তখন আমার বয়স ষোলর কাছাকাছি হবে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা দিব— ভাবসাবই আলাদা। আমি ক্লাশে ফার্স্ট হতাম, তাই আমার মধ্যে কোথায় যেন একটু অহংকারও কাজ করতো। ক্লাশের এমন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না যেটা আমার মতামতের বাইরে গিয়ে হতো। কো-এডুকেশনের আলাদা একটা বিউটি হলো মেয়েরা পড়া না পারলে পচানি দেওয়া যায়, আবার ছেলেরা পড়া না পারলে মান-সম্মান সব শেষ। যেহেতু আমি ক্লাশে ফার্স্ট হতাম তাই আমার জন্য দ্বিতীয়টির ঝুঁকি কম ছিল। তবুও অন্য ছেলেরা পড়া না পারলে ছেলে হিসাবে গায় তো পড়তোই। কারণ মেয়েরা পচানি দেওয়ার সময় তো পুরো ছেলেদের গুষ্ঠিসুদ্ধ দিত। মেয়েদের পচানি ছেলে হিসাবে কাঁহাতক সহ্য করা যায়! তখন বুঝতাম না, মানুষ কেন যে শ্রেষ্ঠত্ব চায়, যেখানে অনিবার্য মৃত্যু এসে ধুয়ে সাফ করে দিয়ে যাবে। তখন আমরা ছেলে-মেয়ে জেন্ডারভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে কী দৌড়! ক্লাশে প্লেস নেওয়া নিয়ে সেকি প্রতিযোগিতা!
আমাদের সময় স্যার ক্লাশ নিয়ে অফিসে চলে গেলে মেয়েরা ক্লাশে বই ও ব্যাগ রেখে কমনরুমে চলে যেত। আবার স্যার আসার সময় স্যারের পিছে পিছে দলবেঁধে ক্লাশে ঢুকতো। আমাদের ক্লাশের সবচেয়ে সুন্দরী আর স্মার্ট মেয়ে ছিল মনীষা। গানবাজনা, নাটক এসবে মনীষা বরাবর এগিয়ে থাকতো। ওই বয়সেই শুধু চোখের ধর্ম দিয়েই বুঝেছিলাম মনীষা একটা চরম বৈভব, একটা রঙিন ডানার প্রজাপতি এবং ঝিরিঝিরি হাওয়ার প্রান্তর। মনীষার সাথে আমার প্রেম-ট্রেম কিছু ছিল না। তবে ওকে ভাল লাগত, কেমন যেন একটু ঘোরের মতো— একপ্রকার ভ্রম। মাঝে মাঝে উপরের ক্লাশ থেকে ওর সাথে টাঙ্কি মারতে আসতো। আমি কটমট করে বলতাম, চোখ ফুটো করে দিব কিন্তু। আচ্ছা, এটা কেন বলতাম? মনীষা আমার কে হয়!
হঠাৎ একদিন টিফিন পিরিয়ডে আমার মাথায় একটা দুষ্ট-বুদ্ধি খেলে গেল। সাথে আর দু’জন বন্ধুকে নিলাম। বললাম, চল মনীষার ব্যাগটা চেক করি। ওর ব্যাগে ক্যাডবেরি বা ভালো ব্রান্ডের কোনো চকোলেট থাকতে পারে। তুমি বড়লোকের মেয়ে বলে একা খাবে নাকি! আমাদের ট্যাক্স দিবা না তা কী করে হয়! আমার সাথের বন্ধু দুটো হি-হি করে হেসে রিপিট করল— ‘তা কী করে হয়!’ যেই প্ল্যান সেই বাস্তবায়ন। আমরা মনীষার স্কুল ব্যাগের চেইন খুলতেই যা যা পেলাম— পুরো যাদুর বাক্স! ওমাই গড, কী নেই সেখানে! ছোট আয়না, লিপিস্টিক থেকে শুরু করে আরো অনেক কিছু। একটা সেনসিটিভ জিনিসও পাওয়া গেল। সেই ফর্দটা এখানে আর লম্বা না করাই ভালো। তবে আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে কোনো রকমের চকোলেট পাওয়া গেল না। আমরা খুব হতাশ হয়ে ব্যাগের চেইন বন্ধ করে নিজেদের বেঞ্চে এসে বসলাম।
এই খবরটা কিভাবে কিভাবে যেন মনীষার কানে চলে গেল। এরপর অংকের ক্লাশ। অংক স্যার ক্লাশে এসে বই চেয়ে নিয়ে চ্যাপ্টার খুঁজে বের করে অংক কষতে দেবেন ঠিক এই মুহূর্তে মনীষা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, স্যার আমাদের অবর্তমানে ছেলেরা আমার ব্যাগ খুলেছে। এরপর স্যার পড়ানোর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করলেন— কে করেছো এই কাজ? স্বীকার করো নইলে পিঠের ছাল ছাড়িয়ে নিব সবার। আমি ন্যায্যত ভাবলাম, আমার জন্য সবাই কেন কষ্ট পাবে। আমি দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বললাম, আমি করেছি। তখনো স্কুলে বেতের সংস্কৃতি পুরোদমে বিদ্যমান। স্যার দপ্তরিকে ডেকে জোড়া বেত আনালেন। আমাকে ডেকে স্যারের সামনে ব্ল্যাকবোর্ডের পাশে দাঁড় করালেন। এরপর এমন শাসানি দিয়ে বললেন, মেয়েদের অবর্তমানে তাদের ব্যাগ খোলা অভদ্রতা এটা জানো না? এটা বলেই আমাকে আচ্ছামতো বেত্রাঘাত করলেন। চরম ধোলাই। আমি একপ্রকার নীরবে দাঁড়িয়েই মার খেলাম।
স্যারের মারের চোটে আমার শার্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং আমার পিঠ কেটে রক্ত পড়ছিল। আমি দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট সহ্য করছিলাম। আমার সহ্যসীমা প্রায় অতিক্রম করে যাচ্ছিল। মারতে মারতে আমি মেঝের উপর পড়ে গেলাম, ঠিক তখনই সবার চোখকে ছানাবড়া করে মনীষা দৌড়ে গিয়ে স্যারের পা জড়িয়ে ধরলো।
স্যারের মূল বক্তব্য হলো, দু’দিন বাদে তোমরা এসএসসি পরীক্ষা পাস করে কলেজে যাবে। সেখানে অবাধ স্বাধীনতা। সেখানে গিয়ে তোমরা আরো অপরাধ করলে কলেজের স্যাররা বলবে, এসব ছেলেমেয়েদের স্কুলের স্যাররা কিছুই শিক্ষা দেননি। কতবড় অপবাদ আমাদের জন্য বুঝতে পারছো? এটা বলে স্যার একটা বড় চিৎকার দিলেন। আমি ভেবেছিলাম এটা আর এত-কি অপরাধ, স্যার হয়তো উপদেশ দিয়ে ছেড়ে দিবেন। কিন্তু ব্যাপারটা অন্যদিকে গড়ালো। এরপরও এটা দু’চার ঘা বেতের বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না। স্যার মারতেই থাকলেন, আর তখন মনীষা কাতর গলায় বারবার বলছিল— স্যার আমার ব্যাগ থেকে কিছু হারানো যায়নি, সব ঠিক আছে। এরকম বারবার বলার মানে হলো ওর খারাপ লাগছিল আমাকে এরকম মারতে দেখে। ওর মনে হচ্ছিল এটা লঘু পাপে গুরুদণ্ড হয়ে যাচ্ছে। হলেও হতে পারে অন্যকোনো মেয়ে ভাবতে পারে যাক পড়ালেখা নিয়ে তো পচানি দেওয়া যায় না ওকে— আজ পালের গোদা ধরা পড়েছে। একবারে ফান্দে পড়েছে বগা। স্যারের মারের চোটে আমার শার্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং আমার পিঠ কেটে রক্ত পড়ছিল। আমি দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট সহ্য করছিলাম। আমার সহ্যসীমা প্রায় অতিক্রম করে যাচ্ছিল। মারতে মারতে আমি মেঝের উপর পড়ে গেলাম, ঠিক তখনই সবার চোখকে ছানাবড়া করে মনীষা দৌড়ে গিয়ে স্যারের পা জড়িয়ে ধরলো। মনীষা করুণ স্বরে বলল, স্যার ছেড়ে দিন ওকে। স্যার মার থামালেন এবং চিৎকার করে বললেন, অভদ্রতার কোনো ক্ষমা নেই। তাহলে অভদ্র জাতি গঠিত হবে। ওকে মারলাম বটে! শিক্ষাটা তোমাদের সবার জন্য। এই বাক্যগুলো বলে স্যার ঝড়ের মতো ক্লাশ থেকে বের হয়ে গেলেন। কারণ তখন আর পড়ানোর মতো পরিবেশ ছিল না। পুরো ক্লাশটা স্তব্ধ হয়ে আছে। সব ছেলেরা মেয়েদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কোনো কোনো মেয়ে আবার মনীষাকে বলল, তুই এই নালিশটা নাও করতে পারতিস। তোর তো কিছু হারানো যায়নি! আমি ছেলেদের নিরস্ত করলাম। ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে হয়তো সেও ভাবেনি। আমার মনে হয় সে এখন অনুতপ্ত। কেউ অনুতপ্ত হলে তাকে আর শাস্তি কেন? বললাম, তোরা আমাকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে চল। পিঠটা জ্বলে যাচ্ছে।
এরপর আমি বেশ কিছুদিন স্কুলে যাইনি। তারপর সরাসরি পরীক্ষার হলে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। কী জানি কোন রুমে মনীষার সিট পড়েছিল! একবার পরীক্ষা হলের গেটের বাইরে ভিড়ের মধ্যে দেখেছিলাম ওকে। আমার সাথে ওর আর খুব একটা মনে করার মতো দেখা হয়নি। এরপর প্রায় সতের বছর পর আমি ঢাকার ডমেস্টিক এয়ারপোর্টে টিকিট নিয়ে লাগেজ করে বসতে যাবো, হঠাৎ এক মাথায় টুপি ও চোখে রোদচশমা পরা তরুণী হাত উঁচু করে ডাকতে লাগল। আমি চরম অনিশ্চিতভাবে বললাম, আমাকে বলছেন? তরুণী সিট ছেড়ে আমার কাছে এসে বলল, আপনার নাম কি বিজয়? আমি বললাম, হ্যাঁ। সে ঢঙ করে বলল, আমি কী আপনাকে একটু তুমি বলতে পারি? আমি ট্যারাব্যাকা করে উত্তর দিলাম, মোটেও না। সে তার চোখ থেকে সানগ্লাস সরালো। মাথার টুপি খসালো। এরপর বলল, আমি মনীষা। তুমি এই দিবালোকে আমাকে চিনতে পারছো না? আমি বললাম, এই লাউঞ্জে অহেতুক সানগ্লাস আর টুপি পরে আছো। তার উপর তুমি তো জিনস্ পরতে, এখন শাড়ি পরে আছো। কিভাবে চিনবো তোমাকে? এবার আমি দার্শনিকের মতো বললাম, তাছাড়া মেয়েদেরকে কে কবে চিনতে পেরেছে? যদি কেউ বলেও চিনেছি, তবুও আমার সন্দেহ থেকে যাবে। এই বাক্যগুলোর মধ্যে মনীষা কি কোনো খোঁচা অনুভব করলো? মনীষা বলল, এবার অন্তত ‘তুমি’ বলার অনুমতি দাও। আমি হেসে বললাম, এখন তো ‘তুমি’ বলবে। তা না হলে আমি আবার মাইন্ড করবো। আমরা দু’জনে হেসে ফেললাম।
মনীষা প্রস্তাব দিল, চলো একটু বসে গল্প করি। আমার ফ্লাইট লেট আছে। আমি বললাম আমারও ফ্লাইট দেরিতে। যানজটের কথা ভেবে আমি একটু আগে এসেছি, আমার এক কলিগ আসবে। তারপর দু’জনে একসাথে ফ্লাই করবো। মনীষা আমার হাত ধরে নিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসালো। আমার কেন যেন অস্বস্তি লাগছে তবুও ওর ডাক অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ব্যক্তিগত পরিচয়, কেন আমি কক্সবাজার যাচ্ছি, কবে ফিরবো এসব আলোচনা হয়ে গেছে। হঠাৎ মনীষা প্রস্তাব দিলো, বিজয় আমি কি তোমার পিঠে একটু হাত দিতে পারি? এই লাউঞ্জে বসে এটা কী ধরনের প্রস্তাব? এটা শুনলে যে কারো গা ঘিনঘিন করার কথা। আমি খুব সামলে নিয়ে দুষ্টামি করে বললাম— পারো। পিঠই তো অন্য কোথাও হলে ঘোর আপত্তি করতাম। মনীষা এরকম চরম দুষ্টমিতেও কথা বাড়ালো না। এরমানে মনে মনে সে খুব সিরিয়াস। সে পরম মমতায় আমার পিঠের উপর হাত বোলাতে লাগল। আমার অস্বস্তি লাগছে তবুও চুপচাপ বসে থাকলাম। কিন্তু তাকে বলতে পারলাম না— সেই বেত্রাঘাতের ক্ষত কবে শুকিয়ে গেছে, এখন আর হাত বুলিয়ে কী হবে? তাকে বলতেই পারলাম না— এই হাত বোলানোয় অন্য কোথাও ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে।
মনীষা তাড়া দিল, কী হলো— ব্যাগের চেইনটা খুলে টিস্যু বের করো। পড়ে যাচ্ছে তো! আমি বললাম, না তোমার ব্যাগ খুলে আবার কোন বিপদে পড়ি!
হঠাৎ মনীষা প্রস্তাব দিল— চল, আইসক্রীম খাই। এটা বলেই সে উঠে গিয়ে পাশের বেকারি শপ থেকে দুটো আইসক্রীম নিয়ে এলো। দু’ হাতে দুটো আইসক্রীম আর তার একটা থেকে গলে পড়ছে। গলে পড়াটা নিজে একটা কামড় বসালো। মেখে গেল তার ঠোঁটে। বিদিকিচ্ছিরি আইসক্রীম অবস্থা! সে তাড়াতাড়ি তার ব্যাগের চেইন খুলে টিস্যু বের করে দিতে বলল। আমি ‘আচ্ছা’ বলে তার ব্যাগের চেইন খুলতে গিয়েও আটকে গেলাম। মনীষা তাড়া দিল, কী হলো— ব্যাগের চেইনটা খুলে টিস্যু বের করো। পড়ে যাচ্ছে তো! আমি বললাম, না তোমার ব্যাগ খুলে আবার কোন বিপদে পড়ি! আবার দেখা যাবে কী-সব বের হবে। তখন আবার… মনীষা মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল— তখন আবার কী! তুমি তো চরম দুষ্ট হইছো! আমিও ছাড়বার পাত্র নয়। আমি বললাম, এসব তো তুমিই শিখাইছো। ভেবে দ্যাখো— কে গুরু! মনীষা খিলখিল করে হেসে উঠল। একই সাথে এই সুনসান ওয়েটিং লাউঞ্জের বাতাসে একটা জোরদার ঢেউ খেলে গেল। আমরা দু’জন আইসক্রীম খাচ্ছি। একটা বাল্যকালীন দৃশ্য!
এবার মনীষা সিরিয়াসলি বলল, একটা প্রশ্ন করবো তোমাকে? আমি বললাম— কর। কিছু তো আর বাকি থাকছে না। ঘটা করে আর অনুমতি নিচ্ছ কেন? মনীষা বলল, সেনসিটিভ প্রশ্ন তাই! আচ্ছা, তুমি ওইদিন ক্লাশে আমার ব্যাগের চেইনটা খুলেছিলে কেন? কিছুই তো নাওনি। আমি হেসে সত্যি কারণটা বললাম— আমি ভেবেছিলাম তোমার ব্যাগে চকোলেট আছে। তোমার চকোলেট আমরা একটু খেলে দোষ কি? তাতে কি তোমার চকোলেট কম পড়বে? নাকি বন্ধুর চকোলেট বন্ধুরা খাবে এটা জগতে এই প্রথম! মনীষা হেসে গড়িয়ে পড়লো— দ্যাখো কী তুচ্ছ ব্যাপার! আর কতবড় শাস্তি হলো তোমার! জানো আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। তোমাকে একবার সরিও বলতে পারিনি, সেটা আরো কষ্টের ছিল। শুধু একটু শান্তি যে আমি স্যারকে শেষপর্যন্ত থামাতে পেরেছিলাম। আমি মনীষাকে বললাম, এবার তুমি বলতো— তোমার তো কিছুই হারায় নি, তবুও তুমি কেন স্যারকে নালিশ করলে? মনীষা জবাব দিল— আসলে আমার ব্যাগে একটা গোপনীয় জিনিস ছিল, যেটা তোমরা দেখে ফেলেছিলে। তোমরা ছেলেরা ওগুলো দেখবে কেন? সেই লজ্জা থেকে রাগ করে স্যারকে নালিশ করেছিলাম। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ভুলটা অনুভব করতে পেরেছিলাম। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। শেষমেশ আমি ছুটে গিয়ে স্যারের পা জড়িয়ে ধরলাম, তখন তুমি মাটিতে পড়ে গিয়েছিলে। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম তোমাদের বাড়িতে যেতে, কিন্তু তোমার মায়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস হয়নি। এরপর তুমি কলেজে গেলেও চেষ্টা করেছিলাম। এতবড় কলেজে হাজার হাজার ছেলেমেয়ের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়? আজ একটা সত্যি কথা বলবো— তুমি বিশ্বাস করবে? আগে বলো শুনে দেখি সেটা বিশ্বাসযোগ্য কিনা! প্রমিজ করলাম পরে দেখলাম একটা ডাহা মিছা কথা। মনীষা আমার মশকরা গায় মাখলো না। সে আবেগ নিয়ে বলল, ওই স্কুল থেকেই আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। তুমি কি বুঝতে পারতে? আমি বললাম— না, কখনো তো বলোনি! এমন একটা স্টাইল করতে কে বুঝবে তোমার মধ্যে ঝামেলা আছে! মনীষা অভিযোগ করে বলল, তুমি তো এক নম্বরের হাঁদারাম। বই ছাড়া আর কি তোমার মাথায় ঢুকেছে? চোখ শুধু বইয়ের দিকে। আশেপাশের দিকে একটু দৃষ্টিটা রাখতে হয়।
আমি বললাম ওটা বললে, আমার প্রতি অবিচার করা হবে। আমি কিন্তু ক্লাশের সব কিছুতেই থাকতাম। আমাকে ছাড়া ক্লাশে কোন সিদ্ধান্তটা হতো শুনি?
মনীষা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল, ওই বয়সে বলার সাহস পাইনি। আজ বললাম আর নিজেকে একটু হালকা করলাম। অনেকদিন পর আমার ভেতর থেকে একটা বড় বোঝা নেমে গেল। এরপর মনীষা বলল, এখন আমি একটা খাবারের প্রস্তাব দিব তুমি কিন্তু না বলতে পারবে না। আমি বললাম, আইসক্রীম তো তুমিই খাওয়ালে। তুমি যেটা বলছো আমি তো সেটাতেই রাজি হচ্ছি। জানিনা আজ আমাকে আরো কিসে কিসে রাজী হতে হবে। আমরা দু’জনেই হেসে ফেললাম। কারণ যা বলতে চেয়েছি শ্রোতা পুরোটাই বুঝে নিয়েছে, আর বক্তাতো বুঝেই বলেছে। আমি মনে মনে বললাম— যাও, আজকের এই সময়টা আমি তোমাকেই দিলাম।
চুপচাপ চোখ মুছে নিল। মানুষ অনুতাপ মুছে ফেলার সুযোগ পেলে মনে হয় এমনই ঘটে। পরিবেশটা ভারী হয়ে গেছে। হালকা করা দরকার। কিন্তু চেষ্টা করেও পারছি কই! কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটিয়ে দিলাম।
মনীষা উঠে গিয়ে সেই আইসক্রীমের দোকান থেকে ক্যাডবেরি চকোলেট কিনে আনল। আমার হতে দিয়ে বলল, আমার সামনে খাও। আমি বসে বসে দেখবো। আমি অনেকটা বোকার মতো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কেউ এটাকে ছেলেমানুষি বলতেই পারে, কিন্তু ওই মুহূর্তে আমি অন্তত ছেলেমানুষি বলতে পারিনি। ওর আবেগকে, ওর অনুশোচনাকে আমি সম্মান জানিয়েছিলাম। কারণ অনুশোচনা সর্বদা পবিত্র হয়। তা মানুষকে স্নানের অধিক ধুয়ে শুদ্ধ করে দেয়। আমি নিরুত্তর— চকোলেটের খোসা ছাড়িয়ে বাচ্চাদের মতো চকোলেট খেতে থাকলাম। আর মনীষা পরম তৃপ্তিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমি ওকে চকোলেট শেয়ার করতে বলিনি, কেননা আমার মনে হয়েছিল সে খেয়ে শান্তি পাবে না, যতটা সে দেখে পাবে। পেয়েছিলও। আমিও অনুভব করেছিলাম— ওর মুখে যে শান্তি আমি দেখেছিলাম তা আমিও খেয়ে পাইনি। খেতে খেতে আমি লক্ষ্য করলাম ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমার মনে হলো, সতের বছর পর আমার কোনো এক ক্ষতকে জড়িবুটি লাগিয়ে সেরে তুলছে নাকি নিজের মধ্যে যে ক্ষতটা গভীর হয়ে আছে সেটাকে উপশম করছে! আমি খাওয়া থামিয়ে বললাম— মনীষা, তুমি মন খারাপ করলে কিন্তু আমি খাব না। তা ছাড়া চারপাশে এত মানুষ, তারা কী ভাববে বলতো? সবাই মনে করবে আমি হয়তো তোমাকে কষ্ট দিয়েছি তাই তুমি কাঁদছো। অথবা মনে করবে তোমাকে চকোলেট খেতে দেইনি বলে তুমি কাঁদছো। মনীষা এরকম হাসির কথাতেও হাসলো না। আমার চেষ্টা ব্যর্থ হলো। সে কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ চোখ মুছে নিল। মানুষ অনুতাপ মুছে ফেলার সুযোগ পেলে মনে হয় এমনই ঘটে। পরিবেশটা ভারী হয়ে গেছে। হালকা করা দরকার। কিন্তু চেষ্টা করেও পারছি কই! কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটিয়ে দিলাম।
এরপর আমার সব অস্বস্তি কাটিয়ে নিরবতা ভেঙে মনীষা জিজ্ঞাসা করলো— তোমার সেই মাথাব্যথার একটা সমস্যা ছিল সেটা সেরে গেছে? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম— তোমার মনে আছে? ওটাতো প্রায়ই হতো না। অনেকদিন পর পর হতো। মনীষা বলল, ওই লো ফ্রিকোয়েন্সিটাও আমার মনে রাখার জন্য যথেষ্ট। আচ্ছা, তোমার বুকের বাম পাশে একটা কালো দাগ আছে— না? আমি প্রায় চমকে উঠে বললাম— তুমি কিভাবে জানো? মনীষা স্বাভাবিকভাবে জবাব দিল— তুমি পিকনিকে গিয়ে ফুটবল খেলার জন্য জার্সি পরছিলে, তখন দেখে ফেলেছিলাম। আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমি বললাম, তুমি আমার সম্পর্কে এত খবর রাখতে? মনীষা দৃঢ়তার সাথে জবাব দিল— হ্যাঁ। কেন তাতো বলেছি। আর দ্বিতীয়বার বলতে পারবো না।
আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। এই মেয়েটা আরো কী-কী বলে আমাকে অবাক করে দিবে কে জানে! ওকে তো আমারও ঘোরের মতো একটু ভালো লাগত সেটা কি আজ বলা ঠিক হবে? সাত-পাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম থাক! আজ ওর এতকিছু বলার পর আমারটা খুব হালকা শোনাবে। প্রশ্নে জড়ালে উত্তর দিতেও প্রবলেম হবে। ওকে খুব স্মার্ট আর ডানপিটে মেয়ে হিসাবে জানতাম। কিন্তু আজ মনে হলো ভেতরে ভেতরের মনীষা খুব নরম মনের মানুষ। জোয়ার-ভাটার নদীর চরে পড়ে থাকা পলির মতো নরম। এখন পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক। আমি পরিবেশটা আরো স্বাভাবিক করার জন্য বললাম— দ্যাখো, তুমি তো আমার কত দাগের কথা বললে। আমি কিন্তু তোমার কোনো দাগের কথা বলতে পারবো না। মনীষা ছোট্ট একটা আদর মাখা চড় মারলো আমার পিঠে, সেই চড়ে না আছে জোর না আছে ব্যথা। সেই চড়ের মধ্যে গাঁথা আছে অনেক কথা! সে হেসে বলল— চুপ করো। তুমি তো চরম দুষ্টু হইছো! তুমি তো আগে এরকম ছিলে না। তোমার এরকম অবনতি হলো কিভাবে? তোমার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে আমার এখন সন্দেহ হচ্ছে!
আমি হেসে বললাম— আসলে সেটার উৎস খুঁজলে তোমার কথাই বলতে হবে। তোমাকে অনুসন্ধান করতে যেয়েই আমার এই দুরবস্থা। মনীষা হেসে বলল, একদম মিথ্যা বলবে না। আমাকে আবার কী অনুসন্ধান করলে? আমি বললাম, আমি সরল মানুষ। সত্যি কথা বলে ফেলেছি। ওই যে ব্যাগের চেইন খুলে অনুসন্ধান…। আমি বিস্ময়ে হতবাক! মানুষ পরিণত হলে কতটা শিখে, যেমন আমি এতদিন পরে মনীষাকে শিখলাম। এবার মনীষা আমাকে তার ব্যাগটা দেখিয়ে বলল, তুমি এটা একটু দেখো তো। আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি। আমি মজা করে বললাম, কোন ভরসায় এগুলো রেখে যাচ্ছ? চুরি করে নিব কিন্তু! মনীষা হেসে বলল, চুরি করার পরীক্ষায় তুমি ফেল করেছিলে। সেজন্যই তো ভরসা করলাম। সেইদিন আমার ব্যাগের চেইন খুলেও কিছু নিতে পারোনি। আজ আর কী নেবে! কী আছে আমার! চেষ্টা করে দেখো আজও কিছু নিতে পারবে না। চুরি করে যারা নিতে পারে তাদের আমি ভালো করে চিনি। তুমি অন্তত সেই দলের নও। এতোগুলো কথা বলে সে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো। আমি বসে বসে মনীষার কথাগুলো তর্জমা করতে লাগলাম। কী বলে গেল সে আমাকে।
মনীষা ওয়াশরুম থেকে এসেই আমাকে প্রশ্ন করলো, আচ্ছা বলতো— উপরের ক্লাশ থেকে ছেলেরা কেউ আমার সাথে কথা বলতে আসলে তুমি অতো রেগে যেতে কেন? আমি মজা করে বললাম, ওয়াশরুম থেকে এইগুলো ভেবে এসেছো? একটা শান্তির জায়গাতে যেয়েও তোমার মনে এইসব জটিল প্রশ্ন? কী জানি কাজটা ফেলে এসেছো কিনা! মনীষা একটা পিঠে ঘা বসিয়ে দিয়ে বলল, যেটা বলছি সেটার উত্তর দাও। আমি দাপটের সাথে উত্তর দিলাম— সোজা ব্যাপার! ওইসব কথক এবং কথা কোনোটারই সৎ উদ্দেশ্যের ছিল না। এটা আমি বুঝতে পারতাম, তাই আমি রেগে যেতাম। যারা বুঝতো না তারা রাগ করতো না। যারা চোখ থেকেও দেখতে পেতো না তারা অন্ধ। ফরচুনেটলি আমি সেই দলের নই। আমার মনে আছে একবার তোমাকে নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারেও বাধা দিয়েছিলাম একজন সহপাঠি হিসাবে। কারণ ক্লাশের অনেক ভালোমন্দের সিদ্ধান্ত আমিই দিতাম। বদনাম হলে তো পুরো ক্লাশের হয়। আমরা ছেলেরা মাথা উঁচু করে হাঁটি কিভাবে! আশাকরি তোমার প্রশ্নের জবাব পেয়েছো। আমি সেই বাঁকা পথে না হেঁটে সোজা পথে হাঁটলাম যেটা মনীষা আশা করেনি।
একজন উড়াল নারীর মিষ্টি কণ্ঠের পেশাদারী অ্যানাউন্সমেন্ট ভেসে আসল হাওয়ায় এবং সাথে সাথে আমরা বুঝতে পারলাম মনীষার ফ্লাইট ছাড়বে অল্পকিছুক্ষণের মধ্যে। আমাকে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কেন জানিনা মনীষার আজকের এই চলে যাবার মুহূর্তটা কাছে এসে আমার মনটা ভারী হয়ে গেল। কষ্ট হচ্ছে কেন? আমার তো ওর সাথে ওইরকম কোনো সম্পর্ক ছিল বলে মনে পড়ছে না। মনীষা যাবার সময় উপদেশ দিতে শুরু করলো। এটা করবে না, সেটা করবে না। হাজার রকমের নিয়ম পালনের প্রতিশ্রুতি দিতে হলো। আমি সব হ্যাঁ বলেছি। ওর চোখ ছলছল করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মনীষা গেট দিয়ে বের হয়ে বাসের দিকে হাঁটতে থাকলো, যে বাসটা তাকে নিয়ে যাবে রানওয়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা প্লেনের কাছে। আমার বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। দূরে গিয়ে বাসে ওঠার আগে হাত নাড়ল মনীষা। আমি সিওর তখন ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।
