এ রইদ পোহানোর জন্য না, গা জুড়ানোর জন্যও না, এ রইদ উষ্ণতার জন্য না, থর থর করে শীতে কাঁপলেও এ রইদ আপনার জন্য না। রইদ চায় আপনি অস্বস্তিতে পড়ুন, উদ্রেক হন,বিব্রত হন, উদ্বিগ্ন হন, আর নিজের পৃথিবীতে আসার সৃষ্টির রহস্যে নিমগ্ন হন, আপনার ভেতর ভাবনার বুদবুদ জেগে উঠুক। আপনি তীব্র কনফিউজড হন। ভাবতে থাকুন, ভাবতে থাকুন, আবার ভাবতে থাকুন। রইদে রইদের সাধু, পাগলী কি তবে বুক অফ জেনেসিসের চরিত্র, না তা কি করে হয়?
তবে কি গ্রিক কোন মিথলজি,নাকি পাগলীটা ইহুদি পুরাণ ও প্রাচীন মেসোপটেমীয় লোককাহিনীর লিলিথ। যিনি মানবজাতির প্রথম নারী এবং আদমের প্রথম স্ত্রী। বশ্যতা স্বীকার করতে অস্বীকার করায় তিনি আদিম স্বর্গ থেকে নির্বাসিত,পরবর্তীকালে তাকে অন্ধকার, প্রলোভন ও ডাইনিদের দেবী (বা ‘রাত্রিদেবী’) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়! নাকি ইভ। নাকি আমাদের সমাজে ঘুরে বেড়ানো নিছক কোনো পাগলী যাকে যে কেউ লালসায় প্রেগনেন্ট করে দিতেও দ্বিধা করে না। যাদের কাছে শিশু রামিশা বা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পাগলীর কোনো পার্থক্য নেই। নাকি রইদ আমাদের বাংলা সাহিত্যের কোনো প্রাচীণ লোক সংস্কৃতির অংশ বিশেষ নাকি কেবলই কোনো মিথ?
রইদ কি জাদুবাস্তবতার গল্প; এই ধরুন মার্কেজ বা হারুকি মুরাকামি ভর করে থাকতে পারে রইদ লেখকের ঘাড়ে, না সুলতান না পিকাসোর কোনো আর্ট ভর করেছিলো, নাকি রইদ কোনো দুর্বোধ্য কবিতা, এই ধরুন বুঝতে না পারা কোনো কবিতা বা আর্ট (ছবি) অনায়াসে আমরা একটা নামে ডাকি তা হলো Abstract!
আসলেই কি? রইদ’ কে এক নামে সবাই তো সিনেমাই বলছে বা বলবে এটাই বাস্তবতা। কারন সিনেমা হলে বসে টিকেট কেটে একজন পরিচালকের নির্মাণে নায়ক নায়িকারদের অভিনয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেপ্লেক্সে পপকর্ণ হাতে বসে দেখে আসা সুন্দর একটি চিত্রায়ণ “রইদ”!
তবে আমি তো কোনো সিনেমার উপাদান পাইনি, গানানাচা নাই, মারামারি নাই, ছেড়ে দে শয়তান নাই, সিনেমা হলে শিষ বা হুইসেল নাই, নায়ক নায়িকাদের উহু আহা নাই, এমনকি তাদের অভিনয়ও নাই! তবে কি আছে ” রইদ” এ? কতগুলো গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া? এরাই অভিনেতা ও অভিনেত্রী?
“রইদ” আপনাকে নাড়াতে আপনারও প্রস্তুতি লাগবে, তা না হলে আপনি কতগুলো গরু ছাগল মহিষ ও সুন্দর সুন্দর কতগুলো জায়গা দেখতে পাবেন আর হল থেকে বের হতে হতে বলবেন সাধু তার শালী (কুলসুম নামে ছাগল) কে কেটেকুটে খেয়ে ফেললো? বউকে পাইলো না তো ( হল থেকে বের হওয়ার মুখে সিড়িতে চব্বিশ /পঁচিশ বছরের এক তরুন তার সাথের তরুনীকে এই কথাই বলতে বলতে বের হচ্ছিল, উত্তরে তরুনী বলছিলো আমাকে না পেলে কি তোমার শালীকে,আরেহ তুমি তো আর পাগল না! তাৎক্ষনিক এসব শুনে হাসবো না ডেকে কথা বলবো) যাহোক,সাধু যেভাবে কুলসুম (ছাগল) কে হজম করেছিলো, আমিও কথাগুলো হজম করলাম আর ভাবলাম পরিচালক অপাত্রে দান করলেন কি এমন আর্ট!
ঢালাওভাবে আমি বলতে রাজি নই যে বাংলাদেশ এই সিনেমা হজম করার জন্য তৈরি না, সেই গল্পের মতো ছাই দিতে দিতে হাত হোক। দর্শক যা চাইবে তা দেখানোর চেয়ে লেখক বা পরিচালক এর কাজ তারাও যা চান তা দর্শক দেখুক, পাঠক পড়ুক । তৈরি হোক তাদের মনস্তত্ত্ব।
এই ধরনের আর্ট Andrei Tarkovsky, Terrence Malick এর কাজে অনেকটা দেখতে পাই। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল দেখছি না হয়তো ফকনার বা মার্কেজের কোনো বই পড়ছি।
মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ কে বলা যাবে হয়তো অনর্গল কিন্তু লিখতে হবে অর্গল বন্ধ করে। কারণ এখানে বলা বা লেখার চেয়ে চিন্তার খোরাক টুকুই বেশি।
রইদ মূলত মাটি, মিথ, মানব জীবনের আদি স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। সৃষ্টি রহস্য উন্মোচিত করবার একটি প্রয়াস। ধীরে ধীরে যেভাবে নদী বয়ে যায়, যেভাবে বায়ুমণ্ডলে বাতাস প্রবাহমান হয়, যেভাবে ঋতু চক্রাকারে ফিরে আসে, যেভাবে মেঘ কেটে রোদ আসে, যেভাবে দিন অতিক্রম করে রাত আসে, যেভাবে পাপ – পূণ্যের পরিনতি হয় তেমনি করে সহজাত, প্রাণবন্ত, ও সরল ভঙ্গিতে মেজবাউর রহমান সুমন রইদ’ ছবিটি এঁকেছেন। ছবি আঁকতে গিয়ে তিনি কোথাও থামেননি, থামতে দেননি কলাকুশলীদেরও। এমনকি দর্শকও যাতে না থামতে পারে সেইরকমই ছবিটি এঁকেছিলেন।
সবচাইতে বিস্ময়কর ব্যাপার হল এখানে প্রধান দুই চরিত্র কোন অভিনয় করেননি। যেভাবে সহজাত মানুষেরা জীবনে বয়ে যেতে দেয়, জীবনকে চলে যেতে দেয়, ঋতু চক্রাকারে মুহূর্তগুলো যায় এবং আসে, তেমন করে মুহূর্তগুলো এলো এবং চলে গেল। রেখে গেল বুক ভরা অস্বস্তি, কনফিউশন এবং কিলবিলে অনেক প্রশ্ন!
এই সিনেমাটা কেবল দেখবার জন্য নয়, অনুভব করবার জন্য। এই মনে হবে এই মনে হবে আপনি বাস্তবতায় আছেন, পরক্ষণে মিথে ডুবে যাবেন। প্রতীকী অর্থে অনেকগুলো বিষয় এখানে রয়েছে। স্পয়লার দিতে চাইনা, তবু কিছু কথা বলতেই হয় ;
যেমন এখানে ছাগল বা কুলসুম চরিত্র, একটি চমৎকার প্রতীকী অর্থে পরিচালক দেখিয়েছেন, ছাগল মানুষের গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনগুলোর একটি। গ্রামীণ জীবনে এটি সরলতা, নির্ভরতা এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার প্রতীক। রইদ-এ ছাগল সেই আদিম, অপ্রদূষিত জীবনের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি এখনও আলাদা হয়ে যায়নি।।
অনেক সংস্কৃতি ও ধর্মে ছাগল বলিদানের প্রাণী। ফলে ছাগল মানুষের দুঃখ, পাপ, ভয় বা ভাগ্য বহনকারী এক প্রতীকও হতে পারে। ইংরেজি “scapegoat” (পাপের বোঝা বহনকারী) শব্দটিও এখান থেকেই এসেছে। এটি সভ্যতার আবরণহীন মানুষের প্রতীকও হতে পারে বা বাংলার গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতিতে ছাগল শুধু একটি প্রাণী নয়, সংসার, সম্পদ, টিকে থাকা এবং দৈনন্দিন জীবনেরও প্রতীক। তাই রইদ-এ এটি বাস্তবতা ও মিথের মধ্যবর্তী এক সেতু হিসেবেও কাজ করতে পারে। আমার কাছে রইদ-এর সামগ্রিক আবহ বিবেচনায় ছাগলটি সবচেয়ে বেশি আদিম জীবন, নির্দোষতা এবং বলিদানের সম্ভাব্য প্রতীক বলে মনে হয়।
আবার সাধুর আকাঙ্ক্ষা হজমের প্রতীক বলে মনে হয়। সাধু বারবার তার বউ পাগলীকে পেতে চেয়েছিল, আকাঙ্ক্ষা করেছিল তার কাছে যাবার। তাকে ভোগ করবার, কিন্তু পারেনি। শেষ পর্যন্ত তার পোষ্য ছাগলের মাংস দিয়ে অতিভোজনের দৃশ্য আদিম আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বলে মনে হয়।
আরও অনেক প্রতীকী বিষয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তাল। যতবার সাধু তাল হাতে নেয় ততবার বউ ফিরে আসে। এটি কি গন্ধম ফলের প্রতীক? বা জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণের প্রতীক? তাল কি তবে আকাঙ্খার প্রতীক? নিষিদ্ধ গন্ধম খেয়ে যেমন আদম- হাওয়া দুনিয়ায় আসে। তেমনভাবে হারিয়ে যাওয়া বউ ফিরে আসে। বউয়ের ফিরে আসা আর কিছুটা শুধরে যাওয়া অথার্ৎ সাদু যেমন করে আকাঙ্খা করে তেমন করে একটু একটু বদলে যাওয়া আবার ছাগলটির ভোজন শেষে অনেক তাল ফিরে পাওয়া এবং তারপরও হাত বাড়িয়ে থাকা এসব কেবলই প্রতীকী অর্থে?
বউ পাগলীর ফিরে আসা এবং আসবার পর সাদুর পাপ করা তারপর তাকে ফিরিয়ে দেওয়া আবারো আকাঙ্ক্ষা করা আবারো আকাঙ্ক্ষা করা। এসব বাস্তবতায় নারীর প্রতি আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের প্রতীক নয় কি?
এখানে পাগলী প্রকৃতি, পাগলী মাটি। পাগলী সহজ ও সহজাত। তার কোন নাম নেই, তার কোন নাম থাকতেও নেই। জল, তিনি ছল, তিনি বল। তিনি শক্তি। তিনি আলো। তাকে স্পর্শ করা যায় না অনুভব করা যায়। তিনি রইদ, তাকে উপভোগ নয় কেবল সম্ভোগও করা যায়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় বেষ্টিত হয়ে তাকে অনুভব করা যায়। অস্তিত্বের আবডালে পুষে বোধের, বোঝার৷
এই জায়গায় রইদ-এর সঙ্গে আন্দ্রেই টারকোভস্কির চলচ্চিত্রের একটি আত্মীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়। টারকোভস্কির মতোই এখানে সময় ধীরে প্রবাহিত হয়। দৃশ্যগুলো গল্পকে এগিয়ে নেওয়ার চেয়ে অনুভূতির স্তর তৈরি করে। আবার প্রকৃতির ভেতর মানুষের আধ্যাত্মিক অবস্থান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে টেরেন্স মালিকের স্মৃতিও জাগে। তবে রইদ কোনো অনুকরণ নয়; এর শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত বাংলার মাটি, জল, পাহাড়, হাওর ও লোকজ সংস্কৃতিতে।
রইদকে ম্যাজিক রিয়ালিজমের বললে কি ভুল হবে? বাস্তব ও অবাস্তবের সীমারেখা কখনও স্পষ্ট থাকেনি যে! সীমার সাথে অসীমের দূরত্ব যেন গুছিয়ে এনেছেন নির্মাতা অনেকখানি। এই বৈশিষ্ট্য গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নিঃসঙ্গতার ১০০ বছর কে মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের অসীম থেকে সীমায় ফিরে আসা,আবার সীমা থেকে অসীমে ছুটে চলা।
নির্মাতা সুমনের নিজস্বতা খেয়াল করেছিলাম হাওয়া চলচ্চিত্রে, এখানেও সুমন তার নিজস্বতা তার স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন পুরোপুরি। তার শেষ কারিশমা দেখিয়েছেন তিনি শেষ দৃশ্যে। নরনারী দুহাত মিলে পৃথিবীর বুকে যে স্বস্তি চেয়েছেন তা অপূর্ব! নাকি তাদের দিকে ঈশ্বর স্বয়ং হাত বাড়ালেন? নাকি মানবের সহজাত আকাঙ্খার বাড়ানো হাত আমরা দেখতে পাই?
মেজবাউর সুমনের নিজস্বতার মধ্যে সবচেয়ে বড় যে দিকটি আমার কাছে তা হল যার যে প্রকৃতি যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দেওয়ার চেষ্টা। তিনি গ্রামীণ মানুষের জীবন আঁকতে গিয়ে অযথা রোমান্টিক বা করুণ চরিত্রে পরিণত করেননি। বরং তাদের জীবনকে তার নিজস্ব রহস্য, সৌন্দর্য ও জটিলতাসহ উপস্থাপন করেছেন। ফলে তার রইদ শহুরে দৃষ্টির বাইরে গিয়ে তার নিজস্ব চরিত্রে দাঁড়িয়ে অস্তিত্বের মুখোমুখি হয়।
তবে রইদ সবার জন্য না। যারা গতির গল্প, স্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট কোনো সমাপ্তি খুঁজবেন, তাদের কাছে ছবিটি ধীর বা দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। কারণ রইদ প্রশ্ন জাগায়, উত্তর কম দেয়। এটি দর্শকের সামনে চিন্তার দরজা খুলে দেয় কিন্তু কোন পথে চিন্তা হাঁটবে তা বলে দেয় না।
তবে রইদ দেখতে বসলে কেবল রইদ” ই দেখতে হবে,পপকর্ণে কামড় বসিয়ে রইদ” দেখতে পারবেন না!
এটি একটি গল্প নয়; মাটি, বৃষ্টি, জল, মেঘ, ধুলো,গাছ, প্রাণ, স্মৃতি, লোকবিশ্বাস এবং মানুষের আদি সত্তা, ও আদিমতাকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এক শিল্পিত প্রয়াস।
অভিনেতা অভিনেত্রীদের কথা কি বলবো, নাজিফা তুষি এখানে কোন অভিনয় করেননি যেনো পাগলী চরিত্র তাই এত সহজাত,এত প্রাণোচ্ছল, স্বাভাবিক।
সাদু চরিত্র অর্থাৎ মোস্তাফিজুর রহমান ইমরানও একই রকম অনেকটাই বলিষ্ঠ। ঋতুচক্রের মতোই তার শিল্পিত প্রয়াসের চেষ্টার সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন।
অন্যান্য চরিত্র যেমন বড় মা তৃষ্ণা সরকার, গাজী রাকায়েত, বন্ধু চরিত্র সবাই যার যার অভিনয় দিয়ে, নিজস্বতা দিয়ে বাস্তব করে তুলেছেন ‘রইদ’কে। এক কথায় সকলেই খুব ভালো করেছেন।
সিনেমাটোগ্রাফির কথা কি বলবো! দুর্দান্ত! দুর্দান্ত!
মিউজিকের বিষয়টিও খুবই লক্ষণীয়। প্রতিটি মিউজিক মনে হচ্ছিল সময় উপযোগী। মাছির ভনভন শব্দটিও মিথলজির চরিত্রের তা বোঝাতে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সঙ্গীত পরিচালক। এরকম অনেক কিছুই রয়েছে যা লিখতে গেলে কলে-বরে বৃদ্ধি পাবে। তবে ছবিটি ধীর, অমিমাংসিত।
