তিন রাস্তার মোড়। একটি রাস্তা গুদারাঘাটের দিকে উত্তরে গেছে, একটি পশ্চিমে, অপরটি বয়ে গেছে পুব দিকে। আমাদের বাড়ি এই তিন রাস্তার মোড়েই অবস্থিত। গুদারাঘাটের দিকের রাস্তার পিঠে একে একে অনেকগুলো দোকান। একেবারে ঘাট লাগোয়া জাফর কাকার দোকান। তারপর বড় দোকানটি সেলিম মিজির। তার বিপরীতে আবুল খায়ের কাকার দোকান। তারপর সোলায়মান খাঁর দোকান। তারপর আমাদের বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে জনা গাজীর দোকান। আর একেবারে মোড়ে আমাদের দোকান। আমাদের দোকানটিই ছিল গ্রামের প্রথম দোকান, যা এখন পরিত্যক্ত। পরিত্যক্ত হওয়ার আগে জনা গাজী এটি চালাতেন।
গরমকাল। পলে পলে কোর্তা-খাওয়া বাতাস আমাদের উদাম গায়ে ধাক্কা লাগায়, তালপাতা শনশন করে বেজে ওঠে। আমরা এই মেঠো রাস্তার বুকে চাড়া দিয়ে দাগ কেটে গুঁড়াগাড়ার দল সারাদিন হা-ডু-ডু খেলায় মেতে থাকতাম— আমি, আমানউল্লাহ, কুট্টি, শাহজাহান, সালাম। গ্রামীণ জনপথ সুনসান নীরবতায় অলংকৃত, মাঝে মাঝে কেবল পথিকের দেখা মেলে। কালেভদ্রে দেখা যায় দু-একটা রিকশা। তবু আমাদের এই গুদারাঘাট সকাল-বিকেল সব সময় সদা জাগ্রত প্রহরীর মতো। এখানটাই গ্রামের প্রবেশপথ, গ্রামের উন্মুক্ত সংসদ। রাতের সব খবর সকালে আর সারাদিনের সব খবর বিকেলে একে একে এসে উপস্থিত হতো দোকানগুলোর মাচায়— ঘরের অন্দরমহল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সব খবরাখবর। কার বউ কী বলেছে, কার মেয়ে কোথায় গিয়েছে, কে কাকে গালমন্দ করেছে, কোথায় মারামারি-ঝগড়া লেগেছে, কোথায় গরু, জমির আইল, গাছ কিংবা পাতা কুড়ানো নিয়ে কাইজ্জা (ঝগড়া) বেধেছে— সব মিলত এখানে। তেমনি আবার নদীর জোয়ার-ভাটার কথা, ঝড়-তুফান, মেঘ-বৃষ্টির কথা, এমনকি রাজনীতির কথাও বাদ যেত না। এই একই পথ ধরেই চলে আসত খেলার কথা, ফুটবলের কথা, চলে আসত পেলে-ম্যারাডোনার কথা।
সাধারণত বৃষ্টির সময় ফুটবল নিয়ে কথা হয় একটু বেশি। তবে এবার বুঝি একটু আগেই ফুটবল নিয়ে কথা হচ্ছে। গড়ের মাঠের ফুটবল নিয়ে নয়, একেবারে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে আলোচনা। চায়ের দোকান, মাঠ, হাটবাজার— সবখানে একই আলাপ: এবার কাপ কে নেবে? ম্যারাডোনাই নেবে! নব্বইয়ে তো নিয়েই গিয়েছিল প্রায়, শুধু রেফারির বিতর্কিত পেনাল্টির বাঁশি বাদ সাধল। ছিয়াশিতে (৮৬) তো নিলই— সব ম্যারাডোনার একক জাদুতে। দুটি গোল তো শতাব্দীর সেরা গোল; একটির নাম ‘হ্যান্ড অব গড’ (Hand of God), আরেকটির নাম ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ (Goal of the Century)।
আমাদের পাঠ্যবইতে তখন আমরা ‘কালো জাদুকর’ নামে পেলের জীবনী পড়ছি— ফুটবল বিশ্বের প্রথম জাত প্লেয়ার, প্রতিপক্ষের জালে এক হাজার গোল করেছিলেন। আর এদিকে চায়ের দোকানে শুধু ম্যারাডোনার জয়জয়কার— হাত দিয়ে গোলের কথা, ৭-৮ জনকে কাটিয়ে গোলের কথা, একাই একটা দলকে টেনে নেওয়ার কথা। সব মিলিয়ে সকলের মুখে মুখে ম্যারাডোনার নাম। যারা সদ্য যুবক, তারা হা করে শুনছেন আর গিলছেন বড়দের মুখে মুখে রচিত মিথ, উপমিথ, সত্য এবং আষাঢ়ে গল্প। গল্প শুনতে সে কী আনন্দ, সাথে সাদা মুড়ি আর চানাচুর! আরও শুনতে চাই, আর কে বলবে— সেই অপেক্ষা চোখে-মুখে। তখন আমি বালক, ক্লাস ফোরে পড়ি। সাল ১৯৯৪।
গ্রামে রাত জেগে খেলা দেখার একটা গ্রুপ ছিল— স্বপন কাকা, ভুট্টো কাকা, দুলাল কাকা, টিপু মামা, হাফেজ পাটোয়ারী, দুলাল মাস্টার, বাদল কাকা। কিন্তু কোথায় দেখা হবে এবার খেলা? কার বাড়িতে? কার ঘরে? গ্রামের সব বাড়িতে তখনো কারেন্ট (বিদ্যুৎ) আসেনি। আবার যাদের বাড়িতে কারেন্ট ছিল, তাদের অনেকের বাড়িতে টিভি ছিল না। যে দু-এক বাড়িতে টিভি ছিল, তাও আবার সাদা-কালো। সবার আলোচনায় মোটামুটি ফয়সালা হলো— মাঝের বাড়ির কাছারিঘরই এবার খেলা দেখার স্পট। সকল আয়োজন সম্পন্ন। কেউ মেঝেতে পাটি এনে বিছাল, কেউ টিভি নিয়ে এল। হাফটাইমের সময় মুখে রুচি ফেরানোর জন্য কেউ কেউ এনে রাখতেন সাদা মুড়ি আর ঝাল চানাচুর।
রাত ১০টা, ১২টা, ৩টায় ম্যাচ হতো। কোনো দিন দুটি, কোনো দিন তিনটি ম্যাচ। ম্যাচের ফিক্সচার এনে টাঙিয়ে রেখেছেন মাঝের বাড়ির দুলাল মাস্টার কাকা। অ্যান্টেনায় ‘ঝিরঝির’ সমস্যার কথা বিবেচনা করে আবহাওয়া পূর্বাভাসের মতো সব ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে ছেলেপুলের দল। যখন গ্রামের এই অবস্থা, আমি তখন স্বপন কাকাকে বলে-কয়ে রাজি করিয়েছি খেলা দেখতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ছোট বলে প্রথমে রাজি হননি; পরে বহু পীড়াপীড়িতে রাজি হলেন কাকা। স্বপন কাকাদের বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে— আমাদের বাড়ি থেকে দুই-তিন বাড়ি পার হয়ে পশ্চিমপাড়ায়; দাদীর আপন ভাইপো। এশার নামাজের পর খাওয়া-দাওয়া করে আমাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন যথারীতি দাদী। আমি শুয়ে রইলাম, ঘুমালাম না। দাদীকে বললাম, “স্বপন কাকা আসবে, কাকার সাথে খেলা দেখতে যাব মাঝের বাড়ি।” দাদী বললেন, “দরকার নাই, ঘুমা। রাত জাগতে পারবি না, শরীর খারাপ করবে।” এমন সময় স্বপন কাকার ডাক, “কামাল, কই তুই? আয়…।” এক ছটকায় বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়ে কাকার কাছে চলে এলাম রাস্তায়। অবশ্যই বলে রাখা ভালো যে, রাস্তা লাগোয়া আমাদের বাড়ি। ঘর থেকে রাস্তার দূরত্ব হাত তিন-চারেক। দাদী বললেন, “যাইস না, যাইস না।” স্বপন কাকাকে বললেন, “দেইখ্যা রাখিস, দেইখ্যা রাখিস। আমারে জ্বালাইয়া খাইলো, আর পারি না।”
রাত ১২টা। খেলা শুরু। ম্যারাডোনাকে তখনো আমি চিনতাম না। মুখে মুখে নাম শুনেই তার ভক্ত হয়ে গেলাম। পাখির আলীর ছোট ভাইয়ের নাম হয়ে গেল ‘ম্যারাডোনা’। বয়স তিন-চার বছর, ম্যারাডোনার মতোই খাট্টাখুট্টা তার দৌড়। পাখির আলীর নামও অবশ্য আরেক পাকিস্তানি ফুটবলারের নামে, কিন্তু কেন তার নাম পাখির আলী তা আদৌ জানা হলো না। পাখির আলী আমার সমবয়সী মামা, আবার সহপাঠীও। তবু ভাগ্যের কী নিয়তি— এক ভাই ম্যারাডোনা, আরেক ভাই পাখির আলী!
যাক, খেলা শুরু হলো। কাকা ম্যারাডোনাকে চিনিয়ে দিলেন— জার্সি নাম্বার ১০। দেখে কেমন জানি বুড়ো বুড়ো লাগল। তখন আমার বয়স নয়-দশ বছর। ভাবছিলাম মাইনুদ্দীন মামার বয়সী হবে অথবা টিপু মামার বয়সী। টিপু মামা আমাদের অত্র দুই-চার গ্রামের মধ্যে সেরা ফুটবল প্লেয়ার। তিনি মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত— এমন এক অঘোষিত ফলাফল অনুমান করা হতো। আন্তঃস্কুল খেলায় তিনি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্লেয়ার। দারোগা মাঠে ফরকাবাদের বিপক্ষে শেষ দশ মিনিটে তিন গোল দিয়ে, চার গোল খাওয়া দারোগা উচ্চ বিদ্যালয়ের লজ্জায় নিমজ্জিত মুখ উজ্জ্বল করেন। পল্লীমঙ্গল মাঠে হামানকর্দির বিপক্ষে গ্রাম পর্যায়ে ৪-০ গোলে পরাজিত করে ট্রফি নিয়ে আসেন, একাই করেন দুই গোল। বল নিয়ে তার পায়ের কারুকাজ ছিল দেখার মতো। আমরা টিপু মামার খেলা দেখতে ছুটে যেতাম গ্রাম থেকে গ্রামে— সেই আলগী, কামরাঙা, শেখদী। টিপু মামা আর দুলাল মামা ছিলেন এমন এক জুটি, যেন ম্যারাডোনা আর ক্যানিজিয়া (Caniggia)। ভুট্টো কাকাও ভালো খেলতেন। হা-ডু-ডু আর ফুটবল খেলা আসলেই এরা তিনজন দলে ‘মাস্ট’ থাকতেন, এদের ছাড়া দলই পূর্ণ হতো না। ক্রিকেট তখনো গ্রামীণ জীবনের কোলাহলে তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।
আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ ছিল ২১ জুন ১৯৯৪। খেলার স্কোর: আর্জেন্টিনা ৪ – ০ গ্রিস। ম্যাচের ৬০ মিনিটের মাথায় সতীর্থ প্লেয়ার ফার্নান্দো রেদেন্দোর পাস থেকে দুর্দান্ত এক বাঁকানো শটে গোল করেছিলেন ম্যারাডোনা। গোল করার পর ক্যামেরার দিকে সোজা দৌড়ে এসে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে তার সেই ভয়ানক ও উন্মাদনার দৃষ্টি ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম এক আইকনিক মুহূর্ত। তার কিছুক্ষণ পর ম্যারাডোনা মাঠ থেকে উঠে যান। অপর তিনটি গোল করেন গোলমেশিন ‘বাতিগোল’ (গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা)। পরের ম্যাচ ২৫ জুন নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। ফলাফল: আর্জেন্টিনা ২ – ১ নাইজেরিয়া। প্রথমে এক গোল খেয়ে পরে দুটি গোল করে ক্যানিজিয়া দলকে জয়ী করেন। ম্যাচ শেষে ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ ‘এফিড্রিন’ পাওয়ায় ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়ে যায়। ফিফার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশ্ব ফুটবলপ্রেমী কেউ এমন একটা সিদ্ধান্ত ভাবতে পারেনি। পেপার-পত্রিকায় এই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও আলাপ-আলোচনা হচ্ছিল, আজও হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা কী? মাঠের খেলার বাইরে রাজনৈতিক খেলা কতটুকু চলেছে— তা নিয়ে চলত চুলচেরা বিশ্লেষণ। সে সময় মানুষের মুখে এমন একটা কথা চাউর ছিল যে, বিশ্বকাপ কর্তৃপক্ষ ম্যারাডোনার বিপক্ষে; আমেরিকা-ইংল্যান্ড ম্যারাডোনার বিপক্ষে। কী হবে আর্জেন্টিনার? কী হবে ম্যারাডোনার? পরের ম্যাচে বুলগেরিয়ার সাথে ২-০ গোলে ম্যারাডোনাবিহীন আর্জেন্টিনা হেরে যায়। এবং এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে রোমানিয়ার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় সর্বকালের লিজেন্ড ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপ শেষ, তারপরও ম্যারাডোনা আলোচনায়। বিবিসি নিউজ করল, সিএনএন নিউজ করল, ভয়েস অব আমেরিকা নিউজ করল। আর কখনো ম্যারাডোনাকে দেখা যায়নি ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে। এদিকে আমি স্কুলে আন্তঃক্লাস ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু করে দিই। খেলায় অংশ নেবে ক্লাস থ্রি, ফোর এবং ফাইভ। থ্রি-কে ম্যানেজ করা আমার জন্য সহজ ছিল, কারণ আমি থ্রির ব্যাচেরই ছিলাম (পাখির আলী, আনিস ও জয়নালকে বলে দিলেই সব হয়ে যেত)। ফাইভকে বলে-কয়ে রাজি করালাম। ফাইভের ক্যাপ্টেন হলো আমিন, ফোরের আমি আর থ্রির পাখির আলী। জুলফু মামার দোকানে বসে সব ঠিকঠাক করলাম— কে কোন দিন খেলবে। শুরু হলো খেলা। প্রতিদিন টিফিন পিরিয়ডের সময় খেলা হতো। প্রথমে টিচারদের কেউ জানতেন না, কারণ আমাদের হেডস্যার খুবই রাশভারী ও গুরুগম্ভীর ছিলেন। প্রত্যেক ছাত্র তাঁকে শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় করত, আমিও করতাম। স্যারেরা মনে করতেন ছেলেরা এমনি এমনি খেলছে। আস্তে আস্তে খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠল। রেফারির দায়িত্ব পালন করলেন আমার গৃহশিক্ষক কাদির মামা। ক্লাস থ্রির কাছে ফাইভ হেরে যাওয়ায়, ফাইনালে আমাদের ফোরের সাথে ওঠে থ্রি। এই ঘটনাটি সে সময় ক্লাস ফাইভের ছাত্রদের একটু বিব্রত করেছিল, আর থ্রি-দের আনন্দ ধরে না। তখন বর্ষাকাল— আজ রোদ তো কাল বৃষ্টি। তখন কাদির মামা টিচারদের অবগত করলেন। ঠিক হলো, বৃহস্পতিবার হাফ পিরিয়ডের পর স্কুল ছুটি হলে স্কুল মাঠেই ফাইনাল খেলা হবে এবং স্যারেরা উপস্থিত থেকে খেলা দেখবেন। অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফাইনাল খেলা শুরু হলো। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। পাখির আলী সাহেববাজার থেকে কিনে আনল চার আনা দামের এক প্যাকেট চকলেট, উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বিতরণ করার জন্য। অবশ্য আমরা চাঁদা তুলে সেই টাকা জোগাড় করেছি। আমি আর কুট্টি টাকা জমিয়ে বল কিনেছি, আর হাওয়া দিতে চলে যেতাম সাহেববাজার। সে কী আনন্দ— প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব! খেলার শেষ পর্যায়ে এসে মফু মামার জোরালো ফ্রি-কিক থেকে থ্রির একটি মেয়ে আহত হলে হেডস্যারের নির্দেশে খেলা ওখানেই সমাপ্ত করা হয়। বড়রাও আমাদের ক্ষুদে ফুটবল ম্যাচ দেখতে ছুটে আসত। টিপু মামাও আসতেন, সাইডলাইন থেকে বলে দিতেন— এভাবে খেল, ওভাবে খেল। খেলাধুলার প্রতি ভীষণ ঝোঁক ছিল আমার, আমি ক্যাপ্টেন্সি করতাম।
একদিন জাহাঙ্গীর মামা বাবাকে বললেন— “তোর মতোই কামাল হইছে।” অর্থাৎ বাবারও খেলাধূলার দিকে প্রচন্ড ঝোঁক ছিল। ভালো ফুটবল খেলতেন। খেলতেন— গ্রাম ভিত্তিক ফুটবল, বিবাহিত- অবিবাহিত ভিত্তিক ফুটবল, শহর বনাম গ্রাম ভিত্তিক ফুটবল। আয়োজকও ছিলেন। তিনি আক্কাস আলি মাঠে ও জেলা স্টেডিয়ামে খেলতেন। বাবার বেশ সুনাম ছিল নানা দিক দিয়েই। তারই একটা ছায়া জাহাঙ্গীর মামা আমার মধ্যে দেখতে পেতেন।
খেলাধূলার নাম শুনলেই কেমন জানি তোর মতোই কামাল হয়ে যায়— এটাই জাহাঙ্গীর মামা বাবাকে বলতেন। । আমাদের ক্লাস ফোরের টিমে খেলত— মফু মামা, ইয়াছিন, আফজাল, আমানউল্লাহ, কুট্টি, ইমাম হোসেন, আলাউদ্দীন, মোর্শেদ ও ওমর ফারুক। আফজাল খুব ভালো দৌড়াতে পারত, মফু মামা ছিল বেস্ট প্লেয়ার, আর ওমর তুলনামূলক কম খেলা পারত। থ্রির মধ্যে ভালো খেলত শিপলু, মানিক, সাহাবুদ্দীন ও পাখির আলী।
আমাদের খেলা শেষ হলে শুনি, জনতা উচ্চ বিদ্যালয় নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রদের নিয়ে চার দল গঠন করে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে— শাপলা, দোয়েল, বাঘ এবং কাঁঠাল। সবগুলোই জাতীয় প্রতীক নিয়ে গঠিত দল। ফাইনালে উঠল শাপলা আর বাঘ। শাপলা দলের অধিনায়ক ছিলেন নশু মামা, উনি গোলকিপার খেলতেন। আমি আর কুট্টি মেঘ-বৃষ্টি মাথায় করে মাইল দুয়েক মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে জনতা স্কুল মাঠে খেলা দেখতে যেতাম। বড় বড় মানকচুর পাতাকে ছাতা বানিয়ে দুই দোস্ত হাঁটতাম আর গল্প করতে করতে যেতাম। তারপর শুরু হলো আন্তঃস্কুল খেলা দারোগা স্কুলে, তারপর গ্রামভিত্তিক ফুটবল খেলা। খেলা আর খেলা, আনন্দ আর আনন্দ। বড়দের সাথে মিশে গিয়ে আজ এখানে, কাল ওখানে খেলা দেখতে যেতাম।
এরপর গ্রাম ছেড়ে শহরে আসি। নতুন পরিবেশ, নতুন মুখের ভাষা বুঝতে বুঝতে চলে এল ১৯৯৮ সাল। আবারও বিশ্বকাপ। বাংলাদেশে তখন ভয়াবহ বন্যা— স্মরণকালের বন্যা, যা ৮৮-র বন্যাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা ডিএনডি (DND) বাঁধের ভেতরের বাসিন্দা; জায়গায় জায়গায় বাঁধ ভাঙার উপক্রম। ভয়ে অনেক সময় রাতে বাড়ির ছাদে ঘুমাতাম। এমন সময় বিশ্বকাপ চলে আসল। আর্জেন্টিনার এবারের ভরসা বাতিস্তুতা আর ওর্তেগা (Ortega)। বাতিস্তুতার খেলা দেখলাম, ওর্তেগারও খেলা দেখলাম। শুরুটা দারুণ ছিল, তবে মন ভরল না। তবে বিশ্ববাসী জিনেদিন জিদান নামে নতুন এক ফুটবল জাদুকরকে দেখল। জিদানের জাদুতে ফ্রান্স প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ স্পর্শ করল। তারপর ২০০২ এল; এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আয়োজন হলো বিশ্বকাপ। দিনের বেলায় সব খেলা হওয়ায় তেমন একটা দেখা হলো না। তবে ফাইনাল খেলা দেখলাম, রোনালদোর (Ronaldo) খেলা দেখলাম। তারপর এল ২০০৬ সাল; ক্রেসপো, তেভেজ, রিকেলমে-দের ওপর আশা রাখলাম, কিন্তু হতাশ হলাম। ২০১০ সালে ম্যারাডোনা কোচ হয়ে এসেছিলেন এবং মেসি, তেভেজসহ একঝাঁক তারকা প্লেয়ার নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, তবু মিশন ব্যর্থ হলো— জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে। এল ২০১৪ বিশ্বকাপ; মেসির শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বকাপ। জানপ্রাণ দিয়ে খেলে ফাইনালে হেরে গেল আবারও জার্মানির গতির কাছে। মেসিকে নিয়ে আলোচনা চারদিকে— তিনি ক্লাব সেরা প্লেয়ার, বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের জন্য ফিট নন। মেসি অবসরের সিদ্ধান্ত নিলেন, ভক্তরা হতাশ হয়ে অনুরোধ করলেন। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা-কল্পনা পাশ কাটিয়ে মিশন ২০১৮ শুরু হলো। এবারও নতুন এক গতির দানব এমবাপ্পের কাছে হেরে বিদায় নিল মেসিকে ঘিরে গোটা আর্জেন্টিনার স্বপ্ন। মেসিকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা হতে থাকল; বিশ্ববাসী ধরে নিল মেসির ভাগ্যে ‘সোনার হরিণ’ নেই। তারপরও বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখাতে এসে কাতার বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে শোচনীয় ২-১ গোলে পরাজয়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক বড় অঘটনের জন্ম দিল সৌদি আরব। ভক্তরা সকল আশা ছেড়ে দিলেন— এবারও ফলাফল শূন্য। কিন্তু ঈশ্বর লিখে রাখলেন অন্য গল্প— ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’। ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরে এল আর্জেন্টিনা। আগের বার যার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল, সেই ফ্রান্সকে ট্রাইব্রেকারে হারিয়ে বুঝে নিলেন মেসি তাঁর প্রাপ্য সম্মান; ৩৬ বছরের খরা মেটাল আর্জেন্টিনা আর তৃষ্ণা মেটাল ভক্তকুল।
এখন ২০২৬ সাল। আবারও বিশ্বকাপ শুরু। পাড়ায় পাড়ায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। এক ভক্ত তো জায়গা-জমি বিক্রি করে মাইলের পর মাইল লম্বা জার্মানির পতাকা টাঙিয়ে ভাইরাল! চলছে পাড়া-মহল্লায় ফ্যান-ফলোয়ারদের শোভাযাত্রা। বাংলাদেশ যেন বিশ্বকাপ মঞ্চের বাইরে আলাদা এক বিশ্বকাপ মঞ্চ, যেখানে মাঠে খেলা নেই, অথচ সেই নব্বইয়ের দশকের মতো উদ্দীপনা পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়। নেই আবাহনী-মোহামেডানের গ্যালারিভরা উত্তেজনা; নেই মোনেম মুন্না, কায়সার হামিদদের নিয়ে আলোচনা; নেই গাউস, জোয়ার্দারদের আলোচনা। এখনো খুঁজি ফিরে খোচপাড়ার ‘একঝাঁক পায়রা’, বেপারীপাড়ার ‘রবিনহুড’, সরদার বাড়ির ‘হারকিউলিস’, পিলকুনির ‘আমরা ক’জন’, সেহাচরের ‘ড্রীমল্যান্ড’—পাড়ার ফুটবল টিমগুলোর স্মৃতিবিজড়িত অম্লান স্মৃতি। তবু নতুন রোমান্স, শিহরণ ও উত্তেজনা নিয়ে দরজায় উপস্থিত উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর ২৩তম বিশ্বকাপ আসর। জেগে ওঠে পাড়া-মহল্লা, জেগে ওঠে চায়ের দোকানগুলো, জেগে ওঠে অফিস -আদালত পাড়া, জেগে ওঠে পত্রিকার ফিচারের পাতা। মনে হয় যেন বিশ্বকাপেই বাংলাদেশ খেলছে, মনে হয় যেন বিশ্বকাপ বাংলাদেশে হচ্ছে। রাত জেগে খেলা দেখছে মানুষ আর দিনভর সেই খেলা নিয়ে গল্প করছে— ৭০-এর বিশ্বকাপ নিয়ে, ৭৮-এর আর্জেন্টিনা-পেরুর ম্যাচ নিয়ে, ৮৬-র আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে, ৯০-এর ফাইনাল নিয়ে, ৯৪-এর রবার্তো বাজ্জিওকে নিয়ে, কিংবা ২০০৬-এ মাতেরাজ্জিকে জিনেদিন জিদানের মাথা দিয়ে গুঁতো (টুস) মেরে ফেলে দেওয়া নিয়ে। আলোচনা হয় ২০১০-এর শাকিরার কণ্ঠে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ থিম সং নিয়ে এবং স্পেনের ‘টিকিটাকা’ ফুটবল নিয়ে। উঠে আসে রজার মিলার-এর সেই কালজয়ী নাচের কথা, ক্রোয়েশিয়ার নারী প্রেসিডেন্টের কথা, সাম্বা নাচের কথা, নেদারল্যান্ডসের ‘টোটাল ফুটবল’-এর কথা, আফ্রিকার ঈগল নাইজেরিয়ার কথা, কিংবা বর্তমানের ‘অ্যাটলাস লায়নস’ মরক্কোর কথা। সেলেসাওদের সাম্বা নাচের ভিড়ে কেউ কেউ খুঁজে চলেন রোনালদিনহো, কাফু, রিভালদো, রবার্তো কার্লোসদের; কেউ খোঁজেন ডেভিড বেকহ্যামকে, খোঁজেন কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারকে। সব যেন ‘ভামোস ফুটবল’।
এবার সবার Dai, dai, ikou, dale, allez, let’s go চোখ থাকবে মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে, নেইমার আর লামিনে ইয়ামালদের দিকে। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে আমার চোখে এখন লেগে আছে সেই ৯৪-এর ফুটবল বিশ্বকাপের স্মৃতি— আমার চোখে দেখা প্রথম বিশ্বকাপ, শৈশবের চোখ দিয়ে দেখা বিশ্বকাপের গল্প, ম্যারাডোনার কথা। এই ফুটবল ঈশ্বরকে নিয়ে বারবার মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশের সেই অমর, অঝোর পঙক্তিটি—
“এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।”
