১.
সাত শতকের একটি ডোবা। এখন বিক্রির জন্য সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। জলপরি গ্রামের আমানুল্লাহ পৈতৃক সূত্রে এই ডোবার মালিক। টিনের বেড়া দেয়া বসতবাড়ির পেছনেই এই সাত শতকের ডোবা। আমানুল্লাহ রাজধানী ঢাকায় স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করেন। উত্তরাধিকারদের ভবিষ্যত চিন্তায় পৈতৃক জমিজমা বিক্রি করে, নিজের জমানো টাকা শেষ করে ছোটো একটি খুপরি ফ্ল্যাটের বুকিং দিয়েছেন নতুন গড়ে ওঠা শহর উত্তরার শেষ সীমানায়। এখন তার শেষ চালানটুকু দিতে তাকে এই ডোবা বিক্রি করতে হচ্ছে।
কিন্তু আশায় গুড়ে বালি। বিক্রির কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। সবকিছু ছেড়েছুড়ে গ্রামেই পড়ে আছেন আমানুল্লাহ ডোবা বিক্রির আশায়। ভোরবেলায় ফজরের নামাজের পড়ে একবার সে ডোবার ধারে গিয়ে দাঁড়ান। কীভাবে এত ডোবা হলো! জ্ঞাতিগুষ্টিরা নিজেদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে মাটি কেটে কেটে এই গর্ত ডোবায় পরিণত করেছে। এমন ধারণা থাকলেও এ এক বিস্ময়কর ডোবা। পূর্ণিমার আলোয় ডোবার পাড়ে গিয়ে বুঝার চেষ্টা করেন আমানুল্লাহ। চারদিকের নারকেল-সুপারি-কাঁঠাল গাছের পাতা পড়ে ডোবার পানি কেমন ক্লিশে দেখায়, অথচ স্বচ্ছতা বজায় রেখেছে আজও। অদ্ভুত এক গহীন গুড়গুড় শব্দ ভেসে আসে ডোবার তলদেশ থেকে। ঢিল ছুড়লে পানির বৃত্তাকার অংশ ধীরে ধীরে যেমন দূরে মিলিয়ে যায়, তেমন কিছু একটা লক্ষ করেন আমানুল্লাহ। চারপাশে নিস্তব্ধ নীরবতা। কাউকেই খুঁজে পেলেন না তিনি। হাতঘড়িতে সময় দেখে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা স্থির হয়ে আছে যেন! উপরের দিকে তাকিয়ে দেখেন আকাশে পূর্ণিমার গোলচাঁদ হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে তাকে। বেশিক্ষণ আর দাঁড়ান না আমানুল্লাহ। চলে আসেন ঘরের মধ্যে। পিতার রেখে যাওয়া পুরানো ফাইলপত্র ঘাঁটতে শুরু করেন। জমি বিক্রি করতে ওই সাত শতকের দলিল-দস্তাবেজ কিছু তো লাগবে। শুধু আরএস খতিয়ান কিংবা মিউটেশনের কাগজ দিয়ে কাজ হবে হয়তো, কিন্তু ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হবে অনেক। বেশ কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটির পরে ক্লান্তি ভর করে শরীরে। দক্ষিণের জানালাটা খুলে তার পাশে রাখা খাটে শুয়ে পড়েন আমানুল্লাহ।
২.
পূর্ণিমার আলো অন্ধকার ঘরটাতে আলোআঁধারির খেলা শুরু করে। আমানুল্লাহ আধো ঘুম আধো চেতনার মাঝে তালগোল পাকানো উদ্ভট স্বপ্নে বিভোর তখন। তার মনে হচ্ছে, হাতে চুড়ি ও পায়ে নূপুর পরিহিত লালপাড় শাদা শাড়ি পরনে এক চল্লিশ ছুঁই ছুঁই রমণী ঘরের বারান্দা দিয়ে ছুটোছুটি করছে। সেই ছায়ামূর্তি খোলা জানালায় ধরা পড়ছে যেন। এবার তন্দ্রা ছুটে চোখ মেলে তাকান আমানুল্লাহ। ঘন ঘন শ্বস পড়ছে তার। ভয় পেয়েছেন কিছুটা। শুয়ে শুয়েই দোয়াদরুদ যা মনে আসছে তাই পড়ছেন। শুনেছেন তার দাদার সঙ্গে জিন থাকতো। অবশ্য ভালো জিন। তাদের নাম ছিল ‘সালাম’ ও ‘আসলাম’। আমানুল্লাহ জেনেছেন পরহেজগার দাদার মৃত্যুর সময় তারা কথা দিয়েছে— এ বংশের কারো ক্ষতি তারা করবে না। সেই ভরসাটুকু সঙ্গী করে ঘরের আলো জ্বেলে দরজা খুলে দাঁড়ান আমানুল্লাহ। বারান্দায় কেউ নেই। কিন্তু টিনের বেড়ার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া পথে চুড়ি ও নূপুরের শব্দ শোনা যায়। আমানুল্লাহ মোবাইলের আলো জ্বেলে পথে নামেন।
আমানুল্লাহ যত এগিয়ে যান চুড়ি ও নূপুরের শব্দ তত দূরতর হয়। তার বসতবাড়ির টিনের বেড়ার সীমানা শেষ করে ডোবার ধারে এসে দাঁড়াতেই ওই শব্দ যেন মিলিয়ে যায়। টুপ করে একটা ঢেউ খেলে ডোবার পানিতে। মনে হলো কেউ যেন এইমাত্র ডুব দিলো। আমানুল্লাহ আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন তখনও পূর্ণিমার গোল চাঁদ তার দিকে তাকিয়ে একইভাবে হাসছে। এই ডোবার ওপাড়েই বিশাল ঘন বাঁশঝাড়। দাদা-পরদাদাদের আমল থেকে চলে আসা এই ঘন বাঁশবাগান এখন পৈতৃক সূত্রে আমানুল্লাহর কাঁধে এসে পড়েছে। ওদিকে চোখ পড়তেই আমানুল্লাহ দেখেন অসম্ভব নিঃসঙ্গতা সেখানে। একটা শীতল বাতাস সেখান থেকে এসে তাকে কাঁপিয়ে দেয়। তার সারা শরীর যেন এই আরামদায়ক বাতাস শুষে নিতে চায়। ভালকো বাঁশ, তরলা ও জাওয়া বাঁশ— সব ধরনের বাঁশের ঘন জঙ্গলে চোখ আটকে যায় আমানুল্লাহর।
হিন্দু-মুসলমান— সব ধর্মের লোকই আমানুল্লাহর পূর্বপুরুষদের সমীহ করে থাকে। তার কিছুটা তিনি দেখেছেন তার দাদা মৌলভী জাফরুল্লাহর ভেতরে। মৃত্যুর সময় কবরে নামাতে পারেনি মৌলভী জাফরুল্লাহর নিজের ছেলেরা। পাড়াপ্রতিবেশী, দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা জাফরুল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়া মানুষেরা সেদিন মৌলভী জাফরুল্লাহকে কবরে শুইয়ে দেয়। জলপরি গাঁয়ের একমাত্র কবরস্থান সংলগ্ন এতিমখানা ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শোনা যে, এখনও রোজ ফজর ও মাগরেবের সময় মৌলভী জাফরুল্লাহর কবর থেকে সারা কবরস্থানে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু ধর্মের লোকজনও আমানুল্লাহকে বলে, খাঁটি কামেল লোক ছিলেন তোমার দাদা। এরকম শুনতে আমানুল্লাহরও ভালো লাগে। একটা খানদানি বংশধারা তিনি বহন করতে পারছেন, এটাই-বা কম কী!
মৌলভী জাফরুল্লাহর মৃত্যুর পর এই বিশাল সম্পত্তি তাঁর ওয়ারিসদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু তারপরও যেটুকু আমানুল্লাহর বাবার অংশে আছে, তাও কম নয়। বিশাল আম-কাঁঠালের বাগিচা, নারকেল-সুপারি, এই বাঁশঝাড় সবকিছু এখনও চলতি পথের মানুষজনের কাছে এক অনাবিষ্কৃত বিস্ময় হয়ে ধরা দেয়। অজয় মুচির কাছ থেকে জানা তার পূর্বসূরিরা আমানুল্লাহর পরদাদাদের আমল থেকে তাদের ভুঁইতে কাজ করতো। আগেকার মানুষজনের অনেক ছেলে-মেয়ে হতো। কিন্তু কার কখন জন্ম, সে-সব হিশেব তাদের জানা ছিল না। কিন্তু আমানুল্লাহদের বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে সে হিশেব মিলে যেত। অজয় মুচি বলে, কে কবে হয়েছে, কার কত বয়স কেউ সঠিক ভাবে বলতে পারতো না। যে বলতে পারে সে ওই বাঁশঝাড়, তার তো জবান নেই। অথচ ওর গায়ে দায়ের কোপ দেখলে বলতে পারতাম এ বছর কার ঘরে কয়টা সন্তান জন্ম নিছে।
আমানুল্লাহ ছোটো মানুষ। তার এ কথায় অবাক হয়। সাথে সাথে খুঁজতে থাকে ভালকো আর তরলা বাঁশের গায়ে প্রাচীন দায়ের কোপ। বাঁশঝাড় থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস আবার কাঁপিয়ে দেয় আমানুল্লাহকে। লক্ষ করেন, ঘন বাঁশবাগান একদিকে হেলে পড়তে চাচ্ছে। আসলেই কী হেলে পড়ছে, না তার দৃষ্টির ভ্রম? বুঝার চেষ্টা করেন আমানুল্লাহ। তখনই লক্ষ করেন আবার ডোবার পানিতে ভুরভুরি কাটার শব্দ। কোনোরকম চিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তায় মানুষের কপালে ভাঁজ পড়ে। আমানুল্লাহ নিজের কপালেও হাত দিয়ে বুঝার চেষ্টা করেন তেমন কোনো ভাঁজ স্পষ্ট হয়েছে কি না। জমিজমা, ক্ষেতখামারও তেমনি; মানুষের ভোগ মেটাতে তার কপালেও ভাঁজ পড়ে। আমানুল্লাহ ভাবেন, তার সঙ্গে সাত শতক ডোবার এই যে লুকোচুরি খেলা, নিশ্চয়ই ডোবা বিক্রির খবর তাকেও দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। তার কপালেও ভাঁজ ফেলেছে। আমানুল্লাহ আর দাঁড়ান না। ধীর পায়ে ঘরের দিকে হেঁটে চলেন।
৩.
আজও দক্ষিণের জানালা খুলে ঘরের হলুদ আলোর নিচে বাপদাদার জমিজমার পুরানো ফাইলপত্র খুলে নিয়ে বসেছেন আমানুল্লাহ। মাঝে মাঝে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করছেন পূর্ণিমার ঝলকানি। মাসের ১৫ দিন অমাবস্যা আর ১৫ দিন পূর্ণিমা। সবে শুরু। সুতরাং থাকবে কিছুদিন। বাইরে থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে। টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা বসতবাড়ির চৌহদ্দির ভেতরে আছে কিছু নারকেল-সুপারি গাছসহ একটি কাঁঠাল ও লিচু গাছ আর কয়েকটি বড়ো, বেশ মোটাসোটা মেহগনি গাছ। ভেতরের আঙিনায় আরও আছে একটি তেজপাতা গাছ, বড়ো লেবু গাছ। তেজপাতা আর লেবু গাছের মাঝে বড়ো শান বাঁধানো ইঁদারা। বাইরে থেকে আসা মিষ্টি গন্ধ আমানুল্লাহর মনে হচ্ছে তেজপাতা গাছের।
হঠাৎ আমানুল্লাহ টের পান ইঁদারার পাড়ে কেউ যেন পানি তুলছে। আবার সপাসপ পানি ঢালার শব্দ। আমানুল্লাহ জানালায় উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। ঝকঝকে গোল চাঁদের আলোয় যেটুকু চোখ যায়, তাতে তার গা ছমছম করে ওঠে। কোনো এক রমণী গোসল করছে বলে মেন হয়। আমানুল্লাহ ডাকেন, কে? কে ওখানে? তার কয়েকবার ডাকাডাকির পর উত্তর এলো, আহ চানটা করে নেই। তারপর আসছি। একটু সবুর করো না গো।
আমানুল্লাহ ভড়কে যান। এ কী গতরাতের সেই রমণী! অথচ এই গ্রীষ্মে ইঁদারার জল নেমে যায় আরও পাতালে। ইঁদারায় দুপুরের গনগনে সূর্যের আলো কিংবা রাতের আকাশে তারার নরম আলো পৌঁছায় কি পৌঁছায় না, তা কখনোই বুঝা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এক আশ্চর্য অদ্ভুত অন্ধকার ঘিরে থাকে ইঁদারার জলে। তবু ওই ঠান্ডা জলে শরীরটা ধুয়ে নিলে যে কেউ আরাম বোধ করবে। আমানুল্লাহর স্মৃতিতে তেমনই এক গড়িয়ে যাওয়া সময়ের কোনো বিশ্রাম জেগে ওঠে। কিছুক্ষণ বাদে চুড়ি আর নূপুরের ধ্বনি তুলে মেয়েটি তোয়ালে দিয়ে চুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমানুল্লাহ প্রথমে ভড়কে গেলেও এখন স্বাভাবিক। দোয়াদরুদ যা পড়ার পড়ে নিয়েছেন আগেই। পরহেজগার দাদা-পরদাদাকে স্মরণ করে নিয়েছেন আল্লাহ-রসুলের নাম জপতে জপতে।
‘কি গো তোমার কাজললতাকে ভুলে গেলে।’ মেয়েটির কথায় সম্মতি ফিরে পায় আমানুল্লাহ। গতরাতে আধো স্বপ্নে আধো জাগরণে দেখা সেই চল্লিশ ছুঁই ছুঁই রমণীর মতো লাগে কাজললতাকে। ‘কি গো পতিদেব। কী ভাবছো?’ ‘পতিদেব’ এই উচ্চারণে আবারও চমকে ওঠেন আমানুল্লাহ। ‘আমি তো আমান, আমানুল্লাহ।’ আমানুল্লাহর এমন কথায় কাজললতা বলে, ‘ওই হলো। এ জন্মে আমান, কিন্তু গত জন্মে তুমি তো ছিলে আমার পতিদেব, সুরেশচন্দ্র। মনে নেই বুঝি? রাগ করে আমি চলে গেলুম বাপের বাড়ি। আর তো নিতে এলে না। তোমাকে দেখতে বুঝি আমার ইচ্ছে করে না।’
একরাশ অভিমান ঝরে পড়ে কাজললতার কণ্ঠে। ‘তুমি ভেতরে এসো।’ আমানুল্লাহর এ কথায় কণ্ঠে আতঙ্ক ঝরিয়ে কাজললতা বলে, ‘না গো না। তোমার অকল্যাণ হবে। তার চেয়ে বরং এই খোলা হাওয়ায় আমার চুলটাকে শুকাতে দাও না।’
বাতাসের ভেতরেও একটা সুগন্ধ টের পায় আমানুল্লাহ। ‘তোমার নিশিচুলের গন্ধ কাজললতা?’ কাজললতাও বড়ো শ্বাস টানে খুব আবেগী ভাবে। হেসে ওঠে সে। আমানুল্লাহর বাড়ির চারপাশ জুড়ে এই সুগন্ধি বাতাস বইছে। এই বাতাস এতক্ষণ কোথায় অপেক্ষা করছিল, কে জানে? ধীরে ধীরে বাতাস এই বাড়ি ছাড়িয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়লো।স্বস্তির নিশ্বাস নেয় কাজললতা। সাথে আমানুল্লাহও। একটু পরে ঘন বাঁশবাগান থেকে নানা রকম শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। হয়তো সেখানেও এই সুবাতাস পৌঁছে গেছে।
পাখিদের ডানা ঝাপটানি, কুব পাখির মন্ত্রণা, ডোবা থেকে কোলা ব্যাঙের স্বর, ঘন বাগিচার ভেতরে অজানা সাপের সরসর চলা— এ সবকিছু এক আলাদা মোহ তৈরি করে কাজললতা আর আমানুল্লাহর প্রকৃতিতে। হঠাৎ বাইরের দমকা বাতাসে আমানুল্লাহর সামনে খোলা ফাইলের ভেতর থেকে একটা কাগজ উড়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ে। সেটি কুড়িয়ে এনে সে দেখে জানালায় কাজললতা নেই। আমানুল্লাহ দ্রুত দরজা খুলে ডাকে, কাজললতা…কাজললতা…কাজল…। কাজললতার চলে যাবার সেই একই ধ্বনি চুড়ি আর নূপুরের নিক্কন ঝড় তোলে আমানুল্লাহর মন্ত্রমুগ্ধ ভুবনে। এই পঞ্চাশ পূর্তি জীবনে এর আগে এমন মোহাচ্ছন্ন পরিবেশের মুখোমুখি কখনো হয়নি সে।
৪.
খুব সকালে আমানুল্লাহর জ্ঞাতিগুষ্টিরা তার নাম ধরে ডাকাডাকি করছে। তাদের চিৎকারে ঘুম ভাঙে আমানুল্লাহর। একজন খরিদ্দার এসেছে। অবশেষে সাত শতক ডোবা বিক্রির একজন ক্রেতা পাওয়া গেল। আমানুল্লাহ চোখে-মুখে পানি দিয়ে লোকজনের সাথে ডোবার পাড়ে গিয়ে দাঁড়ান। ক্রেতাকে হাত করতে ৮ ফুট চওড়া রাস্তা, ইলেকট্রিসিটি, পৌরসভার পানির লাইন যাকে বলে সাপ্লাইয়ের পানি— এসব সুযোগ-সুবিধার কথা বলতে থাকেন আমানুল্লাহ। কিন্তু ডোবা ভরাটের চিন্তায় মুষড়ে যান ক্রেতা। জ্ঞাতিগুষ্টির লোকজনও ক্রেতাকে পটাতে থাকে। অবশেষে প্রতি শতক ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা দরে মোট সাত শতক জমি কিনতে প্রাথমিক ভাবে রাজি হলো ক্রেতা মাইনুদ্দিন। মাঠপর্চা, আরএস খতিয়ান, জমির খাজনা ইত্যাদি কাগজপত্র মাইনুদ্দিনকে বুঝিয়ে দেয়া হলো। সে এখন ভূমি অফিসে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে দেখবে, তারপর ফাইনাল হবে।
লোকজন চলে গেলেও ডোবার ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন আমানুল্লাহ। ভাবনায় গতরাতের কথা, কাজললতার কথা। এই ডোবার সঙ্গে কাজললতার কোনো যোগসূত্র আছে কী? আমানুল্লাহকে ভাবিতে তোলে অতিপ্রাকৃত এসব ঘটনা। রাতের গোলচাঁদের মতো সকালের সূর্যটাও গনগন করছে প্রখর তেজে। কিন্তু সে রোদ নরম মিষ্টি এক শিহরণ জাগায় আমানুল্লাহর শরীরে। ছড়ানো রোদের চিকন আলপথে সে দেখে তার স্বপ্নের পূর্বপুরুষদের পদছাপ। কাজললতার লালপেড়ে শাদা শাড়ির প্রান্ত। তার গ্রীবায় ভেঙে পড়া দীর্ঘকায় ঘন চুলের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে এক লিকলিকে ছায়া। যে ছায়া আড়াল তোলে তার দৃষ্টিপথে। আবারও গতরাতের মতো আমানুল্লাহ টের পান কাজললতার নিশিচুলের গন্ধ।
এ মুহূর্তে অজয় মুচিকে মনে পড়ছে আমানুল্লাহর। তার মুখেই শোনা কুমার নদের ঘাট আমানুল্লাহর কয়েক পুরুষ আগের পরদাদা পানাউল্লার হাতে গড়া। তার নামেই ঘাট ছিল। এই বিশাল জমিজিরাত তারও আগের কোনো প্রাচীন পুরুষ হরিশচন্দ্র জমিদারের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিল। এসব অতিপ্রাকৃত ঘটনার সঙ্গে আমানুল্লাহ নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন যেন। হলদেটে মরীচাধরা কাগজপত্তর উঠে আসে আমানুল্লাহর হাতে। সেখানে জটবাঁধা গুমোট ছায়া। অনাবিষ্কৃত মুছে যাওয়া অস্পষ্ট কালো অক্ষরে কিছু খুঁজে পেতে চান আমানুল্লাহ।
অথচ ভবিষ্যতের ক্রেতা মাইনুদ্দিন ভূমি অফিস থেকে ফেরত এসে বলে, তহশিলদার ভুবন সোম আমানুল্লাহকে দেখা করতে বলেছে। মাইনুদ্দিন আগামীকাল আবার আসবে বলে চলে যায়। তার চলে যাবার পর আমানুল্লাহ সাতপাঁচ ভাবতে শুরু করেন। এ কোন দিবা স্বপ্নে মশগুল সে! এই চিকন সোনারোদে ঘেরা সকালটিতে সে তার যোদ্ধা পূর্বপুরুষের কাসিদা ঘাঁটতে বসেন। একবার খতিয়ে দেখে নিতে চান তার রক্তের পূর্বতন উৎসমূল। বাবা ছিলেন কলেজের শিক্ষক। দাদা ছিলেন মৌলভী, মক্তবের ওস্তাদ। পরদাদা ছিলেন পরহেজগার ইমাম। তারও পিতা একই পথে হেঁটেছেন। এরপর…জানা নেই। সেই অস্বাভাবিক লম্বা বংশলতা সুফিসাধক হয়ে যত্নে ঢেকেঢুকে রাখেন উত্তর বংশজাতকদের। আমানুল্লাহর এইসব ভাবদর্শনের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে এক ডিজনীল্যান্ড বা ওয়াটার ল্যান্ডের মতো অধুনানির্মিত কোনো আধুনিক পার্ক। যেখানে প্রতœসময়ের কাজললতার সঙ্গে তার সখ্য হয়। আর তার পা-ুর চোখে ধরা দেয় কয়েক পূর্বতন প্রাচীন পুরুষের ঘোড়সোয়ার।
৫.
অফিস ছুটির আগে দিয়ে ভূমি অফিসে পৌঁছান আমানুল্লাহ। হাতে হলদেটে মরীচা ধরা অস্পষ্ট দলিল। প্রাচীন হাতের আঁকাবাঁকা লেখা। ভুবন সোম খুব খাতিরযত্ন করে আমানুল্লাহকে। আপনারা যে বংশীয় লোক। আমার পূর্বপুরুষ আপনাদেরকে খুব ভালো করে জানে। কিন্তু আপনি যে ডোবা বিক্রি করবেন, পুরানো খতিয়ান বলে ওখানে আপনার পরদাদাদের কবর রয়েছে। এটা বিক্রি করা কী ঠিক হবে?
ভুবন সোমের কথায় আঁতকে ওঠেন আমানুল্লাহ। বলেন, শুনেছি আমাদের পূর্বপুরুষের পারিবারিক কবরস্থান ছিল। কিন্তু কোনো নিশানা খুঁজে পাইনি। তার কথার পিঠে ভুবন সোম বলে, আদতে আমাদের ধর্মমতে, এমন কোনো জমিজমা বিক্রি করা ঠিক না। ওতে অকল্যাণ হয়। তাই বলছিলাম আর কি। আপনি একটু ভেবে দেখুন।
ভুবন সোমের কথা শেষ হলে হলদেটে প্রায় মুছে যাওয়া অস্পষ্ট দলিলটা আমানুল্লাহ তার সামনে মেলে ধরেন। ভুবন সোম আশ্চর্য হয়ে দলিলটা হাতে নিয়ে খুঁটে খুঁটে দেখে। অনেক কষ্টে আবিষ্কার করে একটি নাম বিক্রেতার জায়গায় হরিশচন্দ্র ভট্টাচার্য আর ক্রেতার নাম শরাফতউল্লাহ। ভুবন সোম কাঁপা গলায় বলে, বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছি, আপনার পূর্বপুরুষ ওই সাত শতক কিনেছিলেন একজন হিন্দু ভদ্রলোকের কাছ থেকে। এ নিয়ে অনেক গল্পও শোনা যায়। সত্য-মিথ্যা জানি না। আমার ঠাকুরদা অশতিপর বৃদ্ধ। শতবর্ষী মানুষ। তার কাছে কিছু জানা যেতে পারে। আপনি যদি যেতে চান।
আমানুল্লাহ রাজি হতেই ভুবন সোম পিয়ন নরেনকে ডেকে বলে,
নরেন তুই আমার সাইকেলটা চালায়ে আমার বাড়ি নিয়ে যাস। আমি দাদাকে নিয়ে যাচ্ছি। সাইকেলের চাবিটা নরেনের হাতে দিতেই নরেন সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। বাইরে বেরিয়ে এসে দুজনে একটি অটো ঠিক করে উঠে পড়ে। খোয়া বিছানো এবড়োখেবড়ো পথ মাড়িয়ে গোসাইপুর পৌঁছতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেছে। বাড়ি পৌঁছে ভুবন সোম আমানুল্লাহকে নিয়ে সোজা গগন সোমের ঘরে গিয়ে ওঠে।
গগন সোম ভুবন সোমের ঠাকুরদা। আমানুল্লাহর দাদা মৌলভী জাফরুল্লাহর সঙ্গে তার জানাশোনা ছিল। ভুবন সোম গগন সোমের কানের কাছে মুখ নিয়ে একটু জোরেই ডাকে, দাদা, মৌলভী জাফরুল্লাহর কথা মনে আছে তোমার?
মৌলভী জাফরুল্লাহর কথা শুনেই গগন সোম তার কাঁপতে থাকা শীর্ণকায় দুই হাত জোড় করে মাথায় ঠেকান। আমানুল্লাহ দেখেন, এক শতবর্ষী হাড্ডিসার বৃদ্ধ বিছানার সঙ্গে লেপটে আছেন। কখানা হাড়ের সঙ্গে কিছু চামড়া ঝুলছে। চোখ বসে গর্তের ভিতর ঢুকে গেছে। চোয়াল ভেঙে দু-গাল কুয়ো সর্বস্ব। তবু চোখের মনিতে জ্যোতি ঠিকরে বেরুচ্ছে। ভুবন সোম আবার বলে, দাদা ইনি হচ্ছেন মৌলভী জাফরুল্লাহর পোতা-ছেলে আমানুল্লাহ। দন্তহীন মুখে সম্ভাষণের র হাসি ছড়িয়ে আমানুল্লাহর দিকে দু-হাত বাড়িয়ে দেন গগন সোম। আমানুল্লাহও তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে বৃদ্ধের দু-হাত নিজের দু-হাতের মধ্যে নিয়ে নেন। এরপর গগন সোমের চোখের সামনে ভুবন সোম সেই মরীচাধরা হলদেটে দলিলটি মেলে ধরে। দাদা, দেখো তো কিছু বুঝা যায় কি না।
শীর্ণ কাঁপা দুই হাতে দলিলটি অনেকক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখলেন। অতীত স্মৃতি কিছু মনে পড়ে যায় তার। চোখের কোণ গড়িয়ে পানি পড়ে। ভগ্ন স্বরে অশতিপর বৃদ্ধ গগন সোম যা বললেন তার মানে দাঁড়ায় এই: তিনিও তার ঠাকুরদার কাছ থেকে মৌলভী জাফরুল্লাহর পূর্বপুরুষদের শিক্ষাদীক্ষা, সভ্যতা এবং খানদানি সম্পর্কে জেনেছেন। কিছু শুনেছেন মৌলভী জাফরুল্লাহর মুখে। ওখানে আগে একটি প্রাসাদোপম চারতলা বাড়ি ছিল হিন্দু বংশীয় ভদ্রলোক হরিশচন্দ্র ভট্টাচার্যের। তার এক সুন্দরী কন্যা ছিল কাজল। যার বিয়ে হয়েছিল বারাসাতে। শ্বশুড়বাড়ির সঙ্গে বনিবনা না হলে সে স্বামীর সঙ্গে অভিমান করে বাপের বাড়ি চলে আসে। এরপর এক পূর্ণিমা রাতে কাজল চারতলার ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনার পরে ওই প্রাসাদোপম বাড়িসহ জমিটি মৌলভী জাফরুল্লাহর পরদাদা শরাফতউল্লাহর কাছে বিক্রি করে দেয় হরিশচন্দ্র। তিনি পরিবারসহ চলে যান নদীয়ায়। পরে শরাফতউল্লাহ বাড়িটি ভেঙে সেখানে নানা জাতের গাছগাছালি লাগান, এর একাংশে তৈরি করেন পারিবারিক কবরস্থান। গগন সোমের কথা মতো ওখানে তিনি বালক বয়সে মৌলভী জাফরুল্লাহর দাদা সোবহানউল্লাহকে কবর দিতে দেখেছেন, এমন কি জাফরুল্লাহর বাবা বরকতউল্লাহকেও। তারা সব নমস্য ব্যক্তি ছিলেন। আবারও হাড্ডিসার কাঁপা দুই হাত জোড় করে গগন সোম কপালে ঠেকান।
গগন সোমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভুবন সোম ও আমানুল্লাহ বাড়ির আঙিনায় এসে দাঁড়ান। ভুবন সোমই নীরবতা ভেঙে বলে, এবার আপনি ঠিক করুন, জমিটা বিক্রি করবেন কি করবেন না। দ্বিধানিত আমানুল্লাহ ঠোঁটের কোণে শুকনো হাসি ছড়িয়ে বলেন, ভেবে দেখি।
৬.
আজ পূর্ণিমার তেজ নেই। শীর্ণ চাঁদ আলোআঁধারের খেলায় মেতেছে। পশ্চিম আকাশে গাঢ় মেঘের ঘনঘটা। মাঝেমধ্যেই ক্ষীণকায় চাঁদ কালো মেঘের গহ্বরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। দূর আকাশে মাঝে মাঝে বিজলীরেখাও ঝিলিক মারছে। গগন সোমের বাড়ি থেকে ফিরে এসে আমানুল্লাহ প্রথমে ডোবার ধারে গিয়ে দাঁড়ান। কোথায় শরাফতউল্লাহ, পানাউল্লাহ, সোবহানউল্লাহ, বরকতউল্লাহ! তারা কী ইচ্ছে করেই কাজললতাকে তার কাছে পাঠিয়েছেন? হঠাৎ আমানুল্লাহ অনুভব করেন তার বুকের পাটা খুব চওড়া হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস বয়ে যেতে থাকে তার ফুসফুসের ঝিল্লিজুড়ে। আবারও সে সুন্দর মিষ্টিগন্ধ। কাজলের নিশিচুলের গন্ধ এ কি? আমানুল্লাহ দাঁড়ান না আর। কাজললতাকে আজ রাতে তিনি খুব করে মনেপ্রাণে চান।
আমানুল্লাহ ঘরে এসে দক্ষিণের জানালা খুলে নিয়ে বসে থাকেন। ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কাজললতা আসবে কি? খুব করে কাজললতাকে ডাকছে সে, তুমি এসো…এসো না…আমার জানার এখনো অনেক বাকি। জানালা দিয়ে বৃষ্টিধোয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে শিবনেত্রে স্থানুর মতো। কোনটা রাহু? কোনটা কেতু? কোনটা কালপুরুষ? তবু তো শুক্লাপক্ষের স্বাতী তারার মতো জ্বলছে কাজললতা আমানুল্লাহর মনের আকাশে।
শেষ প্রহরের দিকে হবে। আমানুল্লাহর পেটের ওপরে ভারী ওজন। শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে। ধীরে ধীরে চোখ মেলেন তিনি। এ কি কাজললতা! হুড়মুড় করে উঠে বসে আমানুল্লাহ। কাজললতা লজ্জা পেয়ে বুকের কাপড় ঠিক করে উঠে দাঁড়ায়। ‘কী লজ্জা গো!’ কাজললতার কণ্ঠ এ কি? আমানুল্লাহ দেখেন কাজললতা গতদিনের মতোই জানালার বাইরে বারান্দায় দাঁতে আঁচল চেপে খিক খিক করে হাসছে। ‘কি গো, স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি।’
আমানুল্লাহ হকচকিয়ে যায়। কী বলবে বুঝে উঠতে পারেন না। মনে হতে থাকে তার শীরের ওপর পড়েছিল জন্তুর উত্তেজনায় ধামসানো মেদবহুল নারীমাংসের স্থূল শরীর। সে এক নিষ্ঠুর বীভৎস আনন্দ। তবু প্রায় পঞ্চাশ পূর্ণ এই জীবনে খুব আরাম বোধ করেন আমানুল্লাহ। ‘তুমি কখন এলে কাজললতা?’ ‘কতক্ষ..ণ। তুমি জাগছিলেই না। হাতভরে বৃষ্টির ছাটও দিয়েছি তোমাকে।’
আমানুল্লাহ লক্ষ করেন বাইরে বৃষ্টির শব্দ। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালে সে বৃষ্টি প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করেছে। তবে কী পূর্ণিমা শেষ! তাহলে কাজললতা এলো কী করে? এসব প্রশ্ন আর নিজের মধ্যে দমিয়ে রাখতে পারলেন না আমানুল্লাহ। ‘কাজল, তুমি এই অন্ধকারে এলে কী করে।’ ‘আজ যে পূর্ণিমার শেষ তাই এলাম।’ ‘পূর্ণিমা ফুরিয়ে গেলে তুমি আর আসবে না?’ ‘ও মা, তুমি সব ভুলে আছ পতিদেব? মনে নেই অন্ধকারে তোমাকে জড়িয়ে তবেই না আমি পথ হাঁটি।’ ‘আমি যদি যাই, তুমি আসবে?’ ‘আসবো কি গো। আর তো আসা হবে না?’ ‘কেন?’ ‘বাবার পাইক পেয়াদা আমাকে আটকে রাখে। যেমন তোমার পূর্বপুরুষ শরাফতউল্লাহ, পানাউল্লাহ, সোবহানউল্লাহ ওরা তোমাকে সম্পর্কজালে জড়িয়ে রাখে।’ ‘তুমি ওদের চেনো?’ ‘ও মা, এ কেমন কথা! তুমি জানো না বুঝি, এখন তো আমি আর ওরা পাশাপাশি বাস করি। কথা হয় আমাদের।’ হঠাৎ বৃষ্টির ভেতরে বিদ্যুচ্চকিত শাদা শান আকাশে ঝলসে ওঠে। আমানুল্লাহর কাছে মনে হয়, এ পৃথিবী ছোটো একটা মুমূর্ষু বালক যেন! বড়ো অনাথ। বাদলা রাতের হু হু আর্দ্র হাওয়ায় ঢাউস আকাশের কোথায় কোন ঘুপচিতে লেখা হচ্ছে আমানুল্লাহর জীবন-মৃত্যুর দিনপঞ্জি? চুড়ি ও নূপুরের ধ্বনি তুলে আমানুল্লাহর ঘর ছেড়ে পথে নামে কাজললতা। তড়িৎ গতিতে দরজা খুলে আমানুল্লাও পথে নামে, ‘কাজললতা…কাজল…।’ তাকে আর দেখা যায় না। শুধু চুড়ি আর নূপুরের শব্দ। ভেসে আসে কাজললতার কণ্ঠ, ‘ভোর হয়ে আসছে। আমাকে যেতে হবে। তুমি এসো না পতিদেব। সামনে কবরস্থান। তুমি ভুল নিশানা করেছো। এসো না গো…।’
ততক্ষণে ডোবার ভেতরে একটা ভুরভুরি কাটার শব্দ। তাকেই লক্ষ্য করে নেমে যেতে থাকে আমানুল্লাহ। হঠাৎ বাধাপ্রাপ্ত হয়। জ্ঞান হারায় সে। যখন হুঁশ হয় আমানুল্লাহর, তখন ঘরময় অনেক লোক। ঢাকা থেকে তার স্ত্রী-পুত্ররা এসেছে। ধীরে ধীরে তিনি সব জানতে পারেন। ফজরের সময় লোকজন নামাজে যাবার পথে তাকে ডোবার কাছ থেকে উদ্ধার করে। এরপর আমানুল্লাহ সব পরিকল্পনা বাতিল করে ঘোষণা দেন পূর্বপুরুষের কবরস্থানের সন্ধান তিনি পেয়েছেন। তাকে সংরক্ষণ উত্তর বংশজাতদের কর্তব্য। তারপর বড়ো মেহগনি গাছে টাঙানো সাত শতক ডোবা বিক্রির সাইনবোর্ডটি নেমে যায়।
পরিশিষ্ট
সাত শতক ডোবার পানিটুকু শুকিয়ে গেছে। এই ঘটনার পর দিনে দিনে ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর সামনেই ডোবার পানি শুকিয়ে যেতে থাকে। শত বর্ষায়ও পানি জমে থাকে না আর। এই অতিপ্রাকৃত ঘটনা আল্লাহর কুদরত বলে শোকরানা আদায় করে জলপরির মানুষজন। সাত শতক ডোবার জমিটুকু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে পূর্বপুরুষদের কবরস্থান চিহ্নিত করেন আমানুল্লাহ। তবু প্রতি পূর্ণিমার সময় তিনি দক্ষিণের জানালা খুলে অপেক্ষা করেন কাজললতার জন্য। কিন্তু সেই চুড়ি ও নূপুরের ধ্বনি আর কোনো জাগতিক মোহকে আচ্ছন্ন করে না। ধ্বংস করে না আমানুল্লাহর ইহজাগতিকতাকে। আমানুল্লাহ টের পান রাতের নিজস্ব কোনো নড়াচড়া নেই। সময় যেন স্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। কার্মো ফোমের পাঁচ-বাই-সাত বিছানা দূরদূরান্তের ব্যবধান গড়ে তোলে আমানুল্লাহর অন্তঃস্থিত শরীরে। এ ভাবেই তিনি টিকে আছেন কেটেছেঁটে, একমেটে জীবনে। আর কোনো তিথিতে কাজললতা কেন, অন্য কোনো অতিথির ধুলোছাপ পড়বে বলে মনে হয় না। স্বাদ নেই, উদ্যোগ নেই, বিকার নেই— প্রতিটি কোষের প্রাণলক্ষণ বিনষ্ট। তবু অবচেতন মনে আমানুল্লাহর হাতপামাথা, এমনকি বুকের যন্ত্রপাতিও কাজ করে চলেছে। এ কাজ নয়, দায়। কার জন্য, কীসের জন্য? হঠাৎ ঠান্ডা ছোঁয়া পেয়ে শিউরে ওঠে আমানুল্লাহর দেহ। এ কী হাতকড়া? পূর্বপুরুষের হাতের ছোঁয়া তার ফুলে ওঠা কপালের রগে, চিন্তার ভাঁজে প্রলেপ বুলিয়ে যায়। ধরতে চান আমানুল্লাহ সেই গায়েবি হাত। পারেন না। তার ঘন চুলের ভেতরে হাওয়া হয়ে ওড়ে। তারপর আরও উঁচুতে দুলতে থাকে শূন্যের ভরে। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে অধস্তন এক বংশজাতক একটা মধ্যবিত্তীয় বোঝাপড়ায় থিতু হলো অবশেষে।
