১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর সালমান রুশদির ‘দি স্যাটানিক ভার্সেস’ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়, অনেকটা ১৯৫১ সালে নিকোস কাজানৎজাকিসের উপন্যাস ‘দি লাস্ট টেম্পটেশন অফ ক্রাইস্ট’-এর সৃষ্ট বিতর্কের মতোই। কাজানৎজাকিসের কাজটি অনেক খ্রিস্টানকে ক্ষুব্ধ করেছিল যিশুর বিতর্কিত চরিত্রায়ণের কারণে, যেখানে উপন্যাসে যিশুকে এমন সব যৌন কার্যকলাপ ও অন্যান্য আচরণে লিপ্ত হতে দেখা যায় যা অনেক খ্রিস্টানের কাছে আপত্তিকর। ‘দি স্যাটানিক ভার্সেস’ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করে, যার ফলে বই পুড়ে ফেলা, এমনকি একটি হত্যাকাণ্ডও ঘটে।
বিতর্কের বিষয় ছিল নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর স্ত্রীদের কিছু আপত্তিকর চরিত্র কেন্দ্র করে, যেমন একজন দালাল এবং একটি পতিতালয়ে বসবাসকারী বারোজন পতিতার জন্য তাদের নাম ব্যবহার করা। আরেকটি আপত্তিকর বিষয় ছিল যে, মরুভূমিতে হাজেরা ও ইসমাইলকে পরিত্যাগ করার জন্য ইব্রাহিমকে “জারজ” বলা হয়েছিল। ‘দি স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসে রুশদি প্রাক-ইসলামিক আরবের ঐতিহাসিক বিয়গুলি টেনে এনেছেন এবং সেগুলোকে ব্যবহার মাধ্যমে বুঝতে চেয়েছেন যে, ইসলাম প্রাক-ইসলামিক ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় ছিল না, বরং এটি অতীত থেকে একটি তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদ ছিল না, বরং পূর্ববর্তী বিশ্বাস ব্যবস্থা থেকে পরিবর্তনের একটি ধীর প্রক্রিয়া ছিল। এই বিষয়গুলি নতুনভাবে কল্পনা করার মাধ্যমে রুশদি বুঝাতে চেয়েছেন যে, সম্ভাবনার এমন বহুত্ব রয়েছে যা প্রামাণ্য ইসলাম স্বীকার করে না। রুশদির প্রস্তাবিত এই বহুত্ব ইসলামের প্রামাণ্য দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী, যা একরৈখিক ইসলামকে ধারণ করে। এই বিষয়গুলি নবীর পবিত্রতার উপর সন্দেহ সৃষ্টি করে, যা সাধারণ মুসলমানদের মনে ইসলামের সত্যতার সন্দেহ জাগিয়ে তুলতে পারে। এই সন্দেহগুলো বিশ্বাসীদের আস্থা এবং উম্মাহর ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মেটাফিকশন হলো ‘এমন এক ধরনের কল্পকাহিনী যেখানে লেখক উপন্যাসের প্রচলিত রীতি এবং ঐতিহ্যবাহী আখ্যান কৌশলকে ব্যঙ্গ করে বা তা থেকে বিচ্যুত হয়ে কোনো রচনার কৃত্রিমতা বা সাহিত্যিকতার প্রতি সচেতনভাবে ইঙ্গিত করেন।’ Metafiction is fiction about fiction. It means the reader reads the story while the process of writing is being discussed or described by the characters or narrator. The characters know they are in a fictional story, or the author reminds the reader that what they’re reading isn’t real. ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ -এর চরিত্রগুলো এর মেটাফিকশনাল বা উত্তর-আধুনিক আখ্যানকৌশলকে সরাসরি ও গভীরভাবে প্রভাবিত এবং পরিচালিত করে।
উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র—জিব্রিল ফারিশতা এবং সালাদিন চামচা—উভয়ই বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত। জিব্রিল হলেন বলিউডের একজন বিখ্যাত অভিনেতা যিনি পর্দায় দেবতাদের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং সালাদিন হলেন একজন ভয়েস আর্টিস্ট বা কণ্ঠ অভিনেতা। তাদের এই পেশাগত পরিচয়ই ফিকশনের ভেতরের ফিকশনকে ফুটিয়ে তোলে। একজন অভিনেতা বা কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তারা বাস্তব জীবনেও প্রতিনিয়ত নতুন চরিত্র ধারণ করছেন। বিমান দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর যখন জিব্রিল নিজেকে ‘দেবদূত’ এবং সালাদিন নিজেকে ‘শয়তান’ হিসেবে আবিষ্কার করেন, তখন তাদের বাস্তব সত্তা এবং অভিনীত সত্তার মধ্যকার সীমানাটি সম্পূর্ণ মুছে যায়। এটি মেটাফিকশনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে চরিত্রগুলো আসলে একটি আখ্যানের অংশউপন্যাসের একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে জিব্রিল ফারিশতার মানসিক অসুস্থতাজনিত অবচেতনের স্বপ্ন বা বিভ্রম। জিব্রিলের এই স্বপ্নের মাধ্যমেই উপন্যাসের ভেতরে একাধিক সমান্তরাল গল্প বা ‘সাব-প্লট’ তৈরি হয়—যেমন জাহিলিয়া নগরী, পয়গম্বর মাহউন্ড এবং আয়েশার তীর্থযাত্রার গল্প। এখানে জিব্রিল নিজেই একজন দর্শক এবং একই সাথে সেই স্বপ্নের ভেতরের আখ্যানের একজন চরিত্র (দেবদূত গ্যাব্রিয়েল)। একটি চরিত্রের মানসিক জগৎ যখন আরেকটি নতুন ফিকশন বা গল্পের জন্ম দেয়, তখন তা মেটাফিকশনের বহুমাত্রিকতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। মেটাফিকশনে প্রায়শই দেখানো হয় যে চরিত্রগুলো লেখকের তৈরি করা নিয়তি বা কাহিনীর কাঠামোর বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে অথবা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগছে।
জিব্রিল ফারিশতা যখন নিজেকে দেবদূত মনে করতে শুরু করেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন না যে তার এই রূপান্তর বা তার চারপাশের ঘটনাগুলো কি বাস্তব, নাকি ঈশ্বরের লেখা কোনো স্ক্রিপ্ট, নাকি তার নিজের কোনো মানসিক বিভ্রম। চরিত্রটির এই যে নিজের অস্তিত্ব, নিজের ওপর অর্পিত ‘ভূমিকা’ এবং কাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক ধরণের আত্মসচেতনতা ও সংশয়—তা মেটাফিকশনের মূল ধারণাকেই ধারণ করে।
রুশদি এই উপন্যাসে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় রেফারেন্স ব্যবহার করে কিছু সমান্তরাল চরিত্র তৈরি করেছেন (যেমন: মাহউন্ড, বাল ইত্যাদি), যা মূলত জিব্রিলের স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এখানে ‘বাল’ চরিত্রটি একজন ব্যঙ্গাত্মক কবি। সে কাহিনীর ভেতরে বসেই মূল ধারা, ক্ষমতা এবং প্রচলিত আখ্যানকে কবিতার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে। একটি ফিকশনের ভেতরে আরেকটি চরিত্রের মাধ্যমে সাহিত্য বা লেখার শক্তি নিয়ে এই যে কাটাছেঁড়া করা, তা মেটাফিকশনাল ধারণার অন্যতম বড় উদাহরণ। এটি বাস্তব ইতিহাস এবং কাল্পনিক কাহিনীর মধ্যকার দেয়ালটি ভেঙে দেয়। জিব্রিলের স্বপ্নের আখ্যানে ‘বাল’ হলেন একজন ব্যঙ্গাত্মক কবি। তিনি প্রচলিত ক্ষমতা এবং পয়গম্বর মাহউন্ডের আখ্যানকে তাঁর কবিতার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেন। বাল চরিত্রটি আসলে উপন্যাসের ভেতরে একজন “বিকল্প লেখক”-এর ভূমিকা পালন করে। তিনি যখন ফিকশনের ভেতরে বসে নতুন কবিতা বা টেক্সট তৈরি করেন, তখন তা সাহিত্যের ভেতরে সাহিত্যের জন্ম দেয় । শেষ পর্যন্ত বালের মৃত্যুদণ্ড সাহিত্যিক স্বাধীনতার ওপর সামাজিক বা ধর্মীয় আঘাতের এক মেটাফিকশনাল রূপক, যা নিজেই নিজের ভাগ্য নির্ধারণের মতো।
সালাদিন চামচা যখন শয়তানের রূপ নিয়ে সুফিয়ানের হোটেলে আশ্রয় নেয়, তখন সুফিয়ান তাকে দেখে ভয় পাওয়ার বদলে প্রাচীন সাহিত্য ও দর্শনের পাতা উল্টাতে থাকেন। সুফিয়ান চরিত্রটি সালাদিনের অলৌকিক রূপান্তরকে ব্যাখ্যা করতে রোমান কবি ওভিডের ‘মেটামরফসিস’ এবং লুসিয়ানের ক্লাসিক সাহিত্যের উদাহরণ টানেন। একটি ফিকশনের ভেতরের চরিত্র যখন অন্য কোনো বাস্তব বা ঐতিহাসিক সাহিত্যিক টেক্সটের রেফারেন্স দেয়, তাকে মেটাফিকশনে “ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি” বলা হয়। সুফিয়ান পাঠককে মনে করিয়ে দেন যে সালাদিনের এই রূপান্তর আসলে সাহিত্যের একটি সুপরিচিত কৌশল মাত্র।
প্রজাপতিখেকো আয়েশার মক্কা যাত্রার উপাখ্যানে মির্জা সাঈদ একজন আধুনিক, যুক্তিবাদী এবং পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত জমিদার। পুরো আখ্যান যখন একটি অলৌকিক রূপকথার মতো এগোতে থাকে, মির্জা সাঈদ তখন সেখানে একজন “সমালোচক” বা “পাঠক”-এর মতো আচরণ করেন। তিনি আয়েশার তৈরি করা জাদুকরী গল্প বা ফিকশনকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেন এবং যুক্তি দিয়ে তা ভাঙার চেষ্টা করেন। একটি কাহিনীর ভেতরে কোনো চরিত্র যখন সেই কাহিনীরই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তা আখ্যানের মেটাফিকশনাল সচেতনতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অ্যালি হলেন একজন পর্বতারোহী, যিনি এভারেস্ট জয় করেছেন। তিনি জিব্রিল ফারিশতার প্রেমিকা এবং তাকে অলৌকিক বিভ্রম থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। জিব্রিল যখন নিজেকে সিনেমার পর্দা, বাস্তবের রূপান্তর এবং স্বপ্নের গোলকধাঁধায় হারিয়ে ফেলেন, অ্যালি তখন তাঁর জীবনের “বাস্তব পৃথিবীর পরিচালক” হিসেবে কাজ করেন। জিব্রিল তাঁর স্বপ্নের ফিকশন থেকে জেগে উঠে অ্যালির কাছে বাস্তবের প্রমাণ খোঁজেন। অ্যালি চরিত্রটি উপন্যাসে ফ্যান্টাসি এবং রূঢ় বাস্তবতার মধ্যবর্তী সীমারেখাটি চিহ্নিত করে মেটাফিকশনের কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে।
জাহিলিয়া নগরীর একটি পতিতালয়ের বারো জন নারী নিজেদের পরিচয় গোপন করে পয়গম্বরের বারো জন স্ত্রীর ছদ্মনাম ধারণ করে। এই চরিত্রগুলো আক্ষরিক অর্থেই রোল-প্লে বা “অভিনয়ের ভেতরে অভিনয়” করে। তারা যখন অন্য ঐতিহাসিক চরিত্রদের নাম ও পরিচয় নিজেদের ওপর আরোপ করে, তখন আসল পরিচয় এবং নকল পরিচয়ের মধ্যকার পার্থক্য মুছে যায়। ফিকশনের ভেতরে চরিত্রদের এই সচেতন রূপবদল মেটাফিকশনের অন্যতম প্রধান কৌশল।
সংক্ষেপে বলা যায়, রুশদি তাঁর কোনো চরিত্রকেই স্রেফ গল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করেননি। সুফিয়ানের দর্শনচর্চা, বালের কবিতা কিংবা পতিতাদের ছদ্মনাম—সবকিছুই পাঠককে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে তারা একটি অত্যন্ত জটিল, সচেতন এবং কৃত্রিম সাহিত্যিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যা মেটাফিকশনের মূল শর্ত।
Magical realism is a genre of literature that depicts the real world as having an undercurrent of magic or fantasy. Magical realism is a part of the realism genre of fiction. এই ধারার রচনায় গল্প বা উপন্যাসের জগতটি বাস্তব পৃথিবীর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে, তবে অলৌকিক বা ফ্যান্টাসি উপাদানগুলোকে এই জগতে খুবই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। রূপকথার মতোই, ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম ঘরানার উপন্যাস এবং ছোটগল্পগুলো কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যকার সীমারেখাকে আবছা করে দেয়।
সালাদিন চামচা চরিত্রটির ওপর জাদু বাস্তবতাবাদের প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং তীব্র। বিমান থেকে অলৌকিক পতনের পর সালাদিনের শরীরে শয়তানের বাহ্যিক রূপ প্রকাশ পায়। তার মাথায় শিং গড়ায়, পা দুটো ছাগলের খুরের মতো হয়ে যায় এবং শরীর লোমশ হয়ে ওঠে। এই দানবীয় রূপ ধারণ করার পরও সালাদিন একজন সাধারণ মানুষের মতোই চিন্তা করে। সে লন্ডনের হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং পুলিশ তাকে একজন অদ্ভুত দেখতে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গ্রেফতার করে। এখানে জাদুকরী রূপান্তরটি বাস্তব পৃথিবীর বর্ণবাদ, বৈষম্য এবং পরিচয় সংকটের সাথে মিশে গেছে।
জিব্রিল ফারিশতা চরিত্রটি বাস্তব এবং অতিপ্রাকৃতিক জগতের মধ্যকার সীমানা সম্পূর্ণ মুছে দেয়। সালাদিন যখন শয়তানের রূপ নেয়, জিব্রিলের মাথার পেছনে তখন দেবদূতের মতো আলোর আভা দেখা দেয়। মানুষ তার মধ্যে অলৌকিক ক্ষমতার সন্ধান করতে শুরু করে। জিব্রিল নিজেই বুঝতে পারে না সে কি একজন সাধারণ মানুষ (অভিনেতা), নাকি সত্যিই সে ঈশ্বরের দূত গ্যাব্রিয়েল। তার এই মানসিক দ্বান্দ্বিকতা বা বিভ্রম পুরো উপন্যাসে জাদুকরী আবহ তৈরি করে। সে বাস্তবে লন্ডনের রাস্তায় হাঁটে, আবার একই সাথে অবচেতনে সে প্রাচীন জাহিলিয়া নগরীতে পয়গম্বরের সাথে কথা বলে। চরিত্রটির এই দ্বৈত সত্তাই ম্যাজিক রিয়েলিজমের মূল ভিত্তি।
জিব্রিলের স্বপ্নের মাধ্যমে অবতীর্ণ হওয়া তরুণী ‘আয়েশা’ চরিত্রটি জাদু বাস্তবতাবাদের এক নিখুঁত উদাহরণ। আয়েশা সাধারণ কোনো খাবার খায় না, সে কেবল জ্যান্ত প্রজাপতি খেয়ে বেঁচে থাকে এবং তার সারা শরীর সবসময় হাজার হাজার উজ্জ্বল প্রজাপতি দিয়ে ঢাকা থাকে। তার এই জাদুকরী রূপ এবং মক্কায় হেঁটে যাওয়ার অলৌকিক দাবি পুরো গ্রামের মানুষের বাস্তব মনস্তত্ত্বকে বদলে দেয়। গ্রামের মানুষ তার এই অবাস্তব সত্তাকে কোনো ভয় বা অবিশ্বাস ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও স্বর্গীয় বলে মেনে নেয়, যা ম্যাজিক রিয়েলিজমের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
রোজা ডায়মন্ড হলেন এক বয়স্কা ব্রিটিশ নারী, যাঁর সমুদ্রতীরবর্তী বাড়ির সামনেই জিব্রিল এবং সালাদিন আকাশ থেকে এসে পড়েছিলেন। জিব্রিল ফারিশতার সান্নিধ্যে আসার পর এই বৃদ্ধা চরিত্রের স্মৃতিগুলো জাদুকরীভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠে। তিনি বর্তমান সময় থেকে অতীতে, তাঁর তরুণী বয়সের আর্জেন্টিনা জীবনের দিনগুলোতে ফিরে যান। চরিত্রটির কাছে অতীত এবং বর্তমানের কোনো পার্থক্য থাকে না; জাদুকরী উপায়ে তাঁর অবদমিত ইচ্ছা ও যৌবন যেন আবার ফিরে আসে।
সালাদিন চামচা যখন শিং ও খুরওয়ালা শয়তানের রূপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন লন্ডনের ‘শাফতার হোটেল’-এর মালিক সুফিয়ান পরিবার তাকে আশ্রয় দেয়। সালাদিনের এই ভয়াবহ রূপ দেখে সুফিয়ান এবং তাঁর স্ত্রী হিন্দ কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি বা অলৌকিক ভয় পাননি। বরং হিন্দ তাকে একজন ‘অসুস্থ বা পঙ্গু’ অতিথির মতো বিবেচনা করে তার জন্য বিছানা ঠিক করে দেন এবং সুফিয়ান তার এই পরিবর্তনের পেছনে প্রাচীন গ্রীক দর্শনের রূপান্তরের তত্ত্ব খুঁজতে থাকেন। অলৌকিক একটি দানবকে খুব সাধারণ পারিবারিক ও লৌকিক আবহে মেনে নেওয়ার এই মানসিকতাই হলো খাঁটি জাদু বাস্তবতাবাদ।
সুফিয়ানের মেয়ে জিশান এবং লন্ডনের অভিবাসী কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় তরুণেরা যখন সালাদিনের এই শয়তানের রূপটি দেখতে পায়, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। তারা এই শয়তানের রূপকে কোনো অশুভ বা অপদেবতা হিসেবে দেখেনি। তৎকালীন লন্ডনের বর্ণবাদী পুলিশ এবং শ্বেতাঙ্গ সমাজের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সালাদিনের এই পৈশাচিক রূপকে তারা “প্রতিরোধের প্রতীক” হিসেবে গ্রহণ করে। এমনকি লন্ডনের তরুণরা সালাদিনের সম্মানে মাথায় নকল শিং পরা ফ্যাশন শুরু করে দেয়। একটি অবাস্তব দৈহিক রূপান্তর কীভাবে রাতারাতি বাস্তব সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তা এখানে জাদুকরীভাবে দেখানো হয়েছে।
সালাদিনের ব্রিটিশ স্ত্রী পামেলা যখন জানতে পারে যে তার স্বামী বিমান দুর্ঘটনায় মারা যায়নি, বরং বেঁচে আছে এবং একটি অদ্ভুত পশু বা শয়তানের রূপ ধারণ করেছে, তখন তার প্রতিক্রিয়াও ছিল জাদুকরী ও মনস্তাত্ত্বিক। পামেলা অলৌকিক ঘটনায় চমকে যাওয়ার চেয়ে নিজের বাস্তব জীবনের পরকীয়া এবং সালাদিনের সাথে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিল। সালাদিনের এই অতিপ্রাকৃতিক রূপান্তর পামেলার কাছে তাদের বৈবাহিক জীবনের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা ও রূপক দূরত্বের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
জিব্রিলের স্বপ্নের ভেতর ‘আয়েশা’র মক্কা অভিযানের গল্পে মির্জা সাঈদ একজন ধনী ও যুক্তিবাদী জমিদার। আয়েশা যখন প্রজাপতি খেয়ে বেঁচে থাকে এবং পুরো গ্রামের মানুষকে নদী-সাগর পায়ে হেঁটে পাড়ি দেওয়ার অলৌকিক স্বপ্ন দেখায়, তখন মির্জা সাঈদ একমাত্র চরিত্র যে এই জাদুকে বিশ্বাস করতে চায় না। সে তার বিলাসবহুল মার্সিডিজ গাড়ি নিয়ে এই তীর্থযাত্রীদের পিছু নেয়। কিন্তু জাদুকরী বাস্তবতা এতটাই শক্তিশালী যে, শেষ পর্যন্ত সাগরের পানি যখন দুই ভাগ হয়ে যায়, তখন তার এই যুক্তিবাদ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বাস্তব ও অবাস্তবের এই লড়াই চরিত্রটির মনস্তত্ত্বকে পুরোপুরি বদলে দেয়।
জিব্রিলের অবচেতনের স্বপ্নে ঐতিহাসিক চরিত্রেও জাদুর প্রভাব স্পষ্ট। কবি বাল যখন পয়গম্বরের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লেখে এবং পরে পতিতালয়ের বারোজন নারীর সাথে ছদ্মনামে লুকিয়ে থাকে, তখন সেই পতিতালয়ের নারীরা পয়গম্বরের স্ত্রীদের রূপক চরিত্র ধারণ করে। এই রূপান্তরের পেছনে কোনো জাদুদণ্ড ছিল না, কিন্তু আখ্যানের খাতিরে চরিত্রগুলোর পরিচয় যেভাবে বদলে যায় এবং জিব্রিল যেভাবে ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর হয়ে তাদের সাথে কথা বলে, তা ইতিহাসকে এক ধরণের জাদুকরী ফিকশনে রূপান্তর করে।
ম্যাজিক রিয়েলিজমের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, অলৌকিক কিছু ঘটলে চরিত্রগুলো ভূত দেখার মতো চমকে যাবে না বা একে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেবে না। ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’-এর চরিত্রগুলো ঠিক তা-ই করে। সালাদিন যখন শিং গজানো শয়তান হয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন লন্ডনের অন্য প্রান্তিক বা কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্রগুলো তাকে দেখে ভয় পাওয়ার বদলে তাঁর এই রূপকে শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি ‘প্রতীক’ হিসেবে উদযাপন করতে শুরু করে। চরিত্রগুলোর এই রূপান্তর ও আচরণ প্রমাণ করে যে, রুশদি এখানে জাদুকে কেবল অলৌকিকতা দেখানোর জন্য ব্যবহার করেননি, বরং চরিত্রগুলোর ভেতরের বিচ্ছিন্নতা, অভিবাসী জীবনের যন্ত্রণা এবং আত্মপরিচয়ের জটিল মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করার জন্য ব্যবহার করেছেন।
সংক্ষেপে, রুশদির এই উপন্যাসে কোনো চরিত্রই জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সাধারণ মানুষ, যুক্তিজীবী বা বর্ণবাদের শিকার হওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—প্রত্যেকের জীবনেই এই জাদুকরী উপাদানগুলো বাস্তবতার একটি সমান্তরাল সত্য হিসেবে ধরা দিয়েছে।
সংক্ষেপে, ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’-এ জাদু বাস্তবতাবাদ কেবল একটি অলংকার নয়; এটি এমন এক শৈল্পিক মাধ্যম যার সাহায্যে লেখক অভিবাসন, নির্বাসন, ধর্ম, বিশ্বাস এবং আধুনিক মানুষের খণ্ডিত সত্তার জটিল বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।



