেছে। এখন নতুন বন্ধনগুলোতে প্রাণের পরশ বুলিয়ে যাওয়া, চারাগাছে জল সিঞ্চনের মতো।
গাড়ি এসে গেলে শিবলু দ্রুত ঢুকে পড়তে পড়তে একহাতে গাড়ির দরজা টেনে বন্ধ করতে যাচ্ছিলো, আমি কী ওর প্রতি কী একটান নিয়ে ছুটে গিয়ে দরজার হাতল খাবলে ধরলাম। শিবলু দরজা ছেড়ে দিয়ে বললো, কি?
আসলে বিষয়টা কিছুই ছিলো না।
আমিও এমনিই মাথাটা গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে ওর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখলাম। আমার ঠোঁট ওর ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের জন্য। শিবলু আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিলো না, ওর ঠোঁটে শিহরণ- আহ্বানও কিছু জাগলো না। আমি তা চাইওনি। তেমন কিছু হলে সেটাই বরং বেমানান হতো ওর-আমারও জন্য। আমি শুধু এমনি এক বিষের ভাণ্ডে একটু অমৃত মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলাম মাত্র। অথবা এক বিষে অন্য বিষ মিলিয়ে যৌগ করার বাসনা জেগেছিলো। অথবা ওর কিছুটা আমার করে রাখা আমার কিছুটা ওকে তুলে দেয়া, না কি, কি ভেবেছিলাম আমি জানি না! আমি গাড়ির বাইরে মাথাটা বের করে আনলে শিবলু বললো এটা আমার বহুদিনের ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু বলেছি না, যা আমার করতে ইচ্ছে করে আমি তার বিপরীতে চলি!
-দুপুর থেকে রাতের এতোটা সময় তুই থেকে গেলি। এই শেষ মুহুর্তে যাওয়ার সময় বললি, তুই আজ আমার জন্য এসেছিস্! এই শুধু এইটুকু সময় আমাকে দান করে আমার অমাত্রিক জীবনটা সুন্দর বেদনায় ভরে দিলি! জীবন নিয়ে খামখেয়ালি করার অবকাশ যে আমার কোনোদিন হয়নি! প্রখর বাস্তবতার ভেতর বসবাস করে একাকীত্বের হাহাকার নিয়ে দূরে দূরে সরে থাকা তোর সাথে আমার চেষ্টা করে কোনোদিন যোগাযোগ করা হয়নি।
– এইটুকু বুঝতি, তাও যদি জানতাম! আহা বিধাতা, এতোটা সুখের পর কারোই বেঁচে থাকা ঠিক না!
-তুই আমার জীবনে মধুরতা হয়ে থাকলে, যদিও তা হলাহলও হতে পারতো। তবু তো সে কালকূট তুই-ই থাকতি! চলে যা তুই। তোর কাছ থেকে যা রাখলাম, তুই জানতেও পারবি না এ আমার কাছে কী দামি হয়ে থাকলো! তুই আমেরিকা চলে যাচ্ছিস, তোর সাথে আর দেখা হবে, সে আশা করি না শিবলু। কারণ জীবন অতো সময় আমাদের আর দেবে বলে মনেহয় না। ভাবছি তুইও তাহলে সময় বিবেচনা করেই ঘরে ফিরছিস্! তবু তোর বিরহ আমার মহার্ঘ হবে! পথের দূরত্ব যেমন বেড়ে গেলো, আর দেশেই বা তুই আসবি কেন? আমিও কোথায় থাকি তাই বা কে জানে! অতএব এটাই বুঝি শেষ দেখা! শেষের কথাগুলো বলতে আমার গলা কাঁপতে থাকে।
শিপলু গাড়ির দরজাটা যেন অবশ হাতে টানলো। যেন এসময় দুয়ার বন্ধের নয়! তাই শব্দটুকু অন্তত রোধ করলো। ওর গাড়ি চলে গেলে আমি অতি ধীর পায়ে ঘরে ফিরে দেখি অ্যাশট্রেতে জ্বলজ্বল করছে সিগারেটের কটা পোড়া অংশ। ফ্লোরে ঝরা ক্ষীণ ছাইও দূরের ছায়াপথের তারার মতো জ্বলছে। কাপে চায়ের দাগ। ঘরজুড়ে ওর নিজস্ব গন্ধ। আমার চোখ ফেটে অশ্রু গলতে লাগলো। অশ্রুকে প্রশ্রয় না দিতে দুইহাতে মুখ ঢেকে ভাবছিলাম, এই ভুরভুরে ঘ্রাণ যে রেখে গেলো তার সাথে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না…। আর দেখা হবে না বলেই কি এই অবিন্যস্ত সোফা-কুঁচকানো বালিশ আর তামাক পোড়া গন্ধ-ছাই সব মহার্ঘ হয়ে উঠলো! এই পরিত্যাক্ত সবকিছুও অন্যের জীবনে সুন্দরতা করে তুলে রাখতেই কি ও বলে, ও ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে চলে! মানে সুন্দরতারহিত জীবন ওর নয়! কোন উৎস থেকে এই অনাবিলতাকে ও আহরণ করে এনেছে?
ও ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তারপর বললো ওর সাথে আমার আর দেখা হবে না! আর এই জন্যই সে অতক্ষণ থিতু হয়ে থেকে গেলো, শেষ থাকা। খামখেয়ালিপণা ছাড়া যে কোনোদিন নিজের কোনো বৈশিষ্ট্য জাহির করেনি বলে, গড়পরতাদের মতো থেকে গেছে সবার কাছে। কিন্তু ওর ছোট ছোট কিছু গুণের প্রকাশ আমাকে সারাজীবন ওর প্রতি মুগ্ধ করে রেখেছে। এইটুকু জানাও ওর কাছে অনেক ছিলো। বলিনি।
একঘুমে রাত পোহালেও সারারাত যেন ওর আঞ্চলিক কথা এবং শেষ সময়ে বলা শুদ্ধ কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছি।
সকালের সব কাজ সেরে ভাবছি একটি আবেগঘন মেসেজ ওকে লিখবো। কিন্তু কোথায় শিবলু? কাল ওর দিকে মুখ বাড়াতেই ভাবছিলাম এই বুঝি ওকে হারালাম। ও আর একটুও থাকবে না আমার জীবনে। যে শিবলু গতকাল সময়ের অগ্রগতিকে বোঝাতে চাঁদ-মঙ্গলের সাথে পৃথিবীর সেতুর সম্ভাবনাকে আমাকে উদাহরণ হিসাবে দেখিয়েছে, এই এইটুকু সময়ের ব্যবধানে সে আমার জীবনে মৃত্যুর সমার্থক দূরের হয়ে গেলো! শিবলু আমাকে ফেসবুকে ব্লক করেছে। আমি জেনেশুনে বিষ পান করলেও, আমিও কি ওর সাথে অগৌণের মতো আচরণ করতে ফোনে চেষ্টা না করে পারি না, গভীরভাবে মনে রেখেও ভুলে থাকার নিবিড় ভানে! না হলে ওকে আর কী বুঝলাম, যে খেয়ালের বশে একটি বাঁধাই করা বইয়ের মতো যেন আপনার অবয়ব থেকে পৃষ্ঠা খুলে খুলে গতকালই আমাকে পাঠ করিয়ে গেছে!
