মিনটির সাথে আমার সম্পর্ক কোনোদিনই ভালো ছিল না । আমি ডাকলে সে ডাকে সাড়া দিত না—এমনকি ফিরেও তাকাত না । ধরা যাক, সে চেয়ারে আরাম করে বসে আছে—আমি হয়তো বললাম, “মিনটি চেয়ার ছেড়ে দে, আমি বসবো” । ও নামবে না—আমার ডাকটাকে সামান্য সম্মান দেখিয়ে কোনো সাড়াও দিবে না । এরপর আচ্ছামতো ধমক দিলে তবে চেয়ার থেকে সুড়সুড় করে নেমে আসবে । এটা শুধু আমার সাথে ওর যাচ্ছেতাই হীন-সম্পর্কের কারণেই । কিংবা আমাকে সে হঠাৎ বাড়িতে আসা দূর সম্পর্কের কোনো অতিথিও ভাবতে পারে, যার কথা শুনলেই বা কী আর না শুনলেই বা কী? কিন্তু মার সাথে ওর সম্পর্কটা মোটেও এমন নয় ।
মা ডাকলে সে লেজ নাড়তে থাকবে এবং “মিঞ” বলে ডাকে সাড়া দিবে । কখনো ঘাড় ঘুরিয়েও ডাক শুনবে । কোনো আবদার থাকলে বার বার মিঞ মিঞ করতে থাকবে । ধরা যাক, মিনটি চেয়ারে গুটিসুটি মেরে আরাম করে শুয়ে আছে; মা বলল— “মিনটি নেমে আসো” । সে চট করে একবার মিঞ বলে নেমে আসবে । মা অসুস্থ হয়ে পড়লে মিনটি মার বিছানায় বসে থাকে মনমরা হয়ে । হয়তো ওষুধ দিতে পারে না, পথ্য দিতে পারে না, কিন্তু একবুক ভালোবাসা নিয়ে কাছে বসে সহানুভূতি তো প্রকাশ করতে পারে । সেটাই ক’জন পারে? আমি মাঝে মাঝে মার পোষা বিড়াল মিনটির পাশবিক কাণ্ডকারখানা কতটা মানবিক হয়ে উঠতে পারে তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম । দেখতাম কীভাবে সে তার সকল সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । দেখতে দেখতে অবাক হয়ে যেতাম যে এই গৃহপালিত ছোট চতুষ্পদ প্রাণীটির আত্মিক সম্পর্ক কতটা বলিষ্ঠ । শেষপর্যন্ত কখন যেন মানুষের সাথে অতল নিংড়ে তুলনাও করে ফেলতাম । বলাবাহুল্য, সেই নিরপেক্ষ তুলনার ফলাফলে আমাদের অনেকের চেয়ে মিনটিই এগিয়ে থাকতো ।
আমাদের বাড়িটা পুরোনো বনেদি বাড়ি । একডাকে আশেপাশে সবাই চেনে । বাড়ির সামনে বড় একখানা উঠান, এরপর ছোট একটা ইটবিছানো আধাভাঙা রাস্তা এবং তারপরই শানবাঁধানো ঘাটের বড় পুকুর । এই ছোট রাস্তাটা ডানদিকে বেশকিছুটা পথ গিয়ে বড় কাঁচারাস্তার সাথে মিশেছে । আর বামদিকে এপাড়া-ওপাড়া হয়ে গ্রাম্য দস্যি মেয়ের মতো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে শেষে! আর সেই বড় কাঁচারাস্তা কিছুটা দূরে উন্নতির হাওয়ালাগা গঞ্জের বাজারে হাত মিলিয়েছে । এই হলো আমাদের বাড়ির সংক্ষিপ্ত ভূগোল । এরকম একটা পুরোনো টাইপের বাড়িতে আমার সত্তরোর্ধ বয়সের মা কপালদোষে একাই থাকে । ছেলেমেয়েরা মানে আমরা ভাইবোনরা চাকরি বা পড়াশুনা সূত্রে বাহিরে থাকি । তাই তার রান্নাবান্না, গৃহস্থালি কাজকর্ম সে নিজেই করে, করতে হয় । কারণ টাকা দিলে হয়তো বাঘের দুধ মিলানো যাবে কিন্তু কাজের লোক নয় । কাজ করতে মার আপত্তি নেই, কিন্তু একজন মানুষ কতক্ষণ একা একা কাটাতে পারে! অন্তত কথা বলার জন্য একজন মানুষ তো দরকার । একটু মান-অভিমান, একটু সুখ-দুঃখের কথা বলা, একটু রাগ ঝাড়া, একটু বকাবকি করা, কিংবা একটু মন খুলে মধুর ঝগড়া করা—এগুলো করার জন্য অন্তত একজন কেউ তো পাশে থাকতে হবে । মার ক্ষেত্রে এসব জটিল এবং চিকন মনোস্তাত্ত্বিক অভাবগুলো দক্ষতার সাথে পূরণ করেছিল মিনটিই ।
মা ফ্রিজ খুললে মার পাশে গিয়ে লেজ বুলায় এবং মিঞ মিঞ করে খাবারের আবেদন জানায় । কারণ সে জানে ফ্রিজ হচ্ছে এমন একটি রঙিন ও শীতলবাক্স যেটা খুললে খাবার বের হয় । তখন মা একখানা বকা দিয়ে বলে— “তোর শুধু রাতদিন খাইখাই করা। কাজকর্ম কিছু আছে তোর?”
ঈশ্বর জানেন যে এই শ্লেষমাখা বাক্যটি মিনটি একটুও বুঝেছে কিনা! কিংবা এই বাক্যটির যে অন্তর্গত উত্তাপ তা মিনটিকে একটুও স্পর্শ করেছে কিনা । কিন্তু মার দৃঢ় বিশ্বাস তার প্রত্যেকটি কথা শব্দ-শব্দান্তরে মিনটি বুঝতে পারে । তারও মানসিক ও শারীরিক ব্যথা-বেদন আছে । তারও আছে পরিশীলিত চিন্তাচেতনা । সে শুধু কথা বলতে পারে না—এইটুকু বিধাতার দেওয়া পক্ষপাতিত্বমূলক অপারগতা । মা প্রায়ই মিনটিকে উদ্দেশ্য করে বলে, “কথা বলতে পারলে তোকে সেজো বউয়ের পাঠশালায় ভর্তি করে দিতাম” ।
আমি যখন ঢাকা থেকে মার কাছে ফোন করি তখন মা হয়তো কিচেনে রান্না করছে । মোবাইলটা বেডরুমে বালিশের কাছে বাজছে । তখন মিনটি এক দৌড়ে মাকে ডাকতে যায় । ডাকার পদ্ধতি হলো—কাছে গিয়ে শাড়িতে সামনের পা দিয়ে মৃদু থাবা দিবে, মিঞ মিঞ করবে আর সামনের দিকে দৌড়ে যাবে, আবার ফিরে আসবে মার কাছে, আবার যাবে । তখন মা বুঝবে ওর গতির দিকে যেতে হবে । ওকে অনুসরণ করে মা দেখতো মোবাইলটা বাজছে । তার ডাকার এই পদ্ধতির সাথে মা এখন খুবই পরিচিত । এই পদ্ধতিতে একবার সে মাকে রাস্তায় ইলিশ মাছ বিক্রেতার কাছে নিয়ে গিয়েছিল । তখন মা ঘরে ফিরে এসে টাকা নিয়ে ওকে ইলিশ মাছ কিনে দিয়েছিল । মা বুঝেছিল ইলিশ মাছের ঘ্রাণ মিনটিকে অস্থির করে দিয়েছে । হয়তো তার খুব ইলিশ মাছ খেতে ইচ্ছে করছে । মা আর মিনটির মধ্যে অনেক পারিবারিক কথোপকথন হয়—একজন আক্ষরিক বাংলা ভাষায় এবং অন্যজন কিছু শব্দ ও আকার-ইঙ্গিতে প্রকাশ করে । ভাষা যাই হোক, দু’জন দু’জনকে বুঝতে পারে এবং বোঝাতে পারে এটাই বড় কথা । এভাবে সমস্তপ্রকার আক্ষরিক ভাষাকে দূর-ছাই করে তাদের নিজেদের মতো করে মনের ভাব ব্যক্ত করে অনায়াসে, এটাই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ।
মিনটি স্বাস্থ্যবতী যুবতী বিড়াল । তার গায়ের রঙ সাদার মাঝে এলোমেলোভাবে কমলা ও হালকা ধূসর রঙের ছোপ দেওয়া । স্বভাব ভীরু টাইপের । প্রভুভক্ত, বুদ্ধিমতী এবং শিকারি । পাশের বাড়ির হুলো বেড়ালে তাড়া করলে সে এক দৌড়ে মার কাছে চলে আসে । কারণ সে জানে এখানে একজন মানুষ আছে যে তাকে সবরকম বিপদ থেকে রক্ষা করবে । কোনো মেনি বিড়ালের সাথে ঝগড়া হলে কেমন এক কান্নার মতো সুর বের করে । হতে পারে এটা তাদের প্রতিবাদ করার সামাজিক কোনো বিধান, যেমন মানুষ আন্দোলন করার সময় স্লোগান দেয় ।
মিনটির শিকার করার দক্ষতা নিয়ে মার সাথে আমারও খুব উচ্চ ধারণা । কারণ সেই আস্থা সে নিজেই অর্জন করেছে । সে জানে এই বাড়িতে মা একা থাকে । সুতরাং তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তারই । গত বর্ষাকালের কোনো এক বিকেলে একটা বিষধর সাপ উঠান থেকে ঘরের ভিতর প্রবেশ করতে যাচ্ছিল । মিনটি সাথে সাথে তাকে আটকে দিল । তখন মা বাড়ির বাহিরে ছিল । বাড়ি ঢুকে মা দেখতে পায়—মিনটি বারান্দায় সূচালো চোখ নিয়ে বসে আছে । তার সামনে একটা নাজেহাল সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে । পরে মা লোক ডেকে সাপটা সরিয়ে ফেলে । মিনটি এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটিয়েছে । ধানের গোলা কিংবা ঘরে ইঁদুর আসলে রেহাই নেই, মিনটি সেটা ধরবেই! মিনটির দায়িত্ববোধ মাঝে মাঝে আমাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড়া করিয়ে দেয় ।
মানুষ মনে করে—কুকুর বিশ্বস্ত এবং বিড়াল স্বার্থপর প্রকৃতির হয় । হয়তো হয়, তবে এই ধারণাটি মিনটির ক্ষেত্রে অন্তত সত্য নয় । মিনটির খাওয়া-দাওয়া কম হলেও তার মধ্যে একটা জমিদারি ভাব আছে । ওর একটা প্লাস্টিকের বাটি আছে যার মধ্যে খাবার দিলে সে বুঝতে পারে এটা তাকে দেওয়া হয়েছে । শুধু ভাত দিলে সে খাবে না, অবশ্যই ভাতের সাথে মাছ বা মাছের কাঁটা থাকতে হবে, কিংবা দুধ থাকতে হবে । তা না হলে সে খাবেই না । মা তার এই জমিদারি খুশি মনে মেনে নেয় । মা ফ্রিজে মিনটির জন্য আলাদা করে মাছ ও দুধ রেখে দেয় । মার কিচেনে মেঝের উপর মাছ বা অন্যান্য খাবার রেখে পুকুর ঘাটে গেলে মিনটি তা পাহারা দেয় । বিড়ালকে মাছ পাহারা দিতে রাখতে আমি শুধু মাকেই দেখেছি ।
মা সকালে চা-বিস্কুট খেয়ে কাজ শুরু করে । একদিন সকালে মা বারান্দায় চেয়ারে বসে চা আর বিস্কুট খাচ্ছে । মিনটি সামনে মেঝের উপর বসে সামনের পা তুলে মিঞ মিঞ ভাষায় চা চাইতে লাগল । মা ছোট একটা টিনের প্লেট এনে চা ঢেলে দিল এবং একটা বিস্কুট দিল । তখন সে চুকচুক করে গরম চা ও বিস্কুট খেয়ে ফেলল । এটা পরে মিনটির নিত্যদিনের নাস্তার মেনু হয়ে দাঁড়িয়েছিল । মিনটির ঘুমানোর জায়গা হলো মার বিছানায় পায়ের কাছে মশারির বাহিরে । আমি ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরলে সে বিছানা চেঞ্জ করে আমার পায়ের কাছে মশারির বাহিরে এসে শুয়ে পড়ে । আমি কয়েকদিন ওর লোমশ গায়ে পা স্পর্শ করায় আচমকা কেঁপে উঠেছি ভয়ে । তখন ধমক দিয়ে বিছানা থেকে নামিয়ে দিয়েছি, কারণ ঘুমের ঘোরে ব্যাপারটা আরো ভয়াবহ কাণ্ডকারখানা হতে পারে । সে আমার সাথে বিবাদ না করে বিছানা ছেড়ে মার কাছে চলে যায় ।
ওর সাথে আমার যতই সম্পর্ক খারাপ হোক না কেন, আমার খাবার সময় ডাইনিং টেবিলের পাশে মেঝেতে বসে সামনের পা তুলে আমার কাছে খাবার চাইবে । তখন ওর কোনো লজ্জা-শরম থাকে না । আমি মাছের কাঁটা ওর প্লাস্টিকের বাটিতে দিতে দিতে বলি, “আমার ডাকে যে কোনো সাড়া দিস না, এখন আমার দেওয়া খাবার খেতে লজ্জা করছে না?”
সে আমার কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে খুশিমনে খাবারগুলো সাবাড় করতে থাকে । হয়তো ওর কাছে পেটের চেয়ে লজ্জা-শরমের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় অথবা আমার কথার ওর কাছে দুই পয়সার দাম নেই । একবার মা গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি তাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করাবো বলে মাকে আনতে বাড়ি গেলাম । মিনটির খুব মন খারাপ, মন খারাপ মারও । মিনটিকে কীভাবে বাড়িতে রেখে যাবে, সে কী খাবে—এসব নিয়ে মার দুশ্চিন্তার শেষ নেই । আমি একটা মধুর ঝামেলায় পড়লাম । সমাধান হলো—আমাদের জমির বর্গাদার রাজি হলো মিনটির সব দায়িত্ব নিতে । বাড়ি থেকে আসার সময় মিনটি অনেকদূর মার পিছে পিছে আসলো । তারপর মা নিষেধ করলে সে বাড়ি ফিরে গেল । আমি ঢাকা পৌঁছানোর দুই-তিন দিন পর মোবাইলে খবর নিয়েছিলাম—মিনটি সারাদিন বারান্দায় বসে থাকে । হয়তো অপেক্ষা করে কখন মা আসবে । একটা দিন শেষ হবার পর পরের দিন আবার অপেক্ষা করে—হতাশা, আবার অপেক্ষা করে আবার হতাশা । এভাবে চলতে থাকে । এসব শুনলে মার মন খারাপ হয়ে যায় । মা ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত মাখিয়ে নাড়াচাড়া করে । আমি বুঝতে পারি মিনটির জন্য মার ভেতরে তোলপাড় করে যাচ্ছে কষ্টে । আমি বলি, “মা বাড়ি যাবার সময় মিনটির জন্য ইলিশ মাছ কিনে দিব” । মা খুশি হয় । এরপর বর্গাদাররা দেখভালের সুবিধার জন্য মিনটিকে জোর করে ধরে বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে বাড়ি নিয়ে যায় । কারণ ভরা বৃষ্টির মৌসুমে তিনবার গ্রামের কাদাপথ ভেঙে মিনটির খাবার দিতে আসা যথেষ্ট ঝামেলার । কিছুদিন পর খবর আসে মিনটি খাওয়া-দাওয়া ভাল করছে না—স্বাস্থ্য ভেঙে হাড়-জিরজিরে হয়ে গেছে । মার মনটা একটা আচ্ছামতো ধাক্কা খায়, ভীষণ মন খারাপ তার ।
ইতিমধ্যে মার ডাক্তার দেখানো শেষ এবং বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছে । মা মিনটির জন্য দুটো ইলিশ মাছ কেটে নিয়ে গেল কৌটার মধ্যে করে । একটা ছোট চতুষ্পদ পশু কতটা আবদার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে এবং একজন মানুষ তার আবদার পূরণের জন্য সাধ্যমতো হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে তা মা এবং মিনটির কাণ্ডকারখানা দেখলে অনুমান করা যেতে পারে । মা বাড়ি গেলে মিনটিকে বর্গাদারদের বাড়ি থেকে আনা হলো । প্রথম দর্শনে সে ছিটকে দূরে চলে গেল । তারপর শঙ্কা ও দ্বিধায় কিছুক্ষণ কেটে গেল—কারণ মানুষের যা পাশবিক ব্যবহার তাতে পশুদের পক্ষে সরলভাবে বিশ্বাস করা কষ্টকর । ধীরে ধীরে মার কণ্ঠস্বর দূর থেকে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে তবে মার কাছে আসলো! মিনটির কোনো মান-অভিমান নেই, কোনো ইগো নেই—সে বাড়িতে এসেই তার দায়িত্ব পালন করতে শুরু করে দিল । মানুষ হলে হয়তো এতদিন ছেড়ে থাকার অপরাধে মার সাথে একপ্রস্থ তুমুল ঝগড়া করে ফেলতো । মিনটি তা করেনি অথবা পশুদের অভিমান প্রশমনের পদ্ধতি আলাদা ।
এর কিছুদিন পর ঢাকা থেকে মোবাইলে মার কাছে খবর পেলাম—মিনটির দুটো বাচ্চা হয়েছে । আমি মজা করে মাকে বললাম— “তুমি তো ঠাকুরমা হয়ে গেলে” । মা একটা অকৃত্রিম তৃপ্তির হাসি দিল । আরো কিছুদিন পর মা ধরা গলায় জানালো—মিনটির বাচ্চা দুটো মারা গেছে । এরপর মিনটি দুইদিন ওই প্রসবের জায়গা থেকে নড়েনি । ওর মনে হয়তো ক্ষীণতম আশা ছিল—কখনো হয়তো বাচ্চা দুটো তার কাছে ফিরে আসবে । সুতরাং তাকে এখানেই অপেক্ষা করতে হবে । মিনটির মাতৃত্ব অবুঝ । মিনটি জানে না—যে যায় সে আর ফিরে আসে না । জগতে ছেড়ে যাবার নিয়ম এমনই কঠিন! মা ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি । ডাক্তার বলেছেন—অপরিণত বাচ্চা দুটো চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল । ঠিক একবছর পর মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে । আমি যথারীতি বাড়িতে যাই মাকে ঢাকা নিয়ে আসবো বলে । আসার দিন মা বলল, “মিনটির মনটা গতকাল থেকে খুব খারাপ। তাকিয়ে দ্যাখ ওর মুখের দিকে” ।
আমি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম, কিন্তু কোনো দুঃখ বা সুখের বিশেষ কিছু পার্থক্য দেখতে পেলাম না । আমার মনে হলো—এসব মার মনের ভ্রম । একসাথে থাকার ফলে মনের মধ্যে এমন ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে । কিছুক্ষণ পর আমি আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম । মা তার ঢাকায় আসার চূড়ান্ত গোছগাছ করে নিচ্ছে । মিনটি আমাদের গোছানো ব্যাগগুলির দিকে একদৃষ্টে বিষণ্ণভাবে তাকিয়ে আছে । আমার ভেতরটা হু-হু করে উঠলো এবং শেষপর্যন্ত আমারও মনে হলো মিনটির মন খারাপ । হয়তো ওর মনে হচ্ছিল—মানুষরা এত পাষাণ কেন? আচ্ছা, ও কি কোনো বিশেষ সেন্স দিয়ে বুঝতে পারছে যে এই দেখাটা শেষ দেখা হয়ে যাচ্ছে? কিংবা ও কি কোনো আভাস পাচ্ছে গতবারের চেয়ে ভিন্ন কিছু ঘটতে যাচ্ছে? মা মাঝে মাঝে অকারণেই মিনটিকে ডাকছে, আবার কখনো এই বাড়ির দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে । “কোনো ইঁদুর কিংবা কোনো সাপ যেন বাড়িতে না ঢোকে। ধানের গোলা পাহারা দিস! বর্গাদাররা যে খাবার দিবে ওটাই খেয়ে নিস! বেশী ঝামেলা করবি না।”—এই জাতীয় অনেক উপদেশ । আমরা আসার সময় মিনটি বারান্দায় বসে থাকে । তাকিয়ে তাকিয়ে আমাদের চলে আসা দ্যাখে । সেই দৃষ্টির মধ্যে কী একটা লুকানো ছিল যে আমার ভেতরটা নিঃসঙ্গ খোলা মাঠের মতো ফাঁকা করে দেয়, কিংবা বলা যায় আমার ভেতরটা ফুটো করে আমূল বিদ্ধ করে দেয় । আমি সকালের ঝকঝকে আলোয় দেখলাম, মার বয়স্ক চোখ দুটো ছলছল করছে ।
ঢাকায় এসে আমি মোবাইল করে জানতে পারলাম মিনটি সারাদিন বারান্দায় বসে থাকে । তাকে ধরে আনতে গেলে সে দৌড়ে পালায় । এরপর একদিন কায়দা করে ধরে বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে বর্গাদাররা বাড়িতে নিয়ে যায় । সেখানে মিনটির যত্নের কোনো ত্রুটি নেই । বর্গাদারদের বাড়িতে একদিন পড়ন্ত দুপুরবেলা হঠাৎ একটা হুলো বিড়াল মিনটিকে তাড়া করে পাশের বাড়ির দিকে নিয়ে যায় । এরপর আর মিনটিকে খুঁজে পাওয়া যায় না । পরে জানা যায় একটা বিড়াল অন্য একটি বিড়ালের তাড়া খেয়ে পুকুরপাড়ের একটা গাছে চড়ে বসে । সেখানে আবার তাড়া খেয়ে ভার সামলাতে না পেরে পুকুরে পড়ে যায় । তার কিছুদিন পর সেই পুকুরপাড়ে একটা বিড়ালের মৃতদেহ পাওয়া যায়! অজস্র মাছি ভনভন করছে সেই মৃতদেহের উপর!






