শৈলজানন্দ রায়
জন্ম ১৪ নভেম্বর ১৯৬৭। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। লেখালেখি করেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সমালোচনা।
প্রকাশিত বই:
– হায় অনন্ত জলবহ্নি (কাব্যগ্রন্থ, শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০৩)
– অন্ধকার বিষয়ক (গল্পগ্রন্থ, শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০৩)
– মৎস্যবতীর জলবাস কিংবা বনবাস (গল্পগ্রন্থ, অন্যপ্রকাশ, ২০০৪)
– জেন্ডার বিশ্বকোষ (যৌথ রচনা, সম্পাদনা সেলিনা হোসেন ও মাসুদুজ্জামান, মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৬)
– মোবারকের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নগুলি (গল্পগ্রন্থ, দোয়েল প্রকাশনী, ২০১৮)
– বাঁশী ও বাঁশের কথকতা (কাব্যগ্রন্থ, দোয়েল প্রকাশনী, ২০১৮)
– নৈঃশব্দ্যমুখী অন্তর্দাহরা (কাব্যগ্রন্থ, বেহুলাবাংলা প্রকাশনী, ২০২২)
– ধরো, শূন্য (কাব্যগ্রন্থ, বেহুলাবাংলা প্রকাশনী, ২০২৩)
প্রকাশিতব্য:
নৌকাবাড়ি (গল্পগ্রন্থ), আয়নাপুরাণ (উপন্যাস), হয়তো বিষণ্ন ত্রিভুজ (কাব্যগ্রন্থ)।
সম্পাদনা করেন সাহিত্যপত্র, বরষা।
একজন সৃজনশীল লেখকের মন যে কবিদের কবিতায় বারবার ফিরে যায়, তাঁদের কবিতাই এবারের সংখ্যায় পাঠকের জন্য সাজিয়ে দেওয়া হলো। কবির প্রিয় কবিতার এই সংগ্রহ পাঠকের ভালোবাসার সঙ্গে মিলে যাক।
***
রাত্রি
অমিয় চক্রবর্তী
অতন্দ্রিলা,
ঘুমোওনি জানি
তাই চুপি চুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে
বলি, শোনো,
সৌরতারা-ছাওয়া এই বিছানায়
—সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি—
কত দীর্ঘ দুজনার গেলো সারাদিন,
আলাদা নিশ্বাসে—এতক্ষণে ছায়া-ছায়া পাশে ছুঁই
কী আশ্চর্য দু-জনে দু-জনা—
অতন্দ্রিলা,
হঠাত্ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোত্স্না,
দেখি তুমি নেই।
হায় চিল
জীবনানন্দ দাশ
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে;
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে-উড়ে কেঁদোনাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে।
কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে
বিনয় মজুমদার
কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে।
কৌটার মাংসের মতো সুরক্ষিত তোমার প্রতিভা
উদ্ভাসিত করেছিল ভবিষ্যৎ, দিকচক্রবাল।
সময়ে ভেবেছিলাম সম্মিলিত চায়ের ভাবনা,
বায়ুসেবনের কথা, চিরন্তন শিখরের বায়ু।
দৃষ্টিবিভ্রমের মতো কাল্পনিক বলে মনে হয়
তোমাকে অস্তিত্বহীনা, অথবা হয়তো লুপ্ত, মৃত।
অথবা করেছে ত্যাগ, অবৈধ পুত্রের মতো, পথে।
জীবনের কথা ভাবি, ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে
পুনরায় কেশোদ্গম হবে না; বিমর্ষ ভাবনায়
রাত্রির মাছির মতো শান্ত হয়ে রয়েছে বেদনা-
হাসপাতালের থেকে ফেরার সময়কার মনে।
মাঝে মাঝে অগোচরে বালকের ঘুমের ভিতরে
প্রস্রাব করার মতো অস্থানে বেদনা ঝরে যাবে।
ফিরে এসো, চাকা-৫৫
বিনয় মজুমদার
হৃদয়, নিঃশব্দে বাজো; তারকা, কুসুম, অঙ্গুরীয়—
এদের কখনো আরো সরব সংগীত শোনাবো না।
বধির স্বস্থানে আছে; অথবা নিজের রূপে ভুলে
প্রেমিকের তৃষ্ণা দ্যাখে, পৃথিবীর বিপণিতে থেকে।
কবিতা লিখেছি কবে, দু-জনে চকিত চেতনায়।
অবশেষে ফুল ঝ’রে, অশ্রু ঝ’রে আছে শুধু সুর।
কবিতা বা গান… ভাবি, পাখিরা— কোকিল গান গায়
নিজের নিষ্কৃতি পেয়ে, পৃথিবীর কথা সে ভাবে না।
আসাদের শার্ট
শামসুর রাহমান
গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো, কিংবা সুর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।
বোন তার ভাইয়ের অম্লান শার্টে দিচেছ লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম, কখনো
হৃদয়ের সোনালী তন্তুর সূক্ষতা।
বর্ষিয়সী জননী, সে শার্ট উঠোনের রৌদ্রে
দিয়েছেন মেলে স্নেহের বিন্যেসে।
ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দূর শোভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে, এখন সে শার্ট,
শহরের প্রধান সড়কে সড়কে,
কারখানার চিমনির চুড়োয়,
গমগমে অ্যাভিনুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম,
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র জলোচ্ছি্বত প্রতিধ্বনিময় মাঠে
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।
আমাদের দূর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা,
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।
সোনালী কাবিন
আল মাহমুদ
১
সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিনী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি,
আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি;
ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন,
ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি;
দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন
আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি ।
বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল
পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না;
তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিও সেই ফল
জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা
পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয়না কবিরা;
দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা ।
পরানের গহীন ভিতর
সৈয়দ শামসুল হক
৪
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছান নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।



