রাজুকে ইশানি খুব আহ্লাদী কন্ঠে জিজ্ঞেস করে- রাজু দা বিলের অই মাঝখানে ফুটে থাকা বড় পদ্মটা আমায় এনে দিতে পারবে? তোমার সাহস আছে? রাজু কেবল স্কুল থেকে ফিরে মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলো ইশানিদের বাড়ি। রাজু হো হো করে হেসে ওঠে। ধুউর! এইডা তো ওয়ান – টু’র ব্যাপার। কহন তুইলা দেওন লাগবে, কও। এহন? তাইলে তুমি চল। দুজনে হাঁটতে থাকে জমিদার বাড়ির সামনের বিশাল পদ্ম দীঘির দিকে।
স্কুলের জামা জুতো খুলে রাজু অমনি ঝাঁপ দিয়ে পড়ে পদ্মবিলে। সবচেয়ে সুন্দর এবং প্রস্ফুটিত দেখে সাতটি লাল পদ্ম এনে দেয় রাজু ইশানিকে। হাতে দিতেই ইশানির চোখগুলো জ্বলজ্বল করে ওঠে। ইশানি আনন্দে রাজুর গালে চুমু খেয়ে বল- তুমি কত্ত ভালো রাজু দা। সবাই তোমার মতো না। রাজু তাকিয়ে দেখে ইশানিও একটা প্রস্ফুটিত পদ্মের মতোই নরোম, কোমল আর অপূর্ব সুন্দর। রাজু শুধু মুচকি হাসে।
০২.
এই পঁচাত্তর বছর আগেও ইশানির দাদা অরুনাভ চৌধুরী ছিলেন বরিশাল সদর উপজেলার গ্রাম সাপানিয়ার দাপুটে জমিদার। কেউ জমিদার বাড়ির ধারেকাছেও ঘেষতে চাইতো না। তবে ইশানির বাবা অনিন্দ্য চৌধুরী পড়ালেখা করেছেন বিলেতে। জাত-পাত, শ্রেনী – গোষ্ঠী এসব তিনি মানেন না বলেই চলে। লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে এসে বরিশাল শহরেই প্রাকটিস করেন। ঢাকায় সেটল করার কথা স্ত্রী স্বপ্না বেশ কয়েকবার বলেছেন। প্রায় ছয় ফিট লম্বা, ফর্সা অনিন্দ্য একেবারেই আমলে নেন নি। বলেছেন – অই যানজট আর কালো ধোঁয়ার শহরে আমি! ইশানি বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠুক তোমাদেরকে ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনে দেব। দুজন গিয়ে থেকো। আমি এই বাপ-দাদার বাড়ি আর রোদ, জল, হাওয়া রেখে কোথাও যাচ্ছি না। বিলের তাজা মাছ, সবজি, ফরমালিন মুক্ত নিজের গাছের ফল এসব নিয়ে খুব ভালো আছি। আমিও জমিদারই। তবে অঘোষিত।
০৩.
আজগর আলী খান ছিলেন সাপানিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ডাকসাইটে অংক মাস্টার। বি.এস সি পাশ করা এই শিক্ষক স্কুল থেকে যা মাইনে পেতেন, তারচেয়ে বেশি পেতেন গ্রামের ছেলেমেয়েকে অংক টিউশন করে। স্ত্রী রাজিয়া বেগম খুব হিসেবী। তাই সংসার চলেও যাচ্ছিলো বেশ। দুই ছেলে রাজু আহমেদ খান এবং রাব্বি আহমেদ খান বেশ ভালো মেধাবী। হেসেখেলে চলে যাচ্ছিলো চারজনের দিন। মাছ-ভাত আর তাঁতের শাড়ি উজ্জ্বল পাড় নিয়ে রাজিয়ার পান খাওয়া মুখে হাসি লেগে থাকতো।
বিপত্তি ঘটলো যখন আজগর আলী যখন লিভার সিরোসিস এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন তখন। যেহেতু এম. পি. ও ভুক্ত স্কুল। কিছু গ্রাচুয়িটি পেলেন কিন্তু তাতো খুবই অপ্রতুল। রাজিয়া এস.এস.সি পাশ। কিন্তু তিনি ভেবে পান না তিনি কী কাজ করবেন!
যখন মানুষ চরম অসহায় হয়ে পড়ে। স্রষ্টা নিজেই কোনো না কোনো পথ খুলে দেন। রাজিয়ার নিরন্তর জায়নামাযে কাঁদা বিফল হয়নি। জমিদার অনিন্দ্য চৌধুরী রাজিয়াকে বলেন- ভাবী আপনি আমাদেরকে যদি একটু সাহায্য করেন! আমাদেরকে দুই বেলা রান্না করে দেবেন। জ্বলে উঠেছিলেন স্বপ্না। কিন্তু অনিন্দ্য সাফ বলে দিয়েছেন – উনি খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ধার্মিক এবং ভদ্র মহিলা। তোমার কথার বাইরে উনি যাবেন না। তুমি পূজা, পার্বণ যা করতে চাও অসুবিধা হবে না। পিঠা-পায়েস উনি রেঁধে দেবেন। আমি উনার রান্না খেয়েছি।
রাজু পেয়েছে বাবার অংকের মেধা। তাই ইশানিকে অংক করাবার ভার দেয়া হয় রাজুকে। রাজু অষ্টম শ্রেনীতে বসে ষষ্ঠ শ্রেনীর ইশানিকে অংক শেখাতে থাকে।
০৪.
অংক রাজু খুব মনযোগ দিয়ে শেখাতে চায়। কিন্তু ইশানির ভালো লাগে ছবি আঁকা, গল্প, গান, ম্যুভি এসব। এরসাথে যতরকম এ্যডভেঞ্চার আছে সবই ইশানি করতে চায়। গাছে মাথায় উঠে পাখির বাচ্চা পেড়ে আনা, বিল থেকে পদ্ম তুলে আনা, যাবতীয় আবদার মেটানোর দায় যেন রাজুর। এমন আহ্লাদী কন্ঠে বলে যে মরে যেতে বল্লেও রাজু বুঝি অনায়াসে মরে যেতো।
সময় গড়িয়ে চলে যাচ্ছিলো বেশ। ইশানি তখন অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে আর রাজু দশম শ্রেণির ছাত্র। দুজনের চোখ মাঝে মাঝেই চোখের গভীরের ভাষা পড়তে থাকে। রাজু মাঝে মাঝেই ইশানিকে এনে দেয় চকলেট, চুইঙ্গাম, কালার পেন্সিল ইত্যাদি। দুজন একই স্কুলে পড়ে। তবে স্কুলে কখনো রাজু কথা বলে না ইশানির সাথে।
একদিন রাজুর সহপাঠী আবিদা রাজুকে হেসে হেসে বলে- এই রাজু আমাকে ইট্টু অংক শেখালেও তো পারিস। রাজু বলে ক্যান শিখামু না, অবশ্যই শিখামু।তুই যদিন কবি, হেদিনই শিখামু।স্কুলের বারান্দায় দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল ইশানি। হঠাৎ যেন কেউ তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এমনই লাগছিল তার। ইচ্ছে করছিল গিয়ে চটাস করে আবিদার দুই গালে দুটো থাপ্পড় কষে দেয়।
সেদিন সন্ধ্যায় পড়াতে এলে রাজু দেখে ইশানির মুখ ভার। তাছাড়া অংক শিখছে না মনযোগ দিয়ে। রাজু জিজ্ঞেস করে – কী অইছে ইশানি? তোমার মনযোগ নাই ক্যান? হঠাৎ রাজু’র হাত চেপে ধরে বলে- আপনে অই আবিদা দিদিরে অংক শেখাইবেন? রাজু উদার হাসিতে বলে- ক্যান শিখাইলে কী? জ্ঞান বিতরণ করলে বাড়ে। তুমিও তোমার কেলাশের ছেলেমেয়ে গো অংক শিখাইতে পারো। ইশানি বলে- রাজু দা তুমি ছেলেদেরকে যত ইচ্ছা অংক শিখাও। কিন্তু কোনো মেয়েকে না। যদি তুমি আবিদা দিদিরে অংক শিখাও আমি ইচ্ছা কইরা ফেল করমু। আর বাবায় তোমারে দোষ দিবে। অগত্যা রাজু বলতে বাধ্য হয়- আচ্ছা শিখামু না। তুমি ভালো কইরা অংক করো, পড়ালেখা করো। অমনি চোখ ছলছল করে ইশানি বলে- ঠিক করমু। তুমি আমারে সামনের পূর্নিমায় অই পদ্ম বিলের ধারে নিয়া যাবা? রাজু বলে দেখা যাক। ইশানি মাথায় হাত উঠিয়ে দিয়ে বলে- এই আমার মাথা ছুঁয়ে কসম কর নিয়া যাবা। রাজু বলে- তোমার মতিগতি আমি বুঝতেছি না ইশানি। নিজেও বিপদে পড়বা, আমারেও বিপদে ফালাবা। ইশানি তখন বাচ্চা খুকির মতো খিলখিল করে হেসে ওঠে। চোখে খেলে যায় এক অদ্ভুত আলোর দ্যুতি।
০৫
সেই রাতে জোছনায় ভেসে যাচ্ছে আসমান- জমিন সব। গাছগুলোর পাতারা চক চক করছে। ইশানি আগেই রাজুকে বলে দিয়েছিল – তার বাবা-মা বরিশাল শহরে যাবে। বাড়িতে সে আর মালতী মাসিই থাকবে। কারণ পরীক্ষায় অযুহাত দিয়ে ইশানি বাবার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে যাবে না। বাবা-মা গায়ে হলুদ, বিয়ে খেয়ে তারপর ফিরবে। রাজু যেন ঠিক রাত দশটায় উঠানে চলে আসে।
দশটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে রাজু এসে উঠানে দাঁড়ায়। দুজনে গিয়ে বসে পদ্ম দীঘির শান বাঁধানো ঘাটে। বিশাল দীধিতে তিনটি ঘাট বাঁধানো। চারিদিকে সারি সারি নারকেল গাছ। জোছনায় ভেজা গাছগুলোর পাতা যেন আরও ঘন সবুজ। পদ্মদিঘিটারে মনে হয় রুপালি সিল্কের ভেতর পদ্ম ফুলের কারুকাজ করা শাড়ি জড়িয়েছে গায়ে। ইশানি গা ঘেষে বসে রাজুর। রাজু বলে – কী অইছে ইশানি? তুমি এমন কর ক্যান? তুমি কী আমারে বাঁচতে দিবা না। ইশানি বলে- তুমি চাও না আমি ভালো থাকি? আমি তো তোমারে ছাড়া বাঁচতেছি না রাজু দা। আমার মন-প্রাণ সব তোমার হয়ে গেছে। তুমি চাইলে এখন আমারে মেরে এই বিলে ফালাইয়া দিয়া যাও। মানুষ মনে করবে- আমি সাঁতার জানি না ডুইব্বা মরছি। আর নাইলে আমারে তোমার বুকের সাথে পিষে মাইরা ফালাও। রাজু বিভিন্ন কথায় অনেক বোঝাতে চেষ্টা করে। কোনো যুক্তিই ইশানির গ্রাহ্য হয় না। তখন রাত প্রায় এগারোটা বেজে গেছে।
এরপর হঠাৎ ইশানি রাজু’র বুকে ঝাপিয়ে পড়ে। রাজুর ঠোঁট কামড়ে দেয়। লেহন করতে থাকে রাজু’র কানের লতি, গলা, বুক। রাজুও একসময় খেই হারিয়ে ফেলে। তারপর পদ্ম দীঘি, আকাশ-বাতাস, জোছনা সাক্ষী থাকলো প্রথম সঙ্গমের। ইশানি ভাবলো আমার নারী জন্ম সফল। আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ আমার স্বপ্নের পুরুষকে দিয়েছি। রাজু ভাবলো – এই মাইয়া আমার জীবনে আযরাঈল অইয়া আইছে। আমারে বাঁচতে দেবে না। আরও ভাবলো নারী সমস্ত মন-প্রাণ দিয়া চাইলে কোন পুরুষের সাধ্য দূরে থাকে! তাছাড়া নারীর যৌবনের আগুনে পোড়াই পৌরুষের ধর্ম।
০৬.
পড়াতে আসে না রাজু সাতদিন। ইশানিও শান্ত হয়ে গেছে। কোনো অস্থিরতা নেই চলন-বলনে। যেন একটা খরস্রোতা নদী শান্ত সরোবর হয়ে উঠেছে। স্বপ্না মেয়ের পরিবর্তন লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করেন- রাজু ক্যান পড়াইতে আসে না। তোর কী অইছে? শরীর খারাপ?
ইশানি বলে – আমি ঠিক আছি। রাজু দা’র সমস্যা জানি না। তার মারে জিগাও। এরপর স্বপ্না অনিন্দ্যকে দিয়ে খোঁজ নেয়ালে রাজু পড়াতে আসে।
রাজু দৃঢ় সংকল্প করে আসে। কোনোভাবেই ইশানির ছল বা মায়ায় সে ধরা দেবে না। কিন্তু ইশানির স্বচ্ছ দীঘির মতো টলটলে চোখের গভীর চাহনি, মৃদু হাসি আর শরীরের বাঁকের কাছে সদ্য যুবক হয়ে ওঠা রাজু কতক্ষনই বা পারবে? রাজুও পারেনি বেশিদিন। বারবার ইশানির কাছে জীবন ভিক্ষা চায়। আর ইশানি কেবলই আদর আর প্রেম মাগে। দুজনের দেখা হয় সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে গভীর রাতে।
এক রাতে দূর থেকে দেখে ফেলে মালতী। যথারীতি স্বপ্নাও জেনে যান। স্বপ্না কথা বলেন কলকতায় জ্যাঠাতো ভাইয়ের সাথে।
০৭.
কোনো বকাবাদ্য না করে স্বপ্না অনিন্দ্যকে সবটা জানান। এবং বুঝিয়ে সুঝিয়ে মেয়েকে ইন্ডিয়া নিয়ে যেতে রাজি করান। একদিন সকালে ইশানি এবং স্বপ্না
প্লেনে চড়ে বসে কলকাতার উদ্দেশ্যে। অনিন্দ্য কিছুদিন পরে যান। এরপর সুদীর্ঘ বছর স্বপ্না এবং অনিন্দ্য দুর্গাপূজা কলকাতায় কাটিয়েছেন। বছরে তিন-চার বার কলকাতা গেছেন। কেবল ইশানির জন্য বাংলাদেশ নিষিদ্ধ ভূমি হয়ে যায়।
চলে গেছে সময় ব্যাথা, বেদনা এবং বিচ্ছেদ সাথে নিয়ে। দুটো হৃদয়ের ক্ষরণের খব বিবিসি, সি এন এন কিংবা বাবা-মায়ের চোখ কেউই রাখেনি। জানে কেবল নিজেরা এবং যাপিত সময়। এর ভেতর স্বপ্না ইন্ডিয়ান ইনিস্টিউট অফ টেকনোলজিস এ আর্কিটেকচার বিভাগে পড়ে আমেরিকার নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ. ডি ডিগ্রি অর্জন করেছে।
তখনই পরিচয় অই বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুন রাশান প্রফেসর ক্লিফোর্ড এর সাথে। শুধু আজও সঙ্গমের সময় রাজু সামনে এসে হাজির হয়। কেবলই মনে হতে থাকে রাজুই বুঝি চুম্বনে চুম্বনে আহত করছে নাভিমূল।
০৮.
কেটে গেছে দুই যুগ। ইশানির বাবা-কেউ বেঁচে নেই। ভাই ও ইন্ডিয়ায় সেটল করেছে।
শুধু অই বাড়িটা পড়ে আছে। মাটির টানে ইশানি এসেছে সাপানিয়া। এসেই খোঁজ নিয়েছে রাজু’র। ইশানি যখন চলে যায়। তখন রাজুর এস এস সি পরীক্ষা। ভাঙা দেহ-মন নিয়ে ভালো ফল রাজুর হয়নি।
রাজু বি.ক.মি. পাশ করে বরিশালেই চাকরি করে। এর সাথে বাজারে আছে নিজের কাপড়ের ব্যবসা।
ইশানি আরও জানতে পারে- রাজুর কিডনি ড্যামেজ দুটোই। সে ভর্তি আছে শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছুটে যায় ইশানি।
স্লিভলেস কালো ব্লাউজ, কালো জামদানি, নাভি বের হয়ে আছে। ঠোঁটে কফি লিপিষ্টিক, কপালে বড় কালো টিপ, চোখে কাজল, আই স্যাডো। বয়স হওয়াতে শরীর একটু ভারী, পেটে একটু মেদ লেগেছে। গিয়েই রাজু’র পাশে বসে পড়ে। বলে ও রাজু দা তোমার কী হইছে গো! আমি তোমারে ইন্ডিয়া নিয়ে যামু। তোমার কিচ্ছু অবে না। এই বলে রাজু’র বুকের ভেতর শুয়ে পড়ে। হা করে তাকিয়ে দেখে রাজুর চৌদ্দ বছর বয়স্ক ছেলে। ততক্ষণে কণ্ঠ এবং শরীরের গন্ধে বুঝে যায় রাজু। কে তার বুকের ভেতর.. অস্ফুট স্বরে বলে- ই শা নি..! রাজুর অই রোগাক্রান্ত, জরাজীর্ণ শরীর তখন সেই প্রথম রাতের মতো এমনভাবে জেগে উঠতে চায় যেন মরা বৃক্ষে সবুজ পাতায় ছেয়ে যাচ্ছে সমস্ত ডালপালা।
মোট পঠিত: 19






