পর্ব-১
এইমাত্র জন্ম হল আমার। মায়ের মুখটা এখনও পর্যন্ত ভালো করে দেখিনি। বাবা কে, তাও জানি না। শুধু এখন আমার চারপাশে ঘিরে ধরা আলো। পৃথিবীতে যে এত আলো আছে, এই প্রথম দেখছি আমি! দেখছি মানে এখনও কিন্তু আমার চোখ বন্ধই। সেই বন্ধ দুচোখ ভেদ করে ছুটে আসছে আলোকরশ্মি। অনুভব করতে পারছি, স্পষ্টই বুঝতে পারছি, আমাকে একটা তীব্র আলোর ঘরে রাখা হয়েছে। আমার ডানদিকে, বাদিকে আমার মতই ওদেরও দুচোখে তীব্র আলোর ঝলকানি। এত চেষ্টা করছি সেই আলোর মধ্যে তাকিয়ে দেখতে, আর প্রত্যেকেবারই চোখ বুজে আসছে আমার। বুঝতে পারছি এখানে এই ঘরে আরও কিছুটা দিন থাকতে হবে আমাকে।
প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম আমাকে এতটা তাড়াতাড়ি জন্ম দেওয়া হবে না। সেই অন্ধকার ঘরটায় এতদিন থাকতে গিয়ে, চারদিকে ভেসে থাকা জল আর মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছিলাম। ঘুম ভাঙতেই সেই অন্ধকার ঠেলে হঠাৎ বেরিয়ে আসা। একসময় মনে হয়েছিল, আমি হয়তো মরেই যাবো কিছুক্ষণের মধ্যে। কেমন সেই দম আটকে আসা আর ঘড়ির কাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধুকপুক ধুকপুক ওঠানামার শব্দ। তারপর এই প্রচণ্ড উত্তাপ। মায়ের উত্তাপ থেকে একেবারে আলাদা! কিভাবে যে শুইয়ে দিয়ে গেল কেউ এই ঘরটায়।
এখন অল্প অল্প হাত-পা নাড়তে শিখেছি। মুখে কিছু বলার চেষ্টা। এমনকি সেই তীব্র আলোর মধ্যেও প্রবলভাবে চোখ মেলে মায়ের মুখটা একবার দেখতে চাইছি। মাও কি আমার মতই, নাকি তীব্র ব্যথা কাটিয়ে উঠে এখন ধীরে ধীরে আসতে চাইছে আমার কাছে। যেখানে মুখোমুখি শুধু আমি আর মা। এতক্ষণে মায়ের সমস্ত যন্ত্রণা যেন আমি অনুভব করতে পারছি। এমনকি বিশ্বাস করুন, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই যে আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হল, সেই থেকে এখন পর্যন্ত আমি কিন্তু শুধু মাকেই খুঁজছি। এমনকি সেই অন্ধকার পেরিয়ে এই আলোর ঘরে এসেও। এত তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আমার। সবকিছু চিনতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে চোখ খুলে আমি ঠিক প্রথম মাকে দেখতে চাই। মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
আমি কিন্তু তখন সত্যি সত্যিই মায়ের সঙ্গে কথা বলতাম। মাও আমার সঙ্গে কত কথা বলতে চাইতো। এমনকি আমরা দুজনে যখন ঘুমিয়ে থাকতাম, মাকে কতদিন দেখেছি আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকতে। সেই অন্ধকারের ভেতরে তখন কত আলো। সেই ধুকপুক-ধুকপুক শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আমার বড় হয়ে চলা। স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম মা আমাকে কি ভীষণভাবে চাইছে। আমাকে কোলে তুলে নিতে চাইছে দুহাত আগলে। মায়ের হাতটা টের পেতাম। হাতের আঙুল। মায়ের আঙুল আমার মাথা বুলিয়ে দিচ্ছে কিংবা শরীর ছুঁয়ে পা পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে ক্রমশ। কি এক অদ্ভূত ভালোলাগা ঘিরে ধরা। সেই মুহূর্তে আমি যেন একটু নড়ে উঠতেই, ওমনি মাও কেমন লাফিয়ে উঠতো হঠাৎ। আর দুহাত দিয়ে আমাকে চেপে ধরে কি যেন বলতে চাইতো অনর্গল।
হয়তো বাবা থাকতো তখন পাশে। বাবাকে শুনিয়ে বলতো কথাগুলো। কিংবা হাসপাতালের সিস্টার। ডাক্তারও হতে পারে। তবে বাবার থাকার সম্ভাবনাটাই বেশি। কারণ বাবা নাকি এত তাড়াতাড়ি আমাকে চায়নি। কি এক বৃষ্টিভেজা রাতে অসাবধানে মাকে জড়িয়ে ধরে অঘটনটা ঘটিয়ে ফেলেছে। মাও যে ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল বাবাকে তাও নয়। হয়তো দুপক্ষেরই সায় ছিল। তবু আরও কিছুটা সময় নিতে চেয়েছিল বাবা। আর কিছুটা দিন পেরিয়ে যেতে চাইছিল কোনও ভাবে। হয়তো বুঝতে চাইছিল, এভাবে রাতারাতি দোকানটা উঠে যাওয়ার পরপরই আমাকে জন্ম দেওয়া ঠিক হল কিনা।
সে রাতে ঘুম হয়নি কারও। বাবা ভাবতেই পারেনি দোকানটা এভাবে উঠে যাবে। মানে এক রাতের মধ্যেই গুড়িয়ে দেবে ওরা। ইউনিয়নের অফিসে অবশ্য কদিন ধরেই পরপর মিটিং চলছিল। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছিল, প্রাণ দেবো, তবু এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়বো না। কিন্তু সে রাতে সবাই যখন দোকান বন্ধ করে চলে গেল, দোকানপাট সব ঝাঁপ বন্ধ, এদিকে স্টেশন চত্বর জুড়ে তখন পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা। খবরটা পেয়েই দৌড়ে গিয়েছিল বাবা। ততক্ষণে দোকানের শেষ দেওয়ালটা ভাঙা চলছে।
সকালবেলা মা এসে চিনতেই পারেনি জায়গাটা। এমনকি বাবার দোকানটা খুঁজতে সময়ে লেগেছে আরও অনেকক্ষণ। রেললাইনের দুপাশে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা দেওয়ালের ভেতর থেকে তখনও উঁকি দিচ্ছে লজেন্স, বিস্কুট আর টুকরো হয়ে যাওয়া আচারের বয়াম। চায়ের কেটলিটাও একপাশে মুখ থুবড়ে পরে ছিল সারারাত। সেই ধুলো মাখা ধ্বংসস্তূপে দোকানটাকে দেখে আঁতকে উঠেছিল মা। যে ঘরটা ঘিরে একটু একটু স্বপ্ন গড়ে উঠছিল, বেঁচে থাকার একটু ভরসা, সেটাই আজ ধুলোয় মিশে গেল। বেঁচে থাকার ভরসাটাই গুড়িয়ে দিয়েছিল যেন কেউ। যেন জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এরপর পৃথিবী জুড়ে শুধুই শূন্যতা।
বাবা অবশ্য হাল ছাড়েনি। তারপরও ভাঙা দেওয়ালটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল বেশ কয়েকবার। কি যেন খুঁজছিল বাবা। আর প্রতিবারই ট্রেন আসার শব্দ বাবাকে সজাক করে দিয়ে চলে যাচ্ছিল নিজের গন্তব্যের দিকে। দোকানশূন্য স্টেশনটা আবার নীরব হতে চাইছিল নিজের মতো।
একদিন এই বাবাই, হয়তো শুধু আমার কথা ভেবে মাকে নিয়ে সোজা ছুটে এসেছিল হাসপাতালের দরজায়। মায়ের চোখে তখনও জল। হয়তো দোকানঘর হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়ার জল। আবার হয়তো আমাকে জন্ম দিতে হবে, এতকিছুর মধ্যেও নতুন আশার সন্ধান, যাকে ঘিরে মানুষ বেঁচে থাকে, তার জন্য কাঁদছিল মা।
আমি অবশ্য ততক্ষণে অন্ধকার ঘরে জল আর ধুকপুক ধুকপুক শব্দের সঙ্গে মিশে বড় হয়ে উঠেছি অনেকটাই। সেই ভীষণ ঘুমের মধ্যে টের পাচ্ছি, আমার মাথা ক্রমশ পরিপক্ক হচ্ছে। আমার হাত, পা, নখ, চুল বাড়ছে। বড় হতে হতে একসময় সেই অন্ধকার ঘরে আর থাকতে চাইছি না আমি। আমাকে আলোর দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে কেউ।
এখন আমাকে দেখলে সহজেই অনুমান করা যাবে আমি জন্মের পরপরই কেমন কাঁদতে শিখে ফেলেছি। এমনকি এই কাচের ঘর থেকে যখন আমাকে তুলে নেওয়া হল, সোজা এগিয়ে দেওয়া হল একুশ নম্বর বেডে, তখনও আমি কাঁদছি। আর এই কাঁদছি বলেই হয়তো মাও কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠছে। টের পাচ্ছি মা আমার জন্য ভাবছে— আমার নাকি খিদে পেয়েছে ভীষণ, সেই রাত থেকে কিছুই নাকি খাইনি।
সেই প্রথম আমাকে মায়ের কাছে দেওয়া। সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম, একটা শীতল হাত যেন আমাকে স্পর্শ করে গেল। ঠিক যেভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল সেই নড়ে ওঠার সময়। টের পেলাম, মায়ের হাত জুড়ে অসংখ্য সুচ বিদ্ধ হওয়ার দাগ। এমনকি পাশে সেলাইনের বোতলটা থেকে বিন্দু বিন্দু ফোঁটা তখনও গড়িয়ে পড়ছে অনর্গল। আমার সেই তীব্র কান্নায় মা দুহাত দিয়ে খুলে দিয়েছে বুক। যে বুক জুড়ে রোদে পোড়া চামড়াটা গুটিয়ে আছে। উঁকি দিচ্ছে হাড়। আমি হাতড়ে যাই। খুঁজতে চাই সেই হাড় সরিয়ে বুকের দুটো ঢেউ। যে ঢেউ থেকে অনর্গল স্রোত এসে ভিজিয়ে দেবে আমায়। শুধুমাত্র আমার জন্যই নামবে বৃষ্টি। অথচ কি আশ্চর্য, আমাকে কিছুতেই কিছু দিতে পারছে না মা।
আমি মায়ের দিকে তাকালাম। মাও কি আমাকে দেখতে চাইছে? নাকি মা এখন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে কিভাবে কত দ্রুত আমাকে শান্ত করাবে বলে। কত দ্রুত আমার মুখে ঢেলে দেবে তৃষ্ণা নিবারণের প্রয়োজনীয় বিন্দু বিন্দু বিচ্ছুরণ। সেই প্রথম দেখলাম, মায়ের চোখ ভর্তি জল। মা কাঁদছে। মা কাঁদছে কেন? কাউকে কি খুঁজছে মা? বাবাকে? চিৎকার করে ডাকতে চাইছে? কিছু বলতে চাইছে মা? আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি মায়ের হাহাকার।
আমার তখন কি যে এক কঠিন অবস্থা। না পারছি নিজেকে সামলাতে, না পারছি মায়ের পাশে দাঁড়াতে। প্রবল খিদেয় আমার চোখ-মুখ জুড়ে তখন অন্ধকার ঠেলে আসছে। মনে হচ্ছে আবার বুঝি আমি মরে যাবো। আমার গলা শুকিয়ে আসছে, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসছে ক্রমশ। তীব্র কষ্ট টের পাচ্ছি ভেতর থেকে। সেই সঙ্গে প্রবল ধুকপুক-ধুকপুক শব্দ। কেমন যেন ঘুমঘুম ভাব জড়িয়ে নিচ্ছে আমায়। আমি কি তাহলে আবার ঘুমিয়ে পড়ছি? গাঢ় ঘুম। এত ঘুম কেন ঘিরে ধরছে আমায়?
যখন চোখ মেলেছি, দেখি মায়ের পাশে শুয়ে আছি আমি। মা হয়তো এতক্ষণ আমার সজাগ হওয়ার অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে বসে ছিল। হয়তো ঘুমোয়নি সারারাত।
তাকিয়ে দেখি শুধু তো মা একা নয়, মায়ের পাশে থাকা লোকটা পর্যন্ত কেমন দেখছে আমায়। কেমন দাঁড়িয়ে আছে মায়ের গা ঘেঁষে। লোকটাকে চেনা লাগছে না? মনে হচ্ছে না, এই তো সেদিনের ভাঙা দোকানটার ভেতর থেকে টুকরো টুকরো লজেন্স আর বিস্কুটের প্যাকেটগুলি কুড়িয়ে এনে রেখেছে শুধুমাত্র আমার জন্য। কেন জানি মনে হচ্ছে, লোকটা শুধু আমাকেই দেখতে চাইছে অবাক হয়ে। এমনকি আমার চোখ, মুখ, হাত নাড়ানো, সবকিছু লক্ষ্য করতে চাইছে অবাক বিস্ময়ে। হয়তো ভাবছে, আমার সঙ্গে লোকটার কতকিছু মিল। মানে ওই এক রকম চোখ, এক রকম মুখ, হাত, এমনকি গায়ের রঙ পর্যন্ত।
লোকটা কি মায়ের পরিচিত কেউ? নাহলে কেনই বা এতক্ষণ মায়ের পাশে এসে এভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আর কেনই বা আমার সজাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক দৌড়ে সিস্টারকে ডেকে আনবে। তারপর ওর হাত থেকে কাগজের স্লিপটা নিয়ে সোজা দৌড়ে যাবে হাসপাতালের গেটের কাছে।
হাসপাতালের গেটের বাইরে তখন কত লোকের ভিড়। কত লোক উদগ্রীব হয়ে দেখার চেষ্টা করছে ভেতরটাকে। কেউ কেউ তো এসেছে একেবারে বিছানা-বালিস নিয়ে। শুয়ে আছে ঠিক গেটের মুখে। মাইকে ডাক এলেই দৌড় আসবে ভেতরের দিকে। আচ্ছা, আমার নামটাও কি? মানে মায়ের নামও কি এই মাইকে ডাকা হয়েছিল একসময়। যে নাম শুনে লোকটা এক দৌড়ে ছুটে এসেছিল সোজা মায়ের পাশে। গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছিল শুধু আমাকে।
ডাক্তার বলছিল, মায়ের বুকে নাকি দুধ নেই। আমাকে তাই অন্য এক মায়ের কাছে দেওয়া হল। সারাটা দুপুর সেই মা-ই আমাকে খাওয়ালো। মা তখন বেডে শুয়ে শুয়ে শুধু আমার খাওয়াই দেখছিল। দেখছিল কি পরম আনন্দে আমি খাচ্ছি। তারপর মায়ের কাছে ফিরে এসে জড়িয়ে নিয়েছি শান্ত ঘুম। টের পাচ্ছিলাম, মায়ের সেই ভাঙা শরীরটা তখনও আমাকে ওম দিয়ে যাচ্ছে। আর শুনিয়ে যাচ্ছে এক নতুন গল্প।
সেই গল্পে বাবা আমার পাশে এসে দাঁড়াবে। হাত থেকে ওষুধের থলিটা নামিয়ে রাখবে মাথার পাশে। তারপর আমাকে ছুঁতে চাইবে।
বাবা কি সত্যি সত্যিই ছুঁতে চাইবে আমায়?
বাবাকে বলি, দাঁড়িয়ে আছো কেন? কোলে তুলে নাও একবার।
দেখি সত্যি সত্যি বাবা আমাকে কোলে তুলে নেয়। বাবার এক হাত আমাকে জড়িয়ে ধরে, অন্য হাতের আঙুলকে শক্ত করে ধরি আমি। টের পাই বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে রাখতে চায়। হাসতে চায়। কথা বলতে চায় সারাদিন আমার সঙ্গে। কত দিনের জমে থাকা কথা। তারপর আমাকে নিয়ে এক দৌড়ে ছুটে যেতে চায় এই হাসপাতাল পেরিয়ে, স্টেশন চত্বর, ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে দূরে কোথাও।
-বাবা তুমি সত্যি সত্যি নিয়ে যাবে আমায়?
দেখি বাবা হাসে। খিলখিল করা হাসি। অবিকল ঠিক যেন আমার মতো।
দেখি, বাবার হাসির মধ্যে চোখ গড়িয়ে আসে জল। বাবা কি তাহলে কাঁদছে? বাবার চোখ ভর্তি জল ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার বুক।
-কি বললে, কাজের কথা চলছে একটা। রাতের সিফটে। এগারোটায় শুরু করে সেই ভোর পর্যন্ত জেগে থাকা। মাস গেলে চার হাজার দেবে ওরা।
বাবা আমাকে কোল থেকে নামিয়ে নেয়। ফিরে গিয়ে দাঁড়ায় মায়ের কাছে। মায়ের সেই সুচবিদ্ধ হাতটা মুহূর্তে যেন নড়ে ওঠে একবার। কিছু কি বলতে চাইছে মা? জানতে চাইছে, বাবা কিছু খেয়েছে কিনা? মানে এই যে এখন এত বেলা হয়েছে, কিছুই নাকি মুখে তোলেনি বাবা। মাকে বলেছিল, আমাকে না দেখা পর্যন্ত নাকি। মা রাগ করেছে ভীষণ। বলেছে, তুমি না বাঁচলে আমরা বাঁচবো কিভাবে?
দেখি বাবা আমাকে মায়ের পাশে রেখে দিয়ে একা হেঁটে যায়। বেরিয়ে যায় হাসপাতালের গেট পেরিয়ে রেললাইন, স্টেশনটাকে পাশে রেখে ভাঙা দোকানগুলি ডিঙিয়ে দূরে কোথাও। কোথায় যাচ্ছে বাবা? কিছু কি খুঁজছে তাহলে? নতুন কোনও রাস্তা। যে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে—।
নতুন কাজটা কিছুতেই হয়তো হাতছাড়া করতে চাইছে না বাবা। নতুন উপার্জন। সারাটা রাত না ঘুমিয়ে জেগে থেকে যখন ভোর ভোর, চোখটা জড়িয়ে আসবে, ঠিক সেই সময় ফাস্ট ট্রেনটা এসে দাঁড়াবে। হর্ণ বাজিয়ে চলে আসবে আবার। নেমে আসবে বাবা। সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে আসবে হাসপাতালের গেটে মুখে। আমাদের ঘুম ভাঙার আগেই মায়ের পাশে এসে দাঁড়াবে। ডেকে তুলবে দুজনকে। তারপর নিজের কাছে নিয়ে যেতে চাইবে।
মা বলবে, এত দেরি করলে যে? সেই যে কখন থেকে বসে আছি আসবে বলে।
বাবা বলবে, এতটা পথ, এটুকু সময় তো দেবে। তাছাড়া এখন তো আর তুমি একা নও। তোমাদের দুজনকেই যে নিতে হবে।
আমি দেখবো, মা কেমন ঝটপট নিজেকে তৈরি করে নেবে ফিরে যাওয়ার জন্য। বাবাও ওষুধপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজ, দৌড়োদৌড়ি করে গুছিয়ে নেবে কত অল্প সময়ে। বাবাকে কিন্তু দেখে বোঝাই যাবে না দোকানটা চলে যাবার পর এই এতগুলি দিন, হাতে তেমন কাজ নেই, টাকা-পয়সা নেই। এমনকি আমাদের নিতে এসেও পকেট প্রায় শূন্য। হয়তো ধার করে নিয়ে আসা সামান্য কিছু টাকা, হয়তো আমার কথা ভেবেই—।
মা কি কাঁদছে আবারও। আনন্দ অশ্রু না? এতদিন পরে ফিরে যাচ্ছে তাই। এমনকি বাবার হাত ধরে আমাকে নিয়ে গেট পেরিয়ে যাওয়ার সময় পিছন ফিরে একবার দেখতে চাইছে ছেড়ে যাওয়া ফাঁকা বেডটাকে। যে বেডের পাশে আরেক মা।
বাবা হাঁটছে। মাও। আমি বাবা আর মায়ের হাত ধরে হাঁটছি।
(ক্রমশ…)
