সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে সাধারণ ভাবে মনে করলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লালসালু, চাঁদের অমাবস্যা কিংবা কাঁদো নদী কাঁদো। অথচ তাঁর নাট্যজগতে প্রবেশ করলে দেখা যায় অন্য এক ওয়ালীউল্লাহকে— যিনি মানুষের সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে তার ভয়, অপরাধবোধ, নিঃসঙ্গতা, নীরবতা এবং অস্তিত্বের অনিশ্চয়তাকে মঞ্চে দাঁড় করিয়েছেন। বহিপীর, তরঙ্গভঙ্গ, সুড়ঙ্গ এবং একাঙ্ক উজানে মৃত্যু মিলিয়ে তাঁর নাট্যভুবন বাংলা নাটকের প্রচলিত বাস্তবতাকে ধীরে ধীরে ভেঙে একটি অন্তর্বাস্তব, প্রতীকী এবং অস্তিত্ববাদী পরিসর নির্মাণ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জীনাত ইমতিয়াজ আলীও ওয়ালীউল্লাহর শিল্পচেতনায় দেশীয় সমাজবোধের সঙ্গে পাশ্চাত্য সমাজবোধ এবং ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী দর্শনের সংযোগের কথা বলেছেন। এইখানেই ওয়ালীউল্লাহর নাটকের স্বাতন্ত্র্য। তিনি ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদকে বাংলায় অনুবাদ করেননি; বরং বাংলার মাটি, নদী, দরিদ্র মানুষ, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর ভিতর দিয়ে তাকে নতুন অর্থ দিয়েছেন। সার্ত্রের ‘অস্তিত্ব আগে, সত্তার সংজ্ঞা পরে’ কিংবা কাম্যুর অর্থহীনতার প্রশ্ন তাঁর নাটকে এসে কোনো প্যারিসীয় ক্যাফেতে বসে থাকে না। তা নেমে আসে গ্রামবাংলার উঠোনে, আদালতের কাঠগড়ায়, পীরের আস্তানায় কিংবা নদীর অন্ধকার জলে।
বহিপীর-এ সেই দেশজ আধুনিকতার প্রথম বড় প্রকাশ। ১৯৫৫ সালে ঢাকা পেন ক্লাবের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নাটকটি পুরস্কৃত হয় এবং পরে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। নাটকের কেন্দ্রে ধর্মবিশ্বাস নয়, ধর্মের সামাজিক ব্যবহার; পীর নয়, পীরতন্ত্রের ক্ষমতা; বিশ্বাস নয়, বিশ্বাসকে পুঁজি করে মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ। তাহেরা, হাতেম আলি, হাসেম এবং বহিপীরের সম্পর্কের ভিতর দিয়ে ওয়ালীউল্লাহ দেখান, অন্ধ বিশ্বাস কীভাবে ব্যক্তিমানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে গ্রাস করে। ফলে লোকজ ধর্মবিশ্বাস এখানে কেবল পটভূমি নয়, মানুষের অস্তিত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করা একটি সামাজিক শক্তি। সমালোচক বেগম আকতার কামাল বহিপীর-এর ক্ষেত্রে প্রচলিত বিষয় থাকলেও ওয়ালীউল্লাহর ‘অন্যতর ভঙ্গি’ ও স্বাতন্ত্র্যের কথা বলেছেন। এই ‘অন্যতর ভঙ্গি’ই পরবর্তী নাটকগুলোর দিকে তাকানোর চাবিকাঠি। ওয়ালীউল্লাহর মানুষ কোনো সরল নৈতিক সূত্রে পরিচালিত মানুষ নয়। সে নিজের ভিতরেই বিভক্ত।
তরঙ্গভঙ্গ-এ সেই বিভক্ত মানুষটি আমেনা। ক্ষুধার যন্ত্রণায় নিজের শিশুসন্তানকে হত্যা করা এবং মরণাপন্ন স্বামীকে ধুতরার বিষ দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া আমেনা আদালতে দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় সম্পূর্ণ নীরব। তাঁর এই নীরবতা নাটকের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সংলাপ। বিচারক তাঁর অপরাধের বিচার করতে গিয়ে ক্রমশ নিজের সমাজ, ন্যায়বোধ এবং বিবেকের মুখোমুখি হন। এখানে কাম্যুর The Stranger-এর মেউরসোর সঙ্গে আমেনার সরাসরি তুলনা হয়তো অতিরঞ্জিত হবে; কিন্তু দুজনের চরিত্রেই সামাজিক নৈতিকতার প্রচলিত ভাষার সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের দূরত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়।
পার্থক্যটিই বরং ওয়ালীউল্লাহকে স্বতন্ত্র করে। মেউরসোর বিচ্ছিন্নতা ইউরোপীয় ব্যক্তিসত্তার সংকটের ভিতর জন্ম নেয়; আমেনার নীরবতা জন্ম নেয় দারিদ্র্য, ক্ষুধা, সামাজিক অবিচার এবং ব্যক্তিগত যন্ত্রণার ভিতর। অর্থাৎ অস্তিত্ববাদ এখানে দেশজ সামাজিক বাস্তবতার শরীর পেয়েছে।
উজানে মৃত্যু-নাটকে এই নির্মাণ আরও বিমূর্ত। তিনটি প্রতীকী চরিত্র, অনিশ্চিত গন্তব্য, নদী, মৃত্যু এবং উজানের দিকে যাত্রা—সব মিলিয়ে নাটকটি কাহিনির চেয়ে অস্তিত্বের অবস্থাকে সামনে আনে। গবেষণায় একে মানুষের নৈঃসঙ্গ্য, শূন্যতা ও যন্ত্রণার সঙ্গে ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী দর্শনের সংযোগস্থল হিসেবে পড়া হয়েছে। সাম্প্রতিক মঞ্চায়ন-আলোচনাতেও নাটকটির তিন প্রতীকী চরিত্রের অনিশ্চিত যাত্রাকে মানবজীবনের সত্য অনুসন্ধানের রূপক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদী এখানে কেবল নদী নয়। ‘উজান’ হয়ে ওঠে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের যাত্রা, অথবা নিজের অস্তিত্বের দিকে ফিরে যাওয়ার অসম্ভব চেষ্টা। বাংলার নদী, মৃত্যু, ভেসে চলা, ঘাট, কুয়াশা—এসব দেশজ চিহ্নের সঙ্গে পাশ্চাত্য অ্যাবসার্ড নাট্যের শূন্যতা মিশে গিয়ে তৈরি করে এক অদ্ভুত নাট্যভাষা। বেকেটের অপেক্ষা যেমন মানুষের অনিশ্চিত অবস্থানকে দৃশ্যমান করে, ওয়ালীউল্লাহর উজানও তেমনই একটি অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে মানুষের চলা। তবে তাঁকে কেবল বেকেট, কাম্যু বা সার্ত্রের অনুসারী বলা ভুল হবে। বরং তাঁর নাটকে পশ্চিমা আধুনিকতার সঙ্গে বাংলার লোকজ মনস্তত্ত্বের একটি সংলাপ তৈরি হয়। মনসামঙ্গল, বেহুলা-লখিন্দরের নদী, পীর-সংস্কৃতি, গ্রামীণ বিচার, ধর্মীয় ভয়, দারিদ্র্য—এসব তাঁর নাটকে সরাসরি পুরাণের পুনর্লিখন না হলেও একটি গভীর দেশজ স্মৃতি হিসেবে কাজ করে। সেই স্মৃতির ভিতরেই আধুনিক মানুষের প্রশ্ন ঢুকে পড়ে। এই কারণেই ওয়ালীউল্লাহর নাটকে নীরবতা একটি ভাষা, নদী একটি চরিত্র, আদালত একটি মানসিক গোলকধাঁধা এবং মৃত্যু একটি দার্শনিক প্রশ্ন। তরঙ্গভঙ্গ নিয়ে বেগম আকতার কামাল যে অভিব্যক্তিবাদী নাট্যরীতির কথা বলেছেন, তার সঙ্গে অস্তিত্ববাদী ও অ্যাবসার্ড বৈশিষ্ট্যের সংযোগও লক্ষ করা যায়।
ভাষা বিজ্ঞানী জীনাত ইমতিয়াজ আলীর মূল্যায়নে, বহিপীর থেকে তরঙ্গভঙ্গ, সুড়ঙ্গ পেরিয়ে উজানে মৃত্যু-তে ওয়ালীউল্লাহর নাট্যচেতনা ক্রমে আরও বিস্তৃত হয়েছে। এই বিবর্তনকে তাই শুধু নাট্যরীতির পরিবর্তন বলা যায় না। এটি একই সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক সমাজ থেকে অন্তর্লোকের দিকে যাত্রা। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই—তিনি বাংলার গ্রামীণ বাস্তবতাকে ছোট করেননি আধুনিকতার নামে, আবার আধুনিক দর্শনকেও দেশজ আবহে এনে সরলীকরণ করেননি। তাঁর নদী ইউরোপীয় দর্শনের নদী নয়, তাঁর মানুষও কেবল অস্তিত্ববাদী তত্ত্বের চরিত্র নয়। তারা ক্ষুধার্ত, ভীত, বিশ্বাসী, অপরাধী, বিচারাধীন এবং একই সঙ্গে গভীরভাবে একা। সেই একাকিত্বেই ফরাসি অস্তিত্ববাদ এসে মিশেছে বাংলার লোকজ মিথ, নদী ও স্মৃতির সঙ্গে। ফলে ওয়ালীউল্লাহর নাট্যতত্ত্ব আসলে কোনো ধারার অনুবাদ নয়; এটি দুই ভুবনের সংঘর্ষ ও সংলাপ থেকে তৈরি এক স্বতন্ত্র আধুনিক বাংলা নাট্যভাষা।



