-১৬
-১৮
-২২
-২৪
-২৬
-২৮
-ডাবল
-রিডবল
-পাস
-সেভেনে
“ম্যারেজ, ফার্স্ট কার্ড!” বলে সজোরে এক বাড়ি দিল কমল। লিটন নক্কা মেরে আরেক বাড়ি দিল। ইশকার ছিঁড়ার গোলাম, নাইন সিরিয়ালে খেলে যাচ্ছে কমল। গেম ওভার। ছানোয়ার, মোস্তফা থ হয়ে তাকিয়ে রইল। মোস্তফা বলল—পাক্কা জুয়াড়ি।
বাড়ির চারদিকে ছেলে, বুড়ো-বুড়ির হৈচৈ। ছানু চুটকি বলতে লাগল। “সেদিন ধৈঞ্চাখেতে কার্ড খেলতেছিলাম। কে যেন বলল—পুলিশ আইয়ে! দে দৌড়! আমি কোনো রকমে লুঙ্গি খোঁচায় গুঁজে পার হয়ে গেলাম দেয়াল। মোবা মেম্বার বাড়ির দিকে দৌড় দিতেই খোলা ড্রেনে পড়ে গেল। কোনো রকম ইজ্জত রক্ষা। নাসিরে তো কট।” মোস্তফা হাসতে লাগল। লিটনও হাসতেছে। মোবারক চুপ। কমল অন্যমনস্ক। চুটকির দিকে কোনো খেয়াল নেই। তাকিয়ে আছে সামনের খোলা উঠানের দিকে। এক ঝাঁক হাঁস প্যাকপ্যাক করতে করতে নেমে যাচ্ছে বিলের জলে। জলের খোলা প্রেমপত্র পেয়ে হয়তো। ঠোঁটে হাজার বছরের কবিতা। আকাশমনি গাছের পাতাগুলো বাতাসের প্রেমে পড়ে ঝিরঝির শব্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। এক মায়াবী বাঁশির সুর। প্রকৃতি নিজেই তার বাঁশিওয়ালা। সোঁদা মাটির ভেতর থেকে জেগে ওঠা এক সুর। কিছুটা জানাশোনা, কিছুটা অজানা— বাকিটা চর্যাপদের মতো এক আলো-আঁধারি ভাষা— ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর’— এমন এক সুর।
দুপুরবেলা। বারোটা প্রায়। রাতে বৃষ্টি হয়েছে কয়েক দফা। সকালেও বৃষ্টি হয়েছে কয়েক দফা। এখনো বৃষ্টির একটা মাতাল গন্ধ আছে আকাশজুড়ে। আবার রোদেরও ঘ্রাণ আছে। তালপাকা রোদ। ভাদ্র মাস বলে কথা। বর্শার ফলার মতো বিঁধে এমন রোদের তেজ। শরীর জ্বলে বৃষ্টিভেজা পচা মরিচের মতো। চোখও জ্বলায়, মনও পোড়ায়।
—মোবা, লাইট দে!
এই বলে একপ্রকার টান দিয়েই গ্যাসলাইটটি নিয়ে নিল কমল। সিগারেট জ্বালাল। সে কী টান, সিগারেটের দম বের হওয়ার জোগাড়। সিগারেটের যদি জবান থাকত, বলত—ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। “কেমন জানি অস্বাভাবিক লাগছে, এত অচেনা আগে কখনো লাগেনি কমলকে”—ছানোয়ার বলল।
চর জানাজাতের খোলা জলে বাড়ির বউ-ঝি, ছেলে-বুড়ো সকলে গোসলে মেতে উঠছে। এই চর এবছর আছে তো আসছে বছর নাই। পদ্মার এই ভাঙাগড়ার সাথে এই জনপদের ছেলেপুলে থেকে বুড়োবুড়ি সবাই অবগত। এই পদ্মারই আরেক নাম কীর্তিনাশা। একটু আগে আজান পড়েছে। জুম্মার আজান। নামাজের পর মেহমান সব এসে পড়বে। বউভাতের সব দাওয়াতি মেহমান। ইতিমধ্যে দু-একজন এসেও পড়েছে। নৌকা ব্যতীত অন্য কোনো বাহন নেই। তারপর যখন-তখন মেঘের লুকোচুরি, বৃষ্টির গোপন ভালোবাসা। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যে দিকেই যাও—বর্ষার থৈথৈ পানি আর পানি। ছোট ছোট দ্বীপের মতো সব ঘরবাড়ি। দূর থেকে মনে হয় কোনো চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়। এক ঘনগভীর রহস্যে ভরপুর এসব গ্রামীণ কাব্যকলা। কমল বুদ্ধের মতো কোনো এক গভীর রহস্যের ভেতর ডুবে আছে। বাহ্যিক এসব দিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
—শালা, শুয়োরের বাচ্চা। বাইনচোদ!
—কী রে, কী হলো? লিটন কমলকে ঠেলা দিয়ে বলল।
—না, কিছু না।
আরও জোরে সিগারেটে একটা যেন স্টিকি টান দিচ্ছে কমল। চোখ লাল। চাহনি এলোমেলো। মোস্তফা বলল—লিটন, যোয়াইস না। আরেক সিট হবে নাকি? কমল চুপ করে রইল।
লিটন বুঝল। একদম চুপ হয়ে গেল। সে অনেক বছর আগের কথা। জুয়ার নেশায় পাগল হয়ে কমলের বাপ ঘরবাড়ি, সংসার, ধানি জমি, ব্যবসাপাতি সব তছনছ করে দিয়েছে। বাপ এখন কই, কোনো হদিস নেই। সেই শৈশব থেকে কমল বানভাসি মানুষের মতো ভেলা বয়ে যাচ্ছে অকূল নদীর সায়রে। কোনো কূল নেই। কী সোনার সংসার! কী উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ! সব শেষ। সেদিনগুলোর কথা মাথায় এলে বাপজানকে মনে মনে সাতশ গালি দেয়। বাপের এই করুণ পরিণতির কথা মনে করে কমল শপথ করেছিল—নিজের কাছেই, কোনো দিন সে জুয়ার আসরে বসবে না। মদ স্পর্শ করবে না। কোনো নারীর কামনায় প্রলুব্ধ হবে না। সে পা দেবে না কোনো মোহের ফাঁদে। পঁচিশ বছরের এক যুবক কমল। যৌবনের কাঁচা রঙ তার শরীরের পরতে পরতে। এত বছর কমল অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করে আসছে। কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। মাঝে মাঝে যদিও বন্ধুদের সাথে তাসের আসরে বসত, জাস্ট কৌতূহলবশত। কখনো কলব্রিজ, কখনো টুয়েন্টি নাইন, কখনো তিন কার্ড খেলত। যখন খেলে একদম জুয়াড়ির মতো খেলে। যখন খেলে না, তখন একদম আনাড়ি। জেনেটিক সিকোয়েন্স। বাপকা বেটা ভার্সন ২.০।
রাত নেমে এল—যেভাবে নেমে আসার কথা সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা পার হয়ে। পুরো পদ্মার চরে রাত। নিঝুম রাত। কেবল চাঁদের জোছনা ভেসে চলে চরের মিশকালো জলের বুক চিরে। গোপন প্রিয়ার মতো জেগে ওঠে তার কামনার কামরাঙা। বকুল ফুল। বকুল ফুল। বকুল ফুলের মতো নৌকা ভেসে চলছে জোছনার সায়রে।
মোস্তফা ভালো গিটার বাজায়। এক সময় তার একটা ব্যান্ডদল ছিল। নাম—’ভবের বাউল’। ভালো লিরিক লিখত। কেন যেন আর কনটিনিউ করল না। আজ কী মনে করে আবার গিটারে সুর তুলল। মোবারক গান ধরল—”ওরে নীল দরিয়া…”। লিটন স্টিক বানানোর কাজে গভীরভাবে নিমগ্ন। রাত বাড়ছে।
চাঁদের রঙ হলুদ হতে হতে ডিমের কুসুমের মতো রঙ হয়ে এসেছে। মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে রাজহাঁস হয়ে সে হলুদ জোছনা বনের ভেতর। দূরে জেলে নৌকার টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছে। ইশারায় ডাকছে রাতজাগা পাখিদের—আয়, দেখে যা। সে কী অপূর্ব আলো! এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর। জল নেচে উঠছে কামনার ছন্দে। বাতাস বয়ে যাচ্ছে খোলা বাতাসের গতিতে। ধানখেতের নিস্তব্ধ বাতাস কেটে চলছে ছোট্ট নৌকা। কখন যে গাঁজার নৌকা পাড় দিয়ে চলছে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আকাশটা ঘুরছে মাথার চারপাশে ভনভন করে। যেন মাছি ভনভন করে ঘোরে মরা মাছের চারপাশে। মনে হয় চাঁদ যেন জলের প্রেমে হাবুডুবু হাবুডুবু খাচ্ছে। চাঁদ যেন কানাই কৃষ্ণ, জল যেন বনমালী রাধামাধব। ওই আকাশের ওপারে ছিল স্বর্গের আবাস। সেখানেই বাস ইন্দ্রের তথা কমলদের…
—শালা, শুয়োরের বাচ্চা। বাইনচোদ!
কমলের মুখ থেকে আবার বের হয়ে আসছে…
—কী রে, আবার কী হলো? ছানু কমলকে টোকা দিয়ে বলল।
—না, কিছু না। কমলের উত্তর।
মোবারক মোস্তফাকে জিজ্ঞেস করল, “বল তো দোস্ত, কোন শালায় এই তাস খেলা আবিষ্কার করেছে? শালায় বদের হাড্ডি। সব কেড়ে নেয়। তিলে তিলে মারে। পঁচাইয়া মারে! নেশায় পড়লে ঘরবাড়ির পথ ভুল হয়ে যায়। কামকাজে মন থাকে না। কখন আবার বসবে; কখন। তাসের নেশায় পড়ে সব গেল!” মোস্তফা বলল—দীপালীও গেল?
কমল তাকিয়ে তাকিয়ে কার্ডের কিংগুলোর ছবি দেখে। স্পেডসের কিং—কিং ডেভিড, হার্টসের কিং—শার্লেমেন, ডায়মন্ডসের কিং—জুলিয়াস সিজার এবং ক্লাবস-এর কিং—আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। কমলের কাছে সবচেয়ে রহস্যময় লাগে—কিং অব হার্টসকে। কী অদ্ভুত কিং! নিজ তরবারি দিয়ে নিজ হাতেই নিজের মাথায় ঠেকিয়ে আছে নিজের মাথা কেটে ফেলার জন্য। কী উদ্যত দৃশ্য! কী বীভৎস! এই কিংয়ের সাথেই খেলার ভবিতব্য উৎকীর্ণ। এখানে ক্লান্ত নয় কমল; নিউটনের মতো তার মাথায় প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—এই পৃথিবীতে এত এত মহামতি, সম্রাট থাকতে কেবল মাত্র এই চারজনকেই কেন বেছে নিল কার্ড আবিষ্কারকগণ? কোন ক্রাইটেরিয়ায়? কোনো পক্ষপাতদুষ্ট হয়নি তো? মহামতি আকবর দ্য গ্রেট কিংবা কিং সলোমন কিংবা সম্রাট অশোককেও তো নেওয়া যেত? যেত না! যেহেতু রোমান অধিপতি জুলিয়াস সিজার আছে, ক্লিওপেট্রাও তো রানির পদ অলংকৃত করতে পারত! পারত না! রানির স্থানে দেখছি যুদ্ধের দেবী প্যালাস, পবিত্র বাইবেলের জুডিথ, রচেল এবং ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথকে। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান হলে কী এমন ক্ষতি হতো! ট্রয়ের হেলেন হলে! কেন, ক্ষতি হতো কি? কী বলিস মোস্তফা?
মোস্তফা বলল—অত জেনে কী লাভ বল! হতো জেনে কোনো লাভ নেই। চল আরেক দাইন খেলি। ৫০০।
ঠিক বলেছিস—অত জেনে কোনো লাভ নেই। কমল শার্লেমেনের মাঝেই নিজ পিতাকে আর জুলিয়াস সিজারের মাঝেই নিজের একটা সুস্পষ্ট রেখা দেখতে পেল। যেমন নাবিকেরা সপ্তর্ষী নক্ষত্রের আলোতে হাল চেনে অকূল দরিয়ার কূলহীন নৌকার গতিপথে। যেমন জ্যোতিষীরা নক্ষত্রের ছলাকলায় খুঁজে পায় ভাগ্যের দেবীকে।
কমল উঠে গেল। উঠে গিয়ে বাড়ির খড়ের পালাটা পার হয়ে আকাশমনি গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়াল। মনে মনে বলল, জীবন এক অদ্ভুত জিনিস! ৫২ তাসের মতো। কেউ কারো সাথে মেলে না। সকলেরই একটা আলাদা জীবন আছে। আলাদা একটা রহস্য। এই রহস্যের গোলকধাঁধায় পড়ে আজ এপার কাল ওপার সোনার রঙ ফলায়। আজ এই দিক কাল ওই দিক ঘুরে আসে পাড়াবেড়ানি বাতাস। সব সিরিয়াল টু-এর খেলা। মোবারক ভাবে—কিং ডেভিড কিংবা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের জায়গায় যদি দরবেশ বাবা কিংবা লোটাস কামালের ছবি হতো, খারাপ হতো কি? হতো না। হায়রে শেয়ারবাজার! টিউশনির জমানো টাকা সব খোয়া গেল ৫২ বাজার ৫৩ গলির বাঁকে। এ-ও এক জুয়া খেলা।
কমলের মনে পড়ে যায় শৈশবে যখন সে হাটের দিন বাজারে যেত, দেখত ক্যানভাসার জাদুকররা তাস দিয়ে নানা রকম জাদু দেখাত। কীভাবে তাস দিয়ে টাকা বানিয়ে ফেলত। সে টাকা সবুজ ঘাসে ছড়িয়ে রাখত। নতুন সব টাকা। চোখ চড়কগাছ হয়ে যেত। দেখে দেখে কমলের ইচ্ছা হতো বড় হয়ে সে জাদুকর হবে। সব তাস টাকা বানিয়ে ফেলবে। বড় হতে হতে কমল বুঝল এই ৫২ বাজারের কত চক্কর। সোনার সংসার রাংতার মতো এলোমেলো। মা কোথায়—সে জানে না। ভাই কোথায়—সে জানে না। বোন কোথায়—সে জানে না। বাবা কোথায়—সে তাও জানে না। সব নিখোঁজের শিরোনামে।
—শালা, শুয়োরের বাচ্চা।
মনে পড়ে যায় কমলের। সে শপথ করেছিল নিজের কাছে—কোনো দিন সে তাস খেলবে না, মদ খাবে না, নারীর প্ররোচনায় পড়বে না। সেও বাবার মতো গোপন চোরাবালির পথে হারিয়ে যায়। পিছনে পড়ে থাকে ইন্দ্রপ্রস্থ। কোনো এক দ্রৌপদী চিৎকার করে ওঠে। সমগ্র বসুধার বক্ষে তখন কদমফুল… হায় যুধিষ্ঠির! হায় কমল! হায় পাশা! হায় তাস! কমল জলপিপি হলে কী ক্ষতি হতো! কিংবা গোবরে পদ্মফুল!
-১৬
-১৮
-২২
-২৪
-২৬
-২৮
-ডাবল
-রিডবল
-পাস
-সেভেনে
