সেলাই খোলা কবিতা: আলফ্রেড খোকনের নিরুত্তর ভুবন | এস এম কাইয়ুম
কবি আলফ্রেড খোকনের এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় দেখা যাচ্ছে, তার প্রতিটিতেই একধরনের নিভৃত, প্রশ্নবিদ্ধ স্বর লক্ষণীয় — কবি যেন প্রতিটি কবিতাতেই কোনো না কোনো দার্শনিক জিজ্ঞাসাকে দৈনন্দিন, প্রায়-গৃহস্থালি ভাষায় বেঁধে ফেলার চেষ্টা করছেন। তার কবিতা পড়তে বসলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল একধরনের সংযত, প্রায় তপস্বী ধরনের ভাষাভঙ্গি — যেখানে অলংকারের বাহুল্য নেই, অথচ প্রতিটি পঙক্তির নিচে একটি গভীর অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন সুপ্ত হয়ে থাকে। এই সংকলনের কবিতাগুলি প্রথম পাঠে সাধারণ, দৈনন্দিন — চুল ছাঁটা, বৃষ্টির স্মৃতি, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা — এইসব অনুষঙ্গ নিয়ে শুরু হয়, কিন্তু ক্রমশ পাঠককে নিয়ে যায় এক অস্বস্তিকর দার্শনিক গভীরতায়। এখানেই খোকনের কবিসত্তার প্রধান কৃতিত্ব — জটিল ভাবনাকে জটিল ভাষায় নয়, বরং সরল, প্রায় কথ্য ভঙ্গিতে ধারণ করার ক্ষমতা।
“মৌন ভাষায় রচিত”-এ কবি একটি চমৎকার প্যারাডক্স নির্মাণ করেছেন — নীরবতাকেই একটি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। এই কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত হল যখন বিমূর্ত দার্শনিক প্রস্তাবনা থেকে হঠাৎ একটি নির্দিষ্ট, নির্মম বাস্তবতায় নেমে আসেন কবি — ফিলিস্তিনে বোমাহত শিশুর মৃতদেহের প্রসঙ্গে। ভাষার ব্যর্থতা যখন রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন নীরবতাই একমাত্র সৎ প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে — এই উপলব্ধিটুকু অল্প কথায় গভীরভাবে বলা হয়েছে। কবিতাটি সংক্ষিপ্ত বলে দার্শনিক দাবি ও রাজনৈতিক চিত্রকল্পের মধ্যে সংযোগ কিছুটা আকস্মিক মনে হলেও, এই আকস্মিকতাই হয়তো ইচ্ছাকৃত — যেন শোক নিজেই কোনো প্রস্তুতি মানে না।
“কার কাছে” কবিতাটি সংকলনের সবচেয়ে মরমী রচনা। বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়া — উভয় অবস্থাতেই আশ্রয়হীনতার প্রশ্ন তুলে কবি একটি কিয়ের্কেগার্দীয় উদ্বেগের জায়গায় পৌঁছান। এখানে “মনের মধ্যে একটা গাছ লাগিয়ে” ছায়া রচনা করার চিত্রকল্পটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য — বাস্তব গাছও মরে যায় জেনেও কল্পনার আশ্রয় নির্মাণ করে বসে থাকার এই মানবিক আত্মপ্রবঞ্চনা কবি অত্যন্ত মমতার সঙ্গে ধরেছেন। শেষ স্তবকের যুক্তি — মৃত্যুর পরে এই প্রশ্ন ভাবার সময়ই থাকবে না — কবিতাটিকে একটি জরুরি নৈতিক তাড়নায় পরিণত করে।
তবে কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে পরিণত ও কাঠামোগতভাবে সুচিন্তিত কবিতা নিঃসন্দেহে “ইহাদের”। এখানে খোকন একটি অসামান্য ক্রমবর্ধমান রূপক নির্মাণ করেছেন — চুল ছাঁটা থেকে শুরু করে বাগানের গাছ ছাঁটাই, তারপর কবিতা রচনার প্রক্রিয়ায় শব্দ ও ছন্দ ছাঁটা, এবং সবশেষে অবহেলা, বেদনা ও ঈর্ষার মতো বিমূর্ত আবেগ ছেঁটে ফেলার আকাঙ্ক্ষা। এই স্তরে স্তরে বিমূর্তায়নের কৌশলটি কবিতাকে একটি মেটাপোয়েটিক মাত্রা দেয় — কবি নিজের সৃজনপ্রক্রিয়ার আত্মসেন্সরশিপকেই কবিতার বিষয়বস্তু করে তোলেন, যা যথেষ্ট সাহসী এবং আত্মসচেতন। প্রতিবেশীদের প্রশ্ন যুক্ত করার মধ্য দিয়ে কবিতাটি নিছক আত্মকথন থেকে বেরিয়ে একটি সামাজিক সংলাপের রূপ নেয়। শেষ পঙক্তিতে আবেগকেও ছেঁটে ফেলার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে কবিতাটি কোনো মিথ্যা সান্ত্বনা না দিয়েই শেষ হয় — এই সততাই কবিতাটিকে স্মরণীয় করে তোলে।
“তরণী পালের জন্য একটি ঝাপসা কবিতা” সামাজিক প্রান্তিকতার প্রশ্নে কবির নৈতিক সততার পরিচয় বহন করে। বৃষ্টি এলেই প্রান্তিক পাল পাড়ার মেয়েটির কথা মনে পড়া এবং বৃষ্টি থামলে তাকে ভুলে যাওয়া — এই নির্বাচনী স্মৃতির চিত্রায়ণে কবি নিজের অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন, যা কবিতাটিকে সস্তা সহানুভূতি থেকে রক্ষা করে। বৃষ্টির মধ্যে গান গাওয়ার প্রসঙ্গে যে যুক্তিগুলি এসেছে — আবেগ দমিত না হওয়া, চোখের জল আড়াল হওয়া — তা কবিতার সবচেয়ে কাব্যিকভাবে ঋদ্ধ অংশ। প্রকৃতি এখানে ছদ্মবেশ ও মুক্তি দুটোরই সহযোগী হয়ে ওঠে।
সবশেষে “গুমখুন” — মাত্র চার পঙক্তির এই কবিতাটি সংকলনের সবচেয়ে সাহসী রূপক-নির্মাণ। দৃষ্টিভ্রমের (সমুদ্রকে নদী মনে হওয়া, তারপর নদীও নদী না থাকা) সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পরিভাষা “গুমখুন”-কে একসূত্রে গেঁথে কবি একটি ভয়ংকর অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরেন — উপলব্ধি যেমন বাস্তবতাকে মুছে দিতে পারে, তেমনি ক্ষমতাও মানুষকে অস্তিত্ব থেকে মুছে দিতে পারে, উভয়ই সাক্ষীহীন এক শূন্যতা তৈরি করে। এত অল্প পরিসরে এমন একটি রাজনৈতিক-দার্শনিক সমীকরণ দাঁড় করানো কবির সংহত ভাষাশৈলীর প্রমাণ, যদিও কবিতাটির সংক্ষিপ্ততা কখনো কখনো মনে হয় যেন এটি একটি বৃহত্তর কবিতার সূচনা-বীজ মাত্র, সম্পূর্ণ কবিতা নয়।
সামগ্রিকভাবে আলফ্রেড খোকনের এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কাব্যভাষার পরিচয় দেয় — যেখানে দৈনন্দিন, গার্হস্থ্য অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে ক্রমশ অস্তিত্ববাদী বা রাজনৈতিক গভীরতায় পৌঁছানোই তাঁর প্রধান কাব্যকৌশল। এই কৌশলের মধ্যে এক ধরনের বিনয় আছে — কবি পাঠককে বড় বড় দার্শনিক বাক্য শোনান না, বরং চুল কাটা বা বৃষ্টিতে হাঁটার মতো সাধারণ মুহূর্তের ভিতর দিয়ে সেই গভীরতায় পৌঁছে দেন। “ইহাদের” ও “তরণী পালের জন্য একটি ঝাপসা কবিতা” এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে পরিণত কাজ বলে মনে হয়, যেখানে আবেগ ও সামাজিক সচেতনতা নিখুঁত ভারসাম্যে মিলিত হয়েছে। তুলনায় “মৌন ভাষায় রচিত” ও “গুমখুন” কিছুটা সংক্ষিপ্ত থেকে যায় — যেন কবি একটি বিশাল ভাবনার দুয়ারে দাঁড়িয়ে থেমে গেছেন। তবু এই সংক্ষিপ্ততাও হয়তো ইচ্ছাকৃত সংযম, কারণ কবি আলফ্রেড খোকনের কাব্যভাষা মূলত অসমাপ্তি ও প্রশ্নের মধ্যেই তার সততা খুঁজে পায় — উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন জাগিয়ে রাখাই যেন তাঁর কবিতার প্রকৃত অভিপ্রায়।
মৌন ভাষায় রচিত
কয়েকটা যুগ পার হওয়ার পর মনে হল
পৃথিবীর কোনো ভাষাই শেখা হল না আমার
তোমরা একথা মানো আর নাই মানো,
আমি এখন মৌন ভাষায় কথা বলি
আমার কি মনে হয়ে জানো?
পৃথিবীতে এ-ভাষাটাই টিকে থাকবে
যেমন ফিলিস্তানে বোমাহত একটি
শিশুর মৃত দেহ দেখার পর
আমার মৌন ভাষাই টিকে যাচ্ছে
আলজিভের ভিতর!
কার কাছে
কার কাছে যাব, বেঁচে থাকার পর?
কার্ কাছে যাব, মরে যাওয়ার পরে?
কেউ বলছে মিশে যাব গোধূলির ওপারে
দূরে যে গ্রাম আবছা দেখা যায়,
তার ভিতরে
ভাবি এই তো আছি ভালো গাছের ছায়ায়
কিন্তু গাছ কোথায়, তারাও তো মরে যায়!
মনের মধ্যে একটা গাছ লাগিয়ে
কিছু গাছের ছায়া রচনা করে
তার নিচে বসে আছি অনেক অনেক বছর;
যদি বুঝি মরে আছি- কার্ কাছে যাব?
বেঁচে থেকেই যদি ভাবি কার কাছে যাব, কার্?
মরে গেলে মোটেও সময় পাব না
একথা ভাববার!
ইহাদের
চুল বড় হয়ে কানের উপর দিয়ে বেয়ে গেছে
লাউয়ের ডাঁটার মত ঝুলে পড়ে ছিল নিচে
পিঠের উপর দিয়ে কোমর অবধি নুইয়েছে
এসবই অতিরিক্ত হয়েছে তাই
ছুটির দিনে ছেঁটে ফেলেছি- গত শুক্রবার।
পরিচিত কয়েকজন জিগ্যে্যস করেছিল
‘এত সুন্দর চুল কেন ছেঁটে দিলেন,
ভালোই তো লাগছিল, দীর্ঘ চুলে
কতজনের তো চুলই হয় না,
আপনি এটা কি করলেন’!
উঠানের বাগানে পাতাবাহারের ডাল ছেঁটেছি
জামরুলের পাতা, ঘাসের ডগা, গোপনে বেড়ে ওঠা
তিন তিনটি নাম, জানালার পাশে নিমের ডাল
কতবার যে হেঁটেছি, আজ আর মনেও পড়ে না
কবিতার খাতায়ও এমনটা হয়েছে অনেকবার
ছন্দকে ছাপিয়ে যাচ্ছে- এই আশঙ্কায়
কত শব্দের রব আমি ছেঁটে দিয়েছি,
মনের মধ্যে, মৃত্যু হয়েছে কত কবিতার!
আজ অনেকদিন পর, অবহেলার দিকে তাকিয়ে
আজ অনেকদিন পর, বেদনার চোখে তাকিয়ে
আজ অনেকদিন পর, ঈর্ষার দিকে তাকিয়ে-
আমি যদি ইহাদেরও ছেঁটে দিতে পারতাম!
তরণী পালের জন্য একটি ঝাপসা কবিতা
আমাদের গ্রামে যখন মুষলধারে বৃষ্টি আসে
তরণী পালের কথা মনে পড়ে;
দৃশ্যের সীমা থেকে তার বাড়িটি
ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে,
এবং আমাদের পাল পাড়াটি আরও
দূরে চলে যেয়ে অন্ত্যজ হয়ে ওঠে;
তখন নিঃসঙ্গ ওই পাড়াটির কথা মনে পড়ে
তখন তরণী পালের কথা মনে পড়ে
তখন সেই নিঃসঙ্গতার কথা মনে পড়ে
তাকে নিয়ে কয়েটি উপকথাও মনে পড়ে,
কিন্তু বৃষ্টি শেষে তার কথা যথারীতি ভুলে যাই
বৃষ্টির সময় ওই অন্ত্যজ পাড়ার ভিতর দিয়ে
যত দূর হেটে আসি
তখন বৃষ্টির ভিতর সেই নিঃসঙ্গ মেয়েটি গান ধরে
বৃষ্টির ভিতর গান করার সুবিধে এই-
আবেগ দমিত হয় না। সুর নিয়ে বিতর্ক জাগে না
তাল নিয়ে নিরঙ্কুশ জ্ঞানের ধারণাও লাগে না
আর সবচেয়ে সুবিধে এই
বৃষ্টির ভিতর কাঁদলে
কেউ চোখের পানি দেখতেও পায় না।
দুর্লভা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা, ১১.-০৮.-২১
গুমখুন
অনেকক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকার পর
যখন ওই সমুদ্রকে নিতান্তই নদী মনে হয়
তখন নদীটাও আর নদী থাকে না;
মানে এটা গুমখুন-নাই করে দেয়ার ব্যাপার!
২৭ জানুয়ারি, ২০২২
•

- শিরোনাম: হাতমেশিনে বোনা
- লেখক: আলফ্রেড খোকন
- প্রকাশক: খড়িমাটি (চট্টগ্রাম)
- ISBN: 9789849882534
- সংস্করণ: প্রথম সংস্করণ, ২০২৪
- পৃষ্ঠা: ১৬
- মূল্য: ৮০ টাকা
আলফ্রেড খোকন, কবি। জন্ম: ১৯৭১, ২৭ জানুয়ারি। গ্রাম: গৈলা। জেলা: বরিশাল। পেশা: লেখালেখি এবং গণমাধ্যমে কাজকর্ম। অসমিয়া, ইংরেজি ও সুইডিশ ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। তিন মনে করেন, সকলেই কবি, সকলে লিখিতরূপের কবি নন। আর কবিতা কোনো বিলাসদ্রব্যও নয়। কবিতা এমনই সাধারণ যে এর প্রভায় বিলাসদ্রব্যর জেল্লাও নুইয়ে পড়ে।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
উড়ে যাচ্ছ মেঘ (১৯৯৮, শ্রাবণ) সম্ভাব্য রোদ্দুরে (২০০১, শ্রাবণ) ফাল্গুনের ঘটনাবলি (২০০৬, ঐতিহ্য) মধু বৃক্ষ প্রতারণা বিষ (২০০৭, পাঠসূত্র) সে কোথাও নেই (২০০৮, পাঠসূত্র) সাধারণ কবিতা (২০০৯, ঝরাপাতা) চল্লিশ বসন্তে (২০১২, জয়তি) দুর্লভার দিন (২০১৫, শুদ্ধস্বর) মৌন তুড়ই (২০১৮, উৎস) নির্বাচিত কবিতা (২০২০, বাতিঘর) শীতের সবজি গুচ্ছ (২০২৩, নাগরী)
ছড়াকবিতা:
মনে আসছে যা যা (২০১৩, অনিন্দ্য।
গদ্যগ্রন্থ:
আলেড় পাড়ে বৈঠক (২০০৮, ঐতিহ্য) আমার (অ) সাধারণ বন্ধুদের প্রেম (২০১৩, শুদ্ধস্বর) আত্মগীতের গদাতঙ্গি (২০১৪, শুদ্ধস্বর) নগরে নিবন্ধনহীন ২০১৮, (কথাপ্রকাশ)






