রমণরাক্ষুসী কৌতুক
১৭
এখনো আমার কাছে নামমাত্র কিছু চিঠিপত্র
আসে; কেন আসে? আমি ব্যক্তিগতভাবে এইসব
চাইনি কখনো, তাই খুলে দেখবার প্রয়োজন
বোধ করি না;— যতিহীন দীর্ঘ চিঠিটি কে লিখেছিল?
ভুল বানানের পর ভুল কিছু বাক্য জুড়ে দিয়ে
অজস্র আক্ষেপ আর যথাস্থানে লিখেছিল, ‘আমি
নিপীড়িত, সিঁড়ি ভেঙে শুধুমাত্র ছ’তলায় উঠে
পড়ি, কোনো-কোনোদিন অন্ধকারে কুমিরশাবক
হয়ে ডেকে তুলি, যেন আমাকেই, মন্দাক্রান্তা ছন্দে’
কাউকে উত্তর লিখি নি, তবু, একই ব্যক্তিদের
তীক্ষ্ণ তিরস্কারমাখা চিঠিপত্র রোজ আসে, ঘরে।
ওগো হিমালয়কন্যা, তোমার ব্রাউন অট্টহাসি,
দেখে নিও, একদিন আমি গ্রাস করে নিরুদ্দেশে
চলে যাবো। এইসব চিঠিপত্র তবু খুলবো না!
কবিতার মেরামতি
তারপর সেই বনমানুষের ফোয়ারা বেলুন দৌড় ত্রিপল সীমানায় ত্রৌঞ্চদ্বীপের মতো বিদ্যালয় বৃত্তিহীন পল্লবিত স্বপ্নে আজকাল তাকে চিরবিপন্ন ভোরের নিকুঞ্জ আলোয় দেখি সই লো সে-কি নিরুদ্দেশ প্রজ্ঞা কিংবা মুছে যাওয়া রক্তাপ্লুত আকাশের অলংকার অন্ধকার ঘাসের কৌতূহলী লণ্ঠনে মাথা গুজে আছে ভারী তামার এস্রাজ পাশেই গেরুয়া আতাগাছ ফাঁকা উদ্যানে সরল কবিতার ক্লাস শেষ ট্রাম কিংবা তার সেই দুরন্ত টেবিলে সাক্ষী গোপাল কালো নদীর শুভ্র গহ্বরে অনেক ধরনের মৎস্যলীলা নাচ ও ফুর্তি মহাজাগতিক ক্লান্ত হাওয়ায় চিত্রিত জলের ওম এবং যা কিছু বিয়োগে বর্ষাকাতর তাই নির্নিমেষ প্রীতম উত্তরপূর্বে তারই অণুসূর্যের অভিজ্ঞান সই লো চলো নিরক্ষর মন অক্ষরে মুখরিত করি তারপর স্থির শকটে লুকিয়ে দেখি কতটা স্ট্যাচু হতে পারে ওই সিকান্দার আর কতটা এই গলিত সময়ে এসেও আখ্যানে লেজ গুটিয়ে বসে পড়ে কবি সই লো চলো দেখে আসি
মূর্ছিত মুকুরের ভৌতনাচ
গগনশিরীষের ভেতর আজ অনেক রকম মূর্খমীনমেঘ জমে আছে। যে স্তিমিত নয়, ওই হস্তিমালিকা, সেও দেখছে এইসব। অথচ আমি অগ্নিগিরি সব উপহাস্য মেনে নিয়েছি। তাই বর্ণবসন্তের বহ্নি কুন্তল স্পর্শে বীতগন্ধ সংকেতে ছড়িয়ে পড়ছে। উচ্ছ্বাস-উত্তালে সবদিকে কুণ্ডলিত নির্বিকার প্রশ্নমালা উঠছে ভেসে। কিন্তু কে যায় আজও খণ্ডিতহৃদয়মালা পেরিয়ে সেই আখ্যানস্বপ্নের নীল পরিধি বুঝে শঙ্খসুরে বিবাহপ্রস্তাবের দেশে? আমি নিরীহ নিশ্চেতন, অকালে চলে যাবো শকুন সূর্যের প্রাক-রৌদ্র পাঁজরে! আমাদের কল্পনা, গান তিথিডোরে হবে ব্যাপ্ত; সকল চতুর্দশপদী খেলা তাই হৃদয়ে অন্তঃজ করে নিয়েছি। আজকাল দেখি মননমুঞ্জরী পাখি উড়ে যায় ঋষিপর্বতের সানুতলে কিংবা ভগ্নযুবকের ধর্ষকাম জাগে রাত্রিরতিকুসুমের আগমনেও। কী যে সেই মূর্ছিত মুকুরের ভৌতনাচ, তুমি বুঝবে না; আজ বুঝি উন্মত্ত-মধ্যমায় এই সৃষ্টি নির্মেদ ঝড় সহসা একদিন ভেঙে যাবে। তবুও সন্ধ্যার বাষ্প-সৈকতে জ্যোতির্ময় বর্মকণাগুলি সেই গার্হস্থ্য পরিমণ্ডলে ডাকে, আমি শুষ্ক সমতলে চিন্তাশূন্য পথিকের মতো সনাতন ধ্বনি তুলে দিগন্তের সকল ডাইনি নক্ষত্রের সাথে উদাত্ত সঙ্গমের কথা ভাবি।
ভাস্কর্য
পাথরটি দাঁড়িয়েছে এক ন্যুব্জ মানুষের মতো;
শহরের বারোতম মিনারের কাছে, হাত তুলে—
আমরা দেখছি, খালি পায়ে উপদ্রবহীন মাঠে,
শরীর ঘামছে, আর হৃদয় ত্রিপলবৎ দেহে
লুকিয়ে রয়েছে। তবু আমরা দেখছি পাথরটি।
হায় সে তো কিছু বলে না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকে; যেন
একদল ফুর্তিবাজ মশাল মানুষ, আকাঙ্ক্ষিত
আলো পেয়ে ছুটে আসে অন্ধকার মুছতে সেই
পাথরের কাছে, জেগে ওঠে তাদের শরীরে ক্রোধ—
ক্রোধের আশ্চর্য রেণু, পরমাণু ও বিবিধ শক্তি।
তারা সকলে বুঝতে চায় পাথরটি কেন স্তব্ধ!
কেন স্তূপীকৃত এই শহরে মানুষ হতে চায় ওই
ন্যুব্জ মানুষের মতো পাথরটি? আমরা কী তার
দাঁড়িয়ে থাকার মৌলিক ভঙ্গিটি অনুকরণ করছি!
