হাওয়া
চাওয়া ছিল হাওয়া বদল করি
হাওয়ার সাথে খেলতে যেতাম
হাওয়ার সাথে সারাজীবন আড়ি
শরীর যখন ভাঙত জ্বরে
কাঁপত নিরবধি
টলমল পারব না তো পেরিয়ে যেতে নদী
শুকিয়ে যেত চোখের তারা
বেড়ে যেত পিলে
মশক হয়তো কামড়ে দিছে তেতো ওষুধ গিলে
শয়ন নিয়ে ভালোই ছিলাম মায়ের পীড়াপীড়ি
হাওয়া বদল করি আমি হাওয়া বদল করি
হাওয়া ছেড়ে যাই যে আমি আবার হাওয়ার বাড়ি
আমি নাকি মানুষ ছিলাম মায়ের হাতের পরে
মা যে আমার আগেই গেছে হাওয়ার বাপের ঘরে
যারা আমায় দুগ্ধ দিছে
কিংবা ওষ্ঠখানি
হাওয়া আমায় ছিনিয়ে নেবে দস্যি ছিনালিনি
একটি হাওয়া দুটি হাওয়া হাওয়ার বাড়াবাড়ি
ভাবখানা তার একটি আদম পুরোটা চায় তারই
বায়ুর সাথে বশত করি পানির সাথে ঘর
যারা আমায় মাংস দিছে তারা তো নয় পর
আমি কোথাও যাচ্ছি কিনা
কোথা থেকে ফিরি
সূর্য বসে পাহাড় থেকে পথ করে দেয় তারি
কিসের উপর হাঁটি আমি কার শরীরে মাখি
হাওয়া আমায় পুষতে দিছে
অধরা এক পাখি
পিতার নামে চলি হয়তো মায়ের নামও জানি
হাওয়া আমায় নিচ্ছে ঘরে দিন দুপুরে টানি
হাওয়া বদল মানেই কিন্তু হাওয়া বদল নয়
হাওয়া যতই অগ্নিপবন
তখন, এ তল্লাটে আমার থাকা হাওয়ার পরিচয়|
স্বর্গবাস
সে জন্মাল আর মরে গেল
কিংবা পৃথিবীতে করেনি সে জন্মগ্রহণ
এখানে সে আসার জন্য আসেনি
এই গ্রহ ছিল তার গ্রহ থেকে গ্রহে যাবার কাল
যদিও সে জানত না কোন গ্রহে ছিল তার ঠিক নিবাস
এমনকি কোথায় যাবে সেটিও ছিল না তার জানা
অনেকেই তার আগেই যাত্রী ছিল এই শূন্যযানে
সহযাত্রীদের অনেকে বলেছিল
এই পৃথিবী আমাদের উদ্দেশ্য নয়
আমরা অমৃতের সন্তান
ঈশ্বর আমাদের পিতা
তিনিই আমাদের দিয়েছেন এই ভ্রমণের কাল
তুমি আগে আসলে আগেই যাবে—তার মানে নেই
তবে এই যাত্রার রয়েছে নির্ধারিত কাল
তার বেশি কেউ পারবে না থাকতে
সহযাত্রীদের অনেকেই এখানে করছে ট্রাফিক কন্ট্রোল
এদিক ওদিক হলেই সপাং বেত্রাঘাত
কারণ পৃথিবীর পুরোটাই ঈশ্বরের অধিকারে নেই
বিশেষত এখানে দেওয়ানির ভার নিয়েছে ক্লাইভ
সর্বত্র কোম্পানির দোকান
সাজিয়েছে ঝলমলে বিপণি
দোকান বালিকাদের আঁখির কটাক্ষে সর্বনাশ
তবু যাত্রাপথে কার না থাকে একটু অভিলাষ
পিতার শাসন থেকে মুক্তির আনন্দ প্রকাশ
তবে কেন এই বেড়াতে আসা
কেন এই অহেতুক ভালোবাসা
কিভাবে দেখবে সে মণিহর্ম্য প্রাসাদ
সাগর সঙ্গমকালে বিচ্ছিন্ন থাকে তার অস্পষ্ট রেখা
এসব দেখতে গেলে যদিও থাকে হারিয়ে যাবার ভয়
তাতে ঈশ্বরের শত্রুদের জয়
সন্তান মাটিতে পিছলে যাবে বলে
মা কি রেখে দেন জরায়ুর ভেতর
যারা জন্মাবে তারা পড়ে যাবে মৃদু হোঁচট খাবে
ভয়ে ভয়ে ফিরে যাবে ˆপতৃক নিবাসে
তবে তার নিবারণী পুলিশ ধরে আছে কুষ্ঠি
পান থেকে চুন খসলে উদ্ধার করে দেবে গুষ্ঠী
যদিও তারাও খায় ঘুষঘাস
তবু এইসব ঝক্কির ভয়ে
জন্মেই আমাদের এই অনন্ত স্বর্গবাস।
পুব না পশ্চিম
আমি প্রায়ই ভুলে পশ্চিমের বদলে
পুবমুখে নামাজ পড়ে ফেলি
পশ্চিমের নামাজ পূর্বে পড়লে শয়তান খুশি হয় জানি
এ নামাজ আর দ্বিতীয়বার হয় না আদায়
যদিও দিকভ্রান্ত নামাজ দুরস্তের ফতোয়া জানি না
তবু ভাবি আমি তো পুবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ি নাই
মনে মনে বলি, প্রভু তুমি তো পুবেরও প্রভু
তোমার দুএকটি ঘর এদিকেও আছে নিশ্চয়
আমাদের দিও না পুবের ভয়
বাড়ির রাস্তা ভুলে গেলে যদিও অন্য দিকে চলে যেতে হয়
তবু বাড়ি ও সমুদ্রের পথ এক নয় জানি
সমুদ্রেও তো তোমার নৌকাগুলো ঠিকমত চলে
এখন আমার ফিরে যাওয়ার সময়
মায়ের গর্ভের স্মৃতি কি আর কেউ রেখেছে মনে
স্মৃতি থাকলে তো আর কেউ পারবে না যেতে
তোমার ঘর তো আর আমি দেখি নাই প্রভু
তবু অন্তরে রয়েছে তোমার ঘরের মূর্তি
দৃশ্য নয় তবু মূর্তির প্রমূর্তির প্রতি তোমার টান
দূর থেকে ভেসে আসছে তোমার আজান
পুব না পশ্চিম ঈশান না ˆনর্ঋত
দিন শেষে তুমি অফুরান|
ভয়
ভয় আমাদের এতদূর এনেছে
আমরা ভয়ের সন্তান
মরার ভয় থেকেই তো যুদ্ধে
প্রতিপক্ষের ঘাড় দিয়েছি মটকে
পিতার অনুগত ও পুত্রের ভালোবাসা—
সেও তো ভয় থেকে
তাদের বিগড়ে যাওয়ার ভয়
একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার ভয়
ভয়ই তো আমাকে ভালোবাসার পথে
বসিয়ে রেখেছে
যেভাবে একটি শিকারি কুকুরের ভয়ে
মেষগুলো সুশৃঙ্খল দলবদ্ধ থাকে
ভালোবাসা হলো একটি কৌশল
ভয়ের উপজাত সন্তান
ভয় না থাকলে ভালোবাসা থাকে না
জন্ম থেকেই আমাকে শেখানো হয় ভয়
পিতাকে কর ভয়, শিক্ষককে কর ভয়
ঈশ্বর ভয়ের বেশি কিছু নয়
প্রেমিকার চলে যাওয়ার ভয়ে
তার নির্বোধ উক্তি নীরবে সয়েছি
ভয় ও ভালোবাসা, ভয় ও আনুগত্য
একই অর্থবোধক
যাকে পেয়েছি ভয়
সে দিয়েছে ভালোবাসা অবশ্যই
নেতা-নেত্রীকে পেলে ভয়
বাড়ি গাড়ি অক্ষয়
ঈশ্বরকে পাও ভয়
মৃত্যুর পরে স্বর্গ নিশ্চয়
অনন্ত ভয়ের করো ভান
তাহলে ভালোবাসায় পড়বে না টান|
দ্বন্দ্ব
আমি তো কিছুদিন বাঁচতেই চেয়েছিলাম
আমি তো কিছুদিন বেঁচেও গেলাম
আমি মরতে মরতে বেঁচে গেছি
বাঁচতে বাঁচতে মরে যাচ্ছি
কারণ এখন আর বাঁচার সময় নাই
খেলার মাঠে নির্ধারিত সময়ে
ফাউল করেতে করতে বেঁচে গেছি
লালকার্ড দেখার আগে পড়েছি সটকে
শূন্যবল ফসকে পেয়ে গেছি লাইফ
তাহলে আরো দুএকটি দান খেলাই তো উচিত
সূর্যপাটে যাওয়ার আগেই তো খেলা যাচ্ছে গুটিয়ে
সবগুলো বল তো আর শূন্যগর্তে পড়বে না
বল ও গর্তের মাপ ঠিক থাকলে
দৌড়ের টাইমিং হলে কবেই যেতাম সটান
বলিহারি তুমিও মেরেছ
আমিও দিয়েছি উড়িয়ে
মাঠে প্রতিপক্ষই তো কাছাকাছি থাকে
যাদের সঙ্গে খেলি নাই
যাদের ঠ্যাঙের সঙ্গে বাধেনি ঠ্যাং
তারা মানবিক চেতনায় ভরপুর
তারা থাক নমস্য উচ্চতায়
আমি তোমাকে মারিব
মারতে মারতে বাঁচাব শুশ্রূষায়
যাদের দেখি নাই
যাদের দেখব না
তারা থাক আমার অদৃশ্য চেতনায় |
