র বী ন্দ্র না থ, স ত্তা-স মু দ্ধা র
শরীর-সঞ্চয়নের ক্রমধারায় একক ‘শরীরী-আমি’র বিকাশ ঘটে| বস্তুতঃ পিতৃ-মাতৃ-শরীরী রূপ-অবয়বের অনুকার-স্থাপনাই বর্তমান একক ‘শরীরী-আমি’র মূর্তিমান প্রকাশ| ‘শরীরী-আমি’র রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ-ছন্দ-চেতন হয়ে ওঠা (becoming attitude)-র সত্যায়িত (attested) রূপকল্পনার বার্তাই এখানে চিন্তাবিদ্ধ|
বার্তা হলো: ধীর গতিতে শরীরী-সম্পূর্ণতা স্থিত হয়, বোধ-বোধির সঙ্কল্প সমৃদ্ধ হয়| তবে, দেশকাল-পাত্রের অসম্পূর্ণ প্রকাশ-বিকাশের কারণে ঐ একক শরীরী-আমি উজ্জ্বল-সমুজ্জ্বল, উন্নত-সমুন্নত হতে পারে না : আর্থ-অনটন ও অভ্যাসগ্রন্থির মলিন ও বিধ্বংসী ঢেউ ঐ একক আমিকে অনড় করে দিতে চায়| অনেক ক্ষেত্রে শরীরী ঐ একক আমির সুস্থতা, পরিপার্শ্বের কল্যাণ-আয়তন— সবকিছুই অচল করে দিতে পারে| তাই, ঐ আর্তি সঙ্গতই — চাই একক শরীরী আমির পূর্ণাভ পুণ্যাশ্রয়ের সূচিক্রম, যা অভ্যাসস্নিগ্ধ ভঙ্গিমায় হবে অনায়াসলব্ধ| এমন সূচিক্রম বাগীশ্বরপ্রতিম রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১খ্রি.-১৯৪১খ্রি.)-এর ˆশশব-ˆকশোরে সচল ছিল| রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত পূর্ণত্ব-সংরক্ষণী বিদ্যালয়-বিধিতে আবদ্ধ ছিলেন না; মূলতঃ তাঁকে আবদ্ধ থাকতে হয়নি| পিতৃ¯^ত্বের মহীয়ান দ্যুতি : সর্বজ্ঞত্বপুষ্টির অচঞ্চল সন্তুষ্টি তাঁকে জীবনতত্ত্ব-সঞ্চয়নের সুবিধে প্রদান করেছে| তিনি পূর্ণায়ত হয়েছেন| দৃষ্টিভাব-রঞ্জিত কাল-আবেশে, পৃথিবী নামক গ্রহের সর্বোত্তম সবকিছুতেই তিনি সংন্যস্ত হয়েছেন | সাহিত্য-সঙ্গীত-সমুত্থানে হয়েছেন সঞ্জীবিত আর অর্বাচীন চিন্তাকর্মসূত্রের আশ্রয়-অভিনিবেশকে তিনি নির্লিপ্ত করতে সাহসী হয়েছেন| তাঁর ঐকান্তিকতায় সুষমামণ্ডিত হয়েছে অখণ্ড শ্রীহ্রীমঙ্গলের নির্ভার সাংস্কৃতিক আবর্তন| জীবন-কষ্টক্লান্ত অথচ পূর্ণত্বপ্রেমী অনুজ নজরুল (১৮৯৯খ্রি.-১৯৭৬খ্রি.)-এর রবীন্দ্রবন্দনা:
ক.‘......তুমি....অমর, তুমি অনন্তপ্রাণ’১ খ. ‘বিশ্বের রবি, ভারতের কবি, শ্যাম বাঙলার হৃদয়ের ছবি’২
নজরুলের এ সন্বেগী সংলাপে ‘অমর’ শব্দটিতে জীবন-সঞ্চয়নের দীপ্তি সংরক্ষিত| ‘অনন্তপ্রাণ’ শব্দটিতে আত্নানুসন্ধানী এবং আত্মবিভূত নিত্যশক্তিধৃতির মহিমা কীর্তিত| ‘বিশ্বের রবি’ বাক্যাংশ সর্বপ্রাণজ্যোতির্ময়তা সমুদ্ভাসিত| ‘ভারতের কবি’ বাক্যাংশ উপমহোদেশীয় অঞ্চল-নিধি রবীন্দ্রনাথের অতন্দ্র পরিচিতি সংহত; তবে, এমন ভাবানুভূতি উপরিউক্ত সর্বপ্রাণজ্যোতির্ময়তারই অনুপূরক| ‘শ্যাম বাঙলার হৃদয়ের ছবি’ বাক্যাংশে রূপশ্রীমণ্ডিত মাতৃভূমির সুচিত্রিত সবুজ-সংসর্গ, বাঙালি মানব-মানবীর প্রেম-বিশ্বস্ততা ও শ্রেয়োকান্তির শ্লীল-পরাগের ঔজ্জ্বল্য প্রসন্ন হয়ে আছে| বাগ&গেয়কার মনীষী, ভ্রংশ চিন্তাকর্মবিদূরণে শপথসিদ্ধ শিল্পী নজরুলের উচ্চারণেই কেবল এমন সব শব্দ বা বাক্যাংশ শোভিত হতে পারে! রবীন্দ্রদীপায়নী ভাবসাযুজ্যে শিল্পসিদ্ধ নজরুল আরো উচ্চারণ করেছেন:
‘তব রসায়িত রসনায় ছিলো নিত্য যে বেদবতী, তোমার লেখনী ধরিয়াছিলেন যে মহা-সরস্বতী, তোমার ধ্যানের আসনে ছিলেন যে শিবসুন্দর তোমার হৃদয়কুঞ্জে খেলিত মদন-মনোহর... ৩
নজরুল-অনুধ্যানে রবীন্দ্রনাথ সমুন্নত, সমুজ্জ্বল, অতুল্য| তিনি ‘রসায়িত রসনা’র প্রতিকল্পনায় রবীন্দ্রনাথের নরবসায়িত সাহিত্যশিল্পায়োজনকে অন্তঃঅবয়বে সংস্থিত করেছেন| তিনি রবীন্দ্রশিল্পকে বোধিস্বত্বরূপম ‘ বেদ’-বিভায় সমুজ্জ্বল করেছেন| অনন্ত শ্রেয়োচেতন মাতৃকান্তি ‘সর¯^তী’কে সংস্থাপিত করেছেন রবীন্দ্রনাথের লিখন-ঐশ্বর্যের বলয়ে| রবীন্দ্রনাথেরধ্যানায়তনেঅনন্তমঙ্গলচৈতন্যেরই ভারা-এমন ভাবকল্পনাতেও নজরুল বিশ্বস্ত| রবীন্দ্রনাথের হৃদয়জ অভীক্ষায়, সৃজন-পটভূমিকায় অনন্ত প্রেমারতির হোলী, যেখানে অদ্বৈত প্রেম-অভিসার-মাধুর্যের অক্লান্তি|-এ সত্যও নজরুলের প্রজ্ঞায়ত অভিনিবেশ :
‘তুমি স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বিশ্বের বিস্ময়|’৪
উপরিউক্ত বাণীরূপমায় ‘স্রষ্টা’, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি’ এবং ‘বিশ্বের বিস্ময়’-রূপে রবীন্দ্রনাথই সংবৃত| নজরুলের উপলব্ধির অন্তঃপুরে সঞ্চিত হ’য়েছিলো রবীন্দ্র-ভাবশিল্পের দ্যুতি| তাঁর অবলোকন-তৃষ্ণা, তাঁর রস-উপলব্ধির
প্রকরণ রবীন্দ্রনাথের শিল্পোয়োজনে সম্পৃক্ত হয়েছে অবলীলায় | রবীন্দ্রনাথের অমৃত-বিস্তারী শিল্পবিশ্বাস, মানবীয় সর্বজ্ঞত্বের ইন্দ্রিয়প্লাবী উপভোগ নজরুলের চেতনায় শ্রীমণ্ডিত হয়েছে বিনম্র ঔজ্জ্বল্যে |
প্রজ্ঞায় ও হৃদয়জ অনুভূতির মহাবিস্তৃতির আনন্দে রবীন্দ্র-সত্তা ভরপূর ছিলো | চিন্তাকর্মাশ্রয়ে সাধারন মানবসত্তা যে অনন্তস্পৃহ আনন্দ লাভ করতে পারে, তা পরিবেশ-অপেক্ষ—রবীন্দ্রনাথের চিন্তাবিজ্ঞান, তাঁর ˆশশব-কৈশোর-তারুণ্যের পরিবেশ-সংস্থিতিরি প্রামাণ্য এ সত্য-তথ্যের অনুষঙ্গী| সাধারণ মানবসত্তা যদি চিন্তাকর্মকর্ষণার লক্ষ্যে শ্রেয়োপথ অনুসরণ না করে, তবে, সমূহবিপদ মানবায়ত এইপৃথিবীর | রবীন্দ্রসত্তার বৃত্তায়নে এই সত্য সঞ্জীবিত হয়েছে হরেক শিল্পনন্দনায়| তাঁর হৃদয়জ সত্যায়ন বিজ্ঞাননিষিক্ত তো বটেই | তার ফলে তিনি হ’য়ে উঠেছেন কল্যাণ-সৌন্দর্যময় এক লোকশিক্ষক—হয়েছেন জীবনস্থিরি সংবাহক—পরম আনন্দ-নির্দেশক|
উল্লেখ্য, সাধারণ মানবসত্তার সাধারণ ভ্রান্তিবিলাস ও পচনমোহ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বোধ পরিচ্ছন্ন| তাঁর সত্যায়ন—স্থিত বিজ্ঞানসূত্র-অবলোকন, তা আত্মঃস্থকরন—এ দুই-এরই ক্ষেত্র আজ সংহার-সম্পন্ন| অশুভ ও কূট প্রশাসকের দজ্জাল প্রকরণে বিজ্ঞানসৌন্দর্য বিনষ্টপ্রায়| ব্যক্তিক তথা সাম্প্রদায়িক জীবনযাপনার স্বতঃস্ফূর্ত আঙ্গিকে আজ নষ্ঠ ভোগের বাহার| বিজ্ঞানশক্তির অব্যবহারই আজ সঞ্চয়িত পৃথিবী-প্রেক্ষাপটে| রবীন্দ্রনাথের উচ্চারন :
‘বিজ্ঞানের সাহায্যে যে-শক্তিকে আমরা আয়ত্ত করেছি সেই শক্তিই মানুষের হিংসা ও লোভের বাহন হ’য়ে তার আত্মঘাতকে বিস্তার করছে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে| এই জন্যেই সম্প্রদায়ের নামে ব্যক্তিগত বিকৃতি মানুষের পাপবুদ্ধিকে যত প্রশ্রয় দেয়, এমন বৈজ্ঞানিক ভ্রান্তিতে কিংবা….বৈষয়িক বিরোধেও না| সাম্প্রদায়িক দেবতা যখন বিদ্বেষবুদ্ধির অহংকারের, অবজ্ঞাপরতার, মূঢ়তার দৃঢ় আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়; শ্রেয়ের নামাঙ্কিত পতাকা নিয়ে অশ্রেয় জগদব্যাপী অশান্তির প্রবর্তন করে-স্বয়ং দেবত্ব অবমানিত হ’য়ে মানুষকে অবমানিত ও পরস্পরব্যবহারে আতঙ্কিত ক’রে রাখে। আমাদের দেশে এই দুর্যোগ আমাদের শক্তি ও সৌভাগ্যের মূলে আঘাত করছে।৫
রবীন্দ্র-মনস্বিতায় ছিলো প্রেমদীপ্তির প্রতুল আলোড়ন। তাই, তিনি ঐক্য ও সমগ্রতার অনুধ্যানে ব্যাপৃত ছিলেন। ‘প্রেমহীনতার কারণে উদ্ভূত বিকৃতি’৬-কে তিনি নিঃষেশ করতে চেয়েছেন। ব্যক্তির পবিত্র ও বিশ্বস্ত প্রকাশ-বিকাশের অনন্তশ্রীস্বত্বকেই কাঙ্ক্ষিত ব’লে ধারণা করেছেন। সংহতি ও ঐক্যের নির্মল বাতাবরণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রসশিল্পী হয়েছেন, তাতে তাঁর নির্ভার দিন-রাত্রিযাপনা হয়েছে শৈল্পিক। তাঁর দৃষ্ঠিপাত, তাঁর অনুভূতি-আহরণের সুতীক্ষ্ণ পরিসংখ্যান ব্যাপৃত থেকেছে রসাস্বাদনে। প্রত্যয়ী শিল্পায়োজনে তিনি ‘মানবতাবিরোধী অচলায়তন’৭ ভাঙতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বদীপ্ত হয়েছেন। তাঁর সত্যায়িত পর্যবেক্ষণ:
‘বিশ্বমানবের বাসস্থান-একদিকে পৃথিবী, আর একদিকে মানুষের স্মৃতিলোক। মানুষ জন্মগ্রহন করে সমস্ত পৃথিবীতে, জন্মগ্রহন করে নিখিল ইতিহাসে।’৮
কৃষ্টিপ্রাজ্ঞ মানব হুমায়ুন কবির-এর প্রণিধানযোগ্য উপলব্ধি : ‘ঐক্যের উদগ্র সাধনায় বিশ্বমানবের ইতিহাস মুখর, কিন্তু চরম সত্তা ও মধ্যে যে মায়া ও পার্থক্যের স্থান আছে, মৃত্যু ও বৈচিত্র্যের সমন্বয় ক’রেই যে সত্য ও জীবন,অভিজ্ঞতার সজ্ঞান ক্ষেত্রে তার উপলব্ধি সহজ নয়। শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথের জীবনে এ সমন্বয়ের সজ্ঞান উপলব্ধির পরিচয় মেলে…’।৯
তথ্যসূত্র ১. ‘তীর্থপথিক’ (রবীন্দ্রনাথের পত্রের উত্তর), নজরুল রচনাবলী-পঞ্চম খণ্ড, প্রথমার্ধ (আবদুল কাদির-সম্পাদিত),প্রথম প্রকাশ; ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৪, পৃ. ৩৭| ২. ‘রবিহারা’, ঐ, পৃ.৩৮| ৩. ঐ| ৪. ৪.‘তীর্থপথিক, পূর্বোক্ত| ৫. ৫.‘মানুষের ধর্ম, রবীন্দ্ররচনাবলী- ২০শ খণ্ড, বিশ্বভারতী, ১৯৬৭, পৃ. ৩৯৭-৯৮| ৬. রফিক কায়সার, কমলপূরাণ, প্রথম প্রকাশ; ঢাকা : প্যাপিরাস প্রেস, ১৯৮১, পৃ. ১৫| ৭. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের শক্তি, সংস্কৃতির ভাঙা সেতু; ঢাকা: মাওলা ব্রাদ্রার্স, ১৯৯৯, পৃ.৮২| ৮. ‘মানব সভ্যতা’, রবীন্দ্ররচনাবলী - ২০শ খণ্ড, বিশ্বভারতী, ১৯৬৭, পৃ. ৪২১| ৯. হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য (আহমদ ছফা-সম্পাদিত), ঢাকা : খান ব্রাদার্স এণ্ড কোং, ১৯৭০, পৃ. ৮০|
