ফুল মালার বয়স এখন প্রায় সত্তর ছুঁইছুঁই। তবে গায়ে গতরে, আর দৈনন্দিন জীবন যাপনে বুড়ি বলে তাকে বাদ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। এখনো সূর্য দেব জেগে ওঠার আগেই তিনি ঘুম থেকে উঠে যান। ঘর বাড়ি উঠোন নিজের হাতে ঝাড়-পোছ করেন।মাটির চুলায় গোবরের ঘুঁটে, আর শুকনা কাঠ, পাতা দিয়ে তিন বেলা নিজের রান্না তিনি নিজেই করে খান। গ্রামের পুজো-আশ্রয়, বিয়ে-থাওয়া অথবা কোন বাড়ির বৌ পোয়াতি হলে ফুল মালার ডাক পড়ে। এই গ্রামের হালের সোল আনা ছাওয়াল-পাওয়াল তাইগের বাপ, জেটা, কাকা, পিসিরা সবাই ফুল মালার হাতের উপর দিয়ে জন্মেছে।
সে ম্যালা যুগ পিছনের কথা, ফুল মালার বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামের সন্তোষ বাওয়ালির ছোট ছেলে আশুর সাথে। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় আশুরে জঙ্গলে খালো। নতুন ঘরের আড়া লাগানো লাগবে তাই মোটা একটা সারি পশুর গাছের খোঁজে সে বাদায় গিয়েছিল ভর দুপুরে একা একা। আশু, সেই গেলো, তো গেলো। আর ফিরে আইলো না। এক দম চুপচাপ যেন হাওয়া হয়ে গেলো দুনিয়া থেকে। বাঘে খালো না কুমিরে টাইনে নিয়ে গেলো তারও কোন হদিস কেউ আর কোন দিন পালো না। স্বামী আশুকে জঙ্গলে খাওয়ার পর নাবালিকা ফুল মালা আরো বছর দুই ছিল স্বামীর ভিটেতে। এরপর জয়মনির টোটায় তার বাপের বাড়িতে ফিরে এসেছিল। বাপ বেঁচে থাকতে ভাইরা সবাই এক সংসারেই ছিল। এরপর ফুল মালার তিন ভাই বাপের ভিটায় আলাদা আলাদা সংসার পাতলো। তার নিজেরও দোচালা একটা গোলের ঘর হলো। ফুল মালার বাপ বেঁচে থাকতেই তার নামে দেড় বিঘা ধানি জমি লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই জমির ধান দিয়েই তার সারা বছরের খোরাকিটা চলে যায়। আর ফুল মালাও সারা জীবন কোন দিন বসে খাওয়ার লোক না । বয়েস কালে ভাইদের সাথে জমিতে হাল চষেছে, জোয়ান মরদদের মত ধান-পান কেটে বয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছে। এখনো এই বয়সেও সে বিলে-ঘাটে যায়। তবে আগের মতো আর তার শরীর পারে না। ভাইদের ছেলেরা পিসিমা’র কাজ কামে কম বেশি হাত লাগিয়ে গুছিয়ে দেয়। ফুল মালাও বাড়ি সহ গ্রামের সবার সাথে মিলে মিশে থাকেন। পুরো জয়মনি গ্রামটাই যেন তার নিজের বাড়ি। গ্রামের ছেলে থেকে বুড়ো সবাই উনাকে আলাদা রকম ভক্তি সম্মান করেন। কালি পুজোর পাত কাটতে হবে? বনবিবির পুঁথি পাঠ করতে হবে? কোন বাড়িতে আশুপীর সত্যপীরের শিরনির বোত্তি থাকা লাগবে? এমন পুজো-আশ্রয়, বিয়ে-থাওয়া, পোয়াতি বাড়িতে ধাইমা’র কাজ এমনকি গ্রামের কোন গরু ছাগলের বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে ঝামেলা হলে গরু ছাগলের মালিকরা ফুল মালার কাছে এসে কাকুতি মিনতি করে। ধাইমা’র কাজে তার হাতযশ জয়মনি টোটা ছাড়িয়ে আরো দূরে দূরে কতো গ্রামে ছড়িয়ে যে গেছে তার ঠিক নাই। বাড়িতে পোয়াতি বৌয়ের ব্যাথা উঠলে দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে মাসে অন্তত দুই-পাচ জন লোক উনাকে নিয়ে যেতে এই গ্রামে আসেন। কোন বাড়িতে বাচ্চা ধরলে ধাই বিদায়ের দিনে ওই বাড়ির মানুষরা ধাইমাকে খুশি করার জন্য নতুন শাড়ি কাপড়, জুতা, ছাতার সাথে উনার ধার্য করা সোল আনা মান্য সহ নগত টাকা পয়সা বাদেও খুশি হয়ে বাড়ির ফলফলাদি সহ আরো কতো কিছু ওনার ব্যাগ ভরে দেয়। তবে এখন দিন বদলাইতেছে। এখন আর আগের মত সবাই খালি ধাইমাদের উপর বিশ্বাস রাখতে পারতেছে না। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কিছু কিছু ধনী বাড়ির মানুষরা পোয়াতি পুতের বউদের ব্যাথা উঠলেই নৌকা টলারে করে মোংলা সদরে নিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে গেলে ডাক্তাররা আগে প্যাট কেটে বাচ্চা বের করে। সে এক আজব কায়দা। ফুল মালা এই হালে এসে দুই-তিনটা রুগীর সাথে হাসপাতালে থেকেছে। হাসপাতালে নিয়ে আসলে ধাইমার আর কি কাজ থাকে বলেন? তারপরও রুগীর বাড়ির লোকদের অনুরোধে তাদের সাথে হাসপাতালে আসা লাগে।রুগীর শরীরের তার বোঝা? এই রুগী কতটুকু ব্যাথা খাতি পারবে? আগে বাচ্চার পা আসতেছে নাকি মাথা? ক্ষনে ক্ষনে রুগীর অবস্থা দেখে নানান ব্যবস্থা নেওয়া। এই সব জ্ঞান কি আর প্যাট কাটার বেলায় কাজে লাগে? বাচ্চা জন্মানোর পর আবার ছোঁয়া-ছুঁয়ি আতুর ঘরের কত নিষেধ বারণ থাকে। ছয় রাতের দিন বিধাতা পুরুষ নবজাতকের আয়ু লেখেন।ওই দিন সন্ধ্যা থেকে আতুর ঘরে ধাইমাদের কত কাজ থাকে। আলো মাটি আর গোবর দিয়ে আতুর ঘর সুন্দর করে ল্যাপা-পোছা করা লাগে। এরপর ধূপ দ্বীপ জ্বেলে দিয়ে আসন পেতে সেই আসনের উপর বিধাতা পুরুষের জন্য নতুন খাতা কলম রেখে দিতে হয়। হাসপাতালের এই হাট বাজারের ভেতর কি আর এই সব নিয়ম কানুন মানা যায়? এই খানে ডাক্তার নার্সরাই বিধাতা পুরুষ। তারা যা ভালো বোঝে তাই করে। তা তুমি ধাইমা হও আর যে মা হও।
এমন একটা ডেলিভারি কেস হয়ে যাওয়ার পর উনার আর তেমন কাজ নেই মনে হওয়াতে রুগীর আত্মীয় সজনদের অনেক বলে কয়ে ফুল মালা আজ সকালে মাংলা থেকে জয়মনিতে তার বাড়ি উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। কচিখালী ঘাটে ট্রলার থেকে নামার পর ঘন্টা খানিক পায়ে হাঁটার রাস্তা। ঘাট থেকে নামার পর তাই ফুল মালা নদীর কূল ঘেঁষা কাঁচা অবদা রাস্তাটি ধরে হাঁটা শুরু করেছেন। ওই দিকে সূর্য দেবও এখন একদম মাথার উপর খা খা রোদ্দুর ছাড়ছেন । কচিখালী ঘাটের ছোট বাজারটা রেখে কিছু দূর সামনে আগলেই অনেকটা পথ আর লোকালয় নেই। নদীটাও এখান থেকে বাক নিয়ে পশ্চিম দিকে কিছু দূর ঘুরে নেমে গেছে সাগরের দিকে। আর জয়মনি গ্রামটির নামেই নাম, ছোট একটি খাল দক্ষিণ পূব দিয়ে ফুল মালাদের গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গিয়ে মিলেছে হরিণটানা নদীর সাথে। জয়মনি খালের ওই পাশটায় ঘন গাছপালা ঢাকা বাদাবন। আর এই পাশে অনেকটা পথ গ্রামের ফাঁকা রাস্তা। তবে রাস্তার এই পাশে পশ্চিম পাশের মত ঘন বন না থাকলেও খালের চরে কেওড়া, বাইন, গেওয়া, গোলপাতা, আর হরগোজার ঝাড় আছে একটু পর পর। এই পারের এই ছাড়া ছাড়া জঙ্গলেও বানর, গুইসাপ সহ হুটহাট নানান কিছু চোখে পড়ে। এমন বাতাসহীন চৈত্রের ভর দুপুরে এই পথটি এখন আরো নিঃসাড় জনমানবহীন ছমছমে হয়ে ওঠেছে। ফুল মালার মত কেউ নিতান্তই কাজ থেকে ফিরতেছে এমন মানুষ ছাড়া এই দুপুর বেলা গ্রামের ফাঁকা মাথার দিকের এই রাস্তায় কেউ হায়ুস করে এই সময়টাতে ঘুরতে যায় না। খালে অবশ্য গোনের সময় মাছ মারার জন্য দুই পাঁচ জন থাকে। তবে এই ভাটিঘার দুপুর বেলা মানুষ জন নদীতে শুধু শুধু কেন যাবে? একটা গোঙানির মত শব্দ আসছে নদীর চরের হরগোজার ঝাড়ের ওই পাশ থেকে। এই দুপুর বেলা গোঙাচ্ছে কেড়া? কেমন পোয়াতি মহিলাদের মত করুণ সুরে গোঙাচ্ছে? ফুলমালা হাটা বাদ দিয়ে থমকে দাড়িয়ে গেলো। হরগোজার ঝাড়ের মদ্দি এই ভর দুপুরে কোনো ঘরের পোয়াতি বৌ কেন যাবে? কিন্তু এই কান্না তো ফুল মালার কাছে প্রায় সারা জীবন ধরে পরিচিত। নিজের পেটে ছেলে পুলে হয়নি তাই কি হবে এই দুই হাত দিয়ে তিনি প্রায় শ-খানিকের বেশি বাচ্চা পেট থেকে পৃথিবীতে নামিয়েছেন। এই কান্না চিনতে তার ভুল হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তাই বলে এই খানে এই হরগোজার ঝাড়ের পাশে এমন কান্না? কার কোথায় জন্ম লেখা আছে স্বয়ং ভগবানই জানেন। পোয়াতির ব্যাথা ওঠার কি আর স্থান, কাল, পাত্র থাকে? আর তার মতো ধাত্রী কি আর এমন সংকট কালে কোন পোয়াতিকে ফেলে রেখে যেতে পারেন। হায়! ভগবান, তাই বলে একটা বাঘিনী? দয়াল আজ তুমি আমায় এ কি ভয়ঙ্কর পরিক্ষার সামনে ফেললে? পুরুষ বাঘের হাত থেকে সন্তানদের জীবন রক্ষা করতে বাঘিনী হয়তো বাদা পার হয়ে এখানে এই নির্জন হরগোজা আর চারিপাশে ঝোপ ঝাড়ে ঘেরা জঙ্গলা স্থানে চলে এসেছে নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে।ব্যাথায় কাতরাতে থাকা বাঘিনীটা ফুল মালার সাড় পেয়ে মাথাটা তুলে উনার চোখের দিকে তাকালো। এ তো ব্যাথায় কাতর অসহায় এক পোয়াতির সজল চোখ। এই চোখে তো কোনো হিংস্রতা নেই, নেই কোন পশু সুলভ অঙ্গভঙ্গি। শুধু জলে ভেজা দুটি নয়ন ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি নিয়ে করুণা ভিক্ষা চাইছে ফুল মালার দিকে চেয়ে। এ যেন একজন নারী অন্য আর একজন নারীকে তার চুড়ান্ত অসহায় মূহুর্তে পাশে চাইছে। এই নির্বাক সংলাপ হয়তো একজন জননীই শুধু পড়তে পারে।
কমলার উপর বাদামী রঙের ডোরাকাটা সুন্দর দুইটি শিশু ভূমিষ্ঠ হলো ফুল মালার অভিজ্ঞ হাতে। শিশু দুইটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই ফুল মালার পরানে ফিরে এলো ভয়। সে এখন কি করবে? বাঘিনীতো আর আগের মতো চুড়ান্ত সংকটে নাই। ছানাগুলো জন্মানোর পর তার শরীর এখন আসতে আসতে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। দুই বার গা ঝাড়া দিয়ে এখন বাঘিনীটি বাচ্চা দুইটার শরীর চাটছে। বাঘিনীর বাচ্চারা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই ফুল মালা মাটিতে পাছা ঘষে ঘষে কিছুটা পেছনে সরে গিয়েছিল। তবে এখন সে সবে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার উঠে দাঁড়ানোর সাড় পেয়ে বাঘিনীটি বাচ্চাদের গা চাটা বাদ দিয়ে ফুল মালার দিকে তাকালো। ঘটনার আকস্মিকতায় ফুল মালার শরীর হটাত পাথরের মত শক্ত হয়ে গেলো। কিন্তু বাঘিনীটির চোখে কোন হিংস্রতা অথবা মানুষ খাওয়ার লোলুপতা নেই। আগের করুণা ভিক্ষার যায়গায় এখন সেখানে তীব্র খুশি ছড়ানো অসীম কৃতজ্ঞতা বোধ । সদ্য প্রসূতি মায়ের সেই কৃতজ্ঞ চোখ ফুল মালার শরীর ও মনের ভয় সরিয়ে আবার সেখানে ফিরিয়ে আনছে বিশ্বাস। এই চোখ তার আজন্ম আপন। এই চোখ তার এ জীবনে পাওয়া সব থেকে পরম প্রাপ্তি ।
