মাহফুজামঙ্গল
লেখক: মজিদ মাহমুদ
ধরন: কবিতা
পৃষ্ঠা: ১১২
মূল্য: ২০০ টাকা
প্রকাশনী: আশ্রম
ISBN : 9789843566010
প্রারম্ভিকা: এস এম কাইয়ুম
কবি মজিদ মাহমুদের ‘মাহফুজামঙ্গল’ একটি একক নারীর নামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রেম, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার সমান্তরাল ভাষ্য। বইটির শিরোনামেই ‘মঙ্গলকাব্য’-এর ধ্বনি আছে — মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের সেই ঐতিহ্য, যেখানে দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হতো পয়ার-ছন্দে। কিন্তু এখানে দেবী নন, এক রক্তমাংসের নারী ‘মাহফুজা’-কেই কবি দেবীত্বে উন্নীত করেছেন, আর তাঁকে ঘিরে নির্মাণ করেছেন এক ব্যক্তিগত পুরাণ।
বইয়ের কেন্দ্রীয় কৌশল হলো ব্যক্তিগত প্রেমকে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক বয়ানের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। ‘শুভসন্ধ্যা’ কবিতায় কবি বুদ্ধের জীবনকাহিনির আদলে এক রূপক প্রেমকথা বলেন — সিংহী, ত্রিবেণী, লুম্বিনী, সুজাতা ও চুন্দের প্রসঙ্গ টেনে এনে শেষে লেখেন, “সুজাতা আর চুন্দের পার্থক্য করি না।” এই পঙক্তিতে যেন প্রেম আর করুণা, জাগতিক আর আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার সীমারেখা মুছে যায় — যিনি প্রথম আহার দিয়েছিলেন আর যিনি শেষ আহার দিয়েছিলেন, দুজনেই কবির কাছে সমান প্রিয়জনের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে ‘মাতাল ড্যোম’ কবিতায় ভাষা একেবারে বদলে যায় — ব্যক্তিগত আবেগ এখানে রাজনৈতিক ব্যঙ্গে রূপান্তরিত হয়। ন্যান্সি রিগ্যান, ক্রেমলিন, সিআইএ-কেজিবি প্রসঙ্গ এনে কবি বিশ্বরাজনীতির ভণ্ডামিকে শ্মশানের রূপকে বিদ্ধ করেন: চিতার ওপর শুয়ে আছে দুই অসহায় নারী, ফটকে বসে আছে দুই মাতাল ড্যোম। এখানে প্রেম নয়, সাম্রাজ্যবাদী লালসার নগ্ন রূপ উন্মোচিত হয়।
‘পতনের মতো’ কবিতাটি উপমার এক দীর্ঘ মিছিল — বন্যহস্তিনী থেকে শুরু করে ছায়াপথ, ইসরাফিলের শিঙা পর্যন্ত একের পর এক চিত্রকল্প সাজিয়ে কবি লেখেন,
“আমার পতন আর তোমার উত্থানের মতো
বিভাজিত ঈশ্বরের মতো।”
এই পঙক্তিতে প্রেমের আত্মসমর্পণ একরকম ধর্মতাত্ত্বিক মাত্রা পায় — প্রেমিক নিজেকে ভেঙে প্রেমিকাকে সম্পূর্ণ করে তোলেন, যেন এক বিভাজিত ঈশ্বরের দুই অর্ধেক তাঁরা।
‘শব্দ’ কবিতাটি ভাষা ও লিপির উৎপত্তি নিয়ে এক আত্মসচেতন ধ্যান — গুহালিপি থেকে কাগজের যুগে আসার ইতিহাসকে প্রেমের বিচ্ছেদ-কাহিনির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে কবি বলেন, প্রত্যেকেই ছিলাম একেকটি অক্ষর। আর ‘এবাদত’ কবিতায় প্রেম ও প্রার্থনা একাকার — “তোমার শরীর আমার তসবির দানা” পঙক্তিতে দেহকে জপমালার সঙ্গে তুলনা করে কবি ঘোষণা করেন প্রেমিকার সান্নিধ্যেই তাঁর কাছে ঈশ্বর জাগ্রত হন। ‘শীত’ কবিতায় আবার সেই প্রেম মৃত্যু ও পূর্বপুরুষের অস্থির সঙ্গে মিলিত হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণীতে রূপ নেয়।
সব মিলিয়ে ‘মাহফুজামঙ্গল’ একটি স্বতন্ত্র স্বর ও ভাষাশৈলি — যেখানে প্রেম শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্ম ও সৃষ্টিতত্ত্বের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এক বিশাল আখ্যান। কবি মজিদ মাহমুদের ভাষা এখানে পয়ার-ঘেঁষা সরল গদ্যছন্দে বহমান, কিন্তু তার নিচে লুকিয়ে আছে গভীর পাঠ ও বিস্তৃত প্রজ্ঞা। একজন নারীকে কেন্দ্র করে গোটা একটি জগৎ-দর্শন নির্মাণের এই সাহস বাংলা কবিতায় বিরল।
এবাদত
মাহফুজা, তোমার শরীর আমার তসবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়
তুমি ছাড়া আর কোনো প্রার্থনায়
আমার শরীর এমন একাগ্রতায় হয় না নত
তোমার আগুনে আমি নিঃশেষ হই
যাতে তুমি হও সুখী
তোমার সান্নিধ্যে এলে জেগে ওঠে প্রবল ঈশ্বর
তুমি তখন ঢাল হয়ে তাঁর তির্যক রোশনি ঠেকাও
তোমার ছোঁয়া পেলে আমার আজাব কমে আসে সত্তর গুণ
আমি রোজ মকশো করি তোমার নামের বিশুদ্ধ বানান
কোথায় পড়েছে জানি তাসদিদ জজম
আমার বিগলিত তেলাওয়াত শোনে ইনসান
তোমার নামে কোরবানি আমার সন্তান
যূপকাঠে মাথা রেখে কাঁপবে না নব্য ইসমাইল
মাহফুজা, তোমার শরীর আমার তসবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।
মাতাল ডোম
আজ মধ্যরাতে তোমাকে যেতে হবে
ন্যান্সি রিগানের শয়নকক্ষে
যেখানে লেখা আছে তৃতীয় বিশ্বের বাঁচবার হিসাব
পারো যদি সেখান থেকেই দেখে নিও
ক্রেমলিনের রুদ্ধ কপাট
ন্যান্সি তার বিছানায় আছে কি না,
রাইসা এখনো ঘুমোয় কি না।
যখন দুই মাতাল পুরুষ মত্ত পৃথিবীর বণ্টনে
তখন তোমার আত্মা বলো কার অঙ্কশায়িনী
তুমি ছাড়া এই হিসাব কেউ পারবে না আনতে
তুমিই ফাঁকি দিতে পারো সিআইএ কেজিবির চোখ
তোমার অদৃশ্য শরীর যদি ছুঁতে পারে
রাইসার ঘুম
ন্যান্সির ঘুম
সহসা দেখবে তারা শ্মশানের মাটি
চিতার ওপর শুয়ে আছে দুই অসহায় রমণী
ফটক-দ্বারে বসে আছে মারিজুয়ানার ধোঁয়ায়
দুই মাতাল ডোম।
পতনের মতো
বন্যহস্তিনী ও মরুভূমিতে ছুটে চলা মাদি ঘোড়ার মতো
ঝরেপড়া বিদ্যুৎ আর অগ্নিদগ্ধ আকাশের মতো
সিংহীর গর্জন আর জোছনায় গলে পড়া নীলগাইয়ের মতো
আকাশগঙ্গা আর সমুদ্র-তরঙ্গের মতো
হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া দাবানলের মতো
ছায়াপথে চঞ্চল গ্রহাণুপুঞ্জের মতো
স্বর্গের উদ্যানে ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো ইভের মতো
ইস্রাফিলের শিঙা ফোঁকার মতো
ছয় দিবস পানির প্লাসেন্টার উপর ভেসে থাকার মতো
গুহাচিত্রে মহিষ দেবতা আর শিকারির ধনুকের মতো
আকাশের দিগন্তে মিশে যাওয়া জাহাজের মতো
গগের রঙের আকাঙ্ক্ষার আর
মকবুলের গজগামিনীর মতো
আমার পতন আর তোমার উত্থানের মতো
বিভাজিত ঈশ্বরের মতো
তুমি অমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ মাহফুজা।
কুরশিনামা
ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়
আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে
সেই নারী এসে আমার হৃদয়-মন তোলপাড় করে যায়
তখন আমার রুকু
আমার সেজদা
জায়নামাজ চেনে না
সাষ্টাঙ্গে আভূমি লুণ্ঠিত হই
এ মাটিতে উদগম আমার শরীর
এভাবে প্রতিটি শরীর বিরহজনিত প্রার্থনায় প্রার্থনায়
তার স্রষ্টার কাছে অবনত হয়
তার নারীর কাছে অবনত হয়
আমি এখন রাধার কাহিনি জানি
সুরা আর সাকির অর্থ করেছি আবিষ্কার
নারী পৃথিবীর কেউ নও তুমি
তোমাকে পারে না ছুঁতে
আমাদের মধ্যবিত্ত ক্লেদাক্ত জীবন
মাটির পৃথিবী ছেড়ে সাত তবক আসমান ছুঁয়েছে
তোমার কুরশি
তোমার মহিমার প্রশংসা গেয়ে
কী করে তুষ্ট করতে পারে এই নাদান প্রেমিক
তবু তোমার নাম অঙ্কিত করেছি আমার তসবির দানায়
তোমার স্মরণে লিখেছি নব্য আয়াত
আমি এখন ঘুমে-জাগরণে জপি
শুধু তোমার নাম।
দেবী
এই তো সেদিন ভূমিষ্ঠ হলো
তোমার ইঞ্চি তেরো নারীর শরীর
সেদিন পারোনি ঢাকতে নিজেরই অসহায় নগ্নতা
আমার মমত্ব তোমাকে করেছে মহান
দক্ষিণ তর্জনী ধরে শিখিয়েছি হাঁটা
সেদিন কে জানত বলো তোমার এমন সাহস
এতটুকু শরীর এমন শক্তির আধার
এরচে বেশি নয় ইংল্যান্ডের রানির ক্ষমতা
এখন আমার মনে হয় মাহফুজা- তুমি তো দেবী
আর আমরা তোমারই গোলাম
তাই নিজ হাতে তোমার মূর্তি গড়েছে আমার ভাস্কর
অর্ঘ্যরে যোগ্য করে গেঁথেছে মালা তোমার পূজারী
অথচ দুর্মুখরা বলে কী জানো
আমার চোখের সামনে তুমি নাকি উঠেছ বেড়ে
আমি নাকি দেখেছি তোমার নগ্নতা
আমার চেয়ে তুমি নাকি দেড় কুড়ি বছরের ছোটো
এর পরও তোমাকে ভাবতে পারি কী করে এমন
তোমার কি জানা আছে মাহফুজা
এইসব মূর্খের জবাব
যারা তোমাকে খণ্ডিত করেছে এমন
তুমি তো পাঁচ হাজার বছর আগের মাহফুজা
তুমি তো পাঁচ লাখ বছর আগের মাহফুজা
তুমি তো সৃষ্টির প্রথম মাহফুজা
পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক তোমার শাসন।
দাসের জীবন
তোমাকে দেখে আমার তৃপ্তি আসে না মাহফুজা
তোমাকে ছুঁয়ে আমার তৃপ্তি আসে না
আবার তোমাকে না দেখলে না ছুঁলে আমি এক
অন্ধকার অসীম শূন্যতায় নিমজ্জিত হই
তোমাকে আমার দহনে নিয়ে আসি
তোমাকে নিয়ে আসি পরম শীতলতায়
আমার দহনে গলে পড়ে তোমার মোম
আমার শীতলতায় থেমে যায় তোমার বাতাস
তবু মনে হয় এক সুচতুর কৌশলে
তোমার চার পাশ গড়েছ প্রতিরোধ-প্রাচীর
তুমি অক্ষত অমীমাংসিত থেকে যাও শেষে
তখন আমার গগনবিদারী হাহাকার
অতৃপ্তিবোধ
আরো হিংস্র আরো আরণ্যক হয়ে
ক্রুদ্ধ আক্রোশে তোমাকে বিদীর্ণ করে
তোমাকে ছিন্নভিন্ন করে
তুমি ছিন্নভিন্ন হয়ে
তুমি ক্ষয়িত ব্যথিত হয়ে
আবার ফিরে আসো অখণ্ড তোমাতে
আমার বিপক্ষে অভিযোগ থাকে না তোমার
কারণ তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পারে না যেতে
আমাদের দাসের জীবন।
খবর
তোমার জন্য এক সাংঘাতিক খবর আছে মাহফুজা
গতকাল আমাদের গ্রাম থেকে এসেছিল এক অদ্ভুত কৃষক
এবার বন্যায় ভেসেছে যার হালের বলদ
সারা দিন নিরন্ন থেকেও চাখেনি আমার ডাইনিংয়ে খাবার
দরোজায় পাটি পেড়ে কেবল তোমার প্রতীক্ষায় বসে ছিল
কেবল তোমার প্রতীক্ষায়
কী যেন এক আরজি নিয়ে এসেছিল
শুধু তোমাকেই বলা যায়— শুধু তোমাকেই।
তুমি তো প্রত্যহ আমার দরোজায় কড়া নাড়ো
অথচ তোমাকে চিনি না আমি
তোমার অপার্থিব জ্যোতি
ছাপ্পান্ন হাজার মাইলের সীমানা ছেড়ে গেছে
তুমি না গেলে
আবাদ রহিত হবে বেরুবাড়ির সেই কৃষকের
আমি তো দেখি তোমার সবুজ স্তন—আগুনের খেত
উরুর কারুকাজে গড়ে ওঠা তাজমহলের থাম
তবু তোমার চুলের অরণ্যে খুঁজিনি কল্যাণের ঘ্রাণ।
এমন অযোগ্য কবিকে তুমি ক্ষমা করো মাহফুজা
যে কেবল খুঁজেছে তোমার নরম মাংস
তবু তোমার স্নেহ আমাকে ঘিরেছে এমন
এই অপরাধে কখনো করোনি সান্নিধ্য ত্যাগ।
এন্টার্কটিকা
মাহফুজা, তোমার এন্টার্কটিকা
মানুষের সন্তানেরা পারে না ছুঁতে
কেবল সূর্যের সঙ্গমে তোমার লবণাক্ত ঘাম
বাহিত হয় আমাদের গ্রীষ্মের দেশে
তোমার বরফসুষমা চিবুক
হিমানির দেহ
অসম্ভব বিশ্বাসে নগ্ন হয়ে আছে তুষার-স্তন
আমার বড়ো হিংসে হয় মাহফুজা
তোমার ওই বিশাল দেহে হেঁটে বেড়ায় পেঙ্গুইন
দংশিত ক্ষতে পচে ওঠে আমাদের বহু ব্যবহৃত শরীর
তোমার স্পর্শে অমর হয় মানুষের মাটি
তুমি যদি বলতে পারো মাহফুজা
আমরাও তোমাদের কেউ
তোমার সত্তার কসম
আর তবে ধরব না বেশ্যার হাত
অন্যথায় তোমার জমাটবদ্ধ নুন গলে
আমাকে ডোবায় যেন অতলান্ত সাগর।
তোমাকে জানলেই
রবীন্দ্রনাথকেও তুমি দাওনি ধরা
কাজীদা অভিমানে তোমার বিপরীত
ফিরিয়েছে গাল
আবার কেন ধরেছ অনুজের পাছ
তুমি ছাড়া নেই আমার কবিতার বিষয়
যেমন ছিল না কীটসের
বোদলেয়ার-নেরুদাও খুঁজেছে তোমাকে
আমিও যেন না জানি তোমার অনাবিষ্কৃত বিষয়
তোমাকে জানলে মানুষের নষ্ট হবে আহারে রুচি
করবে না আবাদ বন্ধ্যা জমিন
নিজেরাই পরস্পর মেতে রবে ভ্রূণ-হত্যায়
তোমাকে জানলেই কিয়ামত হবে
মানুষের পাপ ছুঁয়ে যাবে হাশরের দিন
তুমি যেন আমার ’পরে হয়ো না সদয়
আদরে রেখো না ললাটে হাত
অনাকাঙ্ক্ষিত তিক্ততায় ছুড়ে দাও নাগালের ওপার।
শুভদিন
মিলনের শুভদিন কোনোদিন আসবে না আমাদের
অপেক্ষায় কেটে যাবে আহ্নিক গতি
বছর বছর যাবে নতুনের সমাগমে
অবনত রয়ে যাব সনাতন বিষয়ের কাছে
আমার বয়স যদি বেড়ে যায় একশ বছর
সত্তর হাজার কিংবা অনন্তকাল
তুমি তত দূরাস্ত রয়ে যাবে আমার কাছে
তোমার গতি সমদূরবর্তী সমান্তরাল লাইনের মতো
আমাদের গমনের সহযাত্রী অসংখ্য নদী
কাশবন অড়হর খেত
পদ্মার কৃষক আর মেঘনার ধীবর
প্রতিরোজ বলে দেয় আমাদের
গাঙুরের জলে ভেসে চলে বেহুলার ভাসান
মলুয়ার মদিনার দুঃখের কাসুন্দি ঘেঁটে মনসুর বয়াতি
আমাদের বিরহের ধৈর্যের কাহিনি শোনায়।






