কবি হাসনাইন হীরা’র প্রথম কাব্যগ্রন্থ বাঁক বাচনের বৈঠা (২০২১)। কবি এ কাব্যে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে যেভাবে শব্দ ও চিত্রকল্পের মোড়কে বেঁধেছেন তা প্রশংসার যোগ্য। সময়ের পালাবদলে ব্যক্তিমানস, পরিবেশ ও প্রতিবেশের তীর্যকরূপটি বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে তিনি আরও একবার তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর কবিতা প্রথমবার পাঠ করলে পাঠকদের কাছে আপাতদৃষ্টিতে খাপ ছাড়া মনে হতে পারে; কিন্তু অনুসন্ধানী পাঠক মাত্রই এ কথা স্বীকার করবেন, যে নিবিড় পাঠে কবির প্রতিটি কবিতা স্বতন্ত্ররূপে ধরা দেয়। তিমির হননের কবি জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) কবিতা পড়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বলেছিলেন, ‘চিত্ররূপময়’।
কবি হাসনাইন হীরা’র কবিতা সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি যেন কাব্য পরিব্রাজক হয়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে ডুবুরি মতো পঙ্কিল ছেঁকে ছেঁকে মুক্তদানা তুলে এনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াসী হয়েছেন।
ফ্ল্যাপে কবি নিজের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সুনাম ও সনাম’ একই গাছের দু-দুটো ফল; একটা পাকলে অন্যটা লাল হয়ে ওঠে। একটা ঝরলে অন্যটা মুখস্ত করে মাটির টান। এমন অবাঞ্ছিত অভিমান ভুলতে গিয়ে নিজেকে একদিন খুন করে বসি, সেই থেকে আমি আর পৃথিবীতে নেই। শুনেছি, পৃথিবীতে এখন শোকসভা চলছে। শুনে খুব খুশি হয়েছি। খুশিতে হারিয়ে ফেলেছি আমার নাম। আজ আবার একা একা খুঁজতে বেরুলাম…।
চল্লিশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫)। তিরিশের কাব্যধারা এবং চল্লিশের প্রগতিবাদী জীবন চেতনার সমান্তরালে তিনি ঐতিহ্য, মিথ, দেশ, মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম ও সমাজভাবনাকে কাব্যকলার প্রধান উপজীব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন— যা সমসাময়িক কবিদের থেকে তাঁকে আলাদা অভিধায় চিহ্নিত করেছে। ব্যক্তি মানুষের জীবন সংগ্রাম, বৈষম্য, পরাধীনতার গ্লানি এবং মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায় তার বিখ্যাত রাত্রিশেষ (১৯৪৭) কাব্য গ্রন্থে। রাত্রিশেষ ছিল কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ গ্রন্থের মোট ২৮টি কবিতাকে কবি প্রহর, প্রান্তিক, প্রতিভাস ও পদক্ষেপ এই চারপর্বে বিন্যস্ত করেছেন; এবং প্রতিটি পর্বের মধ্যে এক অপূর্ব মিলবন্ধন রয়েছে।
কবি হাসনাইন হীরা আহসান হাবীবের পথেই হেঁটেছেন। কবিতার বিষয়-বৈচিত্র্যকে পাঠকের কাছে সহজ ও বোধগম্য করার জন্য তিনি ‘বাঁক বাচনের বৈঠা’ গ্রন্থের কবিতাগুলোকে ১. দশঘরার বিনুনিবিতান ২. পাখি ও পাতার টেলিপ্যাথি ৩. পরিব্রাজক সাবানের ফেনা- এই তিনটি পর্বে বিভক্ত করে উপস্থাপন করেছেন। এ গ্রন্থে মোট কবিতার সংখ্যা ৫৩টি।
দশঘরার বিনুনিবিতান পর্বের কবিতাগুলো আঙ্গিক গঠনের দিক থেকে স্বাতন্ত্র্য। এ পর্বের ১৬টি কবিতার প্রতিটিতে কবিতায় দুইটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশ কাব্যভাষ, দ্বিতীয় অংশে গদ্যভাষা। ইতালির কবি পেত্রার্কের অনুকরণে মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) যেমন বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট বা চতুদর্শপদী কবিতার প্রবর্তন করেছিলেন তেমন হাসনাইন হীরা যেন কবিতার নতুন ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষা করেছেন। নতুন সময়ের কবিতা সম্পর্কে কবির সহজ স্বীকারোক্তি : “পুরাণ থেকে নতুনে হাঁটা। দশ কদম পার হলে সমতল—গদ্যের পাঁটা। দশ মানে দশদিগন্ত। অবারিত এই দশে—যে যেমন পারে হাঁটুক। সমতলে নেমে আসলেই নিশ্চিন্ত আবাস। যে যেভাবে পারে গড়ুুক। শুধু মনে রাখুক— দশদিগন্ত পার হলেই সমতল, ধীরপায়ে হাঁটা।”
‘বাঁক বাচনের বৈঠা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘একটি মৌলিক রচনা’। এ কবিতায় কবি মানুষের জীবনকে বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। ঘুরিয়ে বা কায়দা করে কথা বলা মানুষের স্বভাব হলেও— ঘুরিয়ে পথ চলা মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ। কবি যেন সেই বিরুদ্ধ পথেই হাঁটছেন। আর অন্যদেরও পরামর্শ দিয়েছেন গতানুগতিকতার স্রোতে গা না ভাসিয়ে নিজের মতো চিন্তা করতে। কবির ভাষায়:
‘আকাশটা উল্টো করে পড়ো;
পাঁজর বেষ্টিত সামুদ্রিক অঞ্চল থেকে
রক্তের ঢাল বেয়ে বহু নদী বয়ে গেছে
বিস্তীর্ণ হাওরের দিকে।
গতিবিধি যাই হোক—
একেক নদীর চোখ একক রকম উজ্জ¦ল ও উন্মুখ।’
প্রতিটি মানুষের স্রষ্টা এক, দৈহিক গঠন কাঠামো এক, সকলের রক্তের রং লাল; কেবল মুখমণ্ডলের আদল আর বর্ণের মধ্যে সামান্য পার্থক্যের জন্য নদীর গতিপথের মতো মানুষও দিক বদল করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও জাতির তকমায় বসবাস করছে। কবি মনুষ্য জীবনকে নানা অভিধায় দেখলেও জীবনের যত শাখা-প্রশাখাই হোক না কেন—প্রতিটি মানুষই নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র। জীবনে অনেক বাঁধা বিপত্তি আসে। ব্যর্থতা, পরাজয় জীবনকে গ্রাস করতে চায়। মানুষের উপেক্ষাকে গ্লানি না ভেবে কবি তাকে জীবনসংগ্রামের শক্তি হিসেবে ভেবে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ উপেক্ষার দেওয়াল সংগ্রামী মানুষকে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু পরক্ষণেই কবি মানুষের জীবনের আরও নিখুঁত বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘বিমুখবার্তায় উঠে আসা ঘাসের কৌতুকে রাখো পা। রেডিসনে চিকেন কিনে খাও; হাড় চিবানোর শব্দে অনুভব করো—জীবন চিবিয়ে খাওয়ার স্বাদই আলাদা।’
পণ্যবাদী সভ্যতায় মানুষ ভোগ আর উপভোগের পার্থক্য ভুলে গেছে। আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে কখনো জীবন উপভোগ করা যায় না। যাপিতজীবনকে উপভোগ করতে হলে নিজেকে সময় দিতে হবে। কারণ খাবার খিলে খাওয়ার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। খাবার সময় নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে নির্যাসসহ খাওয়ার মধ্যেই আনন্দ ও সার্থকতা।
মোহর হারানো পথ কবিতায় কবি পরজীবনের সাথে বর্তমান জীবনের সেতুবন্ধন আঁকার চেষ্টা করেছেন। হাওয়ার সাথে প্রাণপাখি উড়ে গেলে ডানা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। মৃত্যু অমোঘ সত্য ও সুন্দর। চিরন্তন এ সত্যকে অস্বীকার করার সাধ্য কারও নেই। শতাব্দীকাল ধরে মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক আর যত তালবাহানা করুক না কেন মৃত্যুর কাছে পরাজিত হয়ে তাকে একদিন না একদিন রবিফুলের পোষ্যের মতো পড়ে থাকতে হবে পথে। তবে কবি বিভ্রাট পথে কেবল সম্পর্কের সূত্র ধরেই এগুতে চান। তবুও ‘যে সকল আস্থার মাটি মুড়ে পড়ে থাকি সিজদায়! তার বুক থেকেও হারিয়ে যায় সোনার মোহর।’
ঘুমহীন মোমের আলো কবিতায় কবি কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী নেতা ও সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ফিদেল কাস্ত্রোর (১৯২৬-২০১৬) প্রসঙ্গ টেনে সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি ও সামন্তবাদের দিকটি ইঙ্গিত করেছেন। মধ্যযুগে ইউরোপে সামন্ততন্ত্র বা ভূমিকেন্দ্রীক সরকার ও প্রসাশন ব্যবস্থা চালু ছিল। যার ফলে ভূস্বামীদের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রসাশনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রিভূত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গটিকে ধরার জন্য কবি লিখেছেন, “সামান্তের ধূলিশ্বাসে গজাবে ফিদেলীয় প্রাচীর। অপেক্ষার চৌচির গান গুঁজে রাখব উপচে পড়া কৌটায়। অহেতুক ঝড়-ঝাঁপ্টা যেন ঢুকে পড়তে না পারে— আমাদের সংরক্ষিত এলাকায়।”
ধুলো মেশানো চাঁদের গল্পটা যত মধুরই মনে হোক না কেন—পৃথিবীতে ঠিকানো হারানো উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। পুঁজিবাদের রূঢ়তা সম্বলহীন, ছিন্নমূল, নিঃস্ব মানুষের কাছে ধনীদের চায়ের লিকারের সাথে অর্ধেক জীবন গিলে খাওয়ার মতো মনে হয়। কিন্তু কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়। মোমের মতো একদিন সব নিঃশব্দে গলে যাবে। কেবল সময়ের অপেক্ষা। তখন চাঁদজলে নিজেদের অপরাধটা ধুয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো গতি থাকবে না। কবির ভাষায়:
যতটুকু বুঝি—
এ অসুখ বিদ্রুপ-বিয়োগের ম্যুরাল,
সকালে চায়ে তাই লিকার কম হলে
মিশিয়ে খাই অর্ধেক জীবন,
চাঁদজলে ধুয়ে নেই অপরাধের শ্বাসকাটা রুমাল।
হাসনাইন হীরার কবিতায় চমৎকার গদ্যের আবহ পাওয়া যায়। তিনি যখন সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ কবিতায় লেখেন, “জীবনকে ভুলভাল বুঝিয়ে চাঁদকে সাক্ষী মানা যায়, বিচার পাওয়া যায় না। মৃতদের আড্ডায় রকমারি চা পাওয়া যায়, স্বাদ পাওয়া যায় না। না পাওয়া অন্ধকারই হস্তগত আয়না। আমি তার মুখোমুখি দাঁড়াই; দাঁড়ানোই জীবন।” তখন আমরা জীবনের অন্য মানে খুঁজে পাই। কারণ কবি অন্ধকারকে জীবনের আয়নার সাথে তুলনা করেছেন। অন্ধকারে একাকী আত্মমগ্ন হয়ে আমরা খুঁজে নেই জীবনের হিসাব-নিকাশ। কারণ প্রত্যেক মানুষের শৈশব, কৈশোর, যুবা, বৃদ্ধসময়— জীবনের সব স্তরে কার্যকারণ আলাদা। জীবনছায়াহ্নে অন্ধকার নেমে আসার আগে সবার চোখে চশমা, হাসিবিহীন মুখ যেন আবছায়া অন্ধকার। কবির ভাবনায় “আর অই জীবন জানে— কী করে এড়িয়ে যেতে হয় দৃশ্যের চোখ। এক পাতায় লিখি দুইপাতা সমুদ্রের শ্লোক। তুমি তার তিনপাতা রিভিউ শেষে দেখে নাও — নিজেকে কতটা এড়িয়ে যেতে পেরেছ।” সে সময় কবি জীবনকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন:
চশমা জুড়ে স্বতন্ত্র সন্ধ্যা নেমে আসে;
বন্ধক রাখি হাসি, ছেঁড়াপাতার আশে—
প্রচ্ছদ ও প্রস্তাবনার উচ্চতর নীলে
হুমড়ি খায়—সম্পর্কের হাই তুলে তুলে।
কবি হাসনাইন হীরার কবিতার অন্যতম আকর্ষণ হলো চিত্রকল্প। তিরিশের দশকের পর বাংলা কবিতায় যে আঙ্গিক কৌশলের পরিবর্তন আসে— তা বিবিধ ধারা-উপধারায় প্রবাহিত হয়। একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে কবি কবি হাসনাইন যেন জীবনানন্দন দাশের উত্তরসূরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। কবিতায় তিনি যেন চিত্রের পর চিত্র সাজিয়ে তৈরি করে নিয়েছেন স্বতন্ত্র কাব্যকোলাজ। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তার কবিতা পড়লে মনে হবে চিত্রকল্পই যেন কবিতা। শুন্যতার রূপক কবিতায় কবি লিখেছেন, “তবুও আমরা ভির করি শিল্পের দোকানে। স্বপ্নের দামে এক প্যাকেট জোছনা কিনে খাই। প্রার্থনার ঝালফ্রাই কিংবা কিশমিশ দানার ভোর না গালে না পেলে —চিবিয়ে খাই অর্ধেক জীবন।”
চক্রবূহ্যলোক কবিতায় কবি মানুষের মনোজাগতিক শাশ্বতরূপ আঁকতে গিয়ে আধ্যাত্মিক কবি লালন শাহ (১৭৭২-১৮৯০)-এর দেহতত্ত্ববাদ ও সিগমন ফ্রয়েডের (১৮৫৬-১৯৩৯) মনোসমীক্ষণ তত্ত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন এক ফিলোসফির অবতারণা করেছেন। লালন লিখেছেন,
“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনো বেড়ি দিতাম পাখির পায়।”
অথবা;
“বাড়ির কাছে আরশিনগর সেথায় পড়শি বসত করে,
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।”
মানুষের মন চেতন ও অচেতনে বিভক্ত। মনের চেতন অংশ সামাজিক বিবিধ বিধি-নিষেধ দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু অবচেতন মন কোনো নিয়ম মানে না। ফ্রয়েড মনে করেন, “লিবিডো অনুভূতি হচ্ছে ব্যক্তি জীবনের প্রধান উদ্দীপক ও অনুপ্রেরণা। লিবিডো বলতে ফ্রয়েড কেবল দৈহিক অনুভূতিকে বুঝাতে চাননি। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, ছেলের প্রতি মায়ের মমতা, কন্যার উপর পিতার বাৎসল্য— এই সবই লিবিডো চেতনার অংশ।” পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সুখ ও নষ্টামির মাধ্যমে নতুন প্রাণের জন্ম হয়। মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা এবং বংশ বৃদ্ধির জন্য যা অতি প্রয়োজন। কবি বিষয়টিকে একটু ঘুরিয়ে বলেছেন :
চয়নে আমি স্নানযোগ্য পুরুষ
বীর্য ঢেলে আত্ম জীবনী লিখি,
যেখানে আমার নিরঙ্কুশ কোনো
জন্ম থাকে না, মৃত্যু থাকে না
ঢুকে পরি তাই অনন্তের গুহায়।
ব্রক্ষদেয়াল কবিতায় কাক কোকিলের লুকোচুরি খেলার মধ্যে মানুষের জীবনের নিখাদ বাস্তবতার ছবি এঁকেছেন। কাক বোকা নাগরিক পাখি। কোকিল তাই সুযোগ বুঝে কাকের বাসার ডিম পেড়ে আসে। বোকা কাক কোকিলের ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোঁটায়। অথচ সে ছানা তার নিজের নয়। মানুষের মধ্যেও এই ঘাই মারার স্বভাব বিদ্যমান। তাই কবি লিখেছেন, “শতাব্দীর চোরাস্রোতে বেগানা মাছ ঘাই দিলে দূরগামী স্বপ্ন ডুবে যায়।”
একা হয়ে দাঁড়াও কবিতাটি একদম ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা। অতীন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রাণির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাকে বলা হয় টেলিপ্যাথি। এ কবিতায় কবি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিককে প্রাধান্য দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে আমরা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের চমৎকার শিল্পভাষ লক্ষ্য করি। একা হয়ে দাঁড়াও কবিতায় কবি উদ্যান ও মহাকাল বিষয়ক প্রশ্ন তুলে মানবজীবনের এক চিরায়ত সত্য প্রকাশ করেছেন। আসলে গোধূলিবেলায় প্রতিটি মানুষই খুব একা।
চারুকলার অংকখাতা দারুণ একটি প্রতীকী কবিতা। এ কবিতায় কবি ছোট্ট একটি মার্বেলের মধ্যে পুরো পৃথিবী কল্পনা করেছেন। এ কবিতাটিতে বিন্দু থেকে সিন্ধু খোঁজার রহস্য রয়েছে। মানুষের শেখার জন্য প্রকৃতিতে আলাদা করে কোনো বয়স রাখা হয়নি। তাই পৃথিবীর পাঠ শিখতে শিখতেই জীবনের একটা বড় অংশ কেটে যায়। আকাশজুড়ে একটি রকেট চলে গেলে তার সাদা ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ার আস্তরণের সাথে কবি ঋতুর পালাবদলের দিকটি মিলিয়ে দিয়েছেন। কারণ কবির ভাবনায় তখন অন্য এক পৃথিবী।
মার্বেল রঙের ছোটখাটো একটা পৃথিবী নিয়ে ভাবছি
আহা! শেখার যদি আলাদা কোনো বয়স থাকত . . .!
বিবর্তন কবিতায় কবি সময়ের ব্যবহার দেখিয়েছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। পৃথিবীর ব্যস্ততম নগরীগুলো মধ্যে রাজধানী ঢাকা অন্যতম। এ শহরের কোনো দিনরাত নেই। সারাক্ষণ মানুষের পদচারণায় মুখোরিত থাকে। কবিতায় কবি নগরের রাস্তাকে জলাশয়ের ঢেউয়ের সাথে তুলনা করেছেন। অভাবের কারণে ছিন্নমূল মানুষ বাঁচার তাগিদে শহরমুখী হয়। শহরে এসে তারা দেখতে পায় জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর (১৯২২-১৯৭১) নয়নচারা (১৯৪৫) গল্পগ্রন্থের নয়নচারা গল্পে দুর্ভিক্ষপীড়িত অনাহারি মানুষের বাঁচার প্রচেষ্টা ও শহরের নিখাদ বাস্তবরূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। একইভাবে বিবর্তন কবিতায় অভাবের তাড়নায় কাজের সন্ধানে এসে ছিন্নমূল মানুষেরা জীবনটা খোয়াচ্ছে ক্রমাগত। আর এভাবেই ‘সময়’ দৃশ্য বদল করে যাচ্ছে বারংবার। কবির ভাষায়:
স্বর ও শৈলীহীন জলজল্পনার
হাঁমুখ কামড়ে দেয় মানুষের পা—
মানুষ তা জানে না।
মেয়াদ উত্তীর্ণ সময়ের সফরনামা কবিতায় পৃথিবীতে মানুষের মানবিক সম্পর্কগুলোর উপর কবি দৃষ্টিপাত করেছেন। পৃথিবীতে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো ঘাসের মতো হয়েই জন্মায়। ‘উঠোন’ শব্দটিকে কবি সম্পর্কের মেটাফর হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কারণ সম্পর্ক তেরি হয় মাতৃমুখো গল্পগাছ থেকে। যারা মানুষের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি বা টিকিয়ে রাখতে পারে না— তাদের বোঝাতে কবি ‘নাচতে শেখেনি’ উপমাটি ব্যবহার করছেন। সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য দরকার মনীষা আর মিউচুয়ালিটি।
শাশ্বতের ঘুঘুডাক কবিতায় রাতের রূপালি চাঁদকে মানুষের জীবনের প্রতীকী করা হয়েছে। মানুষের জীবনের সব চাওয়া একবারে পূর্ণ হয় না। অপূর্ণের স্বাদ নিয়েই অনেকে চলে যায় অন্তরালে। জীবনসমরে প্রশ্ন পেলেও উত্তরপত্র ফাঁকাই রয়ে যায়। তাই ‘বয়স বাড়ার সাথে দিন-রাত্রির বহুত ফারাক’ তৈরি হয়। কারণ পৃথিবী নামক এই পান্থশালায় আমরা সবাই দু’দিনের পরিব্রাজক। ভ্রমন শেষ হলে যে যার মতো চলে যাব একা।
টকশো কবিতায় কবি টকশোর উদ্দেশ্য বোঝাতে গিয়ে নানামুখী রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের দেশে টিভিতে প্রচারিত টকশোর উদ্দেশ্য থাকে জাতির সামনে কোনো বিষয়কে তুলে ধরে তার আদ্যপ্রান্ত খোলাসা করে মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া। কিন্তু টকশোতে এসে মূলবিষয়কে ছাপিয়ে গিয়ে বক্তরা নিজেদেরকে জাহির করেন। আবার অনেক সময় সঠিক লোককে আমন্ত্রণ জানানো হয় না। ফলে বক্তব্যের বিষয়বস্তু ধোঁয়াশার অন্ধকারের নিমজ্জিত থাকে। এ কবিতায় কবি বাহুল্য বর্জন করে মৌলিকে ধাবিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। নচেৎ টকশোর উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কবিতার ভাষায় :
হেমন্তকে ডাকুন, হেমন্তের কাছে বসন্তের অনেক ঋণ
তাকে আজ কথা বলতে দিন,
আপনি কেন কথা বলছেন হে বেহুদা অর্বাচীন!
লেবাননের কবি কাহ্লিল জিবরানের বিখ্যাত উক্তি, ‘মানুষ প্রত্যাশার সন্তান’ এ কথাটির স্পষ্ট ছাপ এই কবিতায় রয়েছে। তাছাড়া কবিতার জমিনে অস্তিত্ববাদের আভাস পাওয়া যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর (১৯২২-১৯৭১) বিখ্যাত দুইটি উপন্যাস লালসালু (১৯৪৮) ও চাঁদের অমাবশ্যা (১৯৬৪) তে অস্তিত্ববাদের প্রভাব স্পষ্ট। জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) রূপসী বাংলা (১৯৫৭) কাব্যের সেই দিন এই মাঠ অস্তিত্ববাদের দিকটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
চারিদিকে শান্ত বাতি— ভিজে গন্ধ—মৃদু কলরব;
খেয়ানৌকোগুলো এসে লেগেছে চরের খুব কাছে;
পৃথিবীর এই সব গল্প বেঁচে র’বে চিরকাল;-
এশিরিয়া ধুলো আজ- বেলিন ছাই হয়ে আছে।
আলোচনার বিশেষত্বে জন্য টকশো কবিতার শেষাংশ উদ্বৃতির দাবি রাখে: কথার ভেতর কথা ঠুকলে অঙ্ক ভুলে যাই। ভুল অঙ্কে ফণা ভাঙে সর্পিলসময়। জানেন তো, এই সকল জীবন—ওই সকল সময়ের ফটেকপি! কোনো আওয়াজ নেই, অমরতা নেই; সমরতার পাশে নিজ নিজ ইশকুল খুলে ভেবে দেখুন, আপনার জুতো আপনার চেয়ে ছোট না বড়?
হাসনাইন হীরা বাংলা কথাকলার এক অনন্য নাম। তিনি তার কাব্যকর্মের দ্রুতি ছড়িয়ে বাংলা কবিতাকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবেন—এই প্রত্যাশা আমাদের সবার।
*লেখক : এমফিল গবেষক, বাংলা-বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।



