পর্ব-২
আমাকে যেদিন আনা হল এ বাড়িতে, সেদিন কি প্রবল বৃষ্টি। রাস্তায় জমে যাওয়া এক হাঁটু জল। মায়ের পায়ের কাছ থেকে একটা জলঢোরা সাপ সরে গেল নিমেষে। মনে হচ্ছিল, এত জল যেন সেই অন্ধকার ঘরটার মত ভাসিয়ে নিতে এসেছে আমাকে। চারদিক জলে থৈ থৈ, আমি সেই জলে ভেসে বেড়াচ্ছি। আর ভাসতে ভাসতে টের পাচ্ছি মায়ের ধুকপুক-ধুকপুক শব্দ। টের পাচ্ছি মায়ের সাঁতরে পাড়ে ওঠার চেষ্টা, আর দুহাত দিয়ে আমাকে জাপটে ধরে রাখা।
এখন অবশ্য চোখ মেলে দেখছি কোথায় জল? দেখছি, আমাদের নতুন ঘর। দেখছি, আমাকে দেখে সেই প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও কারা যেন ছুটে এসেছে শুধু একবার দেখবে বলে। সবাই দেখছে আমার হাত, পা, চোখ, মুখ। সবাই দেখতে চাইছে আমার গায়ের রং। আমি কতটা উজ্জ্বল। আর অবাক হচ্ছে আমার সঙ্গে বাবার এতটা মিল দেখে। কেউ কেউ বলছে, বাবা নাকি ছোটোবেলায় একদম ঠিক আমারই মত। মানে সেই একই রকম হাত-পা, একই রকম চোখ-মুখ, একই রকম গায়ের রঙ।
আমি কী তাহলে বাবার ছেলেবেলাতে ফিরে যাচ্ছি? বাবার শৈশব। জন্ম নিয়েই কেমন দুরন্ত বাবা। জন্ম নিয়েই ভয়ঙ্কর তেজ।
মা আমাকে বকুনি দিয়ে গেছে কয়েকবার। বলে গেছে, একদম যেন দুষ্টুমি না করি। এমনকি ভুলেও যেন রেললাইনের ওদিকে দৌড়ে না যাই। রেললাইন জুড়ে নাকি এখনও ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ। ভাঙা দোকানগুলি ঘিরে বর্ষায় তৈরি হওয়া শ্যাওলা আর ঝোঁপ-জঙ্গল। কেমন পরিত্যক্ত নগর। স্টেশনটাও আগের চেয়ে ফাঁকা। শুধু ট্রেন আসার আগে মাইকের ঘোষণা। ট্রেন চলে গেলে আবার একা নীরব।
এই নীরব প্লাটফর্ম যখন সচল ছিল, একদিন এই স্টেশনে এসে নেমেছিল বাবা। চারদিকে তখন কত দোকানপাট। রেল কলোনি ধরে এগিয়ে এসে বস্তির মুখে প্রথমবার দেখা হয়েছিল মায়ের সঙ্গে। মায়ের তখন কতই বা বয়স। সেই যে চোখেচোখে ভাব। এক দৌড়ে ছুটে গিয়েছিল মা।
তারপর তো কতদিন রেললাইন ধরে শুধু হেঁটে যাওয়া। কখনও রেললাইন পেরিয়ে ফাঁকা মাঠ। কখনও লোক ভর্তি সিনেমা হল। একবার তো কোথা থেকে মায়ের জন্য নতুন চুড়ি এনে দিয়েছিল বাবা। মা অবশ্য বাড়িতে এসে দেখায়নি কাউকে। বলেওনি সেকথা। লুকিয়ে রেখেছিল টিনের বাক্সে।
যেদিন বিয়ে হল, মানে সেই যে পালিয়ে গিয়ে মন্দিরে যাওয়া। সেদিন বাক্স খুলে চুড়ির সঙ্গে জমানো দুশো টাকাও নিয়েছিল মা। বাবা বলেছিল, ও টাকা আমি কিছুতেই নিতে পারবো না।
মা বলেছিল, কেন? আমি কি কিছু দিতে পারি না তোমাকে?
বাবা বলেছিল, অতকিছু জানি না। ওটাকা তোমার কাছেই রেখে দাও।
মা বলেছিল, ঠিক আছে। যখন লাগবে, চেয়ে নেবে কিন্তু।
কলোনিতে আগুন লাগার দিন মায়ের টিনের বাক্সটা বার করা যায়নি। আগুনে ঝলসে গিয়ে একেবারে দলাপাকিয়ে গিয়েছিল। কত কেঁদেছিল মা। বাবাকে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, তুমি যদি সেদিন টাকাটা নিয়ে নিতে–।
বিয়ের পর পার্টি অফিস থেকে যখন একটা দোকানের ব্যবস্থা হল, সেদিন থেকে বলা যায় বাবার সংসারি হওয়া শুরু। ভালোই চলছিল দোকানটা। এমনকি রবিবার ছুটির দিনে মায়ের কথা না-শুনে দিব্বি দোকান খুলে বসে থাকতো বাবা। কি এক নেশা যেন। কতদিন গেছে, বাবা দোকান খুলে বসে থেকেছে শুধু বেঁচাকেনা নয়, লোকজন দেখবে বলে। প্লাটফর্ম জুড়ে কত লোকের চলাফেরা। এই দেখার মধ্যে যে কি এক আনন্দ!
এখন ফাঁকা প্লাটফর্মটায় এসে দাঁড়ালে চারপাশের লোকগুলোকে বড্ড নীরব মনে হয়। মনে হয়, কারও মুখে কোনও কথা নেই। এমনকি মুখোমুখি দাঁড়ালেও না। যেন সব কথা ফুরিয়ে গেছে কতকাল আগে।
এখন রাত বাড়লে মা আমাকে আরও জড়িয়ে নিতে চায়। আমি কিন্তু মায়ের জড়িয়ে ধরা হাত গলে ঠিক বাবার কাছে পৌঁছে যাই। দেখি একটা গভীর রাত কিভাবে বাবার মাথার উপর দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে। দেখি, দোকান হারিয়ে বাবা এখন এই রাত জাগা নতুন কাজটায় ঢোকার পর, সারারাত কিভাবে যে কেটে যায়। গোটা রাত জুড়ে উড়ে বেড়ায় গ্রহ-তারা-নক্ষত্র। গোটা রাত জুড়ে বাবার মাথার উপর দিয়ে সরে যাওয়া চাঁদ। আকাশের দিকে তাকিয়ে কি খুঁজতে চায় বাবা? চারপাশে কেমন এলোমেলো বাতাসের চলাফেরা। দূরে কোথাও পাখির ডাক। নাকি হঠাৎ অচেনা ফুলের ভেসে আসা গন্ধ। লক্ষ্য করি, এসবের কিছুই তো চায় না বাবা। শুধু কারখানার উঁচু পাঁচিল ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটু পরপর শুনিয়ে যায় লম্বা বাঁশির ডাক।
কদিনেই বাবা কেমন শুকিয়ে গেছে অনেক। কেমন সারাদিন উদাস উদাস। দেখা হলেও কম কথা বলে। অবশ্য এখন বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়ও কমে এসেছে আমার। একমাত্র এই রাতে মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে থাকার ভেতর ছাড়া। একমাত্র এই সময় বাবার সেই উঁচু পাঁচিল ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুখে বাঁশি। লম্বা শ্বাস নিয়ে ফুঁ দিয়ে যাওয়া। একমাত্র আমি তখন বাবার কাছাকাছি। একেবারে বাবার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটি। বাবা কি টের পায় আমায়? আমায় পেয়ে কেমন নিশ্চিন্তে এগিয়ে যায়!
কোম্পানি থেকে যেদিন বাঁশিটা পেয়েছিল বাবা, সেদিন প্রথমবার ফুঁ দিতে গিয়ে আমার কথাই ভেবেছিল নিশ্চয়ই। ভেবেছিল আমার হাতে বাঁশিটা তুলে দিয়ে, সেই যে আমি এক দৌড়ে বড় রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে যাবো। তখন যে আমি অন্য কেউ। এমনকি বাঁশির শব্দে থামিয়ে দেবো রাস্তার সমস্ত গাড়িগুলো। লোকজন সবাই ঘুরে দেখবে আমায়। পরে অবশ্য মা এসে আমাকে নিয়ে আসবে সোজা কান মলে। বকুনি দিয়ে হাত থেকে কেড়ে নেবে বাঁশিটা। আর সব দোষ দেবে বাবাকে। ডেকে বলবে, তোমার জন্যই ছেলেটা দিন দিন—।
আমি অবশ্য দিনদিন বড়ই হচ্ছি। নাহলে কেন বলুন তো শুধুমাত্র সেই বাঁশির শব্দে সোজা খেলার মাঠে পৌঁছে যাবো হঠাৎ। বল নিয়ে ছুটবো এমাথা-ওমাথা। দেখবো আমার দুপায়ের সঙ্গে বলও ছুটছে কেমন। দেখবো আমার চারপাশে অন্যরাও ছুটছে তখন। ছুটতে ছুটতে ছিটকে পড়ছে কেউ কেউ। আমি অবশ্য গোলবক্সের একদম সামনে, ঠিক তখনই লম্বা বাঁশির ডাক—। দেখবো ছিটকে পরে যাচ্ছি আমি। আর আমার পায়ের বল সোজা গড়িয়ে যাচ্ছে গোলপোস্টের ভেতরে।
কতদিন লাফিয়ে উঠবো নিজেকে নিজের গোল হওয়া দেখে। মা বলবে, কিরে কি হলো তোর? আবার সেই স্বপ্ন নাকি! বলেই মা কেমন জড়িয়ে নেবে আমায়।
আমি অবশ্য এই বাঁশির জন্যই স্কুলে দৌড়বো। স্কুল বলতে প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমগাছের তলায় টিন দিয়ে ঘেরা গোল ঘর। হাতে বাক্স ভর্তি বই-খাতা আর মায়ের হাতে বোনা রঙিন আসন। মাটিতে সেই আসন পেতে সারা দুপুর লেখাপড়া। আমার অবশ্য মন পরে থাকবে লেখাপড়ার চেয়ে ওই খোলা মাঠটার দিকে। কখন যে বল নিয়ে ছুটবো সেই মাঠ জুড়ে। কখন আমার ছোটাছুটি দেখে বন্ধুরাও এসে জুটবে। বলবে, দে, বলটা আমায় দে—। আর সেই বল নিয়ে কাড়াকাড়ির ভিতরে আমি শুনবো একটা লম্বা বাঁশি বাজিয়ে কে যেন বলবে, মিমাংসা তো কিছুই হল না এতক্ষণে, তাহলে এবার যে টাইব্রেকারে যেতে হবে।
আমি দেখবো টিভির পর্দা জুড়ে তখন রাতজাগা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখার দৃশ্য। পেনাল্টি যে মিস করবে, সেই দলের হাতছাড়া হবে বিশ্বকাপ। দেখবো, এক একটা শট্ কি নিঁখুতভাবে জালে ঢুকিয়ে দিচ্ছে সবাই। অথচ কেমন অবাক করে দিয়ে বিখ্যাত সেই স্ট্রাইকার, যার নামে হাজার হাজার ফুটবল ভক্ত, সেই কেমন বোকার মত সহজ গোলটা মিস করে বসবে। কি দুর্বল শট্। কি অসম্ভব একটা অঘটন। দেখবো, কিভাবে মাঠে শুয়ে পরে কাঁদবে সে।
আমিও যেন কাঁদছি হঠাৎ। এমনকি এখন বিকেলের পর মাঠ জুড়ে কেউ নেই তাও। সবাই ফিরে গেছে যে যার ঘরে। সন্ধের মুখে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসে গেছে কেউ কেউ। বাবা ডিউটিতে চলে গেছে আমার মাঠে আসবার অনেক আগেই। আর সেই থেকে আমার কানে শুধুই বাঁশির শব্দটা বেজেই চলেছে। আমি একবার উঠে দাঁড়াচ্ছি। একবার বসছি। একবার হঠাৎ দৌড় শুরু করছি আবার। আমার মনে হচ্ছে বাবা যেন বারবার বাঁশি বাজিয়ে আমাকে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে পরপর।
যেভাবে নির্দেশ দেয় পণ্ডিতস্যার। হাতে লাঠি উঁচিয়ে ছুটে আসে বারবার। ভুল শুধরে দিতে কখনও কখনও বেতের দু-এক ঘা। কতদিন পণ্ডিতস্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্কুল পালিয়ে একা একা মাঠে চলে গিয়েছি। সারাটা দুপুর, বিকেল পেরিয়ে সন্ধের মুখে মাঠে শুয়ে শুয়ে, সামনে বিস্তীর্ণ আকাশ। অজস্র গ্রহ-তারা-নক্ষত্রে ভরা। আমি খুঁজছি সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটাকে। যার আলো একইভাবে পৌঁছে যাচ্ছে বাবার কাছে। বাবাও মাথা উঁচু করে দেখছে সেই আলোটাকে।
মা অবশ্য আমাকে খুঁজে না পেয়ে সারাটা পাড়া বেড়িয়েছে এতক্ষণ। এবাড়ি-সেবাড়ি, উঠোন, বাগান পেরিয়ে মাঠ। মাঠের মাঝখানে একা আমাকে খুঁজে পেয়ে কান ধরে ঘরে নিয়ে এসেছে।
বলছে, ব্যাপারটা কি শুনি? লেখাপড়া, স্নান, খাওয়া-দাওয়া কিছুই কি লাগবে না? সারাদিন শুধু টই-টই করেই চলবে।
আমি তখন অন্য আমি। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে যেন কিছুই বুঝতে চাই না।
মা অবশ্য বলেই যাবে, দাঁড়া তোর বাবা ফিরুক এবার–।
বাবা তাহলে সত্যি সত্যি ফিরবে? মায়ের কথায় আমি ভয় না পেয়ে বরং আনন্দে যেন একটা লাফ দিতে চাই। যেন মাকে জড়িয়ে ধরে জানতে চাই, বাবা কবে ফিরবে প্লিজ বলো না মা, প্লিজ?
মা যেন আমার কথার কিছুই টের পায় না। শুধু ভাত বেড়ে দিয়ে নিজের মত করে উল বুনতে বসে যায়। পুজো পেরোলেই শীত। বাবার জন্য শোয়েটার বুনছে মা।
(ক্রমশ…)



