আমাদের আকাশটা ওভাবে আর দেখা যায় না, শুধু শব্দ শোনা যায়। দূরে কোথাও বোমা পড়লে আমাদের দেয়াল কেঁপে ওঠে। জানালার কাঁচ অনেক আগেই ভেঙে গেছে। আমাদের ছোট্ট ঘরের বাতাসেও এখন পোড়া ধুলোর গন্ধ। আমি আর ইকবাল দেয়ালের ক্ষয়ে যাওয়া ছোট্ট এক ছিদ্রের পাশে বসে আছি। সেই ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালের ছিদ্র দিয়ে আমাদের লাল বলটা দেখা যাচ্ছে। ইকবালের বয়স পাঁচ। সে আমার ছোট ভাই।
আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। প্রায় দুই ঘন্টা যাবত ইকবাল আর আমি বলটার জন্য বসে আছি। ইকবালের চোখদুটো জলে টলমল করছে। তার অপেক্ষা যেন আর সইছে না! লাল বলটা ইকবালের খুব প্রিয়। আমাদের অনেক বল আছে, কিন্তু আমরা লাল বলটা দিয়েই খেলি! আমার সাঈদ মামা বলটা এনে দিয়েছিল। ঈদের আগের দিন। মামা খুব ভালো ফুটবল খেলতো। তাকে নাকি গাজার মেসি বলে ডাকতো। এক স্নিগ্ধ বিকেলে বুঝে ওঠার আগেই আকাশ থেকে একটি বোমা খেলার মাঠে এসে পড়ে। মুহুর্তেই খেলার মাঠের আনন্দ শোকের ছায়ায় পরিণত হয়! মামার স্মৃতি হিসেবে লাল বলটা ছাড়া আর কিছু নেই!
আমাদের কলোনীর সব ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। আতংকভরা জীবন নিয়ে রাস্তা দেখতে আমার খুব ভালো লাগছে। তেজহীন সূর্যের আলোয় রাস্তায় কোন মানুষ নেই। ফাঁকা রাস্তায় লাল বলটা সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথাবার্তা ছাড়া হঠাৎ একটা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ এসে বাতাস কাঁপিয়ে দেয়। আমি ছিদ্র থেকে চোখ সড়িয়ে নিই! ইকবাল ভয় পেয়ে ও আল্লাহ! বলে চিৎকার দেয়। আম্মু দৌড়ে এসে আমাদের দু’জনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। আম্মুর হাত দুটো কাঁপছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, আম্মুও ভয় পেয়েছে। আমরা ছাড়া তার আর কেউ নেই। আব্বু অনেক আগেই চলে গেছে। আম্মু বলেছিল,সে আরেকটা বিয়ে করেছে।
এখন পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক। যদিও আমাদের এইখানে স্বাভাবিক বলে কিছু নেই! কখন কি হয়ে যায়! আল্লাহ, ছাড়া কেউ জানে না! আম্মুকে আমাদের লাল বলের কথা বলি। আম্মু বলল, — “বলটা থাক।
পরে আরেকটা কিনে দেব। কিন্তু আমরা জানি, এই বলটার মতো আর কোনো বল নেই। রাত হলে ইকবাল বলটাকে বুকে নিয়ে ঘুমায়। ঘুমানোর আগে চুমু খায়। মাঝেমধ্যে ফিসফিস করে বলটার সাথে কথাও বলে। আম্মু আমাকে বাইরে বের না হতে বলে, সে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। আজকে আমাদের প্রিয় খাবার রান্না হবে। মাকুলুবা। খেতে দারুণমজা।
অনেকক্ষণ কোনো বোমার শব্দ নেই। মনে হয় বোমাগুলো হয়য়য়ে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে । অনেক দূর পাড়ি দিয়ে আসে তো! আমি আস্তে আস্তে দরজার কাছে গেলাম। দরজার হুকটা ধরতেই বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো। ঠিক তখনই ইকবাল একটা হাঁচি দেয়, আমি ভয় পেয়ে আবার হুক লাগিয়ে দিলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি, ইকবাল আমার দিকে হতাকিয়ে হাসছে। তার হাসি দেখে আমিও হাসতে লাগলাম। কয়েক মিনিট ধরে আমরা হাসতে লাগলাম। হাসি বন্ধ হওয়ার পরে আমাদের চোখাচোখি হলেই আবার হাসতে থাকি। আমাদের হাসির শব্দ শুনে আম্মু ছুটে আসে। আম্মুও আমাদের সাথে হাসতে থাকে। আসলে ইকবাল এর একটু শ্বাসকষ্ট আছে। হাসতে হাসতে তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আম্মু এসে তার বুকটা মালিশ করে দিচ্ছে। তবুও তার হাসি বন্ধ হচ্ছে না!আম্মু আবার রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। আম্মু যাওয়ার পর ইকবালের হাসিও বন্ধ হয়ে যায়।
আমি আবার ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকালাম। বলটা এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। রোদের মধ্যে লাল হয়ে জ্বলছে। আমি যদি স্পাইডারম্যান হতাম! জাল ছুড়ে বলটা টেনে আনতাম। আম্মু রান্না শেষ করে গোসলখানায় ঢুকল। মাকুলুবার সুগন্ধে আমার খিদে লেগে গেছে। ঘর নিস্তব্ধ।
বাইরে কোনো শব্দ নেই। এখনই সময় বলটা নিয়ে আসার। দরজাটা একটু ফাঁক করতেই রোদের আলো ভেতরে ঢুকে পড়ল। আমি ডানে-বামে তাকালাম। রাস্তা ফাঁকা। বলটা যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি মনে মনে হিসাব করলাম— ত্রিশ সেকেন্ড। এর বেশি লাগবে না।
উসাইন বোল্টের কথা মনে পড়ল। আমি বড় হয়ে তার মতো দৌড়বিদ হব। পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত মানুষ। আমি ইকবালের দিকে তাকালাম, ইকবাল হাতের ইশারায় আমাকে সম্মতি দেয়। আমি নিঃশ্বাস নিলাম। তারপর দৌড় দিলাম। রাস্তায় নেমেই মনে হলো পৃথিবীটা হঠাৎ বিশাল হয়ে গেছে। বুকের ভেতর কাঁপুনি। কানে নিজের হৃদয়ের শব্দ। আমি বলটা তুলে নিলাম। ঠিক তখনই আকাশ কেঁপে উঠল। বিকট বিস্ফোরণ। আমি আর পেছনে তাকাইনি। এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আমার বুক তখনো ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে আমি একশো মিটার দৌড়ে এসেছি। ইকবাল ছুটে এসে বলটা বুকে জড়িয়ে ধরল। তার চোখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল। ঠিক তখনই আম্মু আমাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আম্মুর চোখের এককোনে পানি জমে আছে। অবাক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বুঝা যাচ্ছে আম্মু মোটেই আমার কাজটি পছন্দ করেনি। সে আমাদের সাথে কথা না বলে ভিতরের রুমে ঢুকে যায়। একটু পর আম্মু ডাক দিয়ে বলে—— “ওয়াসি… ইকবালকে নিয়ে খেতে আয়।”
হ্যাঁ, আমার নাম ওয়াসি।
*
লেখক | চলচ্চিত্র নির্মাতা
গল্পটি পড়ে ভালো লাগলে,
লেখককে সম্মানি হিসেবে ২০ টাকা পাঠাতে পারেন৷
যেখানে পাঠাবেন [01704447411 (বিকাশ/নগদ)]
