
উপন্যাস: আমারে দেব না ভুলিতে
লেখক: আশীফ এন্তাজ রবি
প্রকাশনী: আদর্শ
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
মূল্য: ৬০০ টাকা
আমাদের জীবনের বিশেষ কিছু মুহুর্তে থাকে যা অবসরে রাজহাঁসের সোনালি পালকের মতো ঝরে পড়ে৷ একখন্ড মেঘ অবসরে সম্মৃতির ঝুম বর্ষা নামায় হৃদ আঙিনায়৷ মন কার্ণিশে কিংবা অনুভূতির ছাদে সেই আবেগী বৃষ্টির রিমঝিম তান ভাসিয়ে নিয়ে চলে কোন সে অজানার খেয়ালে৷ ছেলেমানুষী হাতে বানানে রঙিন কাগুজে নৌকাগুলো তরতরিয়ে সাঁতরে চলে আপন অনুরাগের আবেশ মেখে। তেমনি জলতরঙ্গের এই সেতার বাজে লেখক পাঠকের মাঝেও৷ আর সেই আত্মিক তানের সংয়োগ ঘটিয়ে নিতে পারে একটি বই৷ হ্যাঁ। একটি সার্থক বই কেবল পারে কলম জাদুকর আর তার দর্শকের মাঝের সেই মিলন সেতুর সংযোগ ঘটাতে। লেখক আশীফ এন্তাজ রবির লেখা “আমারে দেব না ভুলিতে” তেমনি একটি বই৷ ইতিহাস নির্ভর, তথ্য সমৃদ্ধ, কাল্পনিক রস জালের বুননে এই বৃহৎ কলেবরে এলজন ভাবুক পাঠক বাস্তবিকই হারিয়ে যেতে বাধ্য।
বইয়ের শিরোনামেই পাঠককে সংযুক্ত করে দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুলের আবেগের সাথে। খেয়ালি কবির কবি পরিচয়ে পরিচিত হবার বুভুক্ষা, সৃষ্টির বাঁধনহারা উল্লাস হতে তাঁর খেয়ালি আবার কখনও বা ছন্নছাড়া প্রেমের কুসুম লয়ের সাথে তাঁর সাম্যবাদী চেতনা ও বিদ্রোহী সত্তার উন্মেষের যে প্রাঞ্জল বর্ণনা তা যেন অনায়সে কবির হাত ধরে আমাদের নিয়ে চলেছে কলকাতা থেকে ঢাকা, ঢাকা হতে কুমিল্লা৷ ফরিদপুর হয়ে আরও কত জনপদে। অজপাড়াগাঁয়ের ইমাম সাহেবের ঘর আলো করে আসা পঞ্চমপুত্র ত্যারাক্ষাপা কী করে দ্রোহের স্মারক হতে বাংলা সাহিত্যে অমর সত্তা হয়ে রইলেন, সেই যাত্রার বয়ান যেন কল্পনায় বুনে চলা ভাবনার চাইতেও নাটকীয়৷ ত্যারাক্ষাপা, নজর আলী, দুখু মিয়া শেষে নজরুল এ যেন এক অঙ্গে নানা বর্ণের এক অভূতপূর্ব বিবর্তন৷ এক অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকর গতিময় এই আখ্যান৷
খেয়ালি কবির জীবনালাখ্যে কুপি বাতি হাতে দেখা হয়ে গিয়েছে কবিগুরু হতে শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দের লাজুক খোলস হতে শিশু কবি জসীমউদ্দিনের পরিপূর্ণতা ও পরিপক্ততা৷ পকেটে শূন্য গড়ের মাঠকে সঙ্গী করেই কবির যে খেয়ালি যাত্রা তা পাঠক হিসেবে কখনও হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে কিঞ্চিত বিব্রতও করে তুলেছে৷ সাথে অবশ্য রসিকও কম করে তোলেনি। সেই আমলে জন্মালে যদি কোন ভাবে তাঁর দর্শন পেতুম তাহলে চায়ের পেয়ালা আর পানের আমেজে নির্ঘাত সাহিত্য আড্ডা জমাতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। আশ্চর্য রূপকথা কবির পরিণয় অধ্যায়েও সামিল। নার্গিসের মখমল ডানা ছেড়ে প্রমীলা দেবীর প্রেমের সাত পাঁকে বাঁধা পড়া মনও যে ফজিলাতুন্নেছার তুখোড় গণিতের হিসেবের কাছে চুরচুর হতে বসেছিল তাও জানা হলো এই বইয়ের পাতার কল্যাণে। বাস্তবিকই কি কবি মনের প্রেমের তৃষ্ণা অপূর্ণই রয়ে যায়?
সংসার জীবনে উদাসীন নজরুলের বুলবুলের পিতৃ পরিচয়টি যেন সবচেয়ে আবেগতাড়িত করে তুলেছে পাঠককে। জ্বরাক্রান্ত ছোট্ট বুলবুলের শিউরে এক হাত রেখে আরেক হাতে তার চিকিৎসা যোগানের অর্থ জোটাতে কবির রুবাইত ই হাফিজ এর অনুবাদের যে সংগ্রাম তা যেন তখন লেখক পরিচয়কে পেছনে ফেলে উজ্জ্বল করে তুলেছিল উদাসীন এক পিতার চরম উদ্বেগকে৷ অপরদিকে শরৎচন্দ্রের পাণি গ্রহণের গল্পটা হতে ইন্দুবালার কন্ঠের জোয়ার, লাজুক কবি জীবনানন্দের চাকরি চলে যাবার নি র্মম বাস্তবতা। কবি লেখকদের জীবন সং গ্রামের যে চিরায়িত অবহেলার নির্ম ম সত্য, সেই নি ষ্ঠু র সত্যতা যেন সহজেই ভাবনার তাল পাতার খেয়াকে ভাসিয়েছে কোন সে তটে। ট্রাম্প চাপা পড়া ছিন্ন ভিন্ন জীবনানন্দকে উদ্ধার করা যে চুনিলাল, দুর্ভিক্ষের পর তার প্রিয় চায়ের দোকানটির কী হলো তা আর জানা হলো না। দেবদাস বেশে তাঁর দোকানে হাজির হওয়া শরৎচন্দ্রেরও জানা হলো না দেরিতে তাঁকে চিনতে পারা চুনিলালের হৃদয়ের জমানো আফসোস তুলে নিলে হয়তো জন্ম নিতে পারত নতুন কোন উপন্যাস৷ তেমনি পাঠক হৃদ বালুকায় চিহ্ন আঁকে একটি কৌতুহল, কী করে ট্রামে পিষ্ট হলেন কবি জীবনানন্দ? একী নিছক দুর্ঘট না নাকি নেপথ্যে অন্য কিছু? কিছু রহস্য লেখক যেন এখানে পাঠকের উদ্দেশ্যেই ছুঁড়ে দিয়েছেন। দিনশেষে পাঠকের রায়টাই যে আসল। সে উপেক্ষা করার জো কার?
বইয়ে পৃথিবীর একই সময়ে দু প্রান্তে ঘটে যাওয়া কত আশ্চর্য কাহিনীকেও বাঁধা হয়েছে বাবুই পাখির মতো দক্ষ শব্দ বুননে। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এর আকাশ ছোঁয়ার গর্ব হতে, ক্ষণিক কালের জন্য রকেটের ফড়িং বেশে পাখনা মেলা, আর্জেন্টাইন সেই সুন্দরী ভিক্টোরিয়ার চোখে রবিনরাগের নতুন সুর ভেজে নেওয়া। হিটলারের আত্ন হন ন হতে ১৯৪৭ এর দেশভাগ। নজরুলের চিকিৎসায় তোলপাড় দুনিয়া, তারপর স্বাধীন বাংলাদেশে কবি নজরুলের নব পরিচয়ে জন্ম। এই সবকিছু মিলিয়ে উপন্যাসের গতি যেন পাঠককে উদ্বেলিত করে পুরোন গল্পকে নতুন করে খুঁজে নেবার অভিপ্রায়ে। বইয়ের ভাঁজে সময়ের পরিসরে আরও উঁকি দিয়ে গেছেন, সত্যজিত রায় হতে কিংবদন্তী দিলিপ কুমার৷ কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানিতে কবি নজরুলের পসার যোগ হতে আবার ভাগ্যের মুখ ফিরিয়ে নেয়া সকল ঘটনাগুলো একই সুঁতোয় গেঁথে নিলে মনে হয়েছে, জীবন আসলেই পদ্মপাতায় গড়িয়ে পড়া জল৷ যাতে নাজুক স্পর্শ পড়লেই মুহুর্তেই পরিবর্তন হয় তার কক্ষপথ।
বইয়ে সাজানো প্রতিটা অধ্যায়ের কাহিনী বিবরণ আমাদের জীবনের এমন সব বাঁকে দাঁড়া করায়, যেখানে বর্ষার কদমের মতো জন্ম দেয় নানা প্রশ্নের। প্রমীলা দেবীর হঠাৎ অমন অচল না হলেই হতো না হ্যারি দাশের সেই করুণ পরিণতি, দা ঙ্গার উত্তপ্ত আঁচে তার ধড় হতে শরীরকে আলাদা করে নেওয়ার নিষ্ঠু/রতার নিদারুণ অবি/চার সময় তখব তো না করলে কী হতো না! পুঁটিরানীর সাথে সেই ম রণ যাত্রী ভিক্ষুকের থলির সংয়োগ, কন্যা ভিক্টোরিয়ার বেড়ে ওঠা, দুর্ভিক্ষে জেগে ওঠা পুঁটিরানীর মানবতা, শরৎ বাবুর কর্কটের হুং/ কারের সম্মুখে আত্মসমর্পণ হতে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ, সাহিত্যের সব উজ্জ্বল চরিত্রগুলো কী করে একেএকে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ল, পাছে বিলিয়ে গেল আলো৷ তীরে তরী ভিড়িয়ে নেয়া কাজীদার জীবনটা যেন আরও বেশি নাটকীয়৷ শেষাংশে কবির অসহায়ত্ব তাঁর শিশুসুলভ জিদ সবকিছুই কেমন এক অজানা মোহে টেনে নিয়েছে। স্মৃতি, ভালোবাসা, সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, মানুষের অস্তিত্বগত অনুভূতিকে অবলম্বন করে রচিত এই উপন্যাস লেখক এক বৃহত্তর সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখিয়েছেন৷ যা কিনা বইটি পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছে একটি জাগ্রত সময়ের জীবন্ত আয়না৷ এক মহামূল্যবান দলিল৷
বইটিতে লেখক প্রতিটি চরিত্রকে উপস্থাপন করেছেন আপন ঢঙে৷ কোন রকম বাহুল্য ছাড়াই৷ জীবনের ছোটছোট সব ঘটনা, হারিয়ে যাওয়া মানুষ, সময়ের অনিবার্য পরিবর্তন, সম্পর্কের সূক্ষ টানাপোড়েন তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠকের মনে কোন কৃত্রিমতার আভাস ফুটিয়ে তোলে না৷ ভাষার লেখনশৈলী ও মাধুর্য হৃদয়ের গভীর অনুভূতি প্রকাশে যে দক্ষতা প্রদর্শন করেছে তা এককথায় অসাধারণ। আর এই আকর্ষণই পাঠককে বইটির সাথে শেষ অবধি সংযুক্ত রেখেছে৷
“আমারে দেব না ভুলিতে”- বইটি দ্রুতগতির বই নয়, এটি ধীরে পাঠকের মনোজগতে প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখে৷ কোথাও অবশ্য অতিরিক্ত বর্ণনা সাময়িক মনোযোগ ধরে রাখতে অক্ষম তথাপি এতে সন্নিবেশিত বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ও ভিন্ন মাত্রিক পর্যবেক্ষণ বইটির সাহিত্য মানকে দিয়েছে অন্য এক উচ্চতা৷ বইটি মূলত নজুরলের জীবনে আবর্তিত করেই রচিত। এই কাহিনির কেন্দ্র বিন্দু কাজীদা আর তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে মঞ্চে উপবিষ্ট হয়েছে আরও সব চরিত্র৷ সকল চরিত্রই নিজ নিজ জায়গা হতে কোন না কোন সময়ের কোন না কোন সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রতিনিধিত্ব করে। এন্তাজ রবি তাঁর সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ, পরিমিত ভাষা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে এমন একটি রচনা আমাদের উপহার দিয়েছেন যা বাংলা গদ্যে অনুভূতির স্বচ্ছতা ও মানবিক গভীরতাকে এক ভিন্ন দর্শনে উন্নীত করতে সমর্থ হয়েছে। কথা শেষ করব বইয়ের ৫১ পেইজে খোদিত আমার একটি অনুচ্ছেদ দিয়ে।
“১৯২০ সালের দুপুরবেলা। প্রখর গ্রীষ্মকাল। চারিদিকে লু হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ার দাপটে কলকাতার বাতাস উত্তপ্ত।
এই গরমের মধ্যে পুরোদস্তুর সৈনি কের উর্দি পড়া এক তরুণ কলকাতার কলেজ স্ট্রীটে ঘুরে বেরাচ্ছে। সে একটি ঠিকানা খুঁজছে। জনে জনে জিজ্ঞেসা করছে, আচ্ছা ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিট কোনটি?
কলকাতার মানুষ ভীষণ ব্যস্ত। ঠিকানা না দেখেই সবাই বলছে, কী জানি বাপু। তুমি খুঁজে নাও।
তরুণটির বেশভূষা দেখে এক পৌঢ় থমকে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, তুমি ৩২ নম্বর খুঁজচো। এ তো পত্রিকার আপিস। এখানে তোমার কী কাজ? তোমার পরিচয় কী বাছা?
তরুণটি গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, আমার নাম হাবিলদার নজরুল ইসলাম। আমি একজন কবি।”
কে জানত? প্রখর দাবদাহে ক্লিষ্ট সেই দ্বিপ্রহরই ছিল কবি নজরুল ইসলামের সাহিত্য পথ অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক ধাপ। সেই তাতানো দুপুরে কাজীদার সেই পথচলা বাংলা সাহিত্যে সেদিন অলক্ষ্যে উন্মুক্ত করে মিশেছিল সুজনের নতুন দুয়ার।
