সবার পরনে সাদা সেলোয়ার কামিজ আর চুনরি ডিজাইন ওড়না। মাস্টার্স ক্লাসের শেষ দিন আজ। সামনের মাস থেকে পরীক্ষা শুরু হবে। প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। বড় মাঠে সবুজ ঘাসের উপর মেয়েগুলো হৈ-হুল্লোড় করছে। বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে একেকজন। চিৎকার করে উঠলো সায়ন্তনী।
“চল, পরীক্ষার আগে বর্ষাকালে একটা টুর দিয়ে ফ্রেশ হই। মাথাটা জ্যাম হয়ে গেছে। পাহাড়ে ঘুরে আসি। তারপর জবরদস্তি পড়া নিয়ে বসি।”
মীরা চমকে উঠে।
“কি বলিস এসব! এক মাস পরে ফাইনাল।”
হো হো শব্দে হেসে ওঠে সায়ন্তনী আর তিথি। ওদের হাসি দেখে বাকিরাও হেসে কুটিকুটি। এইবার ফ্লোর পায় সায়ন্তনী। কিছু তোয়াক্কা করে না।
“সারাজীবন তুই খালি পড়লি আর নোট করলি। তুই পড়। আমরা মজা করে আসি। কয়দিন পর বিয়েশাদি হলে জামাইয়ের সেবা যতœ করবি। টুরে যাওয়ার আসল মজাটা এখন। ফ্রি বার্ডস নাউ।”
কথা থামিয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টি কমে এসেছে। ছিপছিপে পাতলা শরীরের সায়ন্তনীর চোখ চিকচিক করছে। “তোরা কে কে রাজি বল?” আমি আমি করে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। সবার পিছনে মীরাও দাঁড়ায় এসে। সায়ন্তনী মুখ টিপে হাসে। “তাইলে ফাইনাল। আমরা দুই রাত থাকব। সাতজন মাত্র। যাই হোক সমস্যা নেই।”
“কিভাবে যাবি?” তন্বী জিগ্যেস করে।
“এটা আমার উপর ভরসা রাখ।”
“না বলছিলাম যে, কোনো প্যাকেজ নিব?”
“না না, এসব প্যাকেজ ভাল্লাগে না। নিজের মতো মজা করব। আমরা বাসে খাগড়াছড়ি যাব। ওখান থেকে জিপে করে সাজেক।”
“খরচ কেমন হবে রে সায়ন্তনী?” রিমির গলার স্বর ক্ষীণ।
“আরে ভাবিস না রিমি। তোর খরচটা আমি শেয়ার করব। বাকি সবাই যার যার।”
পাহাড়ের একদম চূড়ায় ‘সুখনিবাস’ বাংলোটি। বাংলোর কেয়ারটেকার এক বৃদ্ধ। নাম তার মোবারক। টুরিস্টরা এলে তাকে মোবারক চাচা ডাকে। বলা যায় পাহাড়ের সবার কাছে সে মোবারক চাচা। ঝাঁকড়া চুলের পুরোটা রূপালি রঙের, আলো পড়লে চিকচিক করে। সবসময় সাদা শার্ট আর খাকি ঢোলা প্যান্ট পরে। শার্টের হাতা দুই ভাঁজ দিয়ে গুটিয়ে রাখে। ঢাকা থেকে একটা দল আসছে। সাত বান্ধবীর দল। সাতটা যুবতী মেয়ে! মোবারক বাংলো পরিষ্কার করতে লেগে যায়। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো টুরিস্ট ওঠেনি। আষাঢ় মাসে জমে উঠবে ব্যবসা। মনে মনে ভেবে খুশি হয় মোবারক। দোতলার তিনটা রুম বুকিং কনফার্ম। নিচ তলা খালি। এ সপ্তাহে কেউ আসছে না। রান্নাঘর নিচে। মোবারক উপরের ঘরগুলো পরিস্কার করে নতুন চাদর বিছায়। ফুলদানিতে ফুল রাখে। বুনো ফুল অনেকগুলো। সবগুলো রুমে ফুল রাখে মোবারক, লাল-হলুদ-গোলাপি।
তিথি, মীরা, সায়ন্তনী, রিমি, জয়া, নিশি এবং তন্বী- রোমাঞ্চের খোঁজে রওনা দেয়। প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে খাগড়াছড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে। জিপ এসে সুখনিবাসে থামে। বেলা বারোটা সবাজে। আকাশ কালো করে ঝড় হচ্ছে। আশেপাশে কিচ্ছু দেখা যায় না। গাড়ি থেকে সাতজন নামা মাত্র চুপচুপে ভিজে যায়।
মোবারক একটা মাত্র ছাতা হাতে এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে। হঠাৎ দমকা বাতাস এসে ছাতা উড়িয়ে নিয়ে যায়। মোবারকের পিছনে পিছনে ওরা আসে।
বৃদ্ধ মোবারক চাচা তাদের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সময় বললো, “আপনারা সাতজন এসেছেন, কিন্তু ফেরার সময় কি সাতজনই থাকবেন? এ পাহাড়ে একজন সবসময় বাড়তি থাকে।”
মেয়েরা হো হো করে হেসে উঠল মোবারকের কথায়।
“দারুণ থ্রিল তো।” সায়ন্তনী বলে। “আমরা তো থ্রিল আর চিল করতে আসছি চাচা। আটজন কেন, যাওয়ার সময় সবাই ডাবল হব। চৌদ্দ জন।”
সায়ন্তনীর কথায় সবাই আরেকবার হো হো হাসিতে ফেটে পড়ে।
মোবারক কিছু বলে না। চোখের মনিটা কেবল এদিক ওদিক ঘুরায়। কেমন চুপসে থাকে মোবারক। খাকি ঢোলা প্যান্টে কাঁদার ছিটা লেগেছে। তাকিয়ে দেখে ইতস্তত বোধ করে। কিভাবে লাগলো কাঁদা! সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলার রুমে দিয়ে আসে। তিনটা চাবি এগিয়ে দেয়।
“তিনটা চাবি কেন চাচা? আমরা তো সাতজন।”
“তিনটা রুমের জন্য তিনটা চাবি।”
“তিনটা রুমের সাতটা চাবি দিন। সবগুলো চাবি নিয়ে আসেন। এসব মানব না আমরা।”
মোবারক বুঝতে পারছে না কি করবে। মেয়েগুলো কি বলছে এসব! ওরা কি সত্যি সত্যি এসেছে। মাথা নাড়তে নাড়তে নিচে নেমে আসে মোবারক। মাথাভর্তি রূপালি চুল এলোমেলো হয়ে আছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে গা শিউরে ওঠে মোবারকের।
ফ্রেশ হয়ে সবাই ঘুম দেয়। একবারে রাতে ওঠে। ডিনার শেষে আগুনের কুন্ডলী ঘিরে বসে আছে সবাই। ঝড়ের জন্য পুরো পাহাড় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিচ তলার খালি জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে মোবারক। হঠাৎ তিথি চিৎকার করে উঠল। সে গুনছে- এক, দুই, তিন… আট!
“আমাদের মাঝে আটজন কে?” তিথির আঙুল যেখানে নির্দেশ করছিল, সেখানে শুধুই কুয়াশা। কিন্তু আগুনের আলোয় সেখানে একটা লম্বা ছায়া দেখা যাচ্ছে। তিথি সবাইকে বলতে চেষ্টা করছে কিন্তু তার গলার আওয়াজ কেউ শুনতে পারছে না। এত কাছে বসে আছে সবাই তবু কেউ কারো সাথে কথা শুনতে পারছে না।
হঠাৎ করেই খেয়াল হলো, মাঝখানের টেবিলে রাখা তিথির দামী হীরের আংটিটা নেই। সবাই হতভম্ব! বাইরে প্রচ- ঝড়-বৃষ্টি, কেউ ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। তার মানে আংটিটা কোথায় যাবে। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। এই সাতজনের মধ্যেই কারো কাছে আছে।
সায়ন্তনী ছিল একটু শান্ত মাথার মেয়ে। সে বললো,“চল্ আমরা নিজেদের তল্লাশি করি।” কিন্তু তল্লাশি করেও লাভ হলো না। আংটিটা কারোর কাছেই নেই।
রিমি কান্নাকাটি শুরু করল, “আমাদের মধ্যে চোর কে? আমরা তো একে অপরকে চিনি বছরের পর বছর!”
নিশি হঠাৎ বলল, “বারান্দার জানলার কাঁচটা একটু ভাঙা। কিন্তু বৃষ্টির জল ভেতরে আসেনি।”
জয়া বলল, “যদি কেউ জানলা দিয়ে ওটা ফেলে দেয়?”
সায়ন্তনী সবার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিল। সে দেখল মীরা বারবার তার হাতের ঘড়িটা দেখছে এবং একটু বেশিই ঘামছে।
সায়ন্তনী হাসিমুখে বলল, “মীরা, তোর ঘড়িটা একটু দেখাবি? খুব সুন্দর তো!”
মীরা আঁতকে উঠে বলল, “না, এটা তো সাধারণ ঘড়ি! দেখার কি আছে!”
সায়ন্তনী আর দেরি করল না। সে মীরার হাত থেকে ঘড়িটা টেনে নিল। ঘড়ির ডায়ালের পেছনের একটা গোপন খাঁজে আংটিটা লুকানো ছিল। মীরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সবাই উঠে রুমে চলে যায়। এরপর আর আড্ডা জমে না। শোঁ শোঁ আওয়াজ হচ্ছে। প্রচন্ড ঝোড়ো বাতাস। যেন বাংলোটা উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
সকাল থেকেই মীরা কেমন যেন বদলে গেল। সে সারাক্ষণ আয়নার সামনে বসে বিড়বিড় করতে থাকে। সায়ন্তনী লক্ষ্য করল, আয়নায় মীরার প্রতিবিম্ব তার সাথে তাল মেলাচ্ছে না! মীরা যখন হাসছে, আয়নার প্রতিবিম্ব তখন কাঁদছে।
দুপুরে একসাথে খেতে বসে মীরার গলার কাছে নীলচে আঙুলের ছাপ লক্ষ্য করল রিমি। যেন কেউ তাকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু মীরা নির্বিকার। শুধু বলল, “ওরা আমার রক্ত চাইছে।”
“কারা রক্ত চাইছে?” রিমি জিগ্যেস করে।
“যারা আংটি নিতে চেয়েছিল। নীলমণি আংটি।”
“সায়ন্তনী, এদিকে আয়। মীরা এমন করছে কেন।” ভয়ে চিৎকার করে রিমি। বলতে বলতে মেঝেতে ঢলে পড়ে মীরা। প্রচন্ড ভারি মীরার শরীর। অনেক চেষ্টা করেও সামান্য সরাতে পারে না ওরা।
সায়ন্তনী বুঝতে পারল এটা কোনো সাধারণ চুরি নয়।
এই বাংলোতে বহু বছর আগে এক অতৃপ্ত আত্মা সাতজন কুমারীর প্রাণ নিয়েছিল অমর হওয়ার জন্য। আজ সেই চক্র আবার পূর্ণ হতে চলেছে।
রাত বারোটা। হঠাৎ বাংলোর নিচের তলার বড় হলঘর থেকে নূপুরের আওয়াজ আসতে শুরু করল। ওরা ছয়জন ভয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নিচে নামল। মেঝের ওপর রক্ত দিয়ে একটা বিশাল বৃত্ত আঁকা। আর সেই বৃত্তের সাতটি কোণে সাতজনের নাম লেখা। মাঝখানে বসে আছে মীরা। তার চোখ দুটো পুরো সাদা হয়ে গেছে। সে একটা অদ্ভুত ভাষায় মন্ত্র পড়ছে। হঠাৎ বাংলোর সব দরজা-জানলা খটাস শব্দে একসাথে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের ঝড় আর ভেতরের অতিপ্রাকৃত শক্তি মিলে এক বিভীষিকা পরিবেশ তৈরি করল।
হঠাৎ নিশি চিৎকার করে উঠল, “মীরাকে দেখ!”
সবাই মীরার দিকে তাকায়। মীরার শরীরটা আস্তে আস্তে মাটির ওপর থেকে শূন্যে উঠতে শুরু করল। সায়ন্তনী সাহস সঞ্চয় করে সাথে থাকা পানি পড়া মীরার গায়ে ছিটিয়ে দিল এবং জোরে জোরে দোয়া পড়তে শুরু করল। এক বিকট চিৎকারে বাংলোর জানলার কাঁচগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। একটি কালো ধোঁয়া মীরার শরীর ছেড়ে জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল। সাথে সাথে মীরা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
মীরার শরীর থেকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে গেল, মেয়েরা ভেবেছিল আতঙ্ক শেষ হয়েছে। কিন্তু তারা জানত না, পাহাড়ের আত্মা সহজে শিকার ছাড়ে না। সে শুধু তাদের একজনের শরীর ছেড়ে অন্য কারোর ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষা করছিল।
ভোর হওয়ার আগেই তন্বী উঠে গেল। বাংলোর মূল দরজাটা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ, অথচ চাবিটা গায়েব। হঠাৎ ওপর তলা থেকে এক বিকট হাসির শব্দ ভেসে এল। সবাই দৌড়ে ওপরে গেল, রিমি সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আছে। তার পা দুটো মাটি থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি ওপরে কাঁপছে। সবাই রিমিকে নামানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রিমির ছায়াটা মেঝেতে নেই! রিমির শরীরটা দুলছে, কিন্তু তার কোনো প্রতিবিম্ব আয়নায় পড়ছে না। রিমি হঠাৎ চোখ মেলল। তার চোখ দুটো কুচকুচে কালো, কোনো মণি নেই।
রিমি ফিসফিস করে বলল, “তোদের মধ্যে একজন আগেই মরে গেছে, তোরা কি জানিস কে?”
আতঙ্কে সবাই ছিটকে পিছিয়ে এল। জয়া চিৎকার করে নিচে নামতে গেল, সিঁড়িগুলো আর নিচে নামছে না; সিঁড়িগুলো যেন অনন্তকাল ধরে ওপরের দিকেই উঠে যাচ্ছে। তারা এক গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছে।
হঠাৎ জয়া অনুভব করল তার ঘাড়ের কাছে কারো ঠান্ডা নিঃশ্বাস। চমকে উঠে পেছনে তাকায়। নিশি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নিশির মুখটা পুরো তুবড়ে গেছে, যেন ওপর থেকে পড়ে থেঁতলে গেছে। নিশি হাসল, তার মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল।
“কাল রাতে পাহাড় থেকে পড়ে আমি যখন মারা গেলাম, তোরা কেউ কেন দেখতে পেলি না?”
সায়ন্তনী বুঝতে পারল, তারা আসলে কেউ আর বেঁচে নেই। গত রাতে যখন তারা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আসছিল, তাদের গাড়িটা খাদে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের আত্মাগুলো সেটা মানতে পারেনি বলেই তারা এই বাংলোয় পৌঁছেছিল। তারা নিজেদের লাশের ছবি দেখতে পেল বাংলোর দেওয়ালে টাঙানো পুরানো ফ্রেমে। সেখানে সাতটি কফিনের ছবি। সায়ন্তনী চিৎকার করে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কিন্তু তার কান্না শোনার কেউ নেই।
বৃদ্ধ মোবারক চাচা এক গাদা মাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কবরের ওপর মাটি চাপা দিতে দিতে বিড়বিড় করছে, “সাতজন এসেছিল, সাতজনই মাটির নিচে গেল। পাহাড়ের ক্ষুধা মিটল।”
হঠাৎ বাংলোর সব আলো নিভে গেল। ঘোর অন্ধকারে শুধু শোনা গেল সাতটি মেয়ের সমস্বরে আর্তনাদ, যা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল পাহাড়ের গভীর নিস্তব্ধতায়।
সকালে খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ আসে। খাদ থেকে একটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ি উদ্ধার করে পুলিশ। গাড়ির ভেতরে সাতটি তরুণীর লাশ পাওয়া যায়। তাদের প্রত্যেকের হাতের মুঠোয় একটি করে পুরনো চাবি।
