মাস দুই হলো নূপুর হুইলচেয়ারে।
এ-রুমে ও-রুমে যাচ্ছে।
যখন বিছানায় শুয়ে থাকে তখন হুইলচেয়ারটা খাটের পাশে আড়াআড়িভাবে রাখা থাকে।
হুইলচেয়ারটা দেখলে মাঝে মধ্যেই নূপুরের মনটা বিষিয়ে যায়, কখনো বা দুঃখ-কষ্টে বুকটা উথলে উঠে। পা দুটো তখন যেন আরো শিরশির করতে থাকে।
ওর পায়ের পাতা ধীরে ধীরে আরো শুকিয়ে যাচ্ছে। পায়ে বল নেই। আগের মতো হাঁটতে পারে না। কলেজে যেতে পারে না!
বিছানা আর হুইলচেয়ার- কবে এসব থেকে ছুটি হবে কে জানে?
ডাক্তাররা বলেছে সময় লাগবে, ধৈর্য্য রাখো। জানে, ক্রমাগত চেষ্টা আরও অনেক অনেক অদ্ভূতুড়ে সব যন্ত্রণা নিয়ে এই যুদ্ধটা ওকে চালিয়ে যেতে হবে।
সেই কথা ভেবে বুকটা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। কাকে বলবে ওর দুঃখের কথা, কে শুনবে?
সারারাত এপাশ ওপাশ করে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও টের পায় নি।
সকাল।
ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকে, ‘নূপুর ওঠ তো মা। বেশ বেলা হয়েছে। নাস্তা করে ওষুধ খেয়ে নে।’
হাত বাড়িয়ে মা নুপুরের পায়ের কাছের ভেজানো জানালাটা পুরো খুলে দিলেন।
বাইরের রোদ তেরচা হয়ে রুমে ঢুকল।
আরেকবার ডেকে মা চলে গেলেন রান্নাঘরের দিকে।
চোখ খুলল নূপুর।
ওর চোখ জুড়ে এখনও রাজ্যের ঘুম। আড়মোড়া ভাঙাল।
তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে মাথার পেছনে ডান হাতটা রাখতে গিয়ে ওর মনে হল পা সামান্য ব্যথা করছে।
খোলা জানালা দিয়ে তাকাতেই দেখল এক চিলতে রোদে সকালবেলাটাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে।
আকাশটা ঝকমক করছে। আকাশের রঙে আজ পৃথিবীও নীল হয়ে আছে।
কি সুন্দর।
জানালার পাশের আম গাছটার পাতাগুলো কাঁপছে। প্রচুর আম ধরেছে এবার। বাতাসে আমের বোলের গন্ধ।
সুপারি গাছগুলোতে কয়েক ছড়ি পাকা সুপারি।
ঝিরঝির বাতাসে নূপুরের শরীর মন জুড়িয়ে গেল। গতরাতের গরমের পর এই ঠান্ডা কোমল বাতাস খুব ভাল লাগছে।
সুপারি গাছের ডালে কোথা থেকে উড়ে এলো একটা হলুদ রঙের পাখি। খুব মিষ্টি সুরে শিষ বাজাতে লাগল। পাখির এই কূজনে ভেঙে পড়ল চারপাশের নিস্তব্ধতা।
আকাশের গায়ে রঙিন আভা।
সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে থাকতে মুখে হাত দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল নূপুর। জাগ্রত মস্তিকে এলো নানা ভাবনার সমাহার।
আজ একটা নতুন দিনের সূচনা করেছে প্রকৃতি।
এলোমেলো ভাবনার মাঝে নূপুরের মনে হল ঘুম ভাঙার পরেই আজ যেন ওর মনটা ভালো হয়ে গেছে।
হঠাৎ করে সব কিছু ভাল লাগতে শুরু করল। হলুদ-তেল মাখা একটা সকাল। সামনের বাগানে হয়তো কোন ফুল ফুটেছে। তার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য।
নূপুরের মনোবেদনায় সেই সৌন্দর্য যেন নিরাময় হয়ে ওর কাছে ধরা দিল। সেই সৌন্দর্য দেখতে দেখতে প্রকৃতির কাছ থেকে নূপুর যেন একটা নতুন উপলব্ধি লাভ করল। কিছু ভাঙবে, কিছু গড়বে। জীবনের পাতায় কিছু থেমে থাকে না। এখন এখানে তো, এখনি হয়তো যাবে অন্য পাতায়।
কথাটা যখন হৃদয়ঙ্গম হল, তক্ষনাৎ উঠে বসল নূপুর।
ওর মনে হল, যে বিনিদ্র রজনী ও পার করেছে। অথবা ওর ভগ্ন হুদয়ে যে ব্যথা-বেদনা সহ্য করছে এবং তার যে প্রতিক্রিয়ার তার উপর প্রকৃতি যেন একটা আভরণের মতো কাজ করছে।
কষ্ট, ব্যথা বা আঘাত। এক একটা অনূভূতির নাম।
ক্ষতের আঘাতে যত না ব্যথা পাওয়া যায়। তার চেয়ে বেশি কষ্ট যেন বেঁচে থাকার মাঝে।
ক্ষতের প্রথম অনুভূতি। এর আঘাত। আঘাত পাওয়ার পর যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। যেমনটা নূপুরের বেলায় ঘটেছিল। স্মৃতিপটে ভেসে উঠল সেদিনটা।
ওর অ্যাকসিডেন্টের দিনটা।
নীলক্ষেতে।
রাস্তা পার হবার সময় মিনিবাসটা যখন ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল তখন একটা হোন্ডার চাকা ওর পায়ের উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। সেই আঘাতটা নূপুরের শ্বাস বন্ধ করে ওকে অজ্ঞান করে দিয়েছিল।
এরপর।
জ্ঞান ফিরে নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করল ও। তখনকার যে অনুভূতি। এক অজানা ভয়। ডাক্তারের কথা, নার্সদের ফিসফাস নূপুরের মনে এক অচেনা ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
ওর মনে হয়েছিল ও মারা যাবে।
আব্বু বিভ্রান্ত চোখ-মুখে তাকিয়ে ডাক্তারের কথা শোনছিলেন। চোখে ঝরছিল জলধারা।
ডাক্তার অনর্গল কথা বলছিলেন। আব্বুর মুখ দেখে নূপুরের মনে হয়েছিল কোন কথাই তার কানে যাচ্ছে না। ও শুনতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল।
ডাক্তার জানালেন, ওর পায়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। পায়ের রগেও বড়ো রকমের ক্ষতি হয়েছে।
মা যখন নূপুরকে বুকে জড়িয়ে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল তখন অপলক চোখে ও চেয়েছিল মার দিকে।
নূপুরের মুখে কোন কথা ছিল না। একসময় পুকুরের স্থির জলের মতো ওর দু’চোখ পুকুর হয়ে গিয়েছিল । এত জল সেখানে। শুধু জল আর জল।
তারপর।
উনিশে এপ্রিল, ওর প্রথম সার্জারি।
কেমো, ইনজেকশন।
হসপিটালে ভর্তি থাকা এক অদ্ভূত, কঠিন সময়। একদিন হসপিটালে ওয়াকার ধরে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল নূপুর! ভয় পেয়েছিল। প্রথমবার সত্যিকার ভয়। আর কখনও কি হাঁটতে বা দৌঁড়াতে পারব না?
তথাকথিত অন্যরকম হয়ে যাওয়া শরীর নূপুরকে কখনও আলাদা করে ভাবায়নি। অথচ ওই সার্জারির জন্য ও তৈরি ছিল না। এখনও সার্জারির দাগটা খুব স্পষ্ট, এখনও খুব অস্বস্তিকর যন্ত্রণা।
সময় বয়ে গেছে তার নিজস্ব নিয়মে।
নূপুর আর হাঁটতে পারে না। চলতে পারে না হুইলচেয়ারটা ছাড়া।
যদিও যতবার নূপুর ডাক্তারের কাছে গেছে ততবার ডাক্তার আজাদ ফেরদৌস ওকে বলেছেন, কোন ভয় নেই। তুমি তো ভালই আছ। আবার হাঁটতে পারবে। কলেজে যেতে পারবে।
কিšতু নূপুর জানে ওর পা আর আগের মতো হবে না। মাঝে মাঝে ওর ব্যথা বেড়ে যায়। পায়ের গোড়ালি টনটন করে।
নূপুর জানে, মা এখনও লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন। প্রায়ই শোনে আব্বুকে বলছেন, আমার মেয়েটা কি হবে? ও কি আর হাঁটতে পারবে না? তুমি ডাক্তারকে ভালো করে জিজ্ঞেস কর, ওর পা ভাল হবে তো? কতদিন লাগবে?
আব্বু মাকে সান্ত্বনা দিয়ে দিয়ে বলেন, ডাক্তার তো দেখছেন। চিন্তা কর না।
মা বলেন, আমি ভরসা পাই না। তুমি কিছু একটা কর।
আর নূপুর!
ওর দুঃখগুলো ভুলতে চেষ্টা করল।
শরীরের ভেতরে, বাইরে, সর্বত্রই বদল এসেছে। সেই বদলের জন্য নূপুর তৈরি ছিল না। যেমন যন্ত্রণাগুলোর জন্য তৈরি ছিল না। এখনও না। কিšতু সেসব যে পেরিয়ে যেতে হবে, তার জন্যে প্রতিনিয়ত নিজেকে তৈরি করতে থাকে ও।
বদল আসে ওর অন্তরেও।
এতদিনে ও শিখে গেছে কীভাবে আবার শ্বাস নিবে। কীভাবে বেঁচে থাকবে।
নিজের কষ্টগুলো নিজের কাছে রাখতে শিখল নূপুর।
আজ সকালে। এই মুহূর্তে।
ঘুম ভাঙার পর যেন ওর মন ভালো হয়ে গেল।
জানালায় দিয়ে নূপুর আবার তাকাল উজ্জ্বল আকাশের দিকে।
ভাবল, প্রকৃতি এক প্রকার প্রশান্তি নিয়ে এসেছে ওর ব্যথাভরা জীবনে। যে ব্যথার ভার ও বহন করে চলছে বা ওর ব্যথিত হৃদয়ের টুকরো গুলি ও জোড়া দেবার চেষ্টা করছে। এর সমাধান ওর হাতেই রয়েছে।
ভোরের শিশিরের মত ভঙ্গুর নূপুর। তবু ওর চোখে এখনও একটা প্রাণবন্ত আলো প্রজ্জ্বলিত হয়ে একথাই বলছে, আমি এখনও বেঁচে আছি।
নূপুর ভাবল, যে আঘাত ও পেয়েছে হয়তো তার নিরাময় হতে সময় নিবে। তবে নিরাময় হবেই। একদিন। এর জন্য প্রয়োজন সময়। সময়ই সব ঠিক করে দিবে।
তবে ওকেই ওর হৃদয়ের ভগ্ন ও টুকরো টুকরো অংশগুলো জড়ো করতে হবে। ওর ব্যথা-বেদনার নিরাময় ওকেই করতে হবে। প্রকৃতিই সব কিছু সহজ করে দেবে।
হলুদ পাখিটার মিষ্টি সুরের শিষ এখনও শোনা যাচ্ছে।
নূপুর ধীরে ধীরে খাটের শেষ কোণায় আসল। পাশের দেয়ালে রাখা হুইলচেয়ারের দিকে তাকাল।
এই হুইলচেয়ারটা এখন ওর জীবনের একটা অংশ। এই সত্যটা নূপুর মেনে নিয়েছে। তাই ভাবল, আজ থেকে হুইলচেয়ারটা দেখে ও আর মন খারাপ করবে না।
একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
সব যন্ত্রণা নিয়ে এই যুদ্ধটা ও জিতে যাবেই। ওকে নিয়ে লড়াই করতে করতে মা-আব্বু সবই হারিয়েছে। তবু তাদের ভরসা ও চেষ্টায় কিছু ডুবে যায় নি এখনও। তারা ওকে ডুবে যেতে দিচ্ছে না।
ভরসার হাত দিয়ে ওকে ছুঁয়ে আছে তারা।
একুটুই আশা।
এই আশাটুকুই বাঁচিয়ে রেখেছে ওকে।
আর ওর বিশ্বাস।
নূপুর আবার হাঁটতে পারবে!
হয়তো পাঁচ মাস পর, এক বৎসর, কিংবা বৎসর পেরিয়ে কোন একদিন। জীবনে কখনোই জোর করে কিছু ধরে রাখা যায় না, না মানুষ, না মুহূর্ত। যা হারাবার তা হারাবে। যখন সময় আসবে তখন পাবে।
নিরন্তর কিছু অসম্ভব যন্ত্রণাকাল ভুলে থাকার চেষ্টা করবে ও সামনের দিকে তাকিয়ে। জানে, যুদ্ধটা দীর্ঘ, দীর্ঘ এই চিকিৎসা, এই যাত্রা কীভাবে চলবে! জানে না।
শুধু জানে, যুদ্ধটা চলবে।
হলুদ পাখির সুমিষ্ট শিষের সুর এখন আর শোনা যাচ্ছে না।
হয়তো উড়ে গেছে পাখিটা।
বিছানা ছেড়ে অনেক কষ্ঠে হুইল চেয়ারে বসল নূপুর। ঠেলে ঠেলে এগিয়ে চলল বাথরুমের দিকে।






