দ্বাদশ তৃষ্ণা
ডুবসাঁতার থেকে জেগে উঠে দেখি চতুর হাওয়া বইছে বুকে। কাঁচভাঙ্গা শব্দের টুকরো টুকরো জীবন, চায়ের টেবিলে দ্বাদশ তৃষ্ণা। পূর্ণদীর্ঘ পথের ওপাশে শুইয়ে আছে কমলাক্ষী ঘুম। কচ্ছ বণিকের মতো জল, টান ভর্তি জোয়ার। চৌষট্টি নন্দন ছুঁয়ে থাকি, হাতের মুদ্রায় কৌণিক জ্যামিতি। একজোড়া উড়াল ডানায় কতোটা সুদূর থাকে, ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যায় প্রজাপতি। নীল অন্ধকার গায়ে কে তুমি পাথর, দীর্ঘশ্বাসের নামতা পড় রোদের চাতালে। সূর্যের পুঁজি থেকে প্রথম চন্দ্রগ্রাস তোমাকে দেবো, তুমি দশ আঙ্গুলে বাজিয়ে যেও শুন্যের সানাই। পকেটে সূর্যাস্ত নিয়ে দৌড়ে এসো, রেলগাড়ীর মতো তোমার শরীর, কেমন কু-ঝিকঝিক গন্ধ।
আলোকলতা
তবুও পথে পাথে ঘুরি। নিমকষ্টের বনে রাতের নিঝুম। জ্যোৎস্নাপোড়া ছাই নিয়ে হেঁটে যাবো, আমাদের হাতে হাতে চাঁদের পরাগ। সবুজের রঙ ছুঁই, সুবর্ণরেখার কোলে রূপের মহড়া। আমি পাথরে-পাহাড়ে-গুহায়-হাড়ে লিখে নেব তোমার কাওয়ালি- ষোল কলায় গাঁথা পূর্ণবতী বাণী। তুমি আকাশে আকাশ হয়ে ডেকে যেও আমার বিস্ময়। জেনে রেখ আমি আর তুমি ছাড়া নিসর্গের সকলই পুরাণ। সকলই ছিল, আমাদের জন্মের অধিক আগে। জীবন-মৃত্যু থেকে উঠে আসা আমরা, যারা হাঁটতে হাঁটতে একদিন চলে যাবো অহমের দেশে, ফেলে যাব হাঁস বালিকার শাদা গন্ধ- জলডুবি দিঘি; যুগল জন্মের আলোকলতা।
আট কামরা ও দশ দরজার রেলগাড়ি
খুব কাছ থেকেই তুমি দীর্ঘশ্বাস। তোমার ভেতর ইস্কুলবাড়ির কোলাহল, ছেঁড়া-খোড়া চৈত্রের
বসস্ত। শুরু ও শেষের ঘণ্টা তুমিই বাজাও।
ইতিহাসের শাদা ঘোড়ার মতো তুমিও অবসাদ পুষে রাখো;
কখন ছুঁয়ে দেবে নৃতত্ত্বের প্রথম পাথর।
একদিন গল্পের সন্ধ্যায় তুমি চারুপাঠ হয়ে উঠলে। শরীর ভর্তি স্বরবর্ণ আর একতারার বাজনা।
হাত নেড়ে জানালে তুমি মূলত একটা সড়ক, একে বেঁকে কোথায় যাবে জানো না।
তারপর থেকে আমিও জ্বেলে রাখি কালো আগুন।
চোখের সামনে রেশমী সূতায় বোনা রাত।
এভাবে দূর খুঁজতে গিয়ে এখন আমি আট কামরা ও দশ দরজার রেলগাড়ি।
উছল
রাত আসে, ছুঁয়ে যায় কামরাঙা নদীর আঁচল। কিছুদিন বৃক্ষতলে ছায়া হয়ে কাটিয়েছি মহুয়ার কুসুম নেশায়। পরাঙ্গী ধানের গন্ধে কতবার হারিয়েছি কৈশোরের নবান্ন সকাল। হেমন্ত উড়াল দিতো ধনেশের ডানায় ডানায়। আমারও পিদিম ছিলো, জ্বালিয়ে রাখতে গিয়ে নিভে যেতো প্রতি পূর্ণিমায়। পাখিদের বিমগ্ন শরীরে মিহিদানা চাঁদের পরাগ। কতটা বাঁধবে তারে, টপ্পার আসর থেকে যে সময় পালিয়েছে একা। যে সময় ফাঁকি দিয়ে নিয়ে গেছে কুমারী প্রাচীন- ছাতিমের প্রহর মৌনতা। তুমি যাই বলো অহল্যা জীবন ছেড়ে কোথাও যাবনা, আমিও পাথরে পাথর হয়ে শুয়ে রবো দ্রাবিড় ধূলিতে। তুমি প্রাণ খুলে ডেকে যেও, ডেকে যেও বুকের সারস। জলাঙ্গী কী দেবে জল, রাতপোড়া রোদের উছল।
উষ্ণতা
ভীষণ উষ্ণতা জাগে। চোখের চপল বেয়ে টলটলে ঘ্রাণ নিয়ে মৃত্যুর মতো রূপ নামে। মাথার উপর টাঙানো আকাশ। আমার সীমায় শ্লীল-অশ্লীল কিছুই নেই। শুধু চাঁদের পালান জুড়ে প্রান্তিক নক্ষত্র খোঁজা। কোনোদিন ঘুম ভেঙে জেগে দেখি মাঝরাত শুয়ে আছে আমার শয্যায়, ঠিক যেন বৌয়ের শরীর। ব্রহ্মপুত্র জলে তিন তিন বার দেখেছি দেবীদের স্নান-উৎসব, লাজধোয়া অমৃত শরীর। আমার গোপন খোয়া গেছে চতুর গোপনে। আমিতো বহরে হাঁটি যোজন যোজন। যাযাবর বিশ আঙ্গুলে খেলে বিংশতি পল-অনুপল। কোথাও হঠাৎ থেমে জীবনের পায়ে আঁকি অমরত্বের সুবর্ণরেখা। কখনো আবার অন্ধকার কামারশালায় জ্যোৎস্না বানাই একা একা- এই মৃত্তিকায়।
