জানি তো। তবুও একটু চেষ্টা করবেন এই আর কি!
হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বিশ্বনাথ লন্ড্রির কর্ণধার ষাটোর্ধ লম্বাটে জীর্ণশীর্ণকায় কার্তিকবাবু নির্বিকার ভঙ্গিতে দ্রুত একরঙা সবুজ রিসিভটা মনোয়ার হোসেন সাহেবের হাতে গুঁজে দিয়ে কাজে মনোযোগ দিলেন। এক মুহূর্তের জন্য ক্রেতার দিকে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলেন না। হাতে অনেক কাজ জমে আছে তার। ভোলা হারামজাদাটা লাগাতার কদিন ধরে কাজে আসছে না। আগামীকাল না এলে তিনি কাজের চাপে পড়ে মারা পড়বেন। কাপড়ে কাপড়ে সমস্ত দোকান সয়লাব হয়ে গেছে। দাঁড়ানোর জায়গাটুকু পর্যন্ত নাই।
দোকানটা আর পাল্টানো গেলো না। চল্লিশ বছর ধরে তিনি এই দোকানটিতে পড়ে আছেন। বিদ্যুৎ বিল বাদেই তিনশো টাকার দোকান ভাড়া এখন পনেরো হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। দিনে দিনে দোকানটা যেন আরও অনেক চিপা হয়ে যাচ্ছে।কিছুক্ষণপর দাঁড়াবার জায়গাটুকুও পাবেন না। কাঁটাবন কনকর্ড থেকে আজমল সাহেবের পঞ্চাশ পিসের মতো কাপড় আসবে। ড্রাইভার রফিক দাঁড়িয়ে থেকে কাপড়্গুলো নিয়ে যাবে। এই ঝক্কি তিনি কীভাবে সামাল দিবেন বুঝতে পারছেন না।
কার্তিক বাবু হঠাৎ খেয়াল করলেন মনোয়ার হোসেন সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আছেন। এই তাকানোর অর্থ তিনি জানেন। ভদ্রলোক ভয়ঙ্কর খুঁতখুঁতে স্বভাবের। চোখে চোখ পড়লে হয়ত তিনি আবারও তার প্যাঁচাল আরম্ভ করবেন। এতো প্যাঁচাল পাড়ার সময় কোথায় তার! মনোয়ার হোসেন সাহেব রিসিভ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তার রিসিভ নাম্বার __ 3431। তিনি তার শার্টের দাগ বিষয়ে তাকে আরও বিষদ কিছু বলতে চান। কিন্তু কার্তিকবাবু তো মহাব্যস্ত মানুষ। এক কথা তিনি দুবার বলা পছন্দ করেন না।
আয়রনম্যান ছেলেটা কদিন ধরে কাজে আসছে না। তার জন্য বেশকিছু কাজ জমে আছে। তিনি একা একা হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন।
যদিও মনোয়ার সাহেব জেনেশুনেই তার কাছে এসেছেন। কার্তিক বাবুর হাতের কাজ ভালো। তার এলাকার ড্রীম ড্রাইওয়াশের কাজও নেহায়েত মন্দ না। মিজান মিয়া তার শখের প্যান্টটা পুড়িয়ে না ফেললে সে তাকে ছেড়ে আসতো না।
দাদা!
বলেন, শুনছি।
দাগটা উঠবে তো!
কোন দাগ?
শার্টের হলুদ দাগটা।
ও। আপনি এখনও যাননি।
যেতে পারছি না।
কেন?
টেনশানে।
কিসের টেনশান?
যদি দাগ না ওঠে!
দাগ কখনও ওঠে না। মনে রাখবেন কিছু দাগ থেকেই যায়। তবে আপনারটা বোধহয় উঠবে না।
এমন অলক্ষুণে কথা কেন বলছেন?
এই প্রথম খিটখিটে স্বভাবের কার্তিকবাবু মৃদু হাসলেন।
দাগ উঠবে। তবে হলুদ দাগটা সহযে উঠবে না। হলুদাভ ভাবটা থেকেই যায়। তবে আপনার শার্টের দাগ উঠবে।
চিন্তিত ভঙ্গিতে মনোয়ার হোসেন সাহেব বললেন, কতো পার্সেন্ট?
এই ধরে নিন নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট।
সত্যি তো?
হ্যাঁ, সত্যি।
মনোয়ার হোসেন স্বস্তির সঙ্গে বিশ্বনাথ লন্ড্রি ত্যাগ করলেন ঠিকই কিন্তু তার মনের ভেতর থেকে খুঁতখুঁতে খচখচানিটা ভাবটা গেলো না।
০২
ভোলা, শার্টটা ভালো করে আয়রোন করিস। লোকটা খাতারনাক টাইপের খুঁতখুঁতে। তোর জন্য তাকে তিনদিন ঘুরিয়েছি।
আরও তিনদিন ঘুরেও সে শার্টটা নিতে পারবে না!
কেন?
দাগ ওঠেনি।
সর্বনাশ! দাগ উঠল না কেন?
এটা আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছো? মাসিকে জিজ্ঞেস কর!
দেখি।
ভোলা পেছন ফিরে সাদা স্টাইপের শার্টটা কার্তিকবাবুর টেবিলে রাখে। তিনি নেড়েচেড়ে দেখে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন।
সর্বনাশ! এটা কী করে হলো?
কি হয়েছে?
হলুদ দাগ যে নীল হয়ে গেল?
কি ভুলভাল বকছো! হলুদ দাগ নীল হতে যাবে কেন?
হবে কিরে! হয়ে তো বসেই আছে।
সেটাই তো দেখছি। এখন আর কী করবে! আবার পাঠাও।
কিন্তু লোকটা তো এক্ষুণি এসে পড়বে। টাইম মতো না হলে তার বাসায় গিয়ে দিয়ে আসতে হবে।
তুমি কাজে মন দাও কাকা। আগে লোকটা আসুক। আমি তাকে সামলাবো। দায়িত্বটা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। দেইখো আমি তোমার এই কাস্টমারকে কীভাবে সেটিংস দিই।
কিন্তু এখন লোকটাকে কী বলবো?
বললাম না, তুমি চুপ থাকবা, যা বলার আমি বলবো।
চুপ থাকবা বললেই কি হবে! লোকটা তো আমাকেই জিজ্ঞেস করবে!
হুঁ।
তোমার না একশো দুই ডিগ্রী জ্বর?
হুঁ।
তুমি এক্ষুণি শার্টটা নিয়া মাসির কাছে যাও। বাকিটা আমি সামলাবো।
পারবি তো?
পারবো মানে! খুব পারবো।
অসহায় ভঙ্গিতে কার্তিকবাবু শার্ট নিয়ে বেরুবার পথে আকস্মিক মনোয়ার হোসেন সাহেব এসে হাজির হলেন। কিন্তু কার্তিক বাবু তার দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলেন না। দ্রুত লম্বা লম্বা পা ফেলে কিছুটা চোরের মতো হাওয়া হয়ে গেলেন।
০৩
খুব ভোরে দোকান খোলার অভ্যেস কার্তিক বাবুর। আজ পারলেন না। অনেক দেরি করে ঘুম ভাঙল তার। এসে দেখেন__ মনোয়ার হোসেন সাহেব দোকানের সামনে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছেন। শার্টটা তিনি নিজের হাতে ওয়াশ করেছেন এবং যত্নের সঙ্গে আয়রোন করে বাসায় গেছেন। খাওয়াদাওয়া শেষ করে বিছানায় যেতে যেতে তার অনেক রাত হয়ে গেছে।
মাফ করবেন স্যার। দেরি করে ফেললাম!
সমস্যা নাই। আপনি আগে শাটার খুলুন।
তালা খুলে শাটার উঠিয়ে আগেই তাকে শার্টটা দিতে চাইলেন কার্তিক বাবু। অন্যদিন প্রথমেই দোকান ঝাড় দেন। আগরবাতি জ্বালেন। আজ প্রথমেই হন্নে হয়ে শার্ট খুঁজতে লাগলেন। রাতে শার্টটা রেডী করে এই টেবিলের ওপরেই রেখে গেছেন। এখন নেই।
এ_ও কী সম্ভব! কী বলবেন এখন লোকটাকে!
আপনি কি আমার শার্টটা হারিয়ে ফেলেছেন? না কাউকে ভুল ডেলিভারি দিয়েছেন? আর আমাকে চরকির মতো এত ঘোরাচ্ছেন কেন!
বলতে বলতে বয়স্ক লোকটা শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন। বলে গেলেন তিনি আবারও আসবেন। অন্য কোনো শার্ট দিলে হবে না। তাঁর শার্টটাই তাকে দিতে হবে। ছেঁড়া হোক পোড়া হোক। শার্ট না দিলে তাকে পুলিশে দেবেন।
তিনি নাছোড়বান্দা। তাঁর ও-ই শার্টটা-ই চাই। যদি পাওয়া যায়! সে কারণেই তিনি বারংবার আসছেন! মনোয়ার হোসেন সাহেবকে আরম্ভেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল তার। এই লোক সাধারণ কেউ নন। তাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগও নাই।
গতকাল সমস্তরাত দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন।
০৪
চার চারবার চেষ্টা করেও তার শার্টের দাগ ওঠানো যায়নি। দাগ ওঠে না। কথাটা মনোয়ার হোসেন সাহেব মোটে মানতে নারাজ। এর ভিতরে ভেতরে ভোলা তার শার্টটা হারিয়ে ফেলেছে। খোঁজাখুঁজিও যতেষ্ট হয়েছে। এই শার্ট দোকানে নেই। ভুল ডেলিভারিতে কোথাও চলে গেছে। সে ফেরত নিয়ে না এলে এই শার্ট তাকে দেওয়া কোনোদিনও সম্ভব না। কিন্তু নাছোড়বান্দা মনোয়ার হোসেন সাহেব তিনি তার শার্ট ফেরত চান। হুমকি-ধমকি নয় অলরেডী ভদ্রলোক আদালতে কার্তিক বাবুর নামে মামলা ঠুকে দিয়েছেন। যে ঘটনা তার জীবনে গত চল্লিশ বছরেও ঘটেনি।
কার্তিক বাবু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার নামে মনোয়ার সাহেব প্রতারণার মামলা ঠুকে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্লাইন্টদের দামী কাপড়চোপড় অন্যত্র বিক্রি করে আসছেন। সবখানে পার পেয়ে গেলেও কার্তিক বাবু আজ মনোয়ার সাহেবের কাছে ধরা খেয়ে গেলেন। তিনি এখন কাঠগড়ায়। তার হাত-পা ভীষণ রকম কাঁপছে। যেকোনো মুহূর্তে পড়ে যেতে পারেন। কিছুক্ষণ পর ভোলাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। সে গ্রামের বাড়িতে পালিয়ে গিয়েছিলো। পুলিশ তাকে ধরে এনেছে।
ভোলাকে রিমান্ডে নিলে হয়ত আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে।
এসেছেও। সামান্য একটি পুরাতন শার্টের জন্য লোকটার এত বাড়াবাড়ি ভোলা কোনভাবে মেনে নিতে পারেনি। সে তার ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করেছে। মনোয়ার সাহেবকে ভুজুংভাজুং দিয়ে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে এহেন অপকর্মটি করেছে। তার শখের শার্ট চোরাই মার্কেটে বিক্রি করে দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি যে কাঠগড়া পর্যন্ত গিয়ে গড়াবে___এটা ভাবতে পারেনি।
দাগ উঠেছিল। যেটুকু ছিলো, ওটা চোখে পড়ার মতো নয়। কিন্তু ভোলা যে লোকটার ওপর এতটা ক্ষিপ্ত হয়েছিলো কার্তিক বাবু মোটেও বুঝতে পারেননি। কতবড় বদমায়েশ।
মনোয়ার সাহেব আগামীকাল ভোলাকে নিয়ে চোরাই মার্কেটে যাবেন। তার সেই প্রিয় শার্টটি খুঁজবেন।
