গ্রামের নাম ছাতিয়ানতলা৷ ঐতিহ্যবাহী কুশিয়ারা নদীর কুল ঘেষে গড়ে ওঠা প্রত্যন্ত একটি ছোট গ্রাম ছাতিয়ানতলা৷ গ্রামের একমাত্র নদীর ঘাটে একটি প্রকাণ্ড ছাতিম গাছ সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে গ্রামটির নাম ছাতিয়ানতলা নামকরণের সার্থকতা প্রমাণ করছে৷ আধুনিকতার ছোয়া বিহীন গ্রামটিতে প্রায় সহস্রাধিক মানুষের বসবাস৷ কোর্ট কাচারী বা অন্য কোন বড় ধরনের সমস্যায় না পড়লে কেউ শহরের দিকে যায় না ফলে আধুনিকতার এ যুগে কেউ এ গ্রামে আসলে বেশ অবাকই হবেন৷ নদীর ঘাট থেকে পায়ে হাঁটা কিছুটা পথ পেরুলেই গ্রাম্য আঁকাবাঁকা কাঁচা পথ সাপের মত গ্রামের পা ছুয়ে গেছে৷ ছয় ঋতু ছাতিয়ানতলায় আলাদা আলাদা মুখ নিয়ে আসে। বর্ষায় কুশিয়ারা উন্মত্ত, শরতে কাশবন সাদা, হেমন্তে ধানের গন্ধে ভরে ওঠে গ্রাম, শীতে কুয়াশা নেমে আসে, বসন্তে শিমুল-পলাশ লাল হয়ে জ্বলে ওঠে, আর গ্রীষ্মে বাতাসে মিশে থাকে পাকা ফলের গন্ধ।
এখন শরৎ কাল৷ ছাতিয়ানতলা গ্রামটি তার নিজ রুপের ডালা খুলে নিয়ে বসেছে৷ একজন অপরিচিত একটি ছেলে উজানের শহর কার্পাসডাঙ্গা থেকে নৌকায় চড়ে বসেছে গন্তব্য ছাতিয়ানতলা৷ আজন্ম শহরে বড় হওয়া ছেলেটির কাছে গ্রাম একটি কল্পনার রাজ্য৷ ছেলেটির নাম শাহাদাত হোসেন চৌধুরী৷ জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইট পাথরের শহর ঢাকায়৷ আজ সে ছাতিয়ানতলা গ্রামে যাচ্ছে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ছাতিয়ানতলা গ্রামের মাতবারের ছেলে জহির চাকলাদার এর আমন্ত্রণে গ্রাম ঘুরে দেখার জন্য৷ শাহাদাত যখন গ্রামের ঘাটে নৌকা থেকে নামল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে৷ ঘাটে কাউকে পেল না যাকে জিজ্ঞাসা করবে যে জহির চাকলাদারের বাড়ীটি কোন দিকে৷ কয়েক মুহুর্ত একা দাঁড়িয়ে থেকে মন স্থির করলো সামনের পথটি ধরে এগিয়ে যাবে। গ্রামের মধ্যে ঢুকলে নিশ্চয় কাউকে পেয়ে যাবে৷ সামনের দিকে পা বাড়াতেই সে দেখতে পেল একজন আসছে ঘাটের দিকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না নারী নাকি পুরুষ৷ সে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল৷ কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই সে বুঝতে পারলো যে আসছে সে একজন মেয়ে৷ বয়স উনিশ কিংবা বিশ৷ এলোমেলো চুল কপালে নেমে এসেছে। কাঁখে কলসি। হাঁটার সঙ্গে নূপুরের শব্দ মিলেমিশে তাকে আরও লক্ষণীয় করে তুলেছে। যেন কাশবনের ফাঁক দিয়ে হেঁটে আসা এক টুকরো বিকেল৷ শাহাদাত অবাক দৃষ্টিতে দেখছে৷ যখন কাছাকাছি চলে এসেছে তার পায়ের নুপরের ছন্দময় শব্দে চমকে ওঠে শাহাদাত যেন ঘুম পুরী থেকে জেগে উঠল সে৷ মেয়েটিকে দেখে মনে হলো গ্রামের বিকেল যেন মানুষের রূপ নিয়েছে। একটু ইতস্তত করে শাহাদাত ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো ,আচ্ছা জহির চাকলাদারের বাড়িটা কোন দিকে৷ জীবনে বহু নারীর সাথে কথা বলেছে শাহাদাত কিন্তু কখনও এমন হয়নি মনে হচ্ছে কে যেন তার গলা চেপে ধরে রেখেছে৷ ফিক করে হেসে মেয়েটি বলল, আপনার গলায় কি ব্যাঙ ঢুকেছে? এভাবে কথা বলছেন কেন?
একটু কাঁশি দিয়ে গলা ঠিক করার চেষ্টা করলো শাহাদাত তারপর ঢোক গিলে বলল, না…কিছু না৷ বললেন না বাড়ীটা কোনদিকে?
এই রাস্তা দিয়ে সোজা গিয়ে বড় গেট ওয়ালা যে বাড়ীটি দেখবেন সেটিই ওনাদের বাড়ী, কিছুটা লজ্জিত ভাবে জবাব দিল মেয়েটি৷ এমন সময় একটি নৌকা এসে ঘাটে ভিড়লো৷ নৌকার মাঝি জিজ্ঞাসা করে, কি হয়ছো গো বেটি মরিয়ম? কি জিগায়?
কিছু না চাচা চাকলাদার বাড়ি যাইবো, জবাব দেয় মরিয়ম৷
শাহাদাত হেঁটে গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করে৷ তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে মরিয়মের সেই ছবি৷ যেন বাস্তব নয় স্বপ্ন দেখেছে সে৷ রাতে খাবার পর শাহাদাতের অন্যমনস্ক ভাব দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করে জহির৷ শাহাদাত বিস্তারিত বললে জহির জানায় মরিয়ম এই গ্রামেরই কবির উদ্দিনের কন্যা৷ খুব অল্প বয়সে মা মারা যাবার পর থেকে সেই হয়ে উঠেছে বাড়ীর কত্রী৷ বাড়ীর কাজ থেকে শুরু করে বাঁদরামী কোন কিছুতেই তার জুড়ি নেই৷ সারা গ্রামের মানুষ তাকে একনামে চিনে৷ সাবধান ওর থেকে দূরে থাকবি বড্ড ফাজিল মেয়ে। পরদিন গ্রামটাকে ঘুরে দেখার জন্য জহিরের সাথে বের হয় শাহাদাত৷ সব সময় সে তার চোখের সামনে মরিয়মকে দেখতে পায়৷ গ্রাম ঘুরে ফেরার পথে রাস্তায় সাক্ষাৎ হয় মরিয়মের সাথে৷ শাহাদাত কে দেখেই খিলখিল করে হেসে ওঠে মরিয়ম৷ তারপর জহিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, মিয়াভাই তোমার বন্ধুর গলার ব্যাঙ কি বের হয়ছে নাকি কিছু করণ লাগবো? শাহাদাত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার সরলতা মাখা মুখটার দিকে৷ জাহির কুনই দিয়ে গুতো দিয়ে বলল, কিরে বল? কি খবর তোর?
শাহাদাত জহিরের কুনইয়ের গুতো খেয়ে ভড়কে গেল তারপর তাড়াহুড়ো করে বলল, না ঠিক আছে৷ কিন্ত আশ্চর্য আজও গলার সেই একই অবস্হা৷ জহিরও অবাক হয়ে যায় শাহাদাতের গলা শুনে৷ আবার খিল্খিল্ করে হেসে ওঠে মরিয়ম৷ তার হাসি যেন কাশবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হালকা বাতাস। এবার ধমক দিল জহির, আর দাঁত বের করে হাসতে হবে না৷ জরুরী একটা কাজে শহরে কাল শহরে যাবো আমি দুই তিন দিন থাকতে হতে পারে৷ আমি না আসা পর্যন্ত প্রতিদিন বিকালে ওকে গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাবি কেমন?
আপনার বন্ধু কি ছোট যে হারিয়ে যাবে তাই আমাকে দেখিয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে? বলে দুষ্টুমি ভরা হাসি হাসে মরিয়ম৷
আর পাকনামো করতে হবে না যা বললাম তাই করবি, বলে হাঁটতে শুরু করে জহির ও শাহাদাত৷ জহিরের কথা শুনে মাথা নিচু করল শাহাদাত। ঠোঁটের কোনে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু মরিয়ম কি আসবে? শংকিত হয় শাহাদাত৷ পরদিন বিকালে হাজির হয় মরিয়ম কালো পোশাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে৷ নদীর পাড়ের কাশবনের পাশ দিয়ে হাঁটছে দুজন৷ শাহাদাত যেন স্বপ্নের রাজ্যে ডানা মেলে উড়ছে৷ বাতাসের উপর হাটছে ৷ প্রচুর কথা বলে মরিয়ম৷ একের পর এক প্রশ্ন করেই চলেছে আর শাহাদাত উত্তর দিচ্ছে৷ অজ পাড়াগাঁয়ে এমন একটা মেয়ে কিছুতেই ভাবতে পারছে না শাহাদাত৷ নদীর পাড়ে অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে বাড়ি ফিরে শাহাদাত৷ পরের দিন আবার যথা সময়ে হাজির হয় মরিয়ম৷ নদীর পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে নিচে নদীতে একটা ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা বাঁধা দেখে শাহাদাত জিজ্ঞাসা করে, তুমি নৌকা চালাতে পারো?
আপনি চড়বেন? বলে হাতধরে টেনে নিচে এনে নৌকায় বসিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয় মরিয়ম৷ তারপর দক্ষ মাঝির মত ছপছপ করে পানিতে বৈঠা ফেলে নৌকা বাইতে শুরু করলো৷ অনেকক্ষণ নৌকায় করে ঘুরার পর যখন তারা ফিরলো তখন প্রায় সন্ধ্যা আগত৷ তারাতারি নৌকা বেঁধে বেশ উৎকন্ঠা নিয়ে মরিয়ম বলল, তারাতারি চলেন গ্রামের কেউ এই সন্ধ্যা বেলা দুজনকে দেখলে কিনা কি বলে বসে৷ শুনেছি শহরের মানুষ ভাল কিছু মনে করে না কিন্তু এটা গ্রাম৷ এতক্ষণে বিষয়টি মাথায় আসে শাহাদাতের আসলেই তাই৷ দ্রুত পায়ে ফিরে আসে তারা৷ প্রতিদিন বের হবার আগে শাহাদাত ভাবে আজ সে মরিয়মকে ভালোবাসার কথা বলবে কিন্তু মরিয়মের সামনে আসলেই সব এলোমেলো হয়ে যায়৷ আজ জহিরের শহরে যাবার ৩য় দিন৷ আজ বিকালে ও মরিয়ম এসেছে৷ আজ একটি লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরেছে৷ খোপায় ছাতিম ফুল গুজেছে। আজ তাকে দেব কন্যার মত দেখাচ্ছে ৷ দুজন হাঁটতে হাঁটতে এসে নদীর পাড়ে কাশবনে বসল৷ বাতাসে ছাতিম ফুলের মিষ্টি গন্ধ৷ আজ শাহাদাত মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে আজ সে বলবেই৷ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর শাহাদাত বলল, মরিয়ম আজ তোমাকে একটা কথা বলতে চাই শুনবে?
বলেন, সংক্ষেপে জবাব দেয় মরিয়ম।
তুমি যতক্ষণ আমার পাশে থাকো আমি তন্ময় হয়ে থাকি। তুমি চলে গেলেও আমার কানে তোমার পায়পর নুপুরের ধ্বনি বাজে। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, উত্তর দেয় শাহাদাত।
ভালোবাসা কি আমি জানি না৷ তবে আপনার প্রতি কেমন যেন মায়া জন্ম নিয়েছে আমার মনে৷ আপনার প্রতীক্ষায় কাটে আমার সারাক্ষণ৷ এটা যদি হয় ভালোবাসা তাহলে আমিও আপনাকে ভালবাসি, জবাব দেয় মরিয়ম৷ কিছুক্ষণ মৌন থাকার পর দুজনেই হেসে উঠল৷ সারাটি বিকাল কাশবনের পাশেই বসে কাটালো যখন তারা ফিরলো তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে৷ পথে দেখা হয়ে যায় মরিয়মের বাবার সাথে৷
সেদিন রাতে বাড়িতে ফিরলো জহির৷ শাহাদাত মরিয়মের প্রতি তার অনুভূতি জানায় জহিরকে। সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে জহির। তারপর বলে, আমিও মরিয়মকে ভালোবাসি।
শাহাদাতের শরীরটা টলে উঠল। থেমে পৃথিবী আহ্নিক গতি! একি করলো সে! বন্ধু বিশ্বাস করে নিজের ভালোবাসার মানুষকে তার সাথে রেখে গেলো আর সে কিনা! আর কিছুই ভাবতে পারে না শাহাদাত। দুজনেই নিশ্চুপ। নিরবতা ভাঙলো শাহাদাত।
আমাকে একটা নৌকার ব্যবস্থা করে দে আমি ঢাকায় ফিরে যাব, বন্ধুকে বলে শাহাদাত।
তারপর রাতের নির্জনতাকে সঙ্গী করে ছাতিয়ানতলা গ্রাম ত্যাগ করে নিরবে নিভৃতে।
পরদিন মরিয়ম চাকলাদার বাড়ি যখন এল তখন শাহাদাত ছাতিয়ানতলা গ্রাম থেকে অনেক দুরে৷ ছয় মাস কেটে গেছে। বিকেল হলেই মরিয়ম নদীর পাড়ে যায়। কাশবনের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। যেন বৃদ্ধ ছাতিম গাছের মতোই নিঃসঙ্গ সে। তারপর সন্ধ্যা নামলে ফিরে আসে। শাহাদাত আর ফিরে আসেনি।
