জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কথা উঠলেই বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে প্রথমে যে দুটি নাম পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন শব্দের জগৎকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিলেন যে বাংলা ভাষা তাঁর আগে ও পরে যেন দুই আলাদা সময়ের ভাষা; অন্যজন ভারতীয় চিত্রকলাকে ঔপনিবেশিক শিক্ষার অনুকরণ থেকে সরিয়ে তার নিজস্ব স্মৃতি, ঐতিহ্য ও নন্দনতত্ত্বের দিকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই দুই দীপ্তিমান ব্যক্তিত্বের পাশে, একটু আড়ালে, দাঁড়িয়ে ছিলেন আর-একজন শিল্পী। তাঁর নাম গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আড়ালে ছিলেন—কথাটি অবশ্যই আপেক্ষিক। জোড়াসাঁকোর জীবনে তিনি আড়ালে ছিলেন না; কিন্তু ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসের জনপ্রিয় বয়ানে তাঁর অবস্থান আজও তুলনায় অনেক কম দৃশ্যমান। রবীন্দ্রনাথের ভাইপো, অবনীন্দ্রনাথের দাদা—এই আত্মীয়তার পরিচয় এত দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে যে গগনেন্দ্রনাথের নিজের শিল্পীসত্তা অনেক সময় তার ভিতরেই ঢাকা পড়ে যায়। অথচ ১৮৬৭ থেকে ১৯৩৮—এই সত্তর বছরের জীবনে তিনি যে শিল্পভাষার অনুসন্ধান করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল জাপানি ব্রাশপ্রযুক্তির শিক্ষা, বাংলার প্রকৃতি ও নগরজীবনের পর্যবেক্ষণ, চৈতন্যচেতনার নিজস্ব ব্যাখ্যা, সামাজিক ব্যঙ্গ, লিথোগ্রাফ, কিউবিজম, বিমূর্ততার দিকে অগ্রসর হওয়া এবং আলো-ছায়াকে স্বতন্ত্র নন্দনতাত্ত্বিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার। জাতীয় আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান বোঝার জন্য তাই তাঁকে শুধু ‘ঠাকুরবাড়ির শিল্পী’ বলে পড়লে চলবে না। তাঁকে পড়তে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু আধুনিক মানুষ হিসেবে।
গগনেন্দ্রনাথের শিল্পজীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর নিজস্ব পথের প্রতি এক ধরনের অনমনীয় আকর্ষণ। তিনি দীর্ঘকাল কোনো একটি শৈলীর মধ্যে স্থির থাকেননি। জাপানি শিল্পীদের কাছ থেকে জলরং, ব্রাশ ও ওয়াশের ব্যবহার শিখলেন; রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’-র অলংকরণ করলেন; চৈতন্য ও তীর্থযাত্রী সিরিজে ভারতীয় বিষয়কে নিজের ভাষায় ধরলেন; তারপর হঠাৎ যেন দৃশ্যপট পাল্টে গেল। ব্যঙ্গচিত্রে চলে এলেন। আবার সেখান থেকে ইউরোপীয় আধুনিকতার ভাষা আত্মস্থ করে কিউবিস্ট ও পরবর্তী আধুনিকতাবাদী চিত্রভাষার দিকে এগোলেন।
এই পরিবর্তনগুলোকে যদি কেবল শৈলীগত পরীক্ষা বলে দেখা হয়, তাহলে গগনেন্দ্রনাথের শিল্পের গভীরতম দিকটি অধরা থেকে যায়। কারণ তাঁর কাছে শিল্পের প্রশ্নটি ছিল আসলে ‘কী আঁকব’—এই প্রশ্নের চেয়ে ‘কীভাবে দেখব’—এই প্রশ্নের কাছাকাছি। দৃশ্যমান জগতের ভিতরে যে অদৃশ্য স্তর রয়েছে, মানুষের মুখের ভিতরে যে আর-একটি মুখ লুকিয়ে থাকে, স্থাপত্যের সরল রেখার মধ্যে যে অস্থিরতা থাকে, হাসির মধ্যে যে কান্না থাকে—গগনেন্দ্রনাথ যেন সেই দ্বিতীয় দৃশ্যটিকে ধরতে চাইতেন। তাঁর শিল্প তাই দৃশ্যমানের পুনরুৎপাদন নয়, দৃশ্যমানের ভিতর থেকে অদৃশ্যকে উদ্ধার করার চেষ্টা। গগনেন্দ্রনাথের শিল্পজীবনের শুরুটা ছিল প্রকৃতি, মানুষ ও স্মৃতির কাছাকাছি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে জাপানি শিল্পীদের সংস্পর্শ তাঁর শিল্পচোখকে বদলে দেয়। ইয়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুনশোর মতো শিল্পীদের জলরং ও ওয়াশের ব্যবহার তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর প্রাথমিক প্রকৃতিচিত্রে তাই রঙের চেয়ে টোন, দৃশ্যের চেয়ে আবহ, বস্তুর চেয়ে বাতাস অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদী, আকাশ, পাহাড়, মেঘ, দূরবর্তী গাছপালা—সবকিছু যেন স্পষ্ট অথচ অস্পষ্ট।
এই অস্পষ্টতাকে দুর্বলতা বলে দেখলে ভুল হবে। বরং এখানেই গগনেন্দ্রনাথের শিল্পবোধের প্রথম সূত্রটি পাওয়া যায়। তিনি জানতেন, বাস্তবকে হুবহু আঁকলেই বাস্তব ধরা পড়ে না। কখনো কখনো বাস্তবকে একটু ঝাপসা করে দিতে হয়, যাতে তার ভিতরের সত্যটি দেখা যায়।
জোড়াসাঁকোর বাড়ি, তার সিঁড়ি, বারান্দা, দরজা, জানালা, অন্ধকার ঘর এবং আলো এসে পড়ার বিচিত্র পথ তাঁর পরবর্তী শিল্পে যেন এক মানসিক ভূগোল তৈরি করে। জাতীয় আধুনিক শিল্পকলা সংগ্রহশালার সংরক্ষিত তাঁর কয়েকটি ছবির বিবরণেও দেখা যায়, স্থাপত্য, আলো ও ছায়া তাঁর আধা-বিমূর্ত চিত্রভাষায় বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। ‘Meeting at the Staircase’-এর মতো ছবিতে সিঁড়ি যেন কোথাও পৌঁছায়, আবার কোথাও পৌঁছায় না; স্থাপত্য যেন বাস্তবের ভিতরে থেকেও স্বপ্নের স্থান হয়ে ওঠে। এই সিঁড়িকে তাই শুধু সিঁড়ি হিসেবে দেখলে গগনেন্দ্রনাথকে বোঝা যায় না। সিঁড়ি এখানে ওঠা ও নামার মাঝখানের একটি মানসিক অবস্থা। দরজা এখানে শুধু প্রবেশপথ নয়, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের সীমারেখা। জানালা শুধু বাইরের পৃথিবী দেখার উপায় নয়, ভিতরের অন্ধকারের সঙ্গে বাইরের আলোর একটি সংলাপ। গগনেন্দ্রনাথের শিল্পের এই আলো-ছায়া তাই নিছক কারিগরি নয়। আলো তাঁর কাছে প্রকাশের প্রতীক, ছায়া গোপনের। আলো যত বাড়ে, ততই ছায়া আরও দৃশ্যমান হয়। এই দ্বন্দ্বই তাঁর শিল্পকে রহস্যময় করে তোলে। এখানেই তাঁর কিউবিস্ট পর্বের সঙ্গে তাঁর আগের শিল্পের একটি গভীর যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
ভারতীয় আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে গগনেন্দ্রনাথকে কিউবিজমের অন্যতম অগ্রগণ্য ভারতীয় প্রয়োগকারী হিসেবে দেখা হয়। শিল্প-ইতিহাসবিদ পার্থ মিত্র তাঁর কাজের মধ্যে কিউবিজমের ভাষা ও ব্যাকরণের এক স্বতন্ত্র ব্যবহারের কথা বলেছেন। আনুমানিক ১৯২০ থেকে ১৯২৫-এর মধ্যে তাঁর আধুনিকতাবাদী পরীক্ষা এবং পরে ১৯২৫-এর পরের জটিল পোস্ট-কিউবিস্ট কাজ ভারতীয় শিল্পে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় তৈরি করে। কিন্তু গগনেন্দ্রনাথকে পিকাসো বা ব্রাকের ভারতীয় সংস্করণ ভাবলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। পশ্চিমা কিউবিজমে বস্তু ও স্থানকে ভেঙে নতুন জ্যামিতিক কাঠামো তৈরি করার যে প্রবণতা ছিল, গগনেন্দ্রনাথ সেই ভাষাকে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর স্থাপত্য, মানুষের অবয়ব, সিঁড়ি, দরজা, আলো এবং অন্ধকার যেন একে অন্যের ভিতরে ঢুকে যায়। দৃশ্যটি তখন আর বাইরের পৃথিবীর ছবি থাকে না; হয়ে ওঠে এক মানসিক স্থানের ছবি। সেই কারণেই তাঁর কিউবিস্ট ছবিকে নিছক ‘জ্যামিতিক’ বলা যথেষ্ট নয়। সেখানে জ্যামিতি কখনো কখনো মনস্তত্ত্বের ভাষা হয়ে ওঠে।
একটি ঘর কতটা বড়—এটি স্থাপত্যের প্রশ্ন। কিন্তু একটি ঘর একজন মানুষের কাছে কতটা বড় বা কতটা ছোট—তা মনস্তত্ত্বের প্রশ্ন। গগনেন্দ্রনাথের চিত্রে সেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর স্থাপত্য কখনো মানুষকে আশ্রয় দেয়, কখনো তাকে বন্দি করে, কখনো তাকে অদৃশ্য করে দেয়। মানুষের শরীর ও স্থাপত্যের মধ্যে এই অদ্ভুত সম্পর্ক তাঁর শিল্পের একটি গভীর বৈশিষ্ট্য। চৈতন্যচিত্রের ক্ষেত্রেও তাঁর শিল্পচেতনার এই অনুসন্ধান লক্ষ করা যায়। শ্রীচৈতন্যের জীবন ও ভাবধারাকে নিয়ে তিনি যে চিত্রমালা নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে বিষয়টি ধর্মীয় হলেও তাঁর ভাষা প্রচলিত ভক্তিচিত্রের অনুবাদ নয়। তাঁর চৈতন্যচিত্রে রেখা, ধূসরতা, নরম রঙ এবং শূন্য স্থান মিলিয়ে একটি অন্তর্মুখী আবহ তৈরি হয়। গগনেন্দ্রনাথের চৈতন্য যেন প্রচারকের চেয়ে পথিক, ভক্তির উচ্ছ্বাসের চেয়ে অন্তর্জগতের যাত্রী। তাঁর ‘চৈতন্য’ সিরিজকে এই কারণেই ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার একটি ব্যক্তিগত দৃশ্যভাষা হিসেবে পড়া যায়। এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি। গগনেন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট আত্মজৈবনিক দলিল আমাদের হাতে নেই। ফলে তাঁর ছবিকে ‘অবচেতন মনের প্রতিকৃতি’ বলা একটি ব্যাখ্যামূলক পাঠ, প্রতিষ্ঠিত জীবনীসংক্রান্ত তথ্য নয়। কিন্তু তাঁর চিত্রের পুনরাবৃত্ত আলো-অন্ধকার, রহস্যময় স্থাপত্য, দূরত্ব এবং শূন্যতার দিকে তাকালে এই মনস্তাত্ত্বিক পাঠের যথেষ্ট অবকাশ তৈরি হয়। আর এইখানেই গগনেন্দ্রনাথের শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি সামনে আসে। একই মানুষ যখন রহস্যময়, প্রায় ধ্যানমগ্ন ছবি আঁকছেন, তখন তিনিই আবার সমাজের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে ব্যঙ্গচিত্র আঁকছেন। ১৯১৭-এর পর তাঁর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হতে থাকে এবং ‘Adbhut Lok’, ‘Naba Hullod’, ‘Reform Screams’ ও ‘Birupa Bajra’-র মতো কাজের মাধ্যমে তিনি ঔপনিবেশিক বাংলার সামাজিক আচরণ, ভণ্ডামি, অন্ধ অনুকরণ এবং মধ্যবিত্ত মানসিকতার নানা অসঙ্গতিকে বিদ্ধ করেন। জোড়াসাঁকোতেই তিনি লিথোগ্রাফ ছাপার ব্যবস্থা করেছিলেন। এখানে গগনেন্দ্রনাথের হাসি আসলে খুব সহজ হাসি নয়।
কার্টুনে তিনি মানুষকে বড় করে দেখান, কখনো শরীরকে বিকৃত করেন, মুখকে অস্বাভাবিক করেন, অঙ্গভঙ্গিকে অতিরঞ্জিত করেন। কিন্তু সেই বিকৃতিই কখনো কখনো বাস্তবের চেয়ে সত্য হয়ে ওঠে। মানুষ নিজের যে সামাজিক মুখটি আয়নায় দেখে, গগনেন্দ্রনাথ সেটি আঁকেননি; তিনি এঁকেছেন সেই মুখের পেছনের আচরণকে। পশ্চিমি পোশাকে সেজে ওঠা বাবু, সামাজিক মর্যাদার অভিনয়, ধর্মীয় কর্তৃত্বের আড়ালে স্বার্থ, শিক্ষিত সমাজের আত্মপ্রবঞ্চনা—এসব তাঁর ব্যঙ্গচিত্রে এসেছে। কিন্তু তাঁর ব্যঙ্গ কেবল ‘অন্যকে’ নিয়ে নয়। যে সমাজকে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন, তিনি নিজেও সেই সমাজের অংশ। ফলে তাঁর কার্টুনে আত্মসমালোচনার একটি সম্ভাবনাও থাকে। যেন এই জায়গাটিই তাঁর শিল্পকে আলাদা করে। আসলে বলা দরকার তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে সমাজকে দেখেননি। সমাজের ভিতরে দাঁড়িয়েই সমাজের মুখোশ দেখেছেন। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিষয়কে কার্টুনের বিষয় করে তোলা। ‘Reform Screams’-এর একটি কাজ জগদীশচন্দ্র বসুর উদ্ভিদ-সংক্রান্ত গবেষণাকে ব্যঙ্গের কাঠামোর মধ্যে এনেছিল। অর্থাৎ গগনেন্দ্রনাথের ব্যঙ্গচিত্র শুধু সামাজিক পোশাক-আশাক বা বাবু সংস্কৃতির বিদ্রূপ ছিল না; সমকালীন জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান, সংস্কার এবং আধুনিকতার নানা প্রকাশও তাঁর নজরের বাইরে ছিল না। এইখানে তাঁর শিল্পের দুটি আপাত-বিরোধী স্রোত এক জায়গায় এসে মেলে। চিত্রকলায় তিনি দৃশ্যের ভিতরের অদৃশ্যকে খুঁজছেন, কার্টুনে তিনি সামাজিক মুখের ভিতরের অদৃশ্য চরিত্রটিকে প্রকাশ করছেন। এক ক্ষেত্রে আলো-ছায়া মুখোশ সরায়, অন্য ক্ষেত্রে ব্যঙ্গ সরায় মুখোশ। অর্থাৎ মাধ্যম বদলেছে, অনুসন্ধান বদলায়নি।
গগনেন্দ্রনাথের সঙ্গে থিয়েটারের সম্পর্কও এই দৃষ্টিতে নতুন করে দেখা দরকার। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি শুধু কবিতা ও গান লেখার জায়গা ছিল না; সেখানে নাটক লেখা, অভিনয়, মঞ্চসজ্জা এবং দৃশ্য নির্মাণ ছিল পারিবারিক সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। ‘ডাকঘর’, ‘ফাল্গুনী’, ‘বিসর্জন’সহ বিভিন্ন নাট্যপ্রযোজনায় মঞ্চসজ্জা নিয়ে গগনেন্দ্রনাথ ও অন্য শিল্পীদের কাজের উল্লেখ পাওয়া যায়। সমকালীন স্মৃতিচারণে ‘ডাকঘর’-এর মঞ্চসজ্জায় নন্দলাল বসু ও গগনেন্দ্রনাথের যৌথ ভূমিকার কথাও এসেছে। যেন এই জায়গাতেই গগনেন্দ্রনাথের শিল্পভাবনার আর-একটি দরজা খুলে যায়।
ক্যানভাসের চারটি সীমানার মধ্যে যে আলো তৈরি করা যায়, মঞ্চে সেই আলোকে মানুষের চলাচলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ছবিতে একটি সিঁড়ি আঁকা যায়; মঞ্চে সেই সিঁড়ি দিয়ে অভিনেতা উঠতে পারেন। ছবিতে একটি দরজা অন্ধকারের দিকে খুলে যেতে পারে; মঞ্চে সেই দরজা সত্যিই খুলে যায়। অর্থাৎ চিত্রের দ্বিমাত্রিক স্থান নাটকে এসে ত্রিমাত্রিক হয়ে ওঠে। তাই গগনেন্দ্রনাথের শিল্পকে শুধু চিত্রকলা দিয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর আগ্রহ ছিল দৃশ্য নির্মাণে। কখনো কাগজে, কখনো মঞ্চে, কখনো লিথোগ্রাফে, কখনো স্থাপত্যের রেখায় তিনি একই প্রশ্নের কাছে ফিরেছেন—মানুষকে কীভাবে একটি দৃশ্যের ভিতর স্থাপন করা যায়? আর সেই প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে ছিল আলো।
আলো গগনেন্দ্রনাথের কাছে যেন একটি স্বাধীন চরিত্র। তাঁর ছবিতে আলো কেবল দৃশ্যমান করার কাজ করে না; আলো নিজেই দৃশ্য নির্মাণ করে। অন্ধকারের ভিতর একটি জানালা, একটি সিঁড়ির কোণে পড়া আলো, কোনো স্থাপত্যের ফাঁক দিয়ে আসা ক্ষীণ উজ্জ্বলতা—এসব যেন ছবির ঘটনা। জাতীয় আধুনিক শিল্পকলা সংগ্রহশালার সংগ্রহে থাকা তাঁর বহু কাজের বিবরণেও রহস্যময়তা তৈরিতে আলো ও ছায়ার এই ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
গগনেন্দ্রনাথকে তাই ‘আলো-আঁধারির শিল্পী’ বলা যায়, যদি সেই কথার অর্থ কেবল তাঁর রঙের ব্যবহার না হয়। তাঁর আসল আলো-আঁধারি ছিল চিন্তার। দৃশ্য ও অদৃশ্যের, বাস্তব ও কল্পনার, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার, ব্যক্তিমানস ও সমাজের, হাসি ও বেদনার মধ্যে তিনি ক্রমাগত একটি সীমারেখা তৈরি করেছেন এবং আবার নিজেই সেই সীমারেখা ভেঙেছেন। ঠিক এখানেই যেন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পার্থক্যটিও স্পষ্ট হয়। অবনীন্দ্রনাথ ভারতীয় শিল্পের অতীতকে পুনরাবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আধুনিকতার একটি পথ নির্মাণ করেছিলেন। গগনেন্দ্রনাথ সেই একই সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে অন্য পথে হাঁটলেন। তিনি ভারতীয় ঐতিহ্যকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু তার পুনরাবৃত্তিও করতে চাননি। বরং ইউরোপীয় আধুনিকতার নানা ভাষা, জাপানি শিল্পপ্রযুক্তি এবং নিজের চারপাশের ভারতীয় জীবনকে একসঙ্গে নিয়ে নিজের ভাষা তৈরি করেছিলেন। তাঁর আধুনিকতা তাই ধার করা আধুনিকতা ছিল না। এই কারণেই তাঁকে শুধু ‘বেঙ্গল স্কুলের শিল্পী’ বলাও অসম্পূর্ণ। তিনি বেঙ্গল স্কুলের পরিসরের মানুষ, তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, কিন্তু তার নন্দনতাত্ত্বিক সীমারেখার ভিতরে নিজেকে শেষ করে দেননি। বরং বলা যায়, তাঁর শিল্পজীবনের এক পর্যায়ে তিনি পুনরুজ্জীবনবাদ থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিকতার অনিশ্চিত ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে হয়তো তাঁর কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয় ছিল না।
পিকাসো তাঁকে পথ দেখাতে পারেন, জাপানি শিল্প তাঁকে একটি কৌশল দিতে পারে, ভারতীয় পুরাণ তাঁকে বিষয় দিতে পারে, জোড়াসাঁকো তাঁকে পরিবেশ দিতে পারে, কলকাতা তাঁকে মানুষ দিতে পারে—কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটি তাঁকেই তৈরি করতে হবে। এই ‘নিজের পথ’ খোঁজার প্রবণতাই গগনেন্দ্রনাথের শিল্পীসত্তার কেন্দ্রে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মৃত্যুর পরে গগনেন্দ্রনাথের শিল্প সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তাঁর ‘নিজস্ব পথ’ খোঁজার কথা এবং আলো-ছায়া নিয়ে তাঁর পরীক্ষার কথা স্মরণ করেছিলেন। সেই স্মৃতিচারণের তাৎপর্য এখানেই যে, গগনেন্দ্রনাথের শিল্পের প্রধান শক্তি কোনো একটি প্রতিষ্ঠিত ঘরানায় নিখুঁত দক্ষতা অর্জন নয়; বরং ক্রমাগত পরীক্ষা এবং নিজের পথ আবিষ্কার।
এই শিল্পীসত্তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে পড়লে আর-একটি বিষয় সামনে আসে—গগনেন্দ্রনাথ যেন কখনোই সম্পূর্ণ দৃশ্যমান পৃথিবীতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি মানুষকে দেখেছেন, কিন্তু মানুষের মুখের চেয়ে তার ভঙ্গি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। তিনি বাড়ি দেখেছেন, কিন্তু বাড়ির দেওয়ালের চেয়ে তার ভিতরের অন্ধকার তাঁকে বেশি টেনেছে। তিনি ধর্মীয় চরিত্র এঁকেছেন, কিন্তু ধর্মীয় আখ্যানের চেয়ে তার ভিতরের একাকীত্বকে যেন বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সমাজকে ব্যঙ্গ করেছেন, কিন্তু কেবল হাসানোর জন্য নয়; হাসির পরে যে অস্বস্তি থেকে যায়, সেটিই যেন তাঁর প্রকৃত বিষয়। এই অর্থে গগনেন্দ্রনাথের শিল্পের মধ্যে একটি গভীর অস্তিত্ববাদী সুর খুঁজে পাওয়া যায়। অবশ্য তাঁকে সরাসরি ‘অস্তিত্ববাদী শিল্পী’ বলে শ্রেণিবদ্ধ করা ঐতিহাসিকভাবে সরলীকরণ হবে। কিন্তু তাঁর ছবির নিঃসঙ্গ মানুষ, অচেনা স্থাপত্য, অনির্দিষ্ট গন্তব্যের সিঁড়ি, আলোয় ভেসে ওঠা অন্ধকার এবং ব্যঙ্গচিত্রের আত্মপ্রবঞ্চিত মানুষ—এসবকে একসঙ্গে রাখলে মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর এক ধরনের অস্থির অনুসন্ধান স্পষ্ট হয়।
তাঁর অনেক ছবি যেন শেষ হয়েও শেষ হয় না। একটি সিঁড়ি কোথায় গিয়ে থামছে, একটি দরজা কোথায় খুলছে, একটি ছায়ার ভিতরে আসলে কে দাঁড়িয়ে আছে—তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই অসম্পূর্ণতাই দর্শককে ছবির ভিতরে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। ছবির অর্থ তখন শিল্পীর হাতে সম্পূর্ণ থাকে না; দর্শকের চোখও তার অংশ হয়ে যায়। এযেন গগনেন্দ্রনাথিয় আধুনিকতা। আধুনিক শিল্পের একটি বড় পরিবর্তন ছিল—শিল্পী আর দর্শককে সবকিছু বলে দেবেন না। দর্শককে ভাবতে হবে, সন্দেহ করতে হবে, নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে। গগনেন্দ্রনাথের অনেক কাজ সেই দর্শক-অংশগ্রহণের জন্য জায়গা তৈরি করে। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রেও একই ঘটনা ঘটে। কার্টুন দেখে প্রথমে হাসি আসে। তারপর বোঝা যায়, হাসির বিষয়টি খুব আরামদায়ক নয়। যে মানুষটিকে দেখে হাসছি, তার মধ্যে হয়তো নিজেরই কোনো আচরণ লুকিয়ে আছে। ফলে হাসি ধীরে ধীরে আত্মসমালোচনায় বদলে যায়।এই দ্বৈততাই গগনেন্দ্রনাথকে অনন্য করে তোলে।
তিনি ছিলেন একই সঙ্গে রহস্যের শিল্পী এবং সামাজিক ব্যঙ্গের শিল্পী। তিনি ছিলেন জোড়াসাঁকোর মানুষ, অথচ তাঁর শিল্পের দিগন্ত জোড়াসাঁকোর সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি ভারতীয়, অথচ ভারতীয়তার একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে আবদ্ধ করেননি। তিনি পাশ্চাত্য আধুনিকতার ভাষা গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার অনুবাদক হয়ে থাকেননি। তিনি ঐতিহ্যকে জানতেন, কিন্তু ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তিকে শিল্পের শেষ কথা মনে করেননি। সম্ভবত এই কারণেই গগনেন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের পুনরায় ভাবতে হয়। তাঁকে যদি শুধু অবনীন্দ্রনাথের দাদা হিসেবে দেখি, তাঁর শিল্পের অর্ধেক হারিয়ে ফেলব। যদি শুধু রবীন্দ্রনাথের ভাইপো হিসেবে দেখি, তাঁর স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যাবে। যদি শুধু কার্টুনিস্ট বলি, তাঁর কিউবিস্ট ও পরবর্তী আধুনিকতাবাদী অনুসন্ধান অদৃশ্য হবে। আবার শুধু কিউবিস্ট বললেও তাঁর চৈতন্যচিত্র, প্রকৃতি, নগর, মঞ্চ এবং সামাজিক ব্যঙ্গের বিশাল পরিসর আমাদের চোখের আড়ালে চলে যাবে।
গগনেন্দ্রনাথকে আসলে একটিমাত্র পরিচয়ে ধরা যায় না। তিনি ছিলেন এক অনুসন্ধানী শিল্পী। তাঁর শিল্পের ভিতর দিয়ে ভারতীয় আধুনিকতা নিজেকেই প্রশ্ন করেছে—আমরা কী দেখছি? কীভাবে দেখছি? যে মানুষটিকে দেখছি, সে কি সত্যিই সে-ই? যে সমাজকে সভ্য বলছি, তার ভিতরে কতখানি ভণ্ডামি? যে ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আছি, তা কি জীবন্ত, না কি কেবল স্মৃতি? আর যে আধুনিকতার দিকে ছুটছি, তার ভিতরে আমাদের নিজস্ব মুখটি কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর নেই। গগনেন্দ্রনাথও কোনো সহজ উত্তর দেননি। তিনি রেখা ভেঙেছেন, আকার ভেঙেছেন, স্থান ভেঙেছেন, মুখ বিকৃত করেছেন, আলোকে অন্ধকারের ভিতর ঢুকিয়েছেন, আবার অন্ধকারকে আলোয় দৃশ্যমান করেছেন। কখনো চৈতন্যের দিকে তাকিয়েছেন, কখনো কলকাতার রাস্তার দিকে, কখনো জোড়াসাঁকোর সিঁড়ির দিকে, কখনো নিজের সময়ের সমাজের দিকে। প্রতিবারই তিনি দৃশ্যমানের আড়ালে আর-একটি দৃশ্য খুঁজেছেন। তাই গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মনে রাখার সবচেয়ে যথাযথ উপায় হয়তো তাঁকে কোনো একটি ‘ইজম’-এর মধ্যে বন্দি করা নয়। বরং তাঁকে দেখা যেতে পারে একজন শিল্পী হিসেবে, যিনি দৃশ্যমান পৃথিবীর ভিতরে অদৃশ্য মানুষের সন্ধান করেছিলেন।
তাঁর ক্যানভাসের আলো তাই শুধু আলো নয়। তাঁর অন্ধকারও শুধু অন্ধকার নয়। তাঁর জ্যামিতি শুধু জ্যামিতি নয়। তাঁর হাসিও নিছক হাসি নয়। সবকিছুর ভিতরেই যেন আর-একটি জগৎ অপেক্ষা করে আছে। সেই জগৎটি পুরোপুরি দৃশ্যমান নয় বলেই গগনেন্দ্রনাথ আজও আমাদের চোখের সামনে নতুন হয়ে উঠতে পারেন। তাঁর শিল্পের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত এখানেই—তিনি যা দেখিয়েছেন, তার চেয়েও বেশি কিছু দেখতে আমাদের বাধ্য করেছেন। আর সেই কারণেই গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শুধু ঠাকুরবাড়ির একজন শিল্পী হিসেবে নয়, ভারতীয় আধুনিকতার এক স্বতন্ত্র নির্মাতা হিসেবে পুনরায় পড়া দরকার। তাঁর শিল্পের ইতিহাস আসলে একটি শিল্পীর শৈলী পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি এক মানুষের ক্রমাগত নিজের চোখকে বদলে নেওয়ার ইতিহাস। দৃশ্য থেকে অদৃশ্যে, বাস্তব থেকে কল্পনায়, হাসি থেকে অস্বস্তিতে, ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতায়—গগনেন্দ্রনাথের যাত্রা ছিল এক দীর্ঘ অন্তর্গমন। আর সেই অন্তর্গমনের শেষ প্রান্তে হয়তো কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। আছে শুধু একটি আধো-আলো ঘর, একটি অচেনা সিঁড়ি, দূরে মিলিয়ে যাওয়া একটি পথ, আর তার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিল্পীর নীরব চোখ। সেই চোখই গগনেন্দ্রনাথের প্রকৃত শিল্পভাষা।
