দ্বৈরথ
তোমার আগুন ফুল ও ফণা হয়ে দুলে ওঠে— ব্যাখ্যার অতীত এই সুবাস আর ছোবলের দ্বৈরথে দাঁড়িয়ে ভাবি, উপলব্ধির এক অদৃশ্য ক্যানোলা দিয়ে কী নিপুণা, ঢুকিয়ে দিচ্ছ প্রেম— বইয়ে দিচ্ছ অপাপবিদ্ধ যৌনতার ধারা— প্রতিটি মুহূর্তে আমার কেবলই তোমাকে ইচ্ছে করে— অনিবার্য ইচ্ছে প্রবাহিত হতে থাকে কল্লোলিত ধমনীর ভেতর—
আর দেখো, মস্তিষ্কের গহ্বরে জমা হচ্ছে বিষণ্ণ ঝিঁঝিঁ ডেকে ওঠা দিন— কে জানে, তার অনুবাদ-অযোগ্য সুর আমাকে কোন অজ্ঞাতলোকে নিয়ে যেতে চায়— সেই অজ্ঞতার ফাঁকে ঢুকে পড়ি মোহের বাগানে— এক মৃণ্ময় পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে পান করি মধু— গলা দিয়ে নেমে যায় বিষ— ভাবি, দ্বৈত সত্তা তবে তোমারই আরেক নাম…
বলো, কোন অনির্ণিত অধ্যবসায়ে আয়ত্ত করেছ এই বিদ্যা— অবিসংবাদিত কলা— কেবল তুমিই জানো, কখন ফুল হতে হয়, কখন ফণা—
নতুন কবিতার নামে
এই হিরণ্য সন্ধ্যায় আমি চুপ হয়ে থাকি— কথা বলুক আমার প্রিয় পঙ্ক্তির কবিতা— আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে ধরে নিতে পারি, এই পৃথিবীর সাথে সে কেবল একাত্ম হতে চায়— যেমন, এমন অনেক আকাঙ্ক্ষা নিঃশব্দে লুকিয়ে রাখে গোপন প্রেমিকা—
আর প্রেম, সে তো এক নীরব বজ্রপতনের নাম।
এক ধূর্ত শেয়াল এই গোলাকার বস্তুটিকে নিয়ে খেলা করে শুধু— আমি চাই না, লৌহযুগের কামারশালার পাশে কেবল নিরুত্তেজ দর্শক হয়ে বসে থাকি— আর সবাই আমাদের পৃথিবীটাকে বানিয়ে তুলুক বল—
নতুন কবিতার নামে আমি তাই প্রেমিকার গোপন নাম ডায়রিতে লিখে লিখে রাখি—
সময়
তোমাদের সময় এত অহং-বেষ্টনী দিয়ে আটকে রেখেছ কেন— আমি তো কেবল আমার নাম বনঘুঘুদের পালকে লিখে দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম—
আর চেয়েছিলাম জেনে নিতে, একটা ছেঁড়া তারের বীণা কতটুকু স্বর-শোকে ডুবে থাকে সারাক্ষণ— এক তিরবিদ্ধ বাইসনের চেয়ে তার বেদনা কতটুকু বেশি অথবা কম—
এইভাবে আমি নিশ্চয়ই একদিন সুরের আশ্রয় থেকে বেরিয়ে ভ্যান গগের নীল অথবা পিকাসোর ধূসর হয়ে যাব; অথবা রদ্যাঁর চিন্তক— চিবুকে হাত রেখে ভাবব, আমার চিন্তাবিশ্ব আর কোন মহাবিশ্বের অধীন— অহংকার সেখানেও কি এতটা মহান, ঈশ্বরের মতো?
যে সময় আজ তোমাদের, তা একদিন আমারও হবে— হয়তো সেদিন আমার গোপন পকেটে পেয়ে যাবে দালির ঘড়ি— আর পাবে অজ্ঞাত পরিচয় এক বনঘুঘুর সাদা কঙ্কাল।
অনুপ্রবেশ
তোমার ধ্যানের ভেতরে ঢুকে যাই— যেভাবে একটি জোনাকি অথৈ অন্ধকারে জ্বলে ওঠে, অকস্মাৎ—
আমি জানি, তোমার ধ্যানের জগত এক গোলাপি গ্রহ— সেখানে আমি, এক এলিয়েন ছাড়া আর কিছুই নই— আমি তো নীরবে তোমার সামনে বসে থাকি— যেন চোখ খুলতেই আমাকে দেখতে পাওয়া যায়—
অদূরে শিবের মন্দির; থেকে-থেকে শঙ্খনাদ আসে— তোমার ধ্যানভঙ্গ হলে আমাকেই তখন অপরাধী ভাবো— অথচ পাঁচ পাঁচটি মহাসমুদ্র সেঁচে কোনো গোলাপি শঙ্খ পাইনি আজও—
তোমার ধ্যান, তবে কীভাবে ভাঙাব, দেবি?
আমার কথাগুলো
জানি, তোমরা কেউ আমার কথাগুলো পৌঁছে দেবে না বজ্রবিদ্যুৎভরা মেঘেদের কানে— একটি ফণাতোলা গোখরার কাছে কতটা প্রার্থিত ছিল মধু অথবা ফণিমনসার কাছে চেয়েছিলাম তরতাজা রক্তগোলাপ— সবই অনুক্ত থেকে যাবে— আমি তাই আমার কথাগুলো রেখে যাব পাখিদের ঠোঁটে—
নদীটারও ভাষা ছিল— রোদ্দুর ছড়ানো দিনে উগরে দিয়েছিল তাই কথার বুদবুদ— ধূলোর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে যেভাবে দৃশ্যগুলো তুলে রাখি চোখের ঝুড়িতে— সেইভাবে সযত্নে গেঁথে রাখি এইসব গূঢ় পদাবলি—
মানুষ মূলত বধির, হৃতবাক— তাদের অনুর্বর হৃদয়ে নিজেকে অপচয় করে কেন আমি রুয়ে দিতে যাব এইসব কথা আর শব্দের চারা— আজ তাই, সুমিষ্ট সঙ্গীত শোনাতে গিয়ে বহুবার থেমে থেমে যাই—
তোমাদের কাছে নয়, চলে যাওয়ার আগে আমার সমস্ত কথা পাখিদের ঠোঁটে তুলে রেখে যাব—






