অভি ছেলেটা দেখতে তেমন কিছু না। মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রং শ্যামলা, চুলগুলো সবসময় এলোমেলো। কিন্তু তার চোখ দুটোতে এমন কিছু ছিল, যা রিমাকে প্রথম দিন থেকেই টেনেছিল। সেই চোখে ছিল একটা নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি, যেন বলছে — তোমাকে আমি ছাড়ব না, কখনো না।
ভালোবাসার শুরুটা হয়েছিল তুচ্ছ একটা ঘটনায়।
সেদিন বৃষ্টি নেমেছিল হঠাৎ করে। রিমা স্কুল থেকে ফিরছিল, ব্যাগের বইগুলো ভিজে যাচ্ছিল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সে কী করবে বুঝতে পারছিল না। তখন অভি তার ছাতাটা রিমার মাথার উপর ধরে বলেছিল, “বাড়ি কোনদিকে?”
রিমা রাগী গলায় বলেছিল, “চেনা নেই, অপরিচিত মানুষের ছাতা নেওয়া হয় না।”
অভি হেসে বলেছিল, “তাহলে পরিচিত হয়ে যাই। আমি অভি, আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের ছেলে।”
সেই বৃষ্টির দিন থেকে দুজনের পথ একটাই হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ভালোবাসার পথ কখনো মসৃণ হয় না।
অভির বাবা আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন কড়া মেজাজের মানুষ। গ্রামে তার কথার ওজন ছিল। তিনি শুনেছিলেন ছেলে একটা মেয়ের পেছনে ঘুরছে। সেদিন রাতের খাবার টেবিলে তিনি থালা রেখে সোজাসুজি বললেন, “অভি, এই পাগলামি বন্ধ কর। বংশের ইজ্জত নিয়ে খেলা করতে দেব না।”
অভি মাথা নামিয়ে চুপ করে রইল। কিন্তু তার চোখে পানি আসেনি, আসেনি রাগও। শুধু একটা দৃঢ় শান্তি ছিল, যেন সে জানে — সময় তার পক্ষে।
রিমার বাড়িতেও ঝড় উঠেছিল। তার বাবা হাসুমিয়া মিয়া মেয়েকে ডেকে বলেছিলেন, “রিমা, তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? ওই ছেলের পরিবারের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক হবে না।”
রিমা সেদিন প্রথমবার বাবার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার গলা কাঁপছিল, কিন্তু চোখে ছিল অদ্ভুত একটা আলো। বলেছিল, “বাবা, তুমি যদি না মানো, আমি সারাজীবন অবিবাহিত থাকব। কিন্তু অভি ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না।”
হাসুমিয়া মিয়া রাগে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের কথাটা তার বুকে গেঁথে গিয়েছিল।
দুটো বছর কেটে গেল লুকিয়ে দেখায়, চিঠিতে, ছোট ছোট মুহূর্তে।
অভি প্রতিদিন স্কুলের পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত। রিমা একটু দূর থেকে দেখে হাসত। সেই হাসিই ছিল অভির সারাদিনের শক্তি। বৃষ্টি হোক, রোদ হোক, অভি আসত। একদিনও বাদ পড়েনি।
রিমা একবার বলেছিল, “তোমাকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা ছোট হয়ে যায়। শুধু তুমি আর আমি।”
অভি উত্তর দিয়েছিল, “তুমি চোখ বন্ধ করো, আমি সবসময় থাকব। চোখ খুললেও থাকব, ঘুমালেও থাকব। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।”
কথাটা সেদিন কত সুন্দর লেগেছিল। কেউ জানত না এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে কত গভীর বেদনা।
দুই পরিবারের বাধা ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল।
হাসুমিয়া মিয়া একদিন নিজেই দেখলেন মেয়ে রাতের খাবার ঠিকমতো খাচ্ছে না। চোখের নিচে কালি পড়েছে। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই। তিনি বুঝলেন — এই মেয়েকে জোর করে আটকানো যাবে না। জোর করলে হারিয়ে যাবে।
সেদিন আসরের নামাজের পর আব্দুর রাজ্জাক নিজেই হাসুমিয়া মিয়ার বাড়িতে গিয়েছিলেন। দুই বুড়ো মানুষ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। তারপর হাসুমিয়া মিয়া বললেন, “আপনার ছেলে কি আমার মেয়েকে সুখে রাখতে পারবে?”
আব্দুর রাজ্জাক বুকে হাত দিয়ে বললেন, “আমার ছেলের চোখে আপনার মেয়ের জন্য যে ভালোবাসা দেখেছি, তা আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি।”
সেদিন দুই পরিবার এক হয়ে গিয়েছিল।
বিয়ের দিন ঠিক হল ফাল্গুনের শেষে।
রিমা যেদিন শুনল বিয়ে মঞ্জুর হয়েছে, সেদিন সে অভিকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “অভি, আমরা জিতে গেছি।”
অভির চোখেও পানি এসেছিল। বলেছিল, “না রিমা, আমরা না। তুমি জিতেছ। তোমার জেদ, তোমার ভালোবাসা জিতেছে।”
বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল দুই বাড়িতে। হাসুমিয়া মিয়া মেয়ের জন্য লাল বেনারসি কিনলেন। আব্দুর রাজ্জাক ছেলের জন্য শেরওয়ানি বানাতে দিলেন। বাড়িতে সব সময় হাসির শব্দ।
রিমার মা রাতে রিমার মাথায় তেল মাখিয়ে দিতে দিতে বললেন, “মা, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সবার মন জয় করিস।”
রিমা মায়ের কোলে মাথা রেখে বলেছিল, “মা, অভির পরিবারকে আমি নিজের পরিবার বানিয়ে নেব।”
সেদিন সকালে রিমা অভিকে বলেছিল, “চলো, বিয়ের কেনাকাটা সেরে আসি। মা বললেন বাজার থেকে কিছু জিনিস আনতে।”
অভি হেসে বলেছিল, “তুমি বললেই আমি যাব। পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও।”
দুজনে বেরিয়েছিল সকালে। কাপড়ের দোকান, গহনার দোকান, সংসারের ছোট ছোট জিনিস। রিমা প্রতিটা জিনিস হাতে নিয়ে দেখছিল আর ভাবছিল — এই কাঁসার বাটিটা কোথায় রাখবে, এই চাদরটা কোন ঘরে মানাবে। অভি পাশে দাঁড়িয়ে রিমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। রিমা টের পেয়ে বলত, “দেখছ কী?”
অভি বলত, “তোমাকে।”
রিমা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিত।
বিকেলে ফেরার পথে রিকশায় বসে রিমা অভির কাঁধে মাথা রেখেছিল। রাস্তার দুপাশে গাছের ছায়া পড়ছিল। হাওয়া ছিল মিষ্টি। রিমা ধীরে ধীরে বলেছিল, “অভি, আমি খুব সুখী।”
অভি তার মাথায় হাত রেখে বলেছিল, “আরো সুখী করব। সারাজীবন।”
তারপর সেই মুহূর্তটা এল — যে মুহূর্তের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না।
মেইন রোডে উঠতেই ট্রাকটা এল। ড্রাইভার হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিল, হয়তো ব্রেক ফেল হয়েছিল। কেউ জানে না। রিকশায় ধাক্কা লাগল এমন জোরে যে পৃথিবীটা এক মুহূর্তে থেমে গেল।
অভি রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ল। মাথায় আঘাত পেল, হাত ভাঙল। কিন্তু বেঁচে রইল।
রিমা… রিমা রইল না।
হাসপাতালের সাদা বিছানায় যখন অভি চোখ খুলল, তখন বাইরে রাত।
প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। মাথা ঘুরছিল। শরীরে ব্যথা। তারপর মনে পড়ল — রিমা।
সে উঠতে চাইল। ডাক্তার বাধা দিল। অভি কান্না না করে শুধু বলল, “রিমা কোথায়?”
কেউ উত্তর দিল না।
সে একটাও কথা বলল না। শুধু দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখ বন্ধ করল।
ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেল চুরমার হয়ে — যা কোনোদিন জোড়া লাগবে না।
রিমার বাড়িতে সেই রাতে কান্নার শব্দ থামেনি।
হাসুমিয়া মিয়া মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মেয়ে ঘুমিয়ে আছে মনে হচ্ছিল। এত শান্ত মুখ। এত নিষ্পাপ। সকালে যে মেয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়েছিল, সে আর ফিরে আসেনি।
লাল বেনারসিটা আলমারিতে ছিল। বিয়ের শাড়ি।
কেনা হয়েছিল, পরা হয়নি।
সাত দিন পর অভিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হল।



